পল ফেয়ারব্যান্ড এবং বিরুদ্ধ-আরোহণ
বিজ্ঞান কি সবসময় পরীক্ষা, পর্যবেক্ষণ ও যুক্তির সরল পথে সত্যে পৌঁছয়? পল ফেয়ারব্যান্ড দেখিয়েছিলেন, বিজ্ঞানের ইতিহাসে বহু গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারই প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতি, প্রচলিত তথ্য কিংবা প্রত্যাশিত সিদ্ধান্তের বিপরীতে হেঁটেছে। মিলিকানের তৈলবিন্দু পরীক্ষা, মেন্ডেলিভের পর্যায়সারণী ও রাদারফোর্ডের পরমাণু মডেলের উদাহরণ ধরে এই লেখায় আলোচিত হয়েছে ফেয়ারব্যান্ডের ‘বিরুদ্ধ-আরোহণ’ এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির অন্তর্নিহিত অনিশ্চয়তা।

সংখ্যা ১পরীক্ষা, পর্যবেক্ষণ ও সবশেষে সিদ্ধান্ত—এটাই বৈজ্ঞানিক সত্য নির্মাণের সনাতন পদ্ধতি হিসাবে ধরা হয়। স্বাভাবিকভাবেই একই পরীক্ষা থেকে একই পর্যবেক্ষণের এবং তজ্জনিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সম্ভবনা যতই প্রবল হয় ততই পর্যবেক্ষণটির গ্রহণযোগ্যতা বাড়তে থাকে, বাড়তে থাকে সংশ্লিষ্ট বৈজ্ঞানিক তত্ত্বনির্মাণের সাফল্য। দার্শনিকভাবে এইধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতিকে inductionism বা আরোহী পদ্ধতি বলা হয়। এখন প্রশ্ন হল বিজ্ঞানের ইতিহাস কি এটাই দেখাচ্ছে সবসময়? প্রতি ক্ষেত্রে? ‘ঘটনার ঘনঘটা’-কে ‘বর্ণনার ছটায়’ সাজিয়ে সাহিত্যের মতো বিজ্ঞানেও কি ছোটোগল্প লেখা সম্ভবপর হবে না?—এইসব প্রশ্নের উত্তর পেতে গেলে যাঁদের নাম প্রথম এসে পড়ে বিজ্ঞানের দার্শনিক পল কার্ল ফেয়ারব্যান্ড তাদের মধ্যে অন্যতম। ‘বিজ্ঞান কী?’ এই প্রশ্নের থেকেও ‘বিজ্ঞান কীভাবে কাজ করে?’ এই প্রশ্নের উত্তর সন্ধান করতে গিয়ে ফেয়ারব্যান্ড পৌঁছবেন একধরনের জ্ঞানতত্ত্বগত নৈরাজ্যের জগতে—বোদ্ধামহলে পরিচিত হবেন একজন উত্তরাধুনিক (post-modern) হিসেবে—তাঁকে বলা হবে বিজ্ঞানের সবচেয়ে খারাপ শত্রু১—আর এরকমই কুখ্যাত মানুষটি সদর্পে ঘোষণা করবেন ‘সবই চলে’ (anything goes)। ফেয়ারব্যান্ড-এর দাবির সপক্ষে বিশদে আলোচনা করা এই প্রবন্ধের মূল উদ্দেশ্য নয়, বরং দাবিটির সম্ভাবনার পথ প্রশস্ত করাতেই আপাতত সীমাবদ্ধ থাকা যাক।
১৯২৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর ভিয়েনার এক নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে ফেয়ারব্যান্ডের জন্ম হয়। ছাত্রজীবনে পড়াশোনা-পাগল ফেয়ারব্যান্ডকে মাত্র ১৮ বছর বয়সে পাঠানো হয় আরবেইটস-ডাইন্স বা ফ্যাটিগ ডিউটির কাজে। ১৯৪৫ সালে কর্তব্যরত কর্মচারী হিসাবে জার্মান সেনাবাহিনীতে কাজ করার সময়ই বুলেট এসে লাগল সুষুম্নাকাণ্ডে, শিকার হলেন স্থায়ী পঙ্গুত্ব ও পুরুষত্বহীনতার। বারবার অসহ্য যন্ত্রণার কবলে পড়তে হয়েছে জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে। যুদ্ধের আপাত বিরতির মাঝে মাঝে কখনও লিখতেন থিয়েটারের স্ক্রিপ্ট, কখনও ওয়েমার আকাডেমিতে ক্লাস করতেন। এই সময় তিনি বার্টোল্ড ব্রেখটের সংস্পর্শে আসেন, এমনকি তাঁর সহযোগী হিসাবে স্থায়ী চাকরীর সুযোগও পান। কিন্তু ব্রেখটের অনুরোধ তিনি প্রত্যাখ্যান করেন, যাকে কিনা ফেয়ারব্যান্ড জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল বলে মনে করেন। পরে ইতিহাস ও সমাজবিদ্যার পাঠ নেওয়ার জন্য চলে আসেন ভিয়েনাতে। কিন্তু তেমন ভালো লাগল না, চলে এলেন পদার্থবিদ্যায়, বন্ধুত্ব হল পদার্থবিদ ফেলিক্স রেইনহাফটের সঙ্গে। অবশেষে থিসিস জমা দিলেন দর্শনে। জীবনের এই পর্যায়ে নিজেকে গোঁড়া অভিজ্ঞতাবাদী (staunch empiricist) বলেই মনে করতেন তিনি। ১৯৪৮ সালে কার্ল পপারের সংস্পর্শে আসেন, নিজেকে তখন ভাবতেন পপারিয়ান। পরে অবশ্য পপারের সঙ্গে চিন্তার দূরত্ব বাড়তে থাকে এবং শেষপর্যন্ত পপার-তত্ত্বকে প্রত্যাখ্যান করেন। ১৯৫১ সালে দার্শনিক এলিজাবেথ আনস্কোম্বের উৎসাহে দার্শনিক ভিটগেনস্টাইনের কাছে কাজ করার ইচ্ছা নিয়ে চলে আসেন লন্ডনে। কিন্তু হল না, মারা গেলেন ভিটগেনস্টাইন। যাই হোক লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিক্সে দেখা হল ভবিষ্যতের সহকর্মী ইমরে ল্যাকাটোসের সঙ্গে। যৌথভাবে প্রথম বই ‘Against Method’ (১৯৭৫ সালে প্রকাশিত) লেখার পরিকল্পনা করলেন। লেখা শেষ হবার আগে মারা গেলেন ল্যাকাটোসও। আত্মজীবনীতে ল্যাকাটোসের এই মৃত্যুকে ‘চরম ক্ষতি’ বলেছেন ফেয়ারব্যান্ড২।
১৯৫৮ সালে ফেয়ারাব্যান্ড চলে আসেন বার্কলিতে, স্থায়ীভাবে মার্কিন নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন। এইসময় কিছুকাল ইয়েলেও কাটান। দর্শনের বিভিন্ন বিষয়ের উপর বক্তৃতা দিতেন তিনি। ছাত্রদের পরীক্ষা নেওয়া, টার্মপেপার জমা নেওয়ার পরিবর্তে উৎসাহত করতেন পাঠ্যবিষয়ের উপর ফিল্ম বানাতে। প্রথাগত শিক্ষাকে একপ্রকার অর্থহীন প্রচেষ্টা মনে করে তিনি বলেছেন—‘The best education consists in immunizing people against attempts at education.’ বিজ্ঞানের শিক্ষাদান কেমন হওয়া উচিত এটাও তাঁর ভাবনায় স্থান পেয়েছে। তিনি বলেছেন—“Teachers using grades and the fear of failure mould the brains of the young until they have loss every ounce of imagination they might once have possessed.” ৯০-এর দশকের শেষদিক পর্যন্ত তিনি বার্কলি এবং ইটিএইচ জুরিখের মধ্যে যাতায়াত রেখেছিলেন, ১৯৮৯-তে পাকাপকিভাবে ইউরোপে ফিরে আসেন। অবশেষে ব্রেইন টিউমারে আক্রান্ত হয়ে ১৯৯৪ সালের ১১ই ফেব্রুয়ারী সুইজারল্যান্ডের জেনোলিয়ারে ফেয়ারব্যান্ডের মৃত্যু হয়।
ফেয়ারব্যান্ডের জ্ঞানতত্ত্বগত মূল্যায়ন মূলত তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে—(১) counter-induction বা বিরুদ্ধ-আরোহণ, (২) জ্ঞানতত্ত্বগত বহুত্ব (epistemological pluralism), (৩) জ্ঞানতত্ত্বগত নৈরাজ্য (epistemological anarchy)। বর্তমান নিবন্ধে আমরা শুধু প্রথমটি নিয়েই আলোচনা করব।
বিরুদ্ধ-আরোহণ৩
(১) তত্ত্বকথায় প্রথমেই না গিয়ে একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে তড়িতাধানের ন্যূনতম মান নির্ণয়ের জন্য তথাকথিত ‘তৈলবিন্দু পরীক্ষা’ বা oil-drop experiment-এর আশ্রয় নেন মার্কিন বিজ্ঞানী রবার্ট মিলিকান ও হার্ভে ফ্লেচার। এক্স-রে দিয়ে আয়নিত একদল তৈলবিন্দুকে দুইটি ধাতব পাতের অন্তর্বর্তী তড়িৎক্ষেত্রে পাঠিয়ে তাঁরা তৈলবিন্দুগুলোর সীমাস্থ গতিবেগ বা terminal velocity-এর পরিমাপ করেন। শর্তানুযায়ী সীমাস্থ বেগ তখনই পৌঁছয় যখন তৈলবিন্দুগুলির উপর ক্রিয়াশীল অভিকর্ষবল ও স্থির-তাড়িতিক বল সমান ও বিপরীতমুখী হয়। পরীক্ষালব্ধ ফলাফল থেকে মিলিকান দাবী করেন তৈলবিন্দুগুলির আধান একটি ন্যূনতম মানের পূর্ণসংখ্যার গুণিতক এবং প্রস্থাব দেন যা তৈলবিন্দুগুলির ন্যূনতম আধানের মানই একটি ইলেকট্রনের আধান বা চার্জ। এহেন গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার ও আলোকতড়িৎ সংক্রান্ত গবেষণার জন্য মিলিকানকে ১৯২৩ সালে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। অনুরূপ পরীক্ষাটি করেছিলেন অস্ট্রীয় পদার্থবিদ ফেলিক্স রেইনহাফট। গবেষণায় দেখা গেল ইলেকট্রনের চার্জ আরো কম হতে পারে। ব্যাপারটা স্বাভাবিকভাবেই মিলিকান (যিনি কিনা মনে করতেন আলোর গতিবেগ আর ন্যূনতম আধানের মান এই দুটি বিষয়ে সর্বজনগ্রাহ্য ধারণার প্রয়োজন)-এর কাছে ভালো ঠেকেনি। শুরু হয় মিলিকান-রেইনহাফট বিতর্ক। যদিও অন্যান্য নানা কারণে এবং অন্য পদ্ধতিতে নির্ধারিত ইলেকট্রনের আধানের মান মিলিকানের ফলাফলের সঙ্গে মিলে যাওয়ায় মিলিকানের ফলাফলের গ্রহণযোগ্যতা বাড়তে থাকে। ১৯৭৮ সালে পদার্থবিদ জেরাল্ড হোল্টন নাড়াচাড়া করছিলেন মিলিকানের হাতে লেখা নোটবুক নিয়ে। হোল্টন লক্ষ্য করেন সামগ্রিকভাবে প্রাপ্ত ১৪০-টি উপাত্তের মধ্যে মাত্র ৫৮-টি মিলিকান কোনো এক অজানিত কারণে তাঁর পেপারে উল্লেখ করেছেন। তাহলে বাকি ৮২-টা (৫৯%) তৈলবিন্দুর তথ্য নেই কেন? নাকি কেবলমাত্র পূর্ণসংখ্যার গুণিতক হচ্ছে না বলেই মিলিকান বাদ দিয়েছেন বাকি তথ্যগুলোকে? তথ্যগুলি রেইনহাফটের হাতে পড়লেই বা কী হতো? হোল্টন অবাক হয়ে যান।
তাহলে কি বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে কি পদ্ধতিগত নির্মাণের বাধ্যবাধকতা কি ঘটনার ঘনঘটাকে উপেক্ষা করছে? বিজ্ঞানের গ্রহণযোগ্যতা কি তথ্যের প্রাচুর্য ও সাযুজ্যতা দিয়ে সর্বদা নির্ধারিত হয় না? বিজ্ঞানের সত্যনির্মাণ কি বিজ্ঞান ব্যতীত অন্যান্য নানা প্রভাবগুলি (যেমন—ঐতিহ্যবাহিতা, গোষ্ঠী মনস্তত্ত্ব ইত্যাদি) দিয়ে প্রভাবিত হতে পারে? ব্যাপারটা চোখ এড়ায়নি ফেয়ারব্যান্ডের, এমনকি আইনস্টাইনের মতো কট্টরপন্থী পদার্থবিদকেও বেশ ভাবিয়ে তুলেছিল। ফেয়ারব্যান্ড দেখালেন কেবল তৈলবিন্দু পরীক্ষাই নয় বিজ্ঞানের জগতে এ ঘটনা বারবার হয়েছে, এমনকি যুগান্তকারী আবিষ্কারের ক্ষেত্রেও। নিচের উদাহরণটিই ভাবা যাক।
(২) উনবিংশ শতকের মাঝামাঝি (১৮৬৯) প্রকৃতিতে প্রাপ্ত একাধিক মৌলকে তাদের পারমাণবিক গুরুত্বের ক্রমান্বয়ে সাজিয়ে তথাকথিত পর্যায়সারণী বা Periodic Table তৈরি করেছিলেন রুশ বিজ্ঞানী দিমিত্রি মেন্ডেলিভ। তিনি দাবী করেন মৌলসমূহের ধর্মগুলি তাদের পারমাণবিক গুরুত্বের সঙ্গে পর্যায়ক্রমে পুনরাবৃত্ত হয়। কিন্তু পারমাণবিক গুরুত্বের ক্রমান্বয়ে সাজাতে গিয়ে দেখা গেল আয়োডিন আর টেলুরিয়ামকে যথাস্থানে রাখতে গেলে উপরোক্ত দাবি নস্যাৎ করতে হবে। আবার ধর্মের পরিপ্রেক্ষিতে আয়োডিনকে যথার্থ স্থানে অর্থাৎ ফ্লোরিন, ক্লোরিন, ব্রোমিনের স্তম্ভে আনতে গেলে পারমানবিক গুরুত্বের যথার্থ ক্রমটি নষ্ট হবে। নিজের দাবীর সঙ্গে সাযুজ্য রাখতে মেন্ডেলিভ মনে করলেন টেলুরিয়ামের পারমাণবিক গুরুত্ব পরিমাপে কোথাও ভুল হয়েছে। তিনি টেলুরিয়ামের পারমাণবিক গুরুত্ব বল প্রয়োগে কমিয়ে ১২৮ থেকে ১২৫ করলেন। একই কাজ করা হল বেরিলিয়াম (১৪—৯), ইউরেনিয়াম (১২০—২৪০) ইত্যাদি ক্ষেত্রেও। অর্থাৎ, মেন্ডেলিভ তথ্যপ্রাচুর্য থেকে সহজে অনুমেয় সিদ্ধান্তকে বর্জন করে নিজের সূত্রকে বড় করে দেখলেন, অবস্থান নিলেন বিরুদ্ধ আরোহণের পক্ষে। আশ্চর্য ব্যাপার হল, পরে পর্যায়সারণী যখন পরমাণুক্রমাঙ্কের উর্দ্ধক্রমে তৈরি করা হল, দেখা গেলো মেন্ডেলিভ ঘটনাচক্রে ঠিক ছিলেন। এমনকি সেই সময়ে অনাবিষ্কৃত মৌলগুলির সম্ভাব্য অবস্থান সম্পর্কে মেন্ডেলিভের অনুমানগুলি কার্যত ঠিক। তাহলে ব্যক্তিবিজ্ঞানীকে কি বিরুদ্ধ-আরোহণের স্বাধীনতা দিতে হবে? সিদ্ধান্তের ঠিক-ভুল সংক্রান্ত কঠোরতার পরিবর্তে বিজ্ঞানের অনুসন্ধিৎসাকে খানিক উদ্দেশ্যবিহীন রাখাটা কি সমীচীন নয়? নীচের উদাহরণটি লক্ষ্যণীয়।
জোসেফ জন টমসন আর আরনেস্ট রাদারফোর্ডের পরমাণুর গঠন সম্বন্ধে ভিন্ন মতামত ছিল। প্রথম জন মনে করতেন ঋণাত্মক আধানগুলি ধনাত্মক আধান দিয়ে তৈরি একটি কেকের মধ্যে থাকা মিঠাই-এর মত—যাকে বলে প্লাম-পুডিং মডেল। আর অপরজন মনে করতেন ঋণাত্মক আধানগুলি কেন্দ্রীয়ভাবে অবস্থিত ধনাত্মক আধানযুক্ত নিউক্লিয়াসের চারিদিকে ঘুরছে। এখন একই ধরনের পরীক্ষাগার ব্যবস্থায় (lab setup) আলফা কণা দিয়ে ধাতব পাতের উপর আঘাত করায় দেখা গেল বেশীরভাগ আলফা কণাই পরমাণুর অভ্যন্তর ভেদ করে বেরিয়ে গেল, মাত্র কয়েকটাই উলটো দিকে ফেরত এল। সিদ্ধান্ত করা হল—পরমাণুর অভ্যন্তরের বেশীরভাগটাই ফাঁকা। কিন্তু টমসন যুক্তি দিলেন, যা আলফা কণাগুলি একাধিক সংঘর্ষের সম্মুখীন হয়েছে ধরে নিয়ে—যাকে বলে multiple scattering hypothesis। আর রাদারফোর্ড যুক্তি দিলেন কেন্দ্রীয় ধনাত্মক আধানের উপস্থিতিতে একক সংঘর্ষ বা single scattering ধরে নিয়ে। এক্ষেত্রে টমসনের পক্ষে রায় দেওয়া মানেই রাডারফোর্ডের তত্ত্বকে বিরুদ্ধ আরোহণ ধরে নেওয়া।
উপরের আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বিরুদ্ধ-আরোহণকে চার প্রকারে দেখা যায়।
(১) বেশীরভাগ তথ্যকে বিচারের আওতা থেকে বার করে এনে কেবল সুবিধাজনক তথ্যগুলিকে বিশ্লেষণ করে বৈজ্ঞানিক সত্যের দাবী।
(২) সম্পূর্ণতা এবং সাযুজ্যকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে বা প্রারম্ভিক ধারণার অকাট্যতা দিয়ে প্রভাবিত হয়ে তথ্যের বিশ্লেষণ বা এমনকি তথ্যের পরিবর্তন।
(৩) দুইটি বা ততোধিক ব্যাখ্যার সম্মুখীন হয়ে একই তথ্যের নানাবিধ বিশ্লেষণ।
(৪) প্রাপ্ত তথ্য, প্রচলিত ধারণা বা সম্ভাব্য প্রারম্ভিক অনুমানের একেবারে উলটো দিকে হেঁটে নতুন বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের দাবি।
উপরোক্ত ব্যাপারগুলি যুক্তিনির্মাণের জগতে যতই গোলমেলে মনে হোক ফেয়ারব্যান্ড এগুলির জন্য সংশ্লিষ্ট বৈজ্ঞানিকদের দায়ী করেন নি, বরং দায়ী করেছেন বিজ্ঞানের পদ্ধতিগত অবস্থানকেই। উদাহরণ সহকারে ব্যাখ্যা করেছেন বিজ্ঞানের অভ্যাসকারীদের এবং বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের অনুমোদনকারীদের তরফ থেকে ঠিক কতটা মুক্তমনা হওয়ার প্রয়োজন। তিনি এটাও দেখিয়েছেন যে, পাঠ্যপুস্তকের কঠোর যুক্তি নির্মাণ ঠিক কতটা শিথিল হয়ে পড়ে যদি গবেষণাগারের জ্ঞান-নির্মাণের প্রক্রিয়াকে দার্শনিক ও ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিত থেকে দেখা হয়। ঠিক এই কারণেই ফেয়ারব্যান্ড মনে করেন বিজ্ঞান পাঠ, বিজ্ঞানের দর্শন চর্চা এবং বিজ্ঞানের ইতিহাস পাঠ একেবারেই অবিচ্ছেদ্য। বিষয়টিকে আরও বিশদে জানার জন্য ফেয়ারব্যান্ডের ধারণার অন্যান্য দিকগুলি অন্যত্র আলোচনা করার অঙ্গীকার রাখছি।
তথ্যসূত্র
- ১.J. Preston, G. Munevar & D. Lamb (eds.), ‘The Worst Enemy of Science’, Oxford University Press, 2000
- ২.P. K. Feyerabend, ‘Killing Time’, University of Chicago Press, 1995
- ৩.P. K. Feyerabend, ‘Against Method’, Verso, 1993.

লেখক
অরিন্দম চক্রবর্তী
পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক এবং গবেষক। বর্তমানে গাণিতিক পদার্থবিজ্ঞানে (space and algebraic structures of classical and quantum systems) কাজ করেন। এছাড়াও বিজ্ঞানের ইতিহাস ও দর্শন, ইতিহাস ও রাজনীতি বিষয়ক লেখালিখি করে থাকেন।
সব কাজ দেখুন →সংখ্যা ১-এর অন্যান্য লেখা
সংখ্যা ১সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়
“কম্পিউটার, ই-মেল এবং ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট হ্যাক করা নিয়ে অনেক আলোচনা হয়। কিন্তু আমরা এখন এমন এক যুগে প্রবেশ করেছি যেখানে মানুষকেও হ্যাক করা সম্ভব।” ‘উই আর বিকামিং হ্যাকেবল অ্যানিমেলস’—হাড়হিম করে দেওয়া এক বাস্তবতার কথা আমাদের বলেছেন হারারি।
সংখ্যা ১গল্পস্বল্প
বোতাম
সবকিছু যখন এক ক্লিকে বদলে যায়, তখন কিছু মানুষ নিঃশব্দে পাহারা দেয় তাদের চিরপুরাতন বিশ্বাস। সুতো আর মায়া দিয়ে পার্বতীদি কী বুনে চলেছেন দিনরাত? কাগজের মতো সহজে ছিঁড়ে যাওয়া সম্পর্কের ভিড়ে, বুকের ভেতরে সামান্য কাপড় বাঁচিয়ে রাখার এক মায়াবী আখ্যান ‘বোতাম’।
সংখ্যা ১পুরাতনী
ওড়িশা প্রজাতন্ত্র—বিংশ শতাব্দীর ইতিবৃত্তের এক বিস্মৃত পৃষ্ঠা: দ্বিতীয় পর্ব
১৮৪৫ সালে লেখা ১৯২৫ সালের এক কাহিনি। এক বিকল্প ইতিহাস। বিদ্রোহের গল্প। এক ভবিষ্যতের উড়িষ্যার গল্প। যে উড়িষ্যা একদিন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীন প্রজাতন্ত্রে পরিণত হবে। কিন্তু সেই স্বাধীনতার পথ মসৃণ নয়; তার ভিতর লুকিয়ে আছে অরণ্যের গভীরে জমে থাকা ক্ষোভ, হারিয়ে যাওয়া স্বাধীনতার স্মৃতি এবং পাহাড়ি মানুষের অদম্য আত্মমর্যাদা। শশীচন্দ্র দত্তের এই কল্প-ভবিষ্যতের কাহিনি যেন উনিশ শতকের ঔপনিবেশিক বাস্তবতার এক প্রতিবিম্ব; স্বাধীনতার স্বপ্ন কীভাবে প্রতিরোধের ভাষা খুঁজে পায়, তার এক রোমাঞ্চকর আখ্যান।
আরও পড়ুন
সংখ্যা ২বিজ্ঞান
মনোরোগের ধূসরতায়: চতুর্থ পর্ব
যদি মানুষের চেতনাই হয়ে ওঠে যুদ্ধের গোপন মারণাস্ত্র! নাৎসি বিজ্ঞানীদের গোপন পুনর্বাসন, জাপানের নৃশংস জীবাণুযুদ্ধ, আর মানুষের মনকে বশে আনতে সিআইএ-র কুখ্যাত গোপন প্রকল্প ‘MK-Ultra’! এলএসডি-র যথেচ্ছ প্রয়োগ থেকে শুরু করে যুদ্ধের বন্দীদের ওপর মারাত্মক রাসায়নিক পরীক্ষা—রাজনীতি আর ক্ষমতার নোংরা খেলায় কীভাবে সাধারণ মানুষের মনকে কব্জা করা হয়েছিল? কেন বিটনিক-হিপি বিদ্রোহের মতো গণ-আন্দোলনকে নেশার সাগরে ডুবিয়ে দেওয়া হলো? যে কোনো রাজনৈতিক থ্রিলারকে হার মানানো এক অবিশ্বাস্য ইতিহাসের সাক্ষী হতে পড়ুন চতুর্থ পর্ব—‘মগজধোলাই রাজনীতির থ্রিলার’।
সংখ্যা ২বিজ্ঞান
মনোরোগের ধূসরতায়: তৃতীয় পর্ব
সিগমুন্ড ফ্রয়েড কি একজন মহান মনস্তাত্ত্বিক, নাকি এক চতুর গল্পকার? অবচেতন মন, যৌন অবদমন আর মনঃসমীক্ষণ—যাঁর তত্ত্বে একসময় বুঁদ হয়েছিল গোটা বিশ্ব, তাঁর গবেষণার পেছনে কতটা বিজ্ঞান আর কতটা সাজানো রূপকথা? কোকেন আসক্তি থেকে শুরু করে নিজের ব্যর্থ চিকিৎসা ও রোগীদের আসল পরিণতি লুকিয়ে রাখার পরও কীভাবে একনায়কের মতো নিজের তত্ত্বকে শতাব্দীর সেরা চিকিৎসা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ফ্রয়েড? মনোবিশ্লেষণের সেই জাদুকরী ছদ্মবেশ নিয়ে তৃতীয় পর্ব—‘ফ্রয়েডের বৈজ্ঞানিক রূপকথা’।
সংখ্যা ১বিজ্ঞান
মনোরোগের ধূসরতায়: দ্বিতীয় পর্ব
রোগ নিরাময়, নাকি আধুনিক বিজ্ঞানের পোশাকে আদিম বর্বরতা? কখনো পেটের নাড়িভুঁড়ি কেটে বাদ দেওয়া, কখনো মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল লোব খুবলে নিয়ে রোগীকে জড়ভরত বানিয়ে দেওয়া, আবার কখনো ম্যালেরিয়ার জীবাণু বা ইনসুলিনের মারণ কোমা দিয়ে তথাকথিত ‘চিকিৎসা’! এমনকি এই মারাত্মক লোবোটমির জন্য জুটেছিল নোবেল পুরস্কারও। চিকিৎসকদের অন্ধ অহংকার আর অসহায় পরিবারের আর্তি কীভাবে মানসিক রোগীদের ঠেলে দিয়েছিল এক জীবন্ত নরকে? মনোরোগ চিকিৎসার আদিপর্বের চাঞ্চল্যকর ইতিহাস জানুন দ্বিতীয় পর্বে—‘মনোচিকিৎসার আদিপর্ব: বিজ্ঞানের আড়ালে’।


