বোতাম
সবকিছু যখন এক ক্লিকে বদলে যায়, তখন কিছু মানুষ নিঃশব্দে পাহারা দেয় তাদের চিরপুরাতন বিশ্বাস। সুতো আর মায়া দিয়ে পার্বতীদি কী বুনে চলেছেন দিনরাত? কাগজের মতো সহজে ছিঁড়ে যাওয়া সম্পর্কের ভিড়ে, বুকের ভেতরে সামান্য কাপড় বাঁচিয়ে রাখার এক মায়াবী আখ্যান ‘বোতাম’।

সংখ্যা ১পার্বতীদি ব্লাউজ বানায়। আমাদের বাজারের ভেতরে ওর একটা ছোট মতো দোকান। একটা রঙচটা মেশিন, আর একটা ডিবেতে বোতাম, সুতো এইসব।
আমি ছোটবেলায় দেখেছি, মা পার্বতীদির কাছে ব্লাউজ বানাতে দিলে পার্বতীদি সবসময় ভেতরে দুই ইঞ্চি কাপড় বেশি রাখত।
মা বলত, ‘এত কাপড় ভেতরে রাখো কেন?’
পার্বতীদি বলত, ‘যদি মোটা হও। যদি বাচ্চাকাচ্চা হয়। তখন খুলে দেব।’
মানে ব্লাউজটা শুধু এখনকার জন্য না, পরের শরীরটার জন্যও বানানো।
গত সপ্তাহে আমি গেলাম। একটা কুর্তি নিয়ে। অনলাইনে কিনেছি, সাইজ বড়।
পার্বতীদি চোখে চশমা লাগিয়ে দেখল। বলল, ‘ও মা! এ তো কাগজ গো।’
আমি বললাম, ‘মানে?’
‘এই কাপড় কাগজের মতো। একবার কাটলে আর জোড়া লাগে না। ভেতরে কোনো কাপড় নেই। যা আছে, ওইটুকুই। কমালে কমবে, বাড়াতে পারব না।’
আমি বললাম, ‘কমিয়েই দাও।’
সে কমিয়ে দিল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘তোমার মেয়েটা কেমন আছে?’
পার্বতীদির মেয়ে কলকাতায় থাকে, জ্যাপনিজ নিয়ে পড়েছে তারপর এখন কোনো একটা এম.এন.সি-তে চাকরি করে। পার্বতীদি বলল, ‘ভালো। ওর তো সব অনলাইন। কাপড়, খাবার। আমাকে বলে, মা, তুমি দোকানটা বন্ধ করে দাও এবার। এত কষ্ট করে লাভ কী?’
‘তুমি কী বলো?’
‘আমি বলি, বন্ধ করে দিলে এই যে রোজ তোমরা আসো, একটু বসো, গল্প করো—এটা কোথায় হবে? অনলাইনে বোতাম লাগানো যায়?’
আমি হাসলাম।
পার্বতীদি ডিবে থেকে একটা বোতাম বের করল। পুরনো আমলের, কাঠের।
বলল, ‘এটা দেখছো? এই বোতামটা আমার মায়ের। পঞ্চাশ বছর আগে একটা জামা থেকে খুলে রেখেছিল। বলেছিল, ফেলে দিস না, আবার লাগবে।’
‘লেগেছে?’
‘হ্যাঁ। আমার মেয়ের জামায় লাগিয়েছি। ওর জন্মের সময়।’
আমি কুর্তিটা নিয়ে উঠতে যাব, পার্বতীদি বলল, ‘শোনো, ভেতরে একটু কাপড় রেখে দিলাম।’
আমি বললাম, ‘কিন্তু তুমি বললে এতে কাপড় নেই?’
‘নেই। তবু একটু টেনে টুনে রেখেছি। যদি তুমি একটু মোটা হও।’
আমি কিছু বললাম না। রাস্তায় বেরিয়ে দেখলাম, সবাই নতুন জামা পরে হাঁটছে। ছিঁড়ে গেলে ফেলে দেবে, সারাবে না। কারণ সারানোর চেয়ে ফেলে দেওয়া সস্তা।
শুধু পার্বতীদির দোকানে এখনও একটা বিশ্বাস ঝুলে আছে—মানুষ মোটা হবে, মানুষের বাচ্চা হবে, মানুষ ফিরে আসবে।
আর সেই জন্য দুই ইঞ্চি কাপড় সবসময় ভেতরে রাখতে হয়।

লেখক
সত্যসাধন মণ্ডল
বিশ্বভারতীর প্রাক্তনী। লেখার বিষয় মূলত কবিতা। পত্র-পত্রিকা ও ফেসবুকে নিয়মিত লেখালেখি করেন। ইতিপূর্বে উর্ণপত্র থেকে প্রকাশিত হয়েছে ‘ঈশ্বরের জন্য লেখা কবিতা’ নামে একটি কাব্যগ্রন্থ। তাঁর ঘোষণা অনুসারে—মানুষ আর সাপে ভয় পান, প্রাতিষ্ঠানিক ভূত-ভগবানের বিষয়টি বুঝতে পারেন না এবং উপনিষদ মানেন।
সব কাজ দেখুন →সংখ্যা ১-এর অন্যান্য লেখা
সংখ্যা ১সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়
“কম্পিউটার, ই-মেল এবং ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট হ্যাক করা নিয়ে অনেক আলোচনা হয়। কিন্তু আমরা এখন এমন এক যুগে প্রবেশ করেছি যেখানে মানুষকেও হ্যাক করা সম্ভব।” ‘উই আর বিকামিং হ্যাকেবল অ্যানিমেলস’—হাড়হিম করে দেওয়া এক বাস্তবতার কথা আমাদের বলেছেন হারারি।
সংখ্যা ১পুরাতনী
ওড়িশা প্রজাতন্ত্র—বিংশ শতাব্দীর ইতিবৃত্তের এক বিস্মৃত পৃষ্ঠা: দ্বিতীয় পর্ব
১৮৪৫ সালে লেখা ১৯২৫ সালের এক কাহিনি। এক বিকল্প ইতিহাস। বিদ্রোহের গল্প। এক ভবিষ্যতের উড়িষ্যার গল্প। যে উড়িষ্যা একদিন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীন প্রজাতন্ত্রে পরিণত হবে। কিন্তু সেই স্বাধীনতার পথ মসৃণ নয়; তার ভিতর লুকিয়ে আছে অরণ্যের গভীরে জমে থাকা ক্ষোভ, হারিয়ে যাওয়া স্বাধীনতার স্মৃতি এবং পাহাড়ি মানুষের অদম্য আত্মমর্যাদা। শশীচন্দ্র দত্তের এই কল্প-ভবিষ্যতের কাহিনি যেন উনিশ শতকের ঔপনিবেশিক বাস্তবতার এক প্রতিবিম্ব; স্বাধীনতার স্বপ্ন কীভাবে প্রতিরোধের ভাষা খুঁজে পায়, তার এক রোমাঞ্চকর আখ্যান।
সংখ্যা ১বিজ্ঞান
মনোরোগের ধূসরতায়: দ্বিতীয় পর্ব
রোগ নিরাময়, নাকি আধুনিক বিজ্ঞানের পোশাকে আদিম বর্বরতা? কখনো পেটের নাড়িভুঁড়ি কেটে বাদ দেওয়া, কখনো মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল লোব খুবলে নিয়ে রোগীকে জড়ভরত বানিয়ে দেওয়া, আবার কখনো ম্যালেরিয়ার জীবাণু বা ইনসুলিনের মারণ কোমা দিয়ে তথাকথিত ‘চিকিৎসা’! এমনকি এই মারাত্মক লোবোটমির জন্য জুটেছিল নোবেল পুরস্কারও। চিকিৎসকদের অন্ধ অহংকার আর অসহায় পরিবারের আর্তি কীভাবে মানসিক রোগীদের ঠেলে দিয়েছিল এক জীবন্ত নরকে? মনোরোগ চিকিৎসার আদিপর্বের চাঞ্চল্যকর ইতিহাস জানুন দ্বিতীয় পর্বে—‘মনোচিকিৎসার আদিপর্ব: বিজ্ঞানের আড়ালে’।
আরও পড়ুন
সংখ্যা ২গল্পস্বল্প
কর্নেলের ঘরে যে নদীটা থাকত
বিষ্ণুপুরের তিনশো বছরের পুরোনো বাড়িতে একাকী কর্নেল শশাঙ্কবাবুর শোবার ঘরের মাঝখান দিয়ে বয়ে যেত এক জীবন্ত নদী। সেই নদীই ছিল তাঁর নিঃসঙ্গ জীবনের আশ্রয়। কিন্তু এক জন্মদিনে নদী তাঁর অতীতকে বুকে নিয়ে মিলিয়ে গেলে স্তব্ধ হয়ে যায় কর্নেলের ঘর। হারানো নদীটকে ফিরে পাওয়ার তীব্র জেদে শুরু হয় খনন।
সংখ্যা ১গল্পস্বল্প
নিশ্চিন্তপুরের রূপকথা
১৯২৩ সালে ইছামতীর তীরের এক প্রত্যন্ত গ্রামে কাঠের বাক্সে বন্দি হয়ে আসে এক মণ ওজনের এক বরফের চাঁই। বাড়ির সর্বেসর্বা কাদম্বিনী দেবীর অমোঘ ইচ্ছায় যে বরফ প্রখর গ্রীষ্মের দাবদাহেও এক ফোঁটাও গলে না। দীর্ঘকাল ধরে উঠোনের তুলসীমঞ্চের পাশে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা সেই বরফ হয়ে ওঠে আস্ত একটা গ্রামের সময়, স্মৃতি ও নিয়তির অলৌকিক ঘড়ি।
সংখ্যা ১কবিতা ও ছড়া
আত্মকথা ও অন্যান্য কবিতা
হারিয়ে যাওয়া, থেকে যাওয়া এবং তাদের মাঝখানে জন্ম নেওয়া স্মৃতির এক অদৃশ্য ভূগোল কখনও শব্দে, কখনও স্বপ্নে, কখনও রাগে, কখনও দাগে—কবি খুঁজে ফেরেন। এখানে সৌন্দর্যের পাশে নিঃশব্দে বসে থাকে বিষণ্ণতা, আকাঙ্ক্ষার পাশে অনিবার্য দূরত্ব, আর শৈল্পিক সৌন্দর্যের আড়ালে উঁকি দেয় জীবনের ক্ষত। সে চলে যায় রেখে যায় ক্ষীণ অথচ গভীর কোনো চিহ্ন। হাঁসের চলে যাওয়া পথের মতো—দাগ মুছে যায়, অথচ কোনো একদিন সেই জলের বুকেই শালুক ফুটে ওঠে।

