পত্রসূচনা
আধুনিক বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের দীর্ঘ যাত্রাপথে সাময়িক পত্র সবসময়ই একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। কেবল সৃজনশীল সাহিত্যের, চিন্তাশীল রচনার প্রকাশ-মাধ্যম হিসেবেই নয়; চিন্তা-ভাবনার আদানপ্রদান, নতুন লেখকের আত্মপ্রকাশ, সমাজ-সংস্কৃতির পর্যালোচনা এবং জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্র হিসেবেও পত্রিকা আমাদের বৌদ্ধিক জীবনের এক অপরিহার্য অংশ হয়ে থেকেছে দীর্ঘ দুই শতাব্দী জুড়ে। বহু নতুন কণ্ঠ, সাহিত্য আন্দোলন ও নন্দনতত্ত্ব প্রথম আশ্রয় ও প্রশ্রয় পেয়েছিল মূলধারার বাইরে গড়ে ওঠা প্রাণবন্ত ছোট পত্রিকাগুলিতে, যারা ‘ক্ষুদ্র তবু তুচ্ছ নয়’। কেবল নানা বিচিত্র বিষয়ের লেখাই তারা প্রকাশ করেনি; তৈরি করেছে বিতর্ক, প্রস্তুত করেছে আলোচনার পরিসর ও পাঠকও; নির্মাণ করেছে সাহিত্যিক চেতনার নতুন ভূগোল। এসব প্রাক-আন্তর্জাল যুগের কথা। আজ আন্তর্জালে-ডিজিটালে মিলে দ্রুত বিবর্তিত এই যুগে শব্দে শব্দে যতটা ঠোকাঠুকি অথবা তাৎক্ষণিকের যতটা ভিড়, শান্ত মননশীল সুচিন্তিত লিখনচর্চার স্থায়ী আশ্রয় কোথায় ততটা?
এই ভাবনা থেকেই প্যারালালের ওয়েব-উদ্যোগ—‘সমান্তর’। মূল স্রোতের সঙ্গে নয়; তার সমান্তরালে, সংলাপে-প্রশ্নে-তর্কে, নানা বিকল্প পথের সন্ধান ক’রে, ‘সমান্তর’ এমন এক পরিসর নির্মাণ করতে আগ্রহী যেখানে মুদ্রিত পত্রিকার ঐতিহ্যের বিকল্প ভূমিটি আধুনিক ডিজিটাল পরিসরে নতুন রূপ পেতে পারে।
বাংলা ঋতুচক্র অনুসারে বছরে ছ’টি সংখ্যা প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে সমান্তরের। গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত—প্রতিটি ঋতু তার নিজস্ব আবহ, আবেগ এবং সাংস্কৃতিক সত্তাকে ধারণ করে। আমরা চাই, প্রতিটি সংখ্যাও সেই ঋতুর মতোই স্বতন্ত্র হয়ে উঠুক। প্রতিটি সংখ্যা হোক এক-একটি সময়-দলিল; যেখানে একটি লেখা শুধু প্রকাশিতই হবে না, বরং তার পাশাপশি সময় ও সমাজের সঙ্গে, পাঠকের ভাবনাচিন্তার সঙ্গে কথোপকথনও তৈরি করবে। সাহিত্য, প্রবন্ধ, রাজনীতি, ইতিহাস, দর্শন, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান বিষয়ক বৈদুতিন পত্রিকা সমান্তর সুতরাং গল্প, উপন্যাস, কবিতা ও নানা বিষয়ের প্রবন্ধের পাশাপাশি এখানে থাকবে গবেষণামূলক প্রবন্ধ, আলোচনা-সমালোচনা, পাঠ-প্রতিক্রিয়া এবং আরো নানান বিষয়। বাংলা ভাষায় গবেষণাধর্মী লেখার একটি দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে, কিন্তু ডিজিটাল মাধ্যমে তার সুসংগঠিত উপস্থিতি এখনও সীমিত। ‘সমান্তর’ শুধুমাত্র একটি ডিজিটাল প্রকাশনা-প্রকল্প নয়; বরং একটি আর্কাইভ নির্মাণের কাজও। সামাজিক ও ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশিত অধিকাংশ লেখাই ক্ষণস্থায়ী, অধিকাংশই হারিয়ে যায় তথ্যের স্রোতে। অথচ সাহিত্য ও গবেষণার জন্য প্রয়োজন দীর্ঘস্থায়ী সংরক্ষণ, সহজ অনুসন্ধান এবং ভবিষ্যৎ পাঠকের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ। ‘সমান্তর’ সেই পরিসর নির্মাণের একটি বিনীত প্রয়াস। অলমিতি।