মনোরোগের ধূসরতায়: দ্বিতীয় পর্ব

রোগ নিরাময়, নাকি আধুনিক বিজ্ঞানের পোশাকে আদিম বর্বরতা? কখনো পেটের নাড়িভুঁড়ি কেটে বাদ দেওয়া, কখনো মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল লোব খুবলে নিয়ে রোগীকে জড়ভরত বানিয়ে দেওয়া, আবার কখনো ম্যালেরিয়ার জীবাণু বা ইনসুলিনের মারণ কোমা দিয়ে তথাকথিত ‘চিকিৎসা’! এমনকি এই মারাত্মক লোবোটমির জন্য জুটেছিল নোবেল পুরস্কারও। চিকিৎসকদের অন্ধ অহংকার আর অসহায় পরিবারের আর্তি কীভাবে মানসিক রোগীদের ঠেলে দিয়েছিল এক জীবন্ত নরকে? মনোরোগ চিকিৎসার আদিপর্বের চাঞ্চল্যকর ইতিহাস জানুন দ্বিতীয় পর্বে—‘মনোচিকিৎসার আদিপর্ব: বিজ্ঞানের আড়ালে’।

মনোরোগের ধূসরতায়পর্ব ২/৪
দেবাশিস মুখোপাধ্যায়ের প্রতিকৃতি
১১ মিনিট পড়া
শেয়ার করুন
রোগ নিরাময়, নাকি আধুনিক বিজ্ঞানের পোশাকে আদিম বর্বরতা?সংখ্যা ১
লেখার আকার
লেখার অবস্থান
সূচিপত্র
  1. মনোচিকিৎসার আদিপর্ব: বিজ্ঞানের আড়ালে
  2. উৎসসূত্র:

মনোচিকিৎসার আদিপর্ব: বিজ্ঞানের আড়ালে

মানসিক ব্যাধির সম্বন্ধে জানা-বোঝার অভাব কতটা তা ভালো করে বোঝা যাবে যদি দেখি যে, এই ধরনের রোগীদের সারানোর জন্য কত উদ্ভট চিকিৎসা গত একশো বছর ধরে আধুনিক চিকিৎসার নামে চালান হয়েছে। এইসব চিকিৎসার উদ্ভাবকরা নিজেদের চিকিৎসার সাফল্য নিয়ে অস্বাভাবিকরকম আত্মবিশ্বাসী ছিলেন এবং সেই মানসিকতা সাধারণত কোনো চিকিৎসা না থাকলে বা রোগটাকে না বুঝলেই থেকে থাকে। তবে এক্ষেত্রে মানসিক রোগীদের বিপন্নতাও চিকিৎসকদের অবলীলায় এইসব বিপজ্জনক চিকিৎসায় উৎসাহিত করত। এই সব চিকিৎসার মূল দুটি ধারা যা বিংশ শতাব্দীর প্রথম অর্ধে খুব চালু হয়েছিল তাদের নিয়ে আমরা আলোচনা করব। তাদের মধ্যে একটি শল্যচিকিৎসার ধারা আর অন্যটি ওষুধ প্রয়োগের ধারা যাদের আবার কার্যকারিতার নিজস্ব ব্যাখ্যা ছিল।

ঐতিহাসিকভাবে প্রায় সব সমাজেই একটা ধারণা ছিল যে, শরীরের কোনো অভ্যন্তরীণ অঙ্গ কোনোভাবে বিষাক্ত হলে তার জন্য মানুষ উন্মাদ হতে পারে। রোগের বহিঃপ্রকাশ অনুসারে একেক জনের ক্ষেত্রে একেক অঙ্গ দূষিত হয়ে গেছে বলে মনে করা হত। চেতনানাশকের অভাবে তখন অপারেশনের ঝুঁকি কেউ বিশেষ নিত না। তাই গোড়ার দিকে সবচেয়ে বেশী গৃহীত পদ্ধতি ছিল পেটের নালীকে বিভিন্নভাবে পরিষ্কার করা (colonic irrigation) যা অন্য অনেক চিকিৎসায়ও করা হত। শল্যচিকিৎসার উন্নতি হওয়াতে বিংশ-শতাব্দীতে শুরু হল কাল্পনিক দূষিত অঙ্গের কাটাছেঁড়া করে বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া। সার্জেনদের কাটাছেঁড়ার উৎসাহ ও অসুস্থ ব্যক্তিকে নিয়ে রোগীর পরিবারের বিপন্নতার ফলে এই অপারেশনে সবাই বিশ্বাস করতে শুরু করল। দূষিত অঙ্গের রোগসৃষ্টির দর্শনে সকলের বিশ্বাস থাকাও এই অপারেশনে গোটা সমাজকেই আশাবাদী করেছিল। সার্জেন ও রোগীর আত্মীয়দের যুগলবন্দীতে এই ধরনের চিকিৎসা গত শতাব্দীর দ্বিতীয় দশক থেকে ব্যাপক হারে চালু হয়। আর সেই বিশ্বাসের পরিণতিও ছিল ভয়াবহ।

নিউজার্সির পাগলাগারদের ডিরেক্টর হেনরি কটন নিজে এই ধরনের অপারেশনে খুব বিশ্বাস করতেন। তাঁর উৎসাহে ১৯১৬ সালে সেই উন্মাদাগারে ২০০০ রোগীর ওপর এই শল্যচিকিৎসা করা হয় এবং তার মধ্যে অপরিহার্য বাদে শরীরের প্রায় কোন অভ্যন্তরীণ অঙ্গই বাকি ছিল না। নিজের ক্ষমতার জোরে তিনি এইভাবে উন্মাদরোগ সারানোর ক্ষেত্রে নিজের আশি শতাংশ সাফল্য দাবী করতেন। তাঁর ক্ষমতার জোরে সেই অপারেশনের সাফল্যের ঢাক পেটাতে শুরু করে সংবাদ মাধ্যমও। তাঁর এই চিকিৎসার পেছনে এক বিরাট উৎসাহদাতা ও ত্রাতা ছিলেন সাবেক আমেরিকার মানসিক  চিকিৎসাজগতের প্রধান স্তম্ভ ড. অ্যাডলফ মায়ার। হালের গবেষণায় স্কাল ও শুলকিন দেখেছেন যে, তাঁর নিজের দাবী অনুযায়ী আশি শতাংশ সেরে ওঠার বিপরীতে সেই চিকিৎসার পরে প্রায় সব রোগীরই আগের থেকে অবস্থার অবনতি ঘটত। এমনকি সেই সব অপারেশনে প্রায় ত্রিশ শতাংশ রোগী কেবল অপারেশনের জন্যই মারা যেতেন। এইসব তথ্যকে চাপা দিয়ে সেই চিকিৎসার গুণগান প্রচারে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন ড. মায়ার।

ডাক্তারের নায়কোচিত মানসিকতা আর উন্মাদ রোগীর আত্মীয়দের বিপন্নতা একসঙ্গে মিশে গেলে কী ভয়ানক ফল হয় তার নমুনা পাব ড. হোমসের ঘটনায়। সার্জেন হোমস মানসিক রোগবিশেষজ্ঞ একেবারেই ছিলেননা, কিন্তু তার বিশ্বাস ছিল যে অন্ত্রের জমা মল থেকে উৎপন্ন বিষাক্ত রাসায়নিক উন্মাদ রোগের জন্য দায়ী। তাঁর নিজের ছেলে যৌবনাবস্থা পেরোনোর আগেই উন্মাদ রোগে আক্রান্ত হয়। নিজের ছেলে র‍্যালফের এই রোগ মেনে নিতে পারেননি ড. হোমস। ১৯১৬ সালের মে মাসে নিজের সন্তানের অন্ত্রের ওপর প্রথম শল্যচিকিৎসা করেন ড. হোমস নিজেই। চারদিন বাদের সে ছেলে মারা যায়। এই ঘটনা বাইরে জানানো হয়নি, তবে সেই দুঃখজনক ঘটনা তিনি জানান ড. অ্যাডলফ মায়ারকে। তাঁরই উপদেশে ছেলের সেই অপারেশনের রেকর্ড পুরো লোপাট করে দেন ড. হোমস। নিজের ছেলের মৃত্যুতেও সেই শল্যচিকিৎসার ওপর বিশ্বাস হারায়নি তাঁর। তারপরেও তিনি এইরকম বহু অপারেশন করেছিলেন শুধু নয়, কেবলমাত্র সেই চিকিৎসা নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করার জন্যই একটি বিশেষ ওয়ার্ড এবং ল্যাবরেটরিও তৈরি করেন তিনি। এর থেকেই বোঝা যায় কোন রোগ কেন হয় তা না বুঝলে, তার চিকিৎসা সম্বন্ধে কোন নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি থাকা কতটা কঠিন। এখানেই বিজ্ঞান আমিত্বের কাছে গোহারা হেরে যায়। 

১৯৩০ এর দশকে আস্তে আস্তে সার্জারির উন্নতি হতে দেখা গেল一মানুষের মস্তিষ্কের অপারেশন  করা যাচ্ছে। এর সঙ্গে সঙ্গে মানবমস্তিষ্কের জানা-বোঝাও বাড়ে এবং এও জানতে পারা যায় যে, অন্য প্রাণীদের সাপেক্ষে মানুষের মস্তিষ্কের আকার দেহের তুলনায় অনেক বেশী। সেই মস্তিষ্কের আয়তনের সিংহভাগই দখল করে রাখে ফ্রন্টাল লোব যা আবার অন্য প্রাণীদের ক্ষেত্রে অনুপাতে অনেক কম। প্রাণীজগতের মধ্যে উন্মাদ রোগ মানুষ বাদে অন্যদের দেখাই যায় না, ফলে সেইসব ঘটনাকে জুড়ে পর্তুগিজ বিজ্ঞানী ইগর মনিজ বললেন যে, মানুষের মস্তিষ্কের এই অংশটিকে কেটে বাদ (Lobotomy) দিলে এই উন্মাদ রোগ একেবারেই সেরে যাবে। তাঁর সেই কাটাছেঁড়া তত্ত্ব নিমেষে প্রভাবিত করল আমেরিকার মানসিক চিকিৎসার ‘মাথা’-দের। ড. মায়ার আমেরিকার দুই সার্জেন ফ্রিম্যান ও ওয়াটকে সেই অপারেশন করার ঢালাও অনুমতি দিলেন। সেই দশকের শেষে লোবোটমি অপারেশন ব্যাপকহারে চালু হল। সে খবর দেশের সংবাদ মাধ্যম এবার ব্যাপকভাবে প্রচার করল। উন্মাদ রোগ সারানোর জন্য মস্তিষ্ক অপারেশনের বিস্ময়-ক্ষমতা কাগজের মাধ্যমে জনমানসে প্রতিষ্ঠিত হল। বিখ্যাত পত্রিকা টাইমসে লেখা হল যে, এই চিকিৎসা মাথার ভেতর থেকে আশ্চর্য ক্ষমতায় কেবলমাত্র উন্মাদ হওয়া অংশটিকে টেনে বার করে আনে। এইসব প্রচার ও প্রশাসনের আশীর্বাদে এই অপারেশন বহুল প্রচারিত হয়ে উঠল এবং ড. ফ্রিম্যান সার্জেন হিসেবে প্রায় কিংবদন্তীতে পরিণত হলেন।

আমেরিকার বিখ্যাত কেনেডি রাজনৈতিক পরিবারের মেয়ে রোসমেরি ছিলেন প্রেসিডেন্ট জেফ কেনেডির বোন। শিশুবয়সে তিনি স্বাভাবিক হাসিখুশী আর পাঁচটা মেয়ের মতোই ছিলেন, কিন্তু কোনো  কারণে বড় হবার সঙ্গে সঙ্গে তার মানসিক সমস্যা শুরু হতে লাগল। শেখার ক্ষমতা কমে গেল এবং সামাজিক বোধবুদ্ধির বিকাশ-ও ব্যাহত হতে লাগল। সমাজে পরিচিত ও অপরিচিতের গণ্ডির মধ্যে তিনি আস্তে আস্তে বেমানান হয়ে উঠতে লাগলেন। যদিও অনেক কষ্টে শিখিয়ে পড়িয়ে তাঁকে সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের কিছুটা উপযুক্ত করা গেল, কিন্তু যত বয়স বাড়তে থাকল তাঁকে শাসন করা তত কঠিন হতে থাকল। প্রায়ই তিনি বাড়ি থেকে পালিয়ে যেতেন। নামী পরিবারের খ্যাতির পক্ষে তাঁদের মেয়ের এইরকম আচরণ এক বিপদের সঙ্কেত বলে মনে করা হল। সেই সময়ে ড. ফ্রিম্যানের সুখ্যাতি ও প্রচার তুঙ্গে। সুতরাং কেনেডি পরিবার তাঁদের মেয়ের চিকিৎসার জন্য গোপনে তাঁর শরণাপন্ন হল। ১৯৪১ সালে রোসমেরির মা যখন বিদেশে, তখন তাঁকে না জানিয়ে গোপনে মস্তিষ্কের অপারেশন করলেন ড. ফ্রিম্যান। সেই অপারেশন এতটাই ব্যর্থ হল যে, যে রোজমেরি আগে যেসব কাজ এবং সামাজিক মেলামেশা কিছুটা হলেও করতে পারত, তা সব ভুলে গেল। অনেক চেষ্টার পর কোনোমতে সে কেবল কথাটুকু বলতে আর হাঁটতে শিখল, কিন্তু মানসিকভাবে একরকম জড়বৎ হয়ে গেল। কেনেডি পরিবার তাঁকে গোপনে আমেরিকার এক মানসিক কেন্দ্রে রেখে দিয়ে আসে যেখানে তিনি নিজের দীর্ঘ বাকি জীবন একরকম অনুভূতিহীন হয়ে কাটিয়ে দেন।

বিখ্যাত এক পরিবারের চিকিৎসায় ব্যর্থ হয়েও ড. ফ্রিম্যানের ঔদ্ধত্যে কোন ঘাটতি পড়েনি। ড. ফ্রিম্যানের প্রভাবেই এই চিকিৎসার জন্য তার আবিষ্কারক মনিজকে চিকিৎসাশাস্ত্রে নোবেল প্রাইজ অবধি দেওয়া হয়। এই পুরস্কার মনোরোগবিদ্যার বৈজ্ঞানিক অনিশ্চয়তা এবং নোবেল পুরস্কার-দাতাদের ভ্রমও খুব পরিষ্কার করে দেখিয়ে দেয়। মানববিবর্তনের এক অনন্য সম্পদ মস্তিষ্কের সামনের অংশ frontal lobe-কে কেটে বাদ দিলে একজন মানুষ যে ঊনমানবেরও অধম হয়ে যায় তা সেদিনের বিজ্ঞানীদের চিন্তায় আসেনি। উন্মাদ রোগ পুরুষ মহিলা দু’পক্ষেরই সমান হারে হওয়া সত্ত্বেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই অপারেশন করা হত মহিলাদের। নারীদেরকে দমনের এই প্রবৃত্তি নারীদের প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির দৈন্যকে যেমন প্রকাশ করে, তেমনিই এই বিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতা ও তার প্রবক্তাদের অবৈজ্ঞানিক ও পক্ষপাতদুষ্ট মানসিকতাকেও দেখায়। সার্বিক প্রজ্ঞার এই অভাব সম্ভবত আজও তাড়া করে বেড়াচ্ছে মনোরোগবিদ্যাকে।

উন্মাদ রোগে আক্রান্ত রোগীদের একাংশের রোগ বেশ ভয়াবহ অবস্থায় যেত। তাদের মানসিক রোগের সঙ্গে অন্যান্য শারীরিক উপসর্গ বিশেষ করে পঙ্গুত্ব, অন্ধত্ব, বধিরতা,বিস্মৃতি ইত্যাদি গ্রাস করত যা খুব দ্রুতই তাদের শেষ করে দিত। তখন অনেকেই একে এক ভয়াবহ উন্মাদ রোগ হিসেবে গন্য করে এর নাম দিয়েছিল General paresis of the insane (GPI)। ১৮২২ সালে বেইল প্রথম একে সম্পূর্ণ নতুন এক রোগ হিসেবে চিহ্নিত করেন, যদিও তার কারণ তিনি বার করতে পারেননি। তারপর ১৮৫৭ সালে  এসমার্ক ও জেসেন এইরকম বহু রোগীর ইতিহাস নিয়ে প্রথম দেখলেন যে এইধরনের প্রায় সব রোগীরই অনেক আগে সিফিলিস হয়েছিল। তারও কুড়ি বছর বাদে পরীক্ষাগারে সেইসব রোগীর দেহে সিফিলিসের অনুজীব ট্রিপোনেমা খুঁজে পাওয়া সম্ভব হল। ফলে এই উন্মাদরোগকে সিফিলিসের এক রূপ হিসেবে দেখা হল।

দীর্ঘদিন ধরে অনেকেরই ধারণা ছিল যে শরীরের তাপমাত্রা অনেক বেশি করলে বেশ কিছু রোগ সেরে যায়। সেই বিশ্বাস অনুসারেই ১৯১৭ সালে অস্ট্রিয়ায় এই রোগীদের দেহে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফেরা ম্যালেরিয়ার রোগীদের রক্ত সামান্য পরিমাণে প্রবেশ করান ড. ভাগনার জুরেগ । তাঁর বিশ্বাস ছিল তাতে ম্যালেরিয়া হবে এবং তার উচ্চতাপমাত্রাতেই এই অনুজীব মারা যাবে এবং সিফিলিস ও উন্মাদ দুই রোগই সেরে যাবে। তবে উচ্চ তাপমাত্রায় মানুষ নিজেও মারা যেতে পারে, ফলে সেই অবস্থায় যাবার আগেই ম্যালেরিয়ার ওষুধ কুইনাইন দিয়ে সেই ম্যালেরিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করা হত। এই চিকিৎসায় তাই চিকিৎসাধীন রোগীদের সারাক্ষণ নজরদারি করতে হত।

এই রোগ তখন এতটাই চালু এবং ভয়াবহ ছিল যে, তাতে সারা ইউরোপ ও আমেরিকা আতঙ্কিত ছিল। নিউইয়র্কের মানসিক আশ্রয়ে প্রত্যেক পাঁচজন রোগীর একজন এতে আক্রান্ত ছিলেন। এছাড়াও বহু বিখ্যাত সাহিত্যিক, শিল্পী তখন এই রোগে মারা গেছেন। ফলে যখন জুরেগ দাবী করলেন যে, তাঁর চিকিৎসায় চারভাগের একভাগ রোগী সেরে ওঠে (যা আসলে বেশ কিছুদিন বেশি বাঁচা) তখন সারা বিশ্বে আনন্দের জোয়ার বইল। এই ম্যালেরিয়া চিকিৎসায় যে ছজনের মধ্যে একজন সেই ম্যালেরিয়াতেই মারা যাচ্ছে তা আর কেউই তখন খেয়াল করল না। সবচেয়ে বড় কথা, এই সব ফলাফল জুরেগের মতো মূলত যারা এই চিকিৎসায় বিশ্বাসী তাদেরই দেওয়া হয়েছিল। ফলে সেই ফলাফলের কোনো নিরপেক্ষতা ছিল না। তখন তুলনামূলক ট্রায়ালের ধারণা সেরকমভাবে আসেনি। এই প্রবক্তাদের ফলাফল ঘোষণা হতেই মানুষের মধ্যে তাই নিয়ে ব্যাপক প্রচার শুরু করে দিল সংবাদমাধ্যম। ম্যালেরিয়ার দাউদাউ আগুনেই সিফিলিসের ধিকিধিকি তুষের আগুন জ্বলে ছাই হয়ে যাবার গল্প প্রচারিত হল। দশ বছর বাদে সেই আবিষ্কারের জন্য নোবেল পুরষ্কার পেলেন অস্ট্রিয়ার গবেষক চিকিৎসক ড. ভাগনার জুরেগ।

এই ফলাফল কতটা সত্যি তা যেমন কোনো নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষায় দেখা হল না, তেমনি দেহের তাপমাত্রা বাড়লে কেন যে সেই জীবাণু মরে তারও প্রমাণ দেওয়া হল না। একথা ঠিক যে, দেহের তাপমাত্রা বাড়লে অনেক অনুজীবই আমাদের আক্রমণ করতে গিয়ে তাপমাত্রার কারণে মরে যায় কিন্তু তাতে রোগ যে সবসময়ে সেরে যায় এমনটা নয়। তাহলে তো ম্যালেরিয়ার তীব্র জ্বরে ম্যালেরিয়ার অনুজীবই মারা পড়ত। তা কিন্তু অধিকাংশ সময়েই হয় না। তবে অবশ্যই সেই সিফিলিসের জীবাণু তুলনায় বেশী তাপসংবেদী হতে পারে কিন্তু সেক্ষেত্রে আমাদের শরীরই তো নিজে থেকে দেহের তাপমাত্রা বাড়িয়ে সেই ট্রিপোনেমাদের মেরে দিত। তাও তো ঘটতে দেখা যায় না। ফলে এই চিকিৎসার তত্ত্বগত ব্যাখ্যাও খুব একটা জোরদার নয়। এই চিকিৎসার সাফল্য নিয়ে অবিরত প্রচার ও নোবেল পুরস্কারের মতো সম্মান পাওয়ার পরেও কিন্তু তার পরের দশ বছরে ইউরোপে জুরেগের প্রভাব তেমন বাড়েনি বরং সেই তুলনায় ফ্রয়েডের সাইকো-অ্যানালিসিস সেখানে জাঁকিয়ে বসেছে। বহু প্রশ্নের অসমাপ্ত উত্তর রেখে দিয়েই এই চিকিৎসা ১৯৪০ এর দশকে পেনিসিলিন আবিষ্কার ও সিফিলিসে তার ব্যবহারের ফলে হারিয়ে যায়। সম্ভবত মানসিক রোগের ধাঁধায় এক্ষেত্রেও নোবেল পুরস্কারের স্বর্ণমানও খোয়া গেছিল। 

জুরেগের লোহায় লোহা কাটার তত্ত্বের সাফল্য তাঁরই শহর ভিয়েনার আর এক চিকিৎসক ম্যানফ্রেড সাকেলকে সেই ধরণের আরও বিপজ্জনক এক চিকিৎসায় উদ্বুদ্ধ করল। ১৯২৪ সালে কৃত্রিম ইনসুলিন আবিষ্কারের পর জানা যায় যে, অনেকের ক্ষেত্রে সেই ইনসুলিন রক্তের শর্করার মাত্রা ভয়ঙ্কর কমিয়ে দিতে পারে। সেই সব রোগীর রক্তে শর্করা খুব কমে গেলে তারা জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন এবং প্রায় মৃত্যুর মুখে চলে যান। সেই সময়ে যদি রক্তে আবার গ্লুকোজ মিশিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে সেই মৃত্যুপথযাত্রী রোগীও সঙ্গে সঙ্গে সুস্থ হয়ে যান। উন্মাদ রোগের রোগীদের তিনি প্রচুর পরিমানে ইনসুলিন দিতেন এবং তারা কোমায় গেলে তাদের রক্তে গ্লুকোজ মিশিয়ে তাদের বাঁচান হত। এই চিকিৎসা এতটাই বিস্ময়কর ছিল যে, মাত্র চারমাসে এই নিয়ে তেরোটি গবেষণার রিপোর্ট গবেষণাপত্রে ছাপা হয়। নিজের এই চিকিৎসায় ৮০ শতাংশ উন্মাদ রোগী সেরে ওঠে বলে সাকেল বিশ্বাস করতেন। নিজের নোবেল প্রাইজ পাওয়া যে শুধু কেবল সময়ের অপেক্ষা তাতে তিনি নিশ্চিত ছিলেন। পরে অনেকেই এই চিকিৎসাকে কোন জৈবরাসায়নিক চিকিৎসা বলে মানার চেয়ে তাকে রোগীর প্রতি খুব মনোযোগ দেওয়া এক প্লাসেবো চিকিৎসা হিসেবেই দেখেছিলেন। তাঁকে নোবেল পুরষ্কার দিয়ে নোবেল কমিটি নিজে নিজের নাক এবার অন্তত কাটেনি।

প্রায় একই সময়ে সেই একই দর্শনে, উন্মাদ রোগের আর এক চিকিৎসা আবিষ্কার করেন হাঙ্গেরির চিকিৎসক মেডুনা। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, মানুষের মৃগী এবং উন্মাদ রোগ পরস্পরের বিপরীত ও একটা অন্যটাকে সারাতে পারে। সেই সময়ের এক মনের ওষুধ মেট্রাজোল সুস্থ মানুষের দেহে মৃগীর খিঁচুনি সৃষ্টি করতে পারত। তাই মেডুনা উন্মাদ রোগীদের এই মেট্রাজোল ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে খিঁচুনি সৃষ্টি করতেন এবং সেই অবস্থায় রোগীকে দীর্ঘসময়ে রেখে দিতেন। খিঁচুনি থেকে রোগীরা সেরে উঠলে তিনি দেখতেন যে তাদের উন্মাদ রোগ প্রায় সেরে গেছে। যদিও বিভিন্ন হাসপাতালের রিপোর্ট অনুসারে一এতে অধিকাংশ রোগীর দাঁত, চোয়াল, হাড় এমনকি শিরদাঁড়া ভেঙে যেত। এইসব ক্ষতির ফলে এই চিকিৎসা খুব বেশিদিন চালু থাকেনি। এই নিয়ন্ত্রিত খিঁচুনি সৃষ্টি করতে ইলেকট্রিক শক দিয়ে চিকিৎসা-পদ্ধতি (electro convulsive therapy ECT) এর কদিন বাদেই চালু হয় এবং তা সস্তা বলে ব্যাপক হারে প্রচারিতও হয়। সেই চিকিৎসা যদিও মেডুনার বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করেই হয়েছিল কিন্তু পরে তা উন্মাদ রোগীদের ওপর প্রয়োগ করা বন্ধ হয়। এই চিকিৎসা দীর্ঘকাল তীব্র মানসিক অবসাদের চিকিৎসা হিসেবেই চালু ছিল। ফলে এতে রোগ সারানো, নাকি আতঙ্ক সৃষ্টি করা一কোনটা উদ্দেশ্য ছিল তা বলা কঠিন। আমার মনে হয় আধুনিক বিজ্ঞানের মুখোশে এই চিকিৎসা একরকম আগেকার ওঝাদের ঝাঁটা পিটিয়ে ভূত তাড়ানোরই সমান। ১৯৪৭ সালেই বিখ্যাত টাইম পত্রিকায় এই নিয়ে লেখা হয়—“doctors are beginning to suspect that the ‘cure’ may be worse than the disease. The treatment...causes convulsions that may dislocate the patient’s jaw, break his bones, or even kill him.”


উৎসসূত্র:

এই লেখায় ব্যবহৃত গ্রন্থগুলি সম্পর্কে জানার জন্য প্রথম পর্বের শেষে সন্নিবিষ্ট ‘গ্রন্থঋণ’ অংশটি দেখুন।


শেয়ার করুন
দেবাশিস মুখোপাধ্যায়ের প্রতিকৃতি

লেখক

দেবাশিস মুখোপাধ্যায়

পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র ছিলেন। নগরের কোলাহল থেকে দূরে প্রকৃতির মধ্যে থাকতে পছন্দ করেন এই পরিবেশকর্মী। গ্রামের দরিদ্র মানুষের মধ্যে জীবনমুখী শিক্ষাবিস্তারের কাজেও নিয়োজিত রয়েছেন তিনি। তাঁর রচিত গ্রন্থগুলি হল—‘ক্লাসরুমের রূপকথা: জীবন বিজ্ঞান ও পরিবেশ ভ্রমণ’, ‘স্বাস্থ্যের সন্ধানে অথবা অসুস্থতার খোঁজে’ এবং ‘চিকিৎসার ধূসর জগতে: মন, সমাজ, কর্পোরেট’।

সব কাজ দেখুন →

সংখ্যা ১-এর অন্যান্য লেখা

সম্পাদকীয় প্রচ্ছদসংখ্যা ১

সম্পাদকীয়

সম্পাদকীয়

“কম্পিউটার, ই-মেল এবং ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট হ্যাক করা নিয়ে অনেক আলোচনা হয়। কিন্তু আমরা এখন এমন এক যুগে প্রবেশ করেছি যেখানে মানুষকেও হ্যাক করা সম্ভব।” ‘উই আর বিকামিং হ্যাকেবল অ্যানিমেলস’—হাড়হিম করে দেওয়া এক বাস্তবতার কথা আমাদের বলেছেন হারারি।

সমান্তর সম্পাদক৪ মিনিট
কাগজের মতো সহজে ছিঁড়ে যাওয়া সম্পর্কের ভিড়ে, বুকের ভেতরে সামান্য কাপড় বাঁচিয়ে রাখার এক মায়াবী আখ্যান ‘বোতাম’।সংখ্যা ১

গল্পস্বল্প

বোতাম

সবকিছু যখন এক ক্লিকে বদলে যায়, তখন কিছু মানুষ নিঃশব্দে পাহারা দেয় তাদের চিরপুরাতন বিশ্বাস। সুতো আর মায়া দিয়ে পার্বতীদি কী বুনে চলেছেন দিনরাত? কাগজের মতো সহজে ছিঁড়ে যাওয়া সম্পর্কের ভিড়ে, বুকের ভেতরে সামান্য কাপড় বাঁচিয়ে রাখার এক মায়াবী আখ্যান ‘বোতাম’।

সত্যসাধন মণ্ডল২ মিনিট
১৮৪৫ সালে লিখিত বিকল্প ইতিহাস। এক ভবিষ্যতের উড়িষ্যা, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীন প্রজাতন্ত্রে পরিণত হবে।সংখ্যা ১

পুরাতনী

ওড়িশা প্রজাতন্ত্র—বিংশ শতাব্দীর ইতিবৃত্তের এক বিস্মৃত পৃষ্ঠা: দ্বিতীয় পর্ব

১৮৪৫ সালে লেখা ১৯২৫ সালের এক কাহিনি। এক বিকল্প ইতিহাস। বিদ্রোহের গল্প। এক ভবিষ্যতের উড়িষ্যার গল্প। যে উড়িষ্যা একদিন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীন প্রজাতন্ত্রে পরিণত হবে। কিন্তু সেই স্বাধীনতার পথ মসৃণ নয়; তার ভিতর লুকিয়ে আছে অরণ্যের গভীরে জমে থাকা ক্ষোভ, হারিয়ে যাওয়া স্বাধীনতার স্মৃতি এবং পাহাড়ি মানুষের অদম্য আত্মমর্যাদা। শশীচন্দ্র দত্তের এই কল্প-ভবিষ্যতের কাহিনি যেন উনিশ শতকের ঔপনিবেশিক বাস্তবতার এক প্রতিবিম্ব; স্বাধীনতার স্বপ্ন কীভাবে প্রতিরোধের ভাষা খুঁজে পায়, তার এক রোমাঞ্চকর আখ্যান।

অনুবাদ: মেঘা সিনহা১২ মিনিট

মনোরোগের ধূসরতায় ধারাবাহিকের অন্যান্য পর্ব

বিজ্ঞানের নামে ভয়ংকর অপরাধ, নাকি বিশ্বজয়ের গোপন ব্লু-প্রিন্ট?সংখ্যা ২

বিজ্ঞান

মনোরোগের ধূসরতায়: চতুর্থ পর্ব

যদি মানুষের চেতনাই হয়ে ওঠে যুদ্ধের গোপন মারণাস্ত্র! নাৎসি বিজ্ঞানীদের গোপন পুনর্বাসন, জাপানের নৃশংস জীবাণুযুদ্ধ, আর মানুষের মনকে বশে আনতে সিআইএ-র কুখ্যাত গোপন প্রকল্প ‘MK-Ultra’! এলএসডি-র যথেচ্ছ প্রয়োগ থেকে শুরু করে যুদ্ধের বন্দীদের ওপর মারাত্মক রাসায়নিক পরীক্ষা—রাজনীতি আর ক্ষমতার নোংরা খেলায় কীভাবে সাধারণ মানুষের মনকে কব্জা করা হয়েছিল? কেন বিটনিক-হিপি বিদ্রোহের মতো গণ-আন্দোলনকে নেশার সাগরে ডুবিয়ে দেওয়া হলো? যে কোনো রাজনৈতিক থ্রিলারকে হার মানানো এক অবিশ্বাস্য ইতিহাসের সাক্ষী হতে পড়ুন চতুর্থ পর্ব—‘মগজধোলাই রাজনীতির থ্রিলার’।

দেবাশিস মুখোপাধ্যায়১৬ মিনিট
সিগমুন্ড ফ্রয়েড—এক মহান মনস্তাত্ত্বিক, নাকি মানব ইতিহাসের অন্যতম চতুর গল্পকার?সংখ্যা ২

বিজ্ঞান

মনোরোগের ধূসরতায়: তৃতীয় পর্ব

সিগমুন্ড ফ্রয়েড কি একজন মহান মনস্তাত্ত্বিক, নাকি এক চতুর গল্পকার? অবচেতন মন, যৌন অবদমন আর মনঃসমীক্ষণ—যাঁর তত্ত্বে একসময় বুঁদ হয়েছিল গোটা বিশ্ব, তাঁর গবেষণার পেছনে কতটা বিজ্ঞান আর কতটা সাজানো রূপকথা? কোকেন আসক্তি থেকে শুরু করে নিজের ব্যর্থ চিকিৎসা ও রোগীদের আসল পরিণতি লুকিয়ে রাখার পরও কীভাবে একনায়কের মতো নিজের তত্ত্বকে শতাব্দীর সেরা চিকিৎসা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ফ্রয়েড? মনোবিশ্লেষণের সেই জাদুকরী ছদ্মবেশ নিয়ে তৃতীয় পর্ব—‘ফ্রয়েডের বৈজ্ঞানিক রূপকথা’।

দেবাশিস মুখোপাধ্যায়১৩ মিনিট
মনোরোগের ইতিহাস, বিজ্ঞানের নির্মম পরীক্ষার পরিহাস, ফ্রয়েডীয় ফাঁকফোকর—মনোচিকিৎসা ও ওষুধ সাম্রাজ্যের হাড়হিম করা সত্যের উন্মোচন।সংখ্যা ১

বিজ্ঞান

মনোরোগের ধূসরতায়: প্রথম পর্ব

আমরা কি সত্যিই অসুস্থ, নাকি আমাদের রোগী বানানো হচ্ছে? বিশ্বজুড়ে মানসিক রোগের রমরমা—কিন্তু এই ‘মহামারী’ কি বাস্তব, নাকি করপোরেট মুনাফার কারসাজিতে বানানো এক অবাস্তব আখ্যান? জীবনের তুচ্ছাতিতুচ্ছ দ্বন্দ্ব-জটিলতা কি শিশুর চঞ্চলতা—অস্বাভাবিক? নাকি নেহাৎ ওষুধ কোম্পানির খদ্দের ধরার ফাঁদ। যে বিজ্ঞানের এখনও কোনো জৈব-রাসায়নিক মাপকাঠিই নেই, তা কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে একটা বিরাট বাজার? শুরু হলো দেবাশিস মুখোপাধ্যায়ের অনুসন্ধিৎসু সত্যান্বেষণ—‘মনোরোগের ধূসরতায়’! মনোরোগের ইতিহাস আর তার অন্ধকার, বিজ্ঞানের নির্মম পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরিহাস, ফ্রয়েডীয় ফাঁকফোকর, স্নায়ুযুদ্ধ অথবা সি.আই.এ-র ষড়যন্ত্র—মনোচিকিৎসা ও ওষুধ সাম্রাজ্যের হাড়হিম করা রোমাঞ্চকর সত্য উন্মোচিত হতে চলেছে এই ধারাবাহিকের আঠারোটি পর্ব! আজ প্রথম পর্ব ‘সঙ্কটের স্বরূপ’।

দেবাশিস মুখোপাধ্যায়১৫ মিনিট

আরও পড়ুন

বিজ্ঞানের নামে ভয়ংকর অপরাধ, নাকি বিশ্বজয়ের গোপন ব্লু-প্রিন্ট?সংখ্যা ২

বিজ্ঞান

মনোরোগের ধূসরতায়: চতুর্থ পর্ব

যদি মানুষের চেতনাই হয়ে ওঠে যুদ্ধের গোপন মারণাস্ত্র! নাৎসি বিজ্ঞানীদের গোপন পুনর্বাসন, জাপানের নৃশংস জীবাণুযুদ্ধ, আর মানুষের মনকে বশে আনতে সিআইএ-র কুখ্যাত গোপন প্রকল্প ‘MK-Ultra’! এলএসডি-র যথেচ্ছ প্রয়োগ থেকে শুরু করে যুদ্ধের বন্দীদের ওপর মারাত্মক রাসায়নিক পরীক্ষা—রাজনীতি আর ক্ষমতার নোংরা খেলায় কীভাবে সাধারণ মানুষের মনকে কব্জা করা হয়েছিল? কেন বিটনিক-হিপি বিদ্রোহের মতো গণ-আন্দোলনকে নেশার সাগরে ডুবিয়ে দেওয়া হলো? যে কোনো রাজনৈতিক থ্রিলারকে হার মানানো এক অবিশ্বাস্য ইতিহাসের সাক্ষী হতে পড়ুন চতুর্থ পর্ব—‘মগজধোলাই রাজনীতির থ্রিলার’।

দেবাশিস মুখোপাধ্যায়১৬ মিনিট
সিগমুন্ড ফ্রয়েড—এক মহান মনস্তাত্ত্বিক, নাকি মানব ইতিহাসের অন্যতম চতুর গল্পকার?সংখ্যা ২

বিজ্ঞান

মনোরোগের ধূসরতায়: তৃতীয় পর্ব

সিগমুন্ড ফ্রয়েড কি একজন মহান মনস্তাত্ত্বিক, নাকি এক চতুর গল্পকার? অবচেতন মন, যৌন অবদমন আর মনঃসমীক্ষণ—যাঁর তত্ত্বে একসময় বুঁদ হয়েছিল গোটা বিশ্ব, তাঁর গবেষণার পেছনে কতটা বিজ্ঞান আর কতটা সাজানো রূপকথা? কোকেন আসক্তি থেকে শুরু করে নিজের ব্যর্থ চিকিৎসা ও রোগীদের আসল পরিণতি লুকিয়ে রাখার পরও কীভাবে একনায়কের মতো নিজের তত্ত্বকে শতাব্দীর সেরা চিকিৎসা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ফ্রয়েড? মনোবিশ্লেষণের সেই জাদুকরী ছদ্মবেশ নিয়ে তৃতীয় পর্ব—‘ফ্রয়েডের বৈজ্ঞানিক রূপকথা’।

দেবাশিস মুখোপাধ্যায়১৩ মিনিট
মনোরোগের ইতিহাস, বিজ্ঞানের নির্মম পরীক্ষার পরিহাস, ফ্রয়েডীয় ফাঁকফোকর—মনোচিকিৎসা ও ওষুধ সাম্রাজ্যের হাড়হিম করা সত্যের উন্মোচন।সংখ্যা ১

বিজ্ঞান

মনোরোগের ধূসরতায়: প্রথম পর্ব

আমরা কি সত্যিই অসুস্থ, নাকি আমাদের রোগী বানানো হচ্ছে? বিশ্বজুড়ে মানসিক রোগের রমরমা—কিন্তু এই ‘মহামারী’ কি বাস্তব, নাকি করপোরেট মুনাফার কারসাজিতে বানানো এক অবাস্তব আখ্যান? জীবনের তুচ্ছাতিতুচ্ছ দ্বন্দ্ব-জটিলতা কি শিশুর চঞ্চলতা—অস্বাভাবিক? নাকি নেহাৎ ওষুধ কোম্পানির খদ্দের ধরার ফাঁদ। যে বিজ্ঞানের এখনও কোনো জৈব-রাসায়নিক মাপকাঠিই নেই, তা কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে একটা বিরাট বাজার? শুরু হলো দেবাশিস মুখোপাধ্যায়ের অনুসন্ধিৎসু সত্যান্বেষণ—‘মনোরোগের ধূসরতায়’! মনোরোগের ইতিহাস আর তার অন্ধকার, বিজ্ঞানের নির্মম পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরিহাস, ফ্রয়েডীয় ফাঁকফোকর, স্নায়ুযুদ্ধ অথবা সি.আই.এ-র ষড়যন্ত্র—মনোচিকিৎসা ও ওষুধ সাম্রাজ্যের হাড়হিম করা রোমাঞ্চকর সত্য উন্মোচিত হতে চলেছে এই ধারাবাহিকের আঠারোটি পর্ব! আজ প্রথম পর্ব ‘সঙ্কটের স্বরূপ’।

দেবাশিস মুখোপাধ্যায়১৫ মিনিট