সম্পাদকীয়
“কম্পিউটার, ই-মেল এবং ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট হ্যাক করা নিয়ে অনেক আলোচনা হয়। কিন্তু আমরা এখন এমন এক যুগে প্রবেশ করেছি যেখানে মানুষকেও হ্যাক করা সম্ভব।” ‘উই আর বিকামিং হ্যাকেবল অ্যানিমেলস’—হাড়হিম করে দেওয়া এক বাস্তবতার কথা আমাদের বলেছেন হারারি।
সংখ্যা ১২০১৮ সালের ২৪ অগাস্ট আল জাজিরাকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে প্রথিতযশা ইজরায়েলি ইতিহাসবিদ ইউভাল নোয়া হারারি বলেছিলেন—“কম্পিউটার, ই-মেল এবং ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট হ্যাক করা নিয়ে অনেক আলোচনা হয়। কিন্তু আমরা এখন এমন এক যুগে প্রবেশ করেছি যেখানে মানুষকেও হ্যাক করা সম্ভব।” ‘উই আর বিকামিং হ্যাকেবল অ্যানিমেলস’—হাড়হিম করে দেওয়া এক বাস্তবতার কথা আমাদের বলেছেন হারারি।
স্মার্টফোন, সিসিটিভি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইন্টারনেট অব থিংস, ফেসিয়াল রিকগনিশন এবং বিগ ডেটার মাধ্যমে আমার-আপনার দৈনন্দিন কার্যকলাপের তথ্য বিপুল পরিমাণে সংগ্রহ করা হচ্ছে ও তার বিশ্লেষণও হচ্ছে প্রতি মুহূর্তে। মানুষের পছন্দ-অপছন্দ, ভালো-মন্দ, রুচি, চিন্তাভাবনা, আবেগ, আচরণ এক বিরাট ডিজিটাল পরীক্ষাগারে অদৃশ্য নজরদারির আওতায় রয়েছে। মেঘের আড়াল থেকে অ্যালগরিদম সবসময় আপনার এবং আমার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে চলেছে। অর্থাৎ এখন মানুষ শুধু প্রযুক্তি ব্যবহার করছে না, প্রযুক্তিও মানুষকে ব্যবহার করছে। ম্যানিপুলেটিভ টেকনোলজি, পারসুয়েসিভ টেকনোলজি, সার্ভেইল্যান্স টেকনোলজি-র বাড়বাড়ন্তের এই যুগ ‘বড়ো সুখের সময় নয়’, ‘বড়ো আনন্দের সময় নয়’। হয়তো কিছু না বুঝেই নির্দিষ্ট এক সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বিদ্বেষপূর্ণ একটি ভিডিও আপনি দেখলেন। অ্যালগরিদম আপনার এই আচরণকে আগ্রহের সংকেত হিসেবে ধরে নেবে এবং বারবার একই ধরনের আরও ভিডিও, পোস্ট ও খবর দেখাতে থাকবে। ধীরে ধীরে আপনার দৃষ্টিকে আচ্ছন্ন করবে পাহাড়প্রমাণ মিথ্যা, ঘৃণা, সন্দেহ ও ভুলের হিমালয়। এই ব্যবস্থা আপনাকে কিনিয়েই ছাড়বে একটা স্মার্টফোন, আপনাকে দেখাবেই একটা রিল; প্রযুক্তির সঙ্গে এই পাশাখেলায় অংশ নিতে না চেয়েও অংশ নিতে বাধ্য হবেন আপনি এবং তারপর কখন যে আপনার ব্যক্তিগত রুচি, চিন্তা, সিদ্ধান্তের বস্ত্রহরণ হয়ে যাবে তা আপনি টেরও পাবেন না।
এরই সমান্তরালে নিভৃতে জন্ম নিয়েছে আর এক নতুন মহামারী—মনোসংযোগের অবক্ষয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই যুগকে ভবিষ্যৎ একদিন ‘মনোসংযোগের সংকটের যুগ’ হিসেবে চিহ্নিত করবে কি না, তা এখনই বলা যায় না তবে ১৫ থেকে ৬০ সেকেন্ডের একটি রিলের দৈর্ঘ্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আমাদের একাগ্রতার পরিসরও যে ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে, তা আর নিছক অনুমান নয় বরং আমাদের প্রতিদিনের ব্যক্তি অভিজ্ঞতারই অংশ।
সংশয়, সংকট আর শঙ্কার এই কুয়াশাচ্ছন্ন সময়ে দাঁড়িয়ে, অসংখ্য বিচিত্র আর বহুগুণ শক্তিশালী অডিও ও অডিও-ভিজ্যুয়াল বিনোদনমাধ্যমের ভিড়ে সমান্তর যে নিজের জন্য একটি ছোট্ট পাঠক-পরিসর তৈরি করতে পেরেছে এবং এই বামন-মনোযোগের যুগেও আপনাদের কাছে খানিকটা সময় দাবি করার সাহস দেখাচ্ছে, তার কারণ—পাঠের প্রয়োজন ও গুরুত্ব আজও ফুরিয়ে যায়নি, বরং তা ক্রমশ আরও জরুরি হয়ে উঠছে।
যে-কোনো আবিষ্কারের ফল ভালো-খারাপ দুই-ই হয়। আবিষ্কার ভালো বা খারাপ হয় না, ভালো বা খারাপ হয় মানুষ। আমরা প্রযুক্তির বিরোধী নই; আমরা চাই তা আগ্রাসনের নয়, মানুষের অগ্রগতির সহায় হয়ে উঠুক। সমান্তরের অধিকাংশ লেখার প্রচ্ছদ-ছবি নির্মাণে আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্য নিতে দ্বিধা করিনি কিন্তু ছবিগুলির ভাবনা, বিষয় নির্বাচন ও সৃজনশীল নির্দেশনার ক্ষেত্রে আমাদের নিজস্ব চিন্তাভাবনা রয়েছে।
সমান্তরের শরৎসংখ্যাই পত্রিকাটির প্রথম বর্ষের প্রথম সংখ্যা। ২০২৬ সালে শরৎঋতুর বিস্তৃতি ছিল ১৯ অগাস্ট থেকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত। কিন্তু প্রথম সংখ্যা প্রকাশের ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়সীমার ব্যতিক্রম ঘটাতে আমরা বাধ্য হয়েছি। প্যারালালের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে সমান্তর প্রথম জনসমক্ষে আসে ১১ অক্টোবর। তাই ১১ থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত শরৎসংখ্যাটিকে বহমান রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বাংলা পঞ্জিকা অনুসারে ১৯ অক্টোবর থেকে হেমন্তঋতুর সূচনা হলেও সমান্তরের হেমন্তসংখ্যা প্রকাশিত হবে আগামীকাল, ১ নভেম্বর। এই সংখ্যা চলমান থাকবে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত। প্রথম সংখ্যার ক্ষেত্রে সময়ের এই সামান্য ব্যতিক্রমটুকু মেনে নিয়ে, এরপর থেকে বাংলা ঋতুচক্র অনুসারেই সমান্তরের প্রতিটি সংখ্যা প্রকাশিত হবে।
সমান্তরের শরৎসংখ্যায় মোট ২৪টি লেখা প্রকাশিত হয়েছে। বিজ্ঞান, প্রত্নতত্ত্ব, অর্থনীতি, অনুগল্প, কবিতা ও অনুবাদ—বিষয়বৈচিত্র্যের দিক থেকে সংখ্যাটি যথেষ্ট সমৃদ্ধ। পুরাতনী বিভাগে কৈলাস চন্দ্র দত্ত ও শশী চন্দ্র দত্তের দুটি বিরলপ্রচারিত, বিস্মৃতপ্রায় ইংরেজি গল্পের বাংলা অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে একথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বাংলা ভাষায় গল্প দুটির অনুবাদ এই প্রথম। এদের সাহিত্যিক উৎকর্ষ বা রচনাশৈলী বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে না, কিন্তু বিষয়বস্তুর অভিনবত্ব ও ঐতিহাসিক গুরুত্বের বিচারে এই দুটি গল্পের অনুবাদ নিঃসন্দেহে মূল্যবান সংযোজন। কবিতার ক্ষেত্রেও বিষয় ও অনুভবের বৈচিত্র্য লক্ষ করা যাবে।
এই সংখ্যায় প্রকাশিত হতে শুরু করেছে দুটি ধারাবাহিক রচনা, যাদের বিষয় যথেষ্ট কৌতূহলজনক। তিনটি গল্পের মধ্যে অন্তত দুটিতে লক্ষ করা যায় প্রচলিত ছকের বাইরে গিয়ে মৌলিক কিছু সৃষ্টির চেষ্টা—যেখানে রয়েছে মৌলিক বিষয় নির্বাচন, কল্পনার স্বাতন্ত্র্য এবং ঝুঁকি নেওয়ার সাহস। সব মিলিয়ে, বিষয়বৈচিত্র্য, বিস্মৃত সাহিত্য-উপাদানের পুনরাবিষ্কার এবং নতুন ধরনের লেখার প্রয়াস—এই তিনের সমন্বয়ে সমান্তরের শরৎসংখ্যা পাঠকের আগ্রহ জাগিয়ে তুললে আমাদের এই প্রয়াস সার্থক হবে।
এই দৌড়ের যুগে পড়ার জন্য কাউকে থামতে বলা সহজ নয়। তবু আজও কিছু লেখা মানুষকে থামায়, ভাবায়। কিছু লেখা শুধু পেট ভরায় না; সুস্বাদের, সুগন্ধের অনুভূতি নিয়েও আসে। সমান্তর তার দূত হোক।
সংখ্যা ১-এর অন্যান্য লেখা
সংখ্যা ১গল্পস্বল্প
বোতাম
সবকিছু যখন এক ক্লিকে বদলে যায়, তখন কিছু মানুষ নিঃশব্দে পাহারা দেয় তাদের চিরপুরাতন বিশ্বাস। সুতো আর মায়া দিয়ে পার্বতীদি কী বুনে চলেছেন দিনরাত? কাগজের মতো সহজে ছিঁড়ে যাওয়া সম্পর্কের ভিড়ে, বুকের ভেতরে সামান্য কাপড় বাঁচিয়ে রাখার এক মায়াবী আখ্যান ‘বোতাম’।
সংখ্যা ১পুরাতনী
ওড়িশা প্রজাতন্ত্র—বিংশ শতাব্দীর ইতিবৃত্তের এক বিস্মৃত পৃষ্ঠা: দ্বিতীয় পর্ব
১৮৪৫ সালে লেখা ১৯২৫ সালের এক কাহিনি। এক বিকল্প ইতিহাস। বিদ্রোহের গল্প। এক ভবিষ্যতের উড়িষ্যার গল্প। যে উড়িষ্যা একদিন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীন প্রজাতন্ত্রে পরিণত হবে। কিন্তু সেই স্বাধীনতার পথ মসৃণ নয়; তার ভিতর লুকিয়ে আছে অরণ্যের গভীরে জমে থাকা ক্ষোভ, হারিয়ে যাওয়া স্বাধীনতার স্মৃতি এবং পাহাড়ি মানুষের অদম্য আত্মমর্যাদা। শশীচন্দ্র দত্তের এই কল্প-ভবিষ্যতের কাহিনি যেন উনিশ শতকের ঔপনিবেশিক বাস্তবতার এক প্রতিবিম্ব; স্বাধীনতার স্বপ্ন কীভাবে প্রতিরোধের ভাষা খুঁজে পায়, তার এক রোমাঞ্চকর আখ্যান।
সংখ্যা ১বিজ্ঞান
মনোরোগের ধূসরতায়: দ্বিতীয় পর্ব
রোগ নিরাময়, নাকি আধুনিক বিজ্ঞানের পোশাকে আদিম বর্বরতা? কখনো পেটের নাড়িভুঁড়ি কেটে বাদ দেওয়া, কখনো মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল লোব খুবলে নিয়ে রোগীকে জড়ভরত বানিয়ে দেওয়া, আবার কখনো ম্যালেরিয়ার জীবাণু বা ইনসুলিনের মারণ কোমা দিয়ে তথাকথিত ‘চিকিৎসা’! এমনকি এই মারাত্মক লোবোটমির জন্য জুটেছিল নোবেল পুরস্কারও। চিকিৎসকদের অন্ধ অহংকার আর অসহায় পরিবারের আর্তি কীভাবে মানসিক রোগীদের ঠেলে দিয়েছিল এক জীবন্ত নরকে? মনোরোগ চিকিৎসার আদিপর্বের চাঞ্চল্যকর ইতিহাস জানুন দ্বিতীয় পর্বে—‘মনোচিকিৎসার আদিপর্ব: বিজ্ঞানের আড়ালে’।


