মনোরোগের ধূসরতায়: চতুর্থ পর্ব
যদি মানুষের চেতনাই হয়ে ওঠে যুদ্ধের গোপন মারণাস্ত্র! নাৎসি বিজ্ঞানীদের গোপন পুনর্বাসন, জাপানের নৃশংস জীবাণুযুদ্ধ, আর মানুষের মনকে বশে আনতে সিআইএ-র কুখ্যাত গোপন প্রকল্প ‘MK-Ultra’! এলএসডি-র যথেচ্ছ প্রয়োগ থেকে শুরু করে যুদ্ধের বন্দীদের ওপর মারাত্মক রাসায়নিক পরীক্ষা—রাজনীতি আর ক্ষমতার নোংরা খেলায় কীভাবে সাধারণ মানুষের মনকে কব্জা করা হয়েছিল? কেন বিটনিক-হিপি বিদ্রোহের মতো গণ-আন্দোলনকে নেশার সাগরে ডুবিয়ে দেওয়া হলো? যে কোনো রাজনৈতিক থ্রিলারকে হার মানানো এক অবিশ্বাস্য ইতিহাসের সাক্ষী হতে পড়ুন চতুর্থ পর্ব—‘মগজধোলাই রাজনীতির থ্রিলার’।
মনোরোগের ধূসরতায়পর্ব ৪/৪
সংখ্যা ২মগজধোলাই রাজনীতির থ্রিলার
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানি তখন ব্রিটেনের ওপর লাগাতার আকাশ-হানা চালাচ্ছে। একই সঙ্গে বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্রের আক্রমণে ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা নাস্তানাবুদ। এর ওপর সেই সময়েই আবার ব্রিটেনের ওপর হিটলারের জৈবরাসায়নিক বোমা হামলার গোপন গোয়েন্দা রিপোর্ট প্রকাশ পেল। এই খবরে আতঙ্কিত ব্রিটেন আমেরিকার কাছে জার্মানির বিরুদ্ধে জীবাণুযুদ্ধের মশলার জন্য কাতর দাবি করে। সেই তাগিদেই নতুন ধরনের যুদ্ধের জন্য আমেরিকাকে খুব দ্রুত প্রস্তুত হতে হল। জৈব ও রাসায়নিক যুদ্ধের মালমশলা বানানোর জন্য মেরিল্যান্ডের ক্যাম্প ডেট্রিকে এক অত্যাধুনিক গোপন গবেষণাকেন্দ্র তৈরি হল। আমেরিকার বাছা বাছা ১৫০০ বিজ্ঞানীদের সেখানে নিয়ে আসা হল আর তাদের যত খুশি খরচ করার অধিকার দেওয়া হল। শর্ত একটাই, যা আবিষ্কার করার তা তাড়াতাড়িই করতে হবে। তাদের গবেষণার একটা বড় অংশই ছিল সেই ধরনের মারণাস্ত্র জার্মানি ও জাপান কতদূর বানাতে পেরেছে তা জানা।
সেই সময়ে একই সঙ্গে আমেরিকা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জৈব ও রাসায়নিক অস্ত্রের খবর সংগ্রহের জন্য এক গোয়েন্দা বিভাগ চালু করে। মনে রাখতে হবে আমেরিকা কিন্তু তখনো সরাসরি ইউরোপের মাটিতে যুদ্ধে নামেনি। তারা বরং বেশি চিন্তিত জাপানকে নিয়ে। এই গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান হলেন মার্ক কোম্পানির প্রধান ড. জর্জ মার্ক। ফলে রাসায়নিক যুদ্ধের সাথে ওষুধ কোম্পানির স্বার্থ প্রথম থেকেই জড়িয়ে ছিল। গোয়েন্দা বিভাগের খবরেই প্রকাশ পায় যে চিনের বিস্তীর্ণ এলাকায় জাপান জীবাণুযুদ্ধ চালিয়েছে। তাদের গোপন খবরেই বিজ্ঞানীরা জানতে পারেন, জাপান ও জার্মান এই বিষয়ে বহুদূর এগিয়ে গেছে। তারা যেভাবে সমস্ত নিয়ম-কানুন ভেঙে গবেষণা করে তা আমেরিকার পক্ষে কল্পনা করাই অসম্ভব। আমেরিকার বিজ্ঞানীরা সেইসব গবেষণার ফলাফলের দিকে তীর্থের কাকের মতো তাকিয়ে থাকতেন; তবে দীর্ঘদিন অপেক্ষা করেও তেমন কোনো খবর তাঁরা পাচ্ছিলেন না।
ন্যুরেনবার্গ রাজপ্রাসাদে ছশো নম্বর কোর্টে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের জার্মানির ‘চিকিৎসা গণহত্যা’ অপরাধের ট্রায়াল চলছে। অভিযুক্ত পঁচিশ জনের মধ্যে হাইনরিশ হিমলার নিজের সেলে আত্মহত্যা করেছেন। আউশিৎটজ ক্যাম্পে রাসায়নিক প্রয়োগের হত্যাকাণ্ডের কাণ্ডারী যোসেফ মেঙ্গেলে নিখোঁজ। তবে বাকি তেইশজনের মধ্যে হিটলারের ব্যক্তিগত চিকিৎসক থেকে শুরু করে বিভিন্ন কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের গণহত্যার যেসব গবেষণা করা হয়েছিল তাদের মাথারা আছেন। তাদের মধ্যে আছেন ড. কার্ট ব্লম যিনি একটু আড়ালেই থাকতেন। নাৎসি জার্মানির ক্যান্সার গবেষণার প্রধান ও সহ স্বাস্থ্যমন্ত্রী হলেও আসলে তিনি কিন্তু বিভিন্ন রাসায়নিক প্রয়োগে শরীরে কী ফলাফল হয় সেসব তথ্যের আকর ছিলেন। সেই খবর আমেরিকার গোয়েন্দা বিভাগের থেকে সেই ক্যাম্প ডেট্রিকের গবেষকরা জানতেন। বিচারের সময়ে আমেরিকার কাছে তাঁর গুরুত্ব বিচারকদের জানিয়ে দেওয়া হয়। অনুরোধ করা হয় ফাঁসি দেওয়ার চেয়ে তাঁকে নিয়োগ করাই ভাল। রাসায়নিক, জীবাণু এমনকি মন নিয়ন্ত্রণের ওপর রাসায়নিকের প্রভাব নিয়ে তাঁর গভীর জ্ঞানের সামান্য কিছু ঝলক তিনি জিজ্ঞাসাবাদের সময়ই জানান দেন। আর এও জানিয়ে দেন যে যদি সব জানতে হয়, তাহলে তাঁকে বাঁচিয়ে রাখাই শুধু নয়, তাঁকে আমেরিকার গবেষণার শীর্ষে সম্মান দিয়ে নিয়ে যেতে হবে।
আসলে হিটলারের বাহিনীর যোগ্য গবেষকদের যে গোপনে সব দেশই নিয়োগ করছিল তা তিনি জানতেন। আমেরিকা নিজের স্বার্থে নাৎসি বিজ্ঞানীদের পুনর্বাসন দিতে বেশি আগ্রহী ছিল। যতদিন রুজভেল্ট রাষ্ট্রপতি ছিলেন সেই কাজ সহজে চালানো যাচ্ছিল না। তাঁর মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি হলেন ট্রুম্যান যাঁর কাছে নীতির থেকে রাজনীতি আগে। নাৎসি বিশেষজ্ঞদের গোপনে নিয়োগ করার সিআইএ প্রকল্প ‘অপারেশন পেপারক্লিপ’ দারুণ গতি পেল। সেই নিয়োগের এক দামী টার্গেট ছিলেন ড. ব্লম। তেইশজন অপরাধীর মধ্যে সাত জনকে প্রাণদণ্ড দেওয়া হল, ন’জনকে দীর্ঘ কারাবাস দেওয়া হল। ছাড়া পেলেন ডা. ব্লম। সেই সময়ে বিজ্ঞানীমহলে চালু ছিল যে তিনি এমন বিষের খবর জানেন যা প্রয়োগে মারা হলে কোন প্রমাণ পর্যন্ত থাকে না। সেই ব্লমই বললেন যে একবার আমেরিকায় নিয়ে এলে জৈব ও রাসায়নিক অস্ত্রের গবেষণায় তিনি নতুন বিপ্লব আনবেন। ক্যাম্প ডেট্রিক ও আমেরিকার প্রতিরক্ষা দপ্তরে আনন্দের বন্যা বয়ে গেল। বোঝা গেল কোনো রাষ্ট্রেরই ফ্যাসিবাদের সাথে ধান্দা ছাড়া কোনো নীতিগত বিরোধ আসলে থাকে না। ব্লম প্রায় আমেরিকায় চলে এসেছিলেন। আমেরিকার বিজ্ঞানীদের সংগঠনের তীব্র প্রতিবাদে ব্লমের মতো ভয়ংকর অপরাধীদের আনা বানচাল হয়ে গেল। তবুও সাতশোর বেশি বিজ্ঞানীকে নাৎসি জার্মানি থেকে আনা হল যাদের প্রায় সবাই হিটলারের দলের সদস্য ছিলেন। বেশ প্রভাবশালী তিনজন গবেষক জৈব, রাসায়নিক অস্ত্রের গবেষণায় ক্যাম্প ডেট্রিকে যোগদান করলেন। ব্লমের দুধের সাধ এই তিনজনের ঘোলে সেবার মেটাল ক্যাম্প ডেট্রিক।
অন্যদিকে জাপান চিনের অধিকৃত মাঞ্চুরিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলে জৈব যুদ্ধের হত্যাকাণ্ডে হাত পাকিয়ে ফেলেছে। সেই পুরো প্রকল্পের মাথা জাপানি বিজ্ঞানী ড. শিরো ইশি। তিনি ধরা পড়তেই জানিয়ে দিলেন যে, যদি তাঁর দলের সদস্যদের কূটনৈতিক নিরাপত্তা দেওয়া হয়, তাহলে তিনি তাঁর গবেষণার সব ফলাফল জানিয়ে দেবেন। গুরুত্ব বুঝে তড়িঘড়ি তাঁর দাবি মেনে নিল আমেরিকা। তিনিও জাপানের প্রত্যন্ত প্রান্তে বিভিন্ন মন্দির ও পাহাড়ি গুহায় লুকিয়ে রাখা সেই সব নিহতের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের নমুনা ও স্লাইড আমেরিকার হাতে তুলে দিলেন। সেইসব মূল্যবান স্লাইড গোপনে চলে এল ক্যাম্প ডেট্রিকে। তবে বিজ্ঞানী ইশিকে আমেরিকায় আনার ঝুঁকি আর নিল না প্রতিরক্ষা দপ্তর। বরং তাঁকে আমেরিকার গোপন যে সব গবেষণাকেন্দ্র ও ডিটেনশন সেন্টার এশিয়ায় ছিল সেখানে নিয়োগ করা হল। সেইখানেই তিনি এমন সব নিষ্ঠুর গবেষণা চালাতে পারলেন যা আমেরিকার মাটিতে বসে করা সম্ভব নয়। সেই অবৈধ আমানবিক গবেষণার ক্ষীর খেতে লাগল আমেরিকা।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে বিশ্বরাজনীতির মানচিত্রে এক বিরাট পরিবর্তন হল। সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ও তার উপগ্রহ রাষ্ট্রের উদ্ভব হল। আমেরিকার গোপন সংস্থা সিআইএ-র কাজ বেড়ে গেল। এবার সিআইএ-র গোপন যুদ্ধের মধ্যে দুঃসংবাদ এল। সমাজতান্ত্রিক হাঙ্গেরিতে সরকার উৎখাতের এক অভ্যুত্থানে সিআইএ-র সহযোগী ক্যাথলিক প্রধান যোসেফ মিন্সেন্টি সরকারি বাহিনীর কাছে ধরা পড়ে গেলেন। এতে তত কিছু ঘাবড়ানোর কারণ ছিল না। কিন্তু বিচারের সময়ে সেই পাদরি তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ কেবল স্বীকারই করলেন না বরং কীভাবে সেইসব চক্রান্ত করেছিলেন তাও জানিয়ে দিলেন। যদিও সারা পৃথিবী সেই বিচারের নিন্দা করেছিল, সিআইএ কিন্তু আরও গভীর রহস্যের গন্ধ পেল। সেই স্বীকারোক্তির সময়ে পাদরি যেভাবে আচরণ করেছিলেন, সে স্বরে তিনি কথা বলেছিলেন তা দেখে তাঁরা বুঝেছিলেন যে তিনি তাঁর মনের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছেন। সিআইএ-র বদ্ধমূল ধারণা হল যে, তাদের শত্রু সোভিয়েতরা এমন কিছু পদ্ধতি আবিষ্কার করেছে যাতে মানুষের মনকে বশে আনা যায়। সেই খবর ক্যাম্প ডেট্রিকে যখন পৌঁছল তখন তাদের বিজ্ঞানীদের মাথায় হাত পড়ে গেল। এতদিনের এত পরিশ্রমে তারা যে প্রায় কিছুই করতে পারেনি তা প্রমাণ হয়ে গেল। সিআইএ মন নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে নতুন করে ভাবনা-চিন্তা শুরু করল। যদিও পরে জানা যায় যে তাদের সন্দেহ অমূলকই ছিল, স্রেফ টর্চারেই পাদরি যোসেফ সব বলে দিয়েছিলেন। সেই ভুল সন্দেহই পরে আরও বেড়ে এক ভয়ংকর গতিপথ সৃষ্টি করল।
সিআইএ-র দুঁদে গুপ্তচর অ্যালেন ডালেস আমেরিকার বিখ্যাত রাজনৈতিক পরিবারের মানুষ। কিন্তু তাঁর ইতিহাসের প্রতি এক ভিন্ন বোধ ছিল। তিনি সত্যিই বিশ্বাস করতেন যে, আধুনিক যুগে ইতিহাসের গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করবে গোপন অন্তর্ঘাত এবং সেই বিশ্বাসেই তিনি সিআইএতে যোগ দিয়েছিলেন। তাঁর সেই বিশ্বাস এবং সোভিয়েতের মন নিয়ন্ত্রণের ধারণা তাঁকে বোঝাল যে মনের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা যে গোপন সংস্থার হাতে থাকবে রাজনীতির ভবিষ্যৎও তারই হাতে। তিনি মন নিয়ন্ত্রণকে সিআইএ-র এক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হিসেবে তৈরি করলেন আর রাসায়নিকের মাধ্যমে সেই মন নিয়ন্ত্রণের প্রকল্পের নাম দিলেন MK-ultra। সেই প্রকল্পের জন্য আমেরিকার গোপন জৈব রাসায়নিক অস্ত্র গবেষণার অত্যন্ত যোগ্য গবেষক ড. গোটলিয়েবেকে ডিরেক্টর হিসেবে নিয়ে এলেন ক্যাম্প ডেট্রিক থেকে।
সেই প্রকল্পের শুরুতেই মন নিয়ন্ত্রণে তারা জোর দিয়েছিলেন মনরাসায়নিক LSD-র ক্ষমতা পরীক্ষা দিয়ে। সেই সময়ে সারা পৃথিবীতে একমাত্র স্যানডোজ কোম্পানির হাতেই এর উৎপাদনের পেটেন্ট ছিল। সিআইএ-র ধারণা ছিল সোভিয়েতের মন নিয়ন্ত্রণে এই রাসায়নিকের এক বড় ভূমিকা আছে। সেই সময়ের রাশিয়ান বহু গবেষণাপত্রে এই রাসায়নিক নিয়ে লেখা হচ্ছিল বলেই এই সন্দেহ সৃষ্টি হয়। এছাড়াও আমেরিকা মনে করত যে সুইজারল্যান্ডের নেশার ওষুধের রপ্তানির আলগা নিয়মের জন্য স্যান্ডোজের উৎপাদিত এই রাসায়নিকের একটা বড় অংশ ঘুরপথে সোভিয়েত রাশিয়ায় চলে যায়। সেই কারণেই সিআইএ স্যান্ডোজের সাথে চুক্তি করল যে তাদের উৎপাদিত LSD-র এক বড় অংশ তারা কিনে নেবে যাতে সেই রাসায়নিক রপ্তানি না করা যায়। এইভাবে তাদের হাতে এক বিপুল পরিমাণ নেশার সামগ্রী (LSD) জমা হতে থাকে। মন নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা জানতে সেই জমা রাসায়নিকদের যথেচ্ছভাবে বিভিন্ন পরীক্ষায় ব্যবহার করা শুরু করে সিআইএ। এর সাথে নিজেরাও এই রাসায়নিকের বিভিন্ন মিশ্রণ নিয়ে মনের ওপর পরীক্ষা নিরীক্ষাও চালাতে থাকে। সেই প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত অনেকেই নিজেরাই এই সব রাসায়নিকের মিশ্রণ নিজেদের দেহে প্রয়োগ করতেন তাদের প্রভাব বুঝতে। এভাবে আগুন নিয়ে খেলার ফলে কয়েকজনের মৃত্যুও হয়েছিল।
১৯৫১ সালে সিআইএ-র অধীনস্থ কয়েকজন বিজ্ঞানীকে নিয়ে ড. গোটলিয়েব জাপান রওনা হলেন। উদ্দেশ্য তাদের আবিষ্কৃত মিশ্রণ দিয়ে শত্রুর মন নিয়ন্ত্রণ পরীক্ষা করা। জাপানের এক মিলিটারি বেসে চারজন জাপানিকে সোভিয়েত রাশিয়ার গুপ্তচর সন্দেহে ধরে আনা হয়। বহু ধরনের মন-রাসায়নিকের ইঞ্জেকশন দিয়ে একটানা জেরায় তারা স্বীকার করে যে তারা সত্যিই সোভিয়েতের হয়ে কাজ করে এবং তা বিশ্বাসের জন্যই করে। তাদের মন আর বিশ্বাসকে বিশেষ পাল্টাতে না পেরে অবশেষে তাদের গুলি করে মেরে সমুদ্রের মাঝে ফেলে দেওয়া হয়। ড. গোটলিয়েবের সেই দল তারপর চলে যায় দক্ষিণ কোরিয়ায়। যেখানে পঁচিশ জন উত্তর কোরিয়ান যুদ্ধবন্দীকে মন নিয়ন্ত্রণের নানা রাসায়নিক পরীক্ষায় কমিউনিজমকে অস্বীকার করতে বলা হয়। তাদের মনকে তা সত্ত্বেও বশে আনা যায়নি। অবশেষে তাদেরও গুলি করে মারা হয়। সিআইএ-র মন নিয়ন্ত্রণের পরীক্ষা যে তখনও হামাগুড়িও দিতে শেখেনি তা প্রমাণ হয়েছিল। এছাড়াও জার্মানির মিউনিখে কয়েকজন রাজনৈতিক বন্দীর ওপর ডেট্রিকের গবেষক ফ্র্যাঙ্ক ওলসনের তৈরি মনরাসায়নিকের মিশ্রণ প্রয়োগ করা হয়। তাদের মনকেও পাল্টান গেল না। রাসায়নিকের ব্যর্থতার মূল্য তাদের জীবনের বিনিময়ে দিতে হল। শেষে প্রমাণ লোপাটে তাদের লাশ জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। এই পরীক্ষার সময় স্বয়ং অ্যালেন ডালাস অবধি এসেছিলেন। নিজের ওপর পরীক্ষা করতে গিয়ে ড. ওলসনই একদিন মন নিয়ন্ত্রণকারী রাসায়নিকের হাতে শেষে শহীদ হয়ে গিয়েছিলেন।
সিআইএ-র MK-ULTRA প্রজেক্টের অবস্থা মোটেই আশাপ্রদ নয়। তার ওপর তার অধীনস্থ সব প্রকল্পের অনেকগুলোই ছিল LSD-কে ঘিরে। অন্যদিকে সেই LSD-কে দিয়ে বিভিন্ন ককটেল বানানোতেও সাফল্য আসেনি শুধু নয়, তা করতে গিয়ে তাদের বিজ্ঞানী ওলসন মারা গেছেন। তবে সেই দুর্দিনেও তাদের প্রজেক্টের সহযোগী ওষুধ কোম্পানি এলি লিলির থেকে তাদের কাছে সুসংবাদ এল। তারা স্যান্ডোজ কোম্পানির LSD উৎপাদনের গোপন সূত্র ভেঙে ফেলেছে এবং তারা এখন থেকে যত খুশি পরিমাণে সেই রাসায়নিক তৈরি করতে পারবে। সিআইএ-র বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষার জন্য যে প্রচুর পরিমাণে এই রাসায়নিকের প্রয়োজন ছিল তা সুলভ হয়ে গেল। সেই আনন্দে সিআইএ তাদের থেকে চার লক্ষ ডলারের LSD কিনে নিল। আসলে সিআইএ ঠিক করেছিল যে প্রয়োজনে কোন শত্রু দেশের জলের উৎসে অথবা কোন প্রতিবাদী বিক্ষোভের মানুষদের ওপর এই রাসায়নিক কোনোভাবে প্রয়োগ করবে। তবে যত নিজেদের অনুসন্ধান বেড়েছে তারা ততই বুঝতে পেরেছে যে এই রাসায়নিকের প্রভাব এতটাই অবিশ্বস্ত যে, এর ওপর ভরসা করে মন নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। তবে এর উদ্ভট আচরণই সেই দেশের প্রতিবাদী আন্দোলনকে ছত্রভঙ্গ করতে পরে কীভাবে কাজে লেগেছিল তা আমরা দেখব।
১৯৫৩ সালের জুলাই মাসে কোরিয়ার সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা হতে আমেরিকা হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিল। কম্যুনিস্টদের কারাগার থেকে আমেরিকার ৭২০০ সৈন্য মুক্তি পেয়ে ফিরে এল। সেই খুশির হাওয়ার মধ্যে এক দুঃসংবাদ লুকিয়ে ছিল। মুক্তি পাওয়া সৈন্যদের অনেকেই কোরিয়া আক্রমণের জন্য আমেরিকাকে তীব্র সমালোচনাই শুধু করেনি, তারা কমিউনিজমকে প্রশংসাও করেছিল। তার ওপর আবার সেই সৈন্যদের মধ্যে একুশ জন আমেরিকায় না এসে উত্তর কোরিয়া বা চিনে থেকে গেল। কমিউনিজমকে এইভাবে আলিঙ্গন করে নেওয়াকে মেনে নিতে পারল না আমেরিকার প্রশাসন এবং সংবাদ-মাধ্যম। প্রশাসন ঘোষণা করল যে, সেই সৈন্যরা আমেরিকায় পা রাখলেই তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে। অন্যদিকে সেই ঘটনার গুরুত্ব কমাতে প্রশাসন এবং সংবাদমাধ্যম আবার একযোগে এই ঘটনাকে কমিউনিস্টদের মগজধোলাইয়ের ফল বলে প্রচার করল। সোভিয়েত রাশিয়া যে এই কাজে আমেরিকার থেকে অনেক এগিয়ে রয়েছে তা সে দেশের সংবাদ মাধ্যম প্রচার শুরু করে দিল। সেই সব সৈন্যদের অনেকে রাশিয়া হয়ে ফেরার পথে মাঞ্চুরিয়া অতিক্রম করার সময়েই তাদের চৈতন্য হারিয়ে ফেলেছিল বলে সংবাদমাধ্যমকে জানায়। সেই গল্প দেশের মানুষকে মাঞ্চুরিয়ার সঙ্গে মগজধোলাইয়ের সম্পর্ক আছে বলে বিশ্বাস করাল। সে গল্প তারপর বিভিন্ন থ্রিলারে ফুলে ফেঁপে এমন মাত্রায় পৌঁছোল যে দেশবাসীর মগজধোলাই সম্ভব এবং সোভিয়েত তার জন্য যন্ত্র আবিষ্কার করে ফেলেছে তা বিশ্বাস করতে শুরু করল। মনকে যে রাসায়নিকে পোষ মানানো যায় তা সমাজে বিশ্বাসে পরিণত হল। সেই বিশ্বাসই পরে যে মানসিক রোগের রাসায়নিক চিকিৎসার ওপর বিশ্বাসে পরিণত হয় তা আমরা দেখব। নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করতে সিআইএ নতুন উদ্যমে নেমে পড়ল। ড. গোটলিয়েবের মন নিয়ন্ত্রণের প্রকল্প MK-ULTRA আরও নতুন নতুন প্রকল্পে হাত দিল।
LSD নিয়ে এবার মানুষের ওপর বড় মাপের পরীক্ষা নিরীক্ষা শুরু হল সিআইএ-র তত্ত্বাবধানে। প্রথমেই বেছে নেওয়া হল ড্রাগ আসক্ত এমন মানুষদের যারা কোনরকম প্রতিবাদ করতে পারবেনা। ১৯৫০ এর দশকের শুরুর দিক থেকেই এই সংস্থা LSD ও অন্যান্য বিপজ্জনক মাদকদ্রব্য সেইরকম বহু জায়গায় পাঠান শুরু করল। এইসব পরীক্ষা অধিকাংশই কালো নেশাগ্রস্ত মানুষের ওপর চালাত সিআইএ। এরপর সেই MK-ULTRA প্রকল্পের টাকা বেনামে অনেক গবেষণায় খাটান হল। বোস্টনে ছাত্র, ডাক্তার নার্স ও অন্যান্যরা LSD পাওয়ার জন্য স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে নাম লেখাল। ড. রবার্ট হাইড এদের সেই রাসায়নিক দিতেন এবং তার প্রভাব কী হচ্ছে তা অনুসন্ধান করতেন। এইভাবে বহু গবেষণাকেন্দ্রে স্বেচ্ছাসেবকদের ওপর এই LSD প্রয়োগ করা শুরু হল। গবেষণার নামেই বড় সংখ্যক যুবক যুবতীদের নেশাগ্রস্ত বানিয়ে ফেলল সিআইএ নিজেই।
সিআইএ-র উচ্চপদস্থ অফিসার আলেন ডালেসের ছেলে কোরিয়ার যুদ্ধে আহত হয়ে পঙ্গু হয়ে যান। তাঁর চিকিৎসা চলছিল কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিখ্যাত মনোবিশারদ ড. উলফের অধীনে। নিজের ছেলেকে একদিন সেই ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান ডালেস নিজেই। সেখানে চিকিৎসকের সাথে মন নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কথা বলেন। তাতে ড. উলফের খুব আগ্রহ দেখে তাঁকে সিআইএ-র অধীনে গবেষণায় যোগ দিতে বলেন ডালেস। এরপর ড. উলফের তত্ত্বাবধানে সিআইএ-র উপযোগী গবেষণা শুরু হয়। বহু বছর ধরে মোটা টাকা বরাদ্দ করে সিআইএ। আর কর্নেলের হাসপাতালের রোগীদের ওপর সেই গবেষনা চলতে থাকে। এছাড়া আরো অনেক মনস্তাত্ত্বিকই মন নিয়ন্ত্রণের গবেষণায় সিআইএ-র দেওয়া বেআইনি ওষুধ বা প্রক্রিয়া চালাতে থাকেন। তবে সবটাই হত গোপনীয়তার আড়ালে। এমনকি কানাডার ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড. ক্যামেরন তাঁর রোগীদের ওপর এমন এমন পরীক্ষা এই প্রকল্পের অধীনে করেছিলেন যেগুলিকে কেবল নাৎসি জমানার চিকিৎসা গবেষণার সাথে তুলনা করা যায়। সেইসব ভয়াবহ পরীক্ষার ফলাফলে প্রবল উৎসাহ ছিল ড. গোটলিয়েবের নিজের এবং ড. ক্যামেরনের একটা পরীক্ষা শেষ হতে না হতেই পরের গবেষণার টাকা নিমেষে চলে আসত। এই নীতিহীন গবেষকই পরে আমেরিকার মনোবিদদের প্রধান সংস্থার সভাপতি হন। রাজনীতির হাত মনোচিকিৎসার একেবারে ভেতরে যে প্রসারিত তা প্রমাণ হয়।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহিত্যের গবেষক ছাত্র কেন কেসি নতুনত্ব ও পয়সার লোভেই সিআইএ পরিচালিত গবেষণায় স্বেচ্ছাসেবক হয়ে যোগ দেন। এলএসডি, মেস্কালিন ও অ্যাম্ফেটামিনের বিভিন্ন মিশ্রণ তার ওপর প্রয়োগ করা হত এবং তার অভিজ্ঞতা নিয়ে গবেষণা করা হত। সেই চিকিৎসার সময়েই তিনি মানসিক হাসপাতালে সহায়ক হিসেবে কিছুদিন কাজ করেন। আসলে সেই নেশা ও কাজের অভিজ্ঞতা তার সাহিত্যসৃষ্টিতে কাজে লাগবে বলে ভেবেছিলেন কেন। আর সত্যি সেই অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে এক উপন্যাস ‘One Flew over the Cuckoo’s Nest’ লেখেন তিনি। সেই উপন্যাসে মানসিক রোগ ও তার হাসপাতালের চিকিৎসাকে তুলোধোনা করেন কেন। তাঁর সেই মানসিক অবস্থায় মনে হয়েছিল যে, অধিকাংশই মানসিক রোগী অসুস্থ নয় বরং তাদের একান্ত ও নিজস্ব বাস্তব আছে। হাসপাতালে সেই বাস্তবকে গুঁড়িয়ে চুরমার করে দেওয়া হয়। ১৯৬২ সালে লেখা সেই উপন্যাসের প্রথাভাঙা চিন্তা তখনকার বাজারে অনেকের মনে প্রভাব ফেলে। এবং ১৯৭৫ সালে এর ওপর বানানো সিনেমা সফল হয়। তবে এরকম প্রতিবাদ তখন মানসিক চিকিৎসা-বিরোধী অনেকের মধ্যেই জন্ম নিয়েছিল যার অসারতা নিয়ে আমরা পরে আলোচনা করব।
ড. অসমন্ড ১৯৫০ দশকের এক ব্যতিক্রমী মনোগবেষক। তিনি মনে করতেন LSD, মেস্কালিন ইত্যাদি মন নিয়ন্ত্রণকারী রাসায়নিক মস্তিষ্কের মধ্যে রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটায় এবং সেই একই পরিবর্তন মানসিক রোগ বিশেষ করে উন্মাদ রোগেও হয়ে থাকে। এইধরনের রাসায়নিকের কাজ করা নিয়ে তাঁর মত ও বিশ্বাস তখনকার দিনে খুব কম গবেষকের মধ্যেই ছিল। এই রাসায়নিকদের কাজ করার পদ্ধতি তাঁকে সিআইএ-র গবেষণার কাছে নিয়ে এল। এই সব মাদক রাসায়নিক সত্যিই উন্মাদ রোগের লক্ষণ সৃষ্টি করে কিনা তা জানতে তিনি স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে পেলেন সেই সময়ের বিখ্যাত চিন্তাবিদ ও লেখক আলডাস হাক্সলিকে। তার প্রায় দু’দশক আগে কীভাবে মন নিয়ন্ত্রণ করে ভবিষ্যৎ সমাজ তৈরি হবে তা নিয়ে তিনি ‘Brave New World’ বলে একটি বই লিখেছেন। এইসব রাসায়নিক সেই কাজে লাগতে পারে কিনা তাই নিয়ে তাঁর প্রবল কৌতূহল ছিল। সিআইএ-র সাহায্যে তাঁর কাছে প্রথমে মেস্কালিন ও পরে LSD পাঠিয়ে দিলেন ড. অসমন্ড। সেই সব রাসায়নিক নিয়ে তিনিই সেই গবেষককে দেখালেন যে এরা মানুষকে পাগল বানায় না। এরা মনকে শুধু অন্য এক চেতনার জগতে নিয়ে যায় যাকে তিনি ভারতীয় দর্শনের ভাষায় ‘মোক্ষ’ নাম দিলেন। এই অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে হাক্সলি ‘The Doors of Perception’ (1954) ও ‘Heaven and Hell’ (1956) বলে দুটি বই লিখলেন। পরের দশকে প্রথাভাঙা সংস্কৃতির আবহে এই দুই বই-ই বেস্টসেলার হয়ে উঠল। সেই ওষুধের মনের ওপর প্রভাব বোঝাতে তাঁরা দুজন এই রাসায়নিকদের নাম দিলেন psychedelic। পরে সেই হাক্সলির মাধ্যমেই এই মাদক পৌঁছে গেল সেই সময়ের বিখ্যাত কবি লেখক আলেন গিনসবার্গ ও টিম লিরির কাছে। প্রথাভাঙা সংস্কৃতির মাথারা আস্তে আস্তে এই psychedelic-এ আসক্ত হয়ে উঠলেন। সেই গুণীজনের পদাঙ্ক তারপর অনুসরণ করলেন সেই সময়ে তাঁদের অসংখ্য অনুগত প্রতিবাদী মানুষ যারা ১৯৬০ এর দশকে আমেরিকায় সামাজিক অন্যায় কোনভাবেই মেনে নিতে পারছিলেন না। প্রতিবাদীদের একটা বড় অংশ নেশার মধ্যে ডুবে সামাজিক বাস্তবতা থেকে পালালেন, যার সামনের সারিতেই ছিল হিপি বিটনিক বিদ্রোহীরা। সরকার ও রাষ্ট্র গণ-প্রতিরোধের আগুন থেকে বেঁচে গেল। আপামর জনগণকে নেশায় আচ্ছন্ন করে রাখার গবেষণা সিআইএ-র উদ্দেশ্য হাসিল করতে সাহায্য করল। এ ঘটনা ইতিহাস ও মননের গতিপথকে আমূল পালটে দিল। নিরুত্তর উত্তর দর্শনের জমানা শুরু হল।
এইভাবে জনমানসকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সিআইএ প্রথম দিকে নিজেই ড্রাগ সরবরাহ করতে শুরু করে। বিভিন্ন প্রতিবাদী রাজনৈতিক গ্রুপের মধ্যে মাদক দেওয়া এবং তারা মাদকাসক্ত হলে তাদের মধ্যে ঢুকে পড়ে তাদের ওপর নজরদারি করা শুরু করল। এইভাবে প্রতিবাদী মন যখন মাদকে আসক্ত হয়ে পড়েছে তখন হতাশার আবহে সে মাদক আর সিআইএকে সরবরাহ করতে হল না। তাদের মধ্যে অনেকেই এই ধরনের রাসায়নিক খুব সস্তায় বানাতে ছোট ছোট ল্যাবরেটরি তৈরি করলেন। সান ফ্রান্সিস্কোতে স্ট্যানলি ও স্কালি একেবারে খাঁটি LSD জলের দরে প্রচুর পরিমাণে বানাতে লাগল। অনেকে আবার সেই রাসায়নিক বাসে করে সারা দেশের মানুষের মধ্যে বিনা পয়সায় বিতরণ করতে থাকল। সিআইএ-র অসমাপ্ত কাজ প্রতিবাদীরাই প্রবল উৎসাহে অজান্তে চালিয়ে নিয়ে গেল। একটা প্রজন্ম যখন প্রতিবাদ থেকে নেশায় ডুবে গেল তখন আমেরিকার প্রশাসন বুঝল যে বিপদ কেটে গেছে। এবার এই LSD-র নেশা বন্ধ করা দরকার। সরকার আস্তে আস্তে কড়া হল। এর ক্ষতি নিয়ে ব্যাপক প্রচার হল, সরবরাহ কড়া হাতে নিয়ন্ত্রণ করা হল আর তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ধরপাকড় শুরু হল। এক নেশা থেকে মুক্তি পেতে মানুষ চলে গেল অন্য নেশায়। ওষুধ কোম্পানির বিভিন্ন ধরনের নেশার বড়ি সেই জায়গা দখল করে নিল। নেশা ও মানসিক ওষুধ, ওষুধ প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলির কাছে হিরের খনি হয়ে উঠল। রাসায়নিক বড়ি মনের ওপর শাসন করার বৈধতা পেয়ে গেল। মানসিক রোগের চিকিৎসাকে আমাদের এই পরিপ্রেক্ষিতেই দেখতে হবে।
উৎসসূত্র
এই লেখায় ব্যবহৃত গ্রন্থগুলি সম্পর্কে জানার জন্য প্রথম পর্বের শেষে সন্নিবিষ্ট ‘গ্রন্থঋণ’ অংশটি দেখুন।

লেখক
দেবাশিস মুখোপাধ্যায়
পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র ছিলেন। নগরের কোলাহল থেকে দূরে প্রকৃতির মধ্যে থাকতে পছন্দ করেন এই পরিবেশকর্মী। গ্রামের দরিদ্র মানুষের মধ্যে জীবনমুখী শিক্ষাবিস্তারের কাজেও নিয়োজিত রয়েছেন তিনি। তাঁর রচিত গ্রন্থগুলি হল—‘ক্লাসরুমের রূপকথা: জীবন বিজ্ঞান ও পরিবেশ ভ্রমণ’, ‘স্বাস্থ্যের সন্ধানে অথবা অসুস্থতার খোঁজে’ এবং ‘চিকিৎসার ধূসর জগতে: মন, সমাজ, কর্পোরেট’।
সব কাজ দেখুন →সংখ্যা ২-এর অন্যান্য লেখা
সংখ্যা ২কবিতা ও ছড়া
উইকএন্ড ট্যুর
শুক্রবারেই শ্যামলালের প্ল্যান, টুক করে ট্যুর! একদিনের ছুটিতে হাওয়াবদলের সাধ নিয়ে সপরিবারে বেরিয়ে পড়া। তারপর ট্রেনের সিট, হোটেলের বন্দোবস্ত, গাড়ির জোগাড়, গিন্নির ফরমান আর ফর্দ সামলাতে সামলাতে প্রকৃতি দর্শনের সুযোগটুকুও গেল ফসকে। পকেট হল হালকা, অভিজ্ঞতার ঝুলি হল ভারী! সব মিলিয়ে, এইভাবেই শেষ হল শ্যামলালের উইকএন্ড ট্যুর।
সংখ্যা ২গল্পস্বল্প
কর্নেলের ঘরে যে নদীটা থাকত
বিষ্ণুপুরের তিনশো বছরের পুরোনো বাড়িতে একাকী কর্নেল শশাঙ্কবাবুর শোবার ঘরের মাঝখান দিয়ে বয়ে যেত এক জীবন্ত নদী। সেই নদীই ছিল তাঁর নিঃসঙ্গ জীবনের আশ্রয়। কিন্তু এক জন্মদিনে নদী তাঁর অতীতকে বুকে নিয়ে মিলিয়ে গেলে স্তব্ধ হয়ে যায় কর্নেলের ঘর। হারানো নদীটকে ফিরে পাওয়ার তীব্র জেদে শুরু হয় খনন।
সংখ্যা ২বিজ্ঞান
মনোরোগের ধূসরতায়: তৃতীয় পর্ব
সিগমুন্ড ফ্রয়েড কি একজন মহান মনস্তাত্ত্বিক, নাকি এক চতুর গল্পকার? অবচেতন মন, যৌন অবদমন আর মনঃসমীক্ষণ—যাঁর তত্ত্বে একসময় বুঁদ হয়েছিল গোটা বিশ্ব, তাঁর গবেষণার পেছনে কতটা বিজ্ঞান আর কতটা সাজানো রূপকথা? কোকেন আসক্তি থেকে শুরু করে নিজের ব্যর্থ চিকিৎসা ও রোগীদের আসল পরিণতি লুকিয়ে রাখার পরও কীভাবে একনায়কের মতো নিজের তত্ত্বকে শতাব্দীর সেরা চিকিৎসা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ফ্রয়েড? মনোবিশ্লেষণের সেই জাদুকরী ছদ্মবেশ নিয়ে তৃতীয় পর্ব—‘ফ্রয়েডের বৈজ্ঞানিক রূপকথা’।
মনোরোগের ধূসরতায় ধারাবাহিকের অন্যান্য পর্ব
সংখ্যা ২বিজ্ঞান
মনোরোগের ধূসরতায়: তৃতীয় পর্ব
সিগমুন্ড ফ্রয়েড কি একজন মহান মনস্তাত্ত্বিক, নাকি এক চতুর গল্পকার? অবচেতন মন, যৌন অবদমন আর মনঃসমীক্ষণ—যাঁর তত্ত্বে একসময় বুঁদ হয়েছিল গোটা বিশ্ব, তাঁর গবেষণার পেছনে কতটা বিজ্ঞান আর কতটা সাজানো রূপকথা? কোকেন আসক্তি থেকে শুরু করে নিজের ব্যর্থ চিকিৎসা ও রোগীদের আসল পরিণতি লুকিয়ে রাখার পরও কীভাবে একনায়কের মতো নিজের তত্ত্বকে শতাব্দীর সেরা চিকিৎসা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ফ্রয়েড? মনোবিশ্লেষণের সেই জাদুকরী ছদ্মবেশ নিয়ে তৃতীয় পর্ব—‘ফ্রয়েডের বৈজ্ঞানিক রূপকথা’।
সংখ্যা ১বিজ্ঞান
মনোরোগের ধূসরতায়: দ্বিতীয় পর্ব
রোগ নিরাময়, নাকি আধুনিক বিজ্ঞানের পোশাকে আদিম বর্বরতা? কখনো পেটের নাড়িভুঁড়ি কেটে বাদ দেওয়া, কখনো মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল লোব খুবলে নিয়ে রোগীকে জড়ভরত বানিয়ে দেওয়া, আবার কখনো ম্যালেরিয়ার জীবাণু বা ইনসুলিনের মারণ কোমা দিয়ে তথাকথিত ‘চিকিৎসা’! এমনকি এই মারাত্মক লোবোটমির জন্য জুটেছিল নোবেল পুরস্কারও। চিকিৎসকদের অন্ধ অহংকার আর অসহায় পরিবারের আর্তি কীভাবে মানসিক রোগীদের ঠেলে দিয়েছিল এক জীবন্ত নরকে? মনোরোগ চিকিৎসার আদিপর্বের চাঞ্চল্যকর ইতিহাস জানুন দ্বিতীয় পর্বে—‘মনোচিকিৎসার আদিপর্ব: বিজ্ঞানের আড়ালে’।
সংখ্যা ১বিজ্ঞান
মনোরোগের ধূসরতায়: প্রথম পর্ব
আমরা কি সত্যিই অসুস্থ, নাকি আমাদের রোগী বানানো হচ্ছে? বিশ্বজুড়ে মানসিক রোগের রমরমা—কিন্তু এই ‘মহামারী’ কি বাস্তব, নাকি করপোরেট মুনাফার কারসাজিতে বানানো এক অবাস্তব আখ্যান? জীবনের তুচ্ছাতিতুচ্ছ দ্বন্দ্ব-জটিলতা কি শিশুর চঞ্চলতা—অস্বাভাবিক? নাকি নেহাৎ ওষুধ কোম্পানির খদ্দের ধরার ফাঁদ। যে বিজ্ঞানের এখনও কোনো জৈব-রাসায়নিক মাপকাঠিই নেই, তা কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে একটা বিরাট বাজার? শুরু হলো দেবাশিস মুখোপাধ্যায়ের অনুসন্ধিৎসু সত্যান্বেষণ—‘মনোরোগের ধূসরতায়’! মনোরোগের ইতিহাস আর তার অন্ধকার, বিজ্ঞানের নির্মম পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরিহাস, ফ্রয়েডীয় ফাঁকফোকর, স্নায়ুযুদ্ধ অথবা সি.আই.এ-র ষড়যন্ত্র—মনোচিকিৎসা ও ওষুধ সাম্রাজ্যের হাড়হিম করা রোমাঞ্চকর সত্য উন্মোচিত হতে চলেছে এই ধারাবাহিকের আঠারোটি পর্ব! আজ প্রথম পর্ব ‘সঙ্কটের স্বরূপ’।
আরও পড়ুন
সংখ্যা ২বিজ্ঞান
মনোরোগের ধূসরতায়: তৃতীয় পর্ব
সিগমুন্ড ফ্রয়েড কি একজন মহান মনস্তাত্ত্বিক, নাকি এক চতুর গল্পকার? অবচেতন মন, যৌন অবদমন আর মনঃসমীক্ষণ—যাঁর তত্ত্বে একসময় বুঁদ হয়েছিল গোটা বিশ্ব, তাঁর গবেষণার পেছনে কতটা বিজ্ঞান আর কতটা সাজানো রূপকথা? কোকেন আসক্তি থেকে শুরু করে নিজের ব্যর্থ চিকিৎসা ও রোগীদের আসল পরিণতি লুকিয়ে রাখার পরও কীভাবে একনায়কের মতো নিজের তত্ত্বকে শতাব্দীর সেরা চিকিৎসা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ফ্রয়েড? মনোবিশ্লেষণের সেই জাদুকরী ছদ্মবেশ নিয়ে তৃতীয় পর্ব—‘ফ্রয়েডের বৈজ্ঞানিক রূপকথা’।
সংখ্যা ১বিজ্ঞান
মনোরোগের ধূসরতায়: দ্বিতীয় পর্ব
রোগ নিরাময়, নাকি আধুনিক বিজ্ঞানের পোশাকে আদিম বর্বরতা? কখনো পেটের নাড়িভুঁড়ি কেটে বাদ দেওয়া, কখনো মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল লোব খুবলে নিয়ে রোগীকে জড়ভরত বানিয়ে দেওয়া, আবার কখনো ম্যালেরিয়ার জীবাণু বা ইনসুলিনের মারণ কোমা দিয়ে তথাকথিত ‘চিকিৎসা’! এমনকি এই মারাত্মক লোবোটমির জন্য জুটেছিল নোবেল পুরস্কারও। চিকিৎসকদের অন্ধ অহংকার আর অসহায় পরিবারের আর্তি কীভাবে মানসিক রোগীদের ঠেলে দিয়েছিল এক জীবন্ত নরকে? মনোরোগ চিকিৎসার আদিপর্বের চাঞ্চল্যকর ইতিহাস জানুন দ্বিতীয় পর্বে—‘মনোচিকিৎসার আদিপর্ব: বিজ্ঞানের আড়ালে’।
সংখ্যা ১বিজ্ঞান
মনোরোগের ধূসরতায়: প্রথম পর্ব
আমরা কি সত্যিই অসুস্থ, নাকি আমাদের রোগী বানানো হচ্ছে? বিশ্বজুড়ে মানসিক রোগের রমরমা—কিন্তু এই ‘মহামারী’ কি বাস্তব, নাকি করপোরেট মুনাফার কারসাজিতে বানানো এক অবাস্তব আখ্যান? জীবনের তুচ্ছাতিতুচ্ছ দ্বন্দ্ব-জটিলতা কি শিশুর চঞ্চলতা—অস্বাভাবিক? নাকি নেহাৎ ওষুধ কোম্পানির খদ্দের ধরার ফাঁদ। যে বিজ্ঞানের এখনও কোনো জৈব-রাসায়নিক মাপকাঠিই নেই, তা কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে একটা বিরাট বাজার? শুরু হলো দেবাশিস মুখোপাধ্যায়ের অনুসন্ধিৎসু সত্যান্বেষণ—‘মনোরোগের ধূসরতায়’! মনোরোগের ইতিহাস আর তার অন্ধকার, বিজ্ঞানের নির্মম পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরিহাস, ফ্রয়েডীয় ফাঁকফোকর, স্নায়ুযুদ্ধ অথবা সি.আই.এ-র ষড়যন্ত্র—মনোচিকিৎসা ও ওষুধ সাম্রাজ্যের হাড়হিম করা রোমাঞ্চকর সত্য উন্মোচিত হতে চলেছে এই ধারাবাহিকের আঠারোটি পর্ব! আজ প্রথম পর্ব ‘সঙ্কটের স্বরূপ’।

