প্যারালাল

প্যারালালের কথা

লেখার আকার

অনেক সময় কিছু কিছু পদক্ষেপ কোনও পরিকল্পনা ছাড়াই শুরু হয়। যেখানে কোনও ব্যবসায়িক পরিকল্পনা থাকে না; থাকে না ভবিষ্যতের সুস্পষ্ট নকশা, অফিস, বড়ো সংস্থার পরিচয় অথবা অনেকটা পুঁজি কিংবা কোনও বিস্তৃত পরিকাঠামো। থাকে শুধু কিছু মানুষ, কিছু কথা, কিছু প্রশ্ন, কিছু কৌতূহল, কিছু অস্থিরতা—আর থাকে কিছু বলার তাড়না। প্যারালালের গল্পটাও অনেকটা তেমনই। আজ যে নামটির সঙ্গে বই, লেখক, সম্পাদক, মুদ্রক, পাঠক এবং প্রকাশনার একটি দীর্ঘ যাত্রা জড়িয়ে গেছে, সেই প্যারালালের শুরু কিন্তু প্রকাশনা হিসেবে নয়। তার শুরু হয়েছিল একটা ফেসবুক পেজ দিয়ে—প্যারালাল পেজ।

সেই আরম্ভটা ছিল অনেক সহজ। আজ পিছন ফিরে তাকালে মনে হয়, সেই সহজ আরম্ভের মধ্যেই হয়তো আগামীদিনের প্যারালালের এগিয়ে চলার রসদ ছিল। প্রথম থেকেই একটা বিষয় পরিষ্কার ছিল—আমরা শুধুমাত্র কিছু পোস্ট করার জন্যই পোস্ট করব না। আমরা এমন বিষয় নিয়ে লিখব, যেগুলো মানুষকে ভাবায়, জানতে শেখায়, প্রশ্ন করতে শেখায়। ইতিহাস, সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞান, রাজনীতি, অর্থনীতি, পরিবেশ, ভূবিজ্ঞান, শিল্প সংস্কৃতি—বিষয়ের পরিসর ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয়েছে। মানবাধিকার, নারী অধিকার, লিঙ্গ বৈষম্যের মতো সামাজিক প্রশ্নও আমাদের লেখার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। ২০১৯ সালে প্যারালাল পেজের শুরুর দিনগুলি থেকেই আমাদের মূল আগ্রহ ছিল তথ্যভিত্তিক, অনুসন্ধানী এবং মননশীল লেখা। কোনও বিষয়ের সঙ্গে পাঠকের আলতো পরিচিতি ঘটিয়ে দেওয়াই নয়, সেই বিষয়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা পারিপার্শ্বিক ইতিহাস আর রাজনীতিও খুঁজে দেখা। কোনও ঘটনা শুধু ঘটেছিল—এই তথ্যে থেমে না থেকে, কেন ঘটেছিল, কী ছিল তার প্রভাব, বর্তমানের সঙ্গে তার সম্পর্কই বা কী—সেই প্রশ্নগুলির উত্তর খোঁজা; বিজ্ঞানের একটি বিষয়কে শুধু ‘নিছক তথ্য এবং তত্ত্ব’ হিসেবে না দেখে বিজ্ঞানের ইতিহাস ও তার সামাজিক প্রেক্ষাপটের দিকে অনুসন্ধিৎসু হয়ে তাকানো; কোনও ঐতিহাসিক চরিত্রকে শুধু কিংবদন্তির আলোয় না দেখে তার সময়, কাজ এবং বিতর্কের মধ্যে তাকে বোঝার চেষ্টা করা—এইভাবেই প্যারালাল পেজ ধীরে ধীরে চর্চার একটি নিজস্ব চরিত্র তৈরি করতে পেরেছিল। আমরা বুঝতে শুরু করলাম, আমাদের প্যারালাল পেজের লেখার জগৎ শুধু ‘লেখক’ আর ‘পাঠক’-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মাঝখানে থাকে অসংখ্য মানুষ—যাঁরা পড়েন, প্রশ্ন করেন, তথ্য খুঁজে দেন, ভুল ধরিয়ে দেন, উৎসাহ দেন।

এভাবেই প্যারালাল পেজের চারপাশে ধীরে ধীরে অনেকে জড়ো হতে শুরু করলেন। প্রথমে হাতে গোনা কয়েকজন। তারপর আরও কয়েকজন। এভাবেই তাঁরা আমাদের সঙ্গে লেখালেখিতে অংশ নিলেন, কেউ লেখার প্রুফ চেক করে দিলেন, কেউ পোস্টার তৈরিতে হাত লাগালেন। কেউ নিয়মিত লিখলেন, কেউ মাঝে-মাঝে নির্দিষ্ট কোনও বিষয় নিয়ে লিখলেন, কেউ তথ্য দিলেন, কেউ গবেষণার উপাদান জোগাড় করে দিলেন। আবার এমন অনেক মানুষও আমাদের সঙ্গে যুক্ত হলেন, যাঁদের সঙ্গে আমাদের আগে কোনও পরিচয় ছিল না। তাঁরা প্যারালাল পেজের লেখা পড়েছেন, ভালো লেগেছে, কোনও বিষয় নিয়ে কথা বলতে চেয়েছেন, তারপর কোনও একদিন নিজেরাই লিখতে শুরু করেছেন। কেউ লেখক হয়ে উঠলেন, কেউ নিয়মিত পাঠক, কেউ সহযোগী। একসময় দেখা গেল প্রায় একশো জন লেখক বিভিন্ন সময়ে প্যারালালের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। প্যারালাল পেজের নারী ও পুরুষ লেখকের অনুপাতও ছিল প্রায় সমান। এভাবে প্যারালাল পেজের পরিসর ক্রমশ বড়ো হয়েছে, হয়ে উঠেছে বহু মানুষের লেখালিখি, মত বিনিময়, কথা বলার জায়গা। একটি ছোট সাংস্কৃতিক পরিসর থেকে শুরু করে এত মানুষের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়া—এটাই প্যারালালের সবচেয়ে বড়ো সাফল্য। প্যারালালের সবচেয়ে বড় সম্পদ আর প্রাপ্তি এই লেখক ও পাঠকরাই।

প্যারালাল পেজের প্রকাশনা হয়ে ওঠার গল্পটাও এভাবেই দানা বেঁধেছিল। আমরা যখন কোনও একটি বিষয় নিয়ে ধারাবাহিকভাবে লিখতে শুরু করলাম, তখন কিছু লেখা শুধু ফেসবুকের পোস্ট হয়ে থাকতে চাইল না। সেগুলোর মধ্যে একটা স্থায়িত্বের সম্ভাবনা দেখা দিল। দুটো প্রস্তাব আমাদের অনেকেরই মাথায় এসেছিল—(১) ছেপে বই করা, (২) একটি ওয়েবসাইট করে ফেলা। দুয়ের কোনো সংঘাত ছিল না— একটা করলে অন্যটা করা যাবে না— এরকম নয়। তবুও দুটো পথেই পা বাড়ানোর মত ক্ষমতা আর সাহস আমাদের তখন ছিল না। একটা পথ বেছে নিতে হল, লিটিল ম্যাগাজিন করার স্বাভাবিক দক্ষতার ওপর দাঁড়িয়ে—লেখাগুলোকে দুই মলাটে ধরে রাখা। জন্ম নিল কয়েকটি বই। প্যারালাল পেজের লেখা থেকে প্যারালাল প্রেসের বই—এটা আমাদের কাছে শুধুই একটা বই প্রকাশের ঘটনা ছিল না। কারণ সেদিন আমরা প্রথম বুঝেছিলাম—ডিজিটাল পরিসরে জন্ম নেওয়া একটা লেখা যা কিনা সহজলভ্য তাও বই হতে পারে, বহু গ্রন্থবিলাসী পাঠকের ভালোবাসাও অর্জন করতে পারে। বহুদিন পরে কোনও বইয়ের তাক থেকে আবার বেরিয়ে আসতে পারে। তবু ওয়েবসাইটের সম্ভবনাকে আমরা কখনোই বাতিল করি নি।

ক্রমশ বই প্রকাশের বিষয়বস্তু বেড়েই চলল—বিজ্ঞান থেকে ইতিহাস, ভূতত্ত্ব থেকে সমাজবিদ্যা, প্রত্নতত্ত্ব থেকে রাজনীতি। সুন্দরবন বিষয়ে অনেকগুলি বই প্রকাশিত হল। তারপর শিশু সাহিত্য বিশেষভাবে পুরোনো সোভিয়েত আমলের বইগুলো আমাদের নতুন পরিচিতি দিল। আমরা ঠিক করলাম সেলফ পাবলিশিং এর নামে যা চলে সেই পথে যাব না আর টাইটেল বাড়ানোর জন্যে পুরোনো বই রিপ্রিন্ট করবো না। যদিও ফেসবুক পেজটা আর সেভাবে চালানো গেল না— বুঝলাম লকডাউন যেভাবে পেজে লেখার ফুরসৎ করে দিয়েছিল, নিউ নরম্যাল পরিস্থিতি সেটা আবার কেড়ে নিয়েছে। আজ পেছন ফিরে দেখলে মনে হয়, প্রকাশনা তাই ঠিক সময়ে আমাদের জন্যে সঠিক সুইচ ওভার।

খুব ঢিলেঢালা হলেও কাজ চালানোর জন্যে একটা সাংগঠনিক কাঠামো দিতে হল—যদিও আমরা জানি এবং মানিও যে বহু মানুষ যাঁরা এই সংগঠনে ততটা সক্রিয় নন তাঁরাও নিজেদের প্যারালালের অংশ বলেই মনে করেন। বই বিক্রি করলেও প্যারালালকে কোনো ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হবে না—এরকমই সিদ্ধান্ত আমরা নিয়েছিলাম। সে সিদ্ধান্তে আজও অবিচল আছি আমরা। তাই আমরা যারা ‘প্যারালাল করি’ তারা প্রথাগত পারিশ্রমিক নিই না, লভ্যাংশ তো দূরের কথা। নিজেদের দক্ষতা এবং শ্রম ভর্তুকি হিসেবেই জমা রইলো প্যারালালের লাভের খাতায়। আমরা ঠিক করেছি—বাজারে প্যারালালের নামে ঋণ রাখব না; প্রেস-বাঁধাই কর্মীর কাছে ধার বাকি রাখবো না; আর ব্যবসায়িক উদ্যোগ না হলেও পেশাদারিত্বে কোনো ঘাটতি রাখবো না। অনেকটা দুরূহ পথ হেঁটে আসার পর আজ স্থিরবিশ্বাসে বলতে পারি—লাভ করার দায় কম বলেই বই নির্মাণের ব্যাপারে একবগ্গা‌ থাকতে পেরেছি। যাঁরা প্যারালালকে চেনেন তাঁরা প্যারালালের বই ভরসা করে কিনে ফেলতে পারেন— শুনেছি বহুজন এমনও বলেন।

প্রকাশনা হিসেবে পাঁচ বছর টলোমলো পায়ে চলার পর মোটামুটি শক্ত পায়ে যখন দাঁড়ানো সম্ভব হয়েছে, তখন আবার ওয়েবস্পেসের ভাবনাটা ভিড় করতে থাকে। নতুন মানুষ ছাড়া নতুন কাজ শুরু না করার বোঝাপড়ায় ছিলাম—প্যারালালের পুরোনো পাঠক কিংবা নিষ্ক্রিয় সদস্য নতুন করে সংগঠকের ভূমিকা নিলে নতুন কাজে হাত দেওয়া হবে—হলও তাই। কয়েক মাসের মধ্যেই ওয়েবসাইট আর ই-ম্যাগাজিন তৈরির জটিল এই কর্মকাণ্ডটি রূপ পেল। প্যারালালের বাইরের কারও সাহায্য ছাড়াই নিজেদের দক্ষতাতেই তৈরি হয়ে গেল প্যারালাল লেন, সমান্তর পত্রিকা আর ব্লগজিন অন্যপাতা। যে কথোপকথনের আগ্রহ থেকে প্যারালালের এই পথ চলা সেই কথোপকথনের নতুন আর একটা মাধ্যম।

আমরা জানি না প্যারালালের আগামী সম্ভাবনা কী? কিন্তু আমরা জানি, আমাদের শুরুটা যে জায়গা থেকে হয়েছিল—জিজ্ঞাসা আর কৌতূহল, তা আমরা হারাতে চাই না। প্যারালাল আমাদের কাছে একটা দীর্ঘ আলাপের পরিসর। একটা চলতে থাকা বহুস্তরীয় কথোপকথন। লেখক-সম্পাদক, লেখক-লেখক, লেখক-পাঠকের মধ্যে। অতীত ও বর্তমানের মধ্যে। এক প্রজন্ম ও পরের প্রজন্মের মধ্যে। সেই কথা বলাটা আজও চালিয়ে যেতে পারছি। আমরা চাই, আরও অনেক মানুষ সেই কথোপকথনের অংশ হয়ে উঠুন। আমরা কোনও গন্তব্য ঘোষণা করছি না; বরং একটা যাত্রার সূচনা করছি মাত্র।