জয়নাগের বপ্পঘোষবাট তাম্রশাসন: একটি বিতর্কিত অবস্থানের প্রেক্ষাপটে
দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার পাথরপ্রতিমা ব্লকের মলয়া গ্রাম থেকে প্রাপ্ত মহারাজ জয়নাগের বিতর্কিত তাম্রশাসনকে কেন্দ্র করে এই গবেষণামূলক প্রবন্ধে উন্মোচিত হয়েছে সুন্দরবনের প্রাচীন ইতিহাসের এক বিস্মৃত অধ্যায়। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, প্রাচীন নদীপথ, তাম্রশাসনের বিবরণ ও ক্ষেত্রসমীক্ষার সূত্র ধরে লেখক অনুসন্ধান করেছেন বপ্পঘোষবাটের সম্ভাব্য অবস্থান, সমকালীন প্রশাসনিক কাঠামো এবং উপকূলীয় বাংলায় ব্রাহ্মণ্য সমাজের বিকাশ। ইতিহাসের প্রচলিত ব্যাখ্যাকে প্রশ্ন করে এই অনুসন্ধান তুলে ধরে দক্ষিণবঙ্গের অতীত পুনর্বিবেচনার নতুন সম্ভাবনা।

সংখ্যা ১দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার পাথরপ্রতিমা ব্লকের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নসামগ্রীটি হল মহারাজ জয়নাগের বহুল বিতর্কিত একটি তাম্রশাসন। আঞ্চলিক শ্রুতি ও ব্রিটিশ আমলের দলিল দস্তাবেজ থেকে জানা যায়, এটি পাওয়া গিয়েছিল সাবেক হাতিয়াগড় পরনার অন্তর্গত অধুনা পাথরপ্রতিমা ব্লকের বানাই নদীর পূর্ব-তীরবর্তী মলয়া গ্রাম (সাবেক জে-এল-নং-৯৮) থেকে। ব্রিটিশ আমলে ১৮৫০-৫৫ খ্রিস্টাব্দে জনৈক স্মিথ সাহেব এখানে নীলের আবাদ করার জন্য পত্তনী নিয়ে নীলকুঠি করার সময় একটি ঢিবি উৎখনন-কালে ইটের ইমারতের তলপত্তনের মধ্য থেকে অনেকগুলি স্বর্ণমুদ্রা-সহ এই তাম্রশাসনটি সংগ্রহ করেন। ১৯৯৪-৯৫ খ্রিস্টাব্দে মলয়া লাগোয়া মধুসূদনপুর গ্রামে ক্ষেত্রসমীক্ষাকালে নীলকর সাহেবদের একটি জীর্ণ কুটির লক্ষ করেছিলাম। পার্শ্ববর্তী ‘নীলেরআট’ গ্রামনাম নীল-আবাদের দ্যোতক। এই তাম্রশাসনটি এখন অস্ট্রেলিয়ার পার্থের মিউজিয়ামে রক্ষিত। এটির প্রথম বিবরণ পাওয়া যায় এল. ডি. বার্নেট কর্তৃক সম্পাদনায় ‘Epigraphia Indica XVIII’১ এবং পরে রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় ‘Epigraphia Indica XIX’।২ বার্নেট জানিয়েছিলেন, কলকাতার জনৈক Mr. J. Greig একটি নোটসহ এই তাম্রশাসনটি অস্ট্রেলিয়ার পার্থ মিউজিয়ামে দান করেন। উক্ত নোটে লিখিত ছিল Mr. James Smith এর মাল্লিয়া নামক নীলের এস্টেট থেকে গ্রামবাসীদের দ্বারা এটা সংগৃহীত হয় এবং Mr. Smith ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দে তাঁকে এটি দান করেন। সে সময় তাম্রশাসনটি পাঠোদ্ধারের একটি ব্যর্থ চেষ্টা হয়। অসমাপ্ত প্রাথমিক একটি পাঠও Mr. Greig ওই তাম্রশাসনের সঙ্গে মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষকে প্রদান করেন। সেই পাঠটি করেছিলেন ‘R. Mitro, Asiatic Society, 6th December 1854.’।৩ নিম্নবঙ্গের ইতিহাস সচেতন ব্যাক্তি মাত্রেই স্মিথ সাহেবের নামের সাথে পরিচিত আছেন। তিনি একাধারে রাজকর্মচারী এবং অপরদিকে সুন্দরবনের সদ্য হাসিলকৃত কয়েকটি বাদাবনের ইজারাদার। জটার দেউলের আমলক শীর্ষের সোনার কলসে কামন দেগে বিনষ্ট করার গল্পের নায়করূপেও বিশেষভাবে তিনি কুখ্যাত ছিলেন।৪
বপ্পঘোষবাট বা জয়নাগের তাম্রশাসন প্রাপ্তির ‘মাল্লিয়া’ স্থানটির প্রকৃত অবস্থান কোথায়, সেকালে সেই সংক্রান্ত কেউ নির্দিষ্ট কোনো ঠিকানা দিয়ে যাননি। কিন্তু স্মিথের জমিদারী যে আমাদের সুন্দরবন অঞ্চলেই ছিল, এবং তাঁর কীর্তিকলাপ এখনো এখানে কতটা সজীব, তা আমরা ঐতিহ্যগতভাবে এবং ক্ষেত্রসমীক্ষায় প্রাপ্ত হই। সুন্দরবনের জটারদেউল সহ নানান প্রাচীন স্থাপত্যের মধ্য থেকে তিনি কত যে সম্পদ আহরণ করেছিলেন, তা কিছু কিছু তথ্যেও আমরা পেয়ে থাকি। তিনিই জানিয়েছিলেন জটার স্থাপত্যের মধ্যে আট বছর বালকের আকৃতির একটি প্রস্তর ভাস্কর্য ছিল।৫ কিন্তু পরবর্তী সময় সেই ভাস্কর্যের কোনো হদিস আমরা পাইনি। প্রত্যক্ষদর্শীর সন্তানাদির বিবরণ অনুযায়ী স্মিথ সাহেব জটারদেউলের অভ্যন্তর থেকে অসংখ্য ভাস্কর্য বের করে নিয়ে যান। অপরদিকে মরিসন সাহেব জানিয়েছিলেন, মিস্টার স্মিথের মল্লিয়া নামক নীল এস্টেট বর্ধমান থেকে প্রায় ৩০ মাইল দক্ষিণে অবস্থিত ছিল।৬ কিন্তু নলিনীকান্ত ভট্টশালী মহাশয় নিম্নগাঙ্গেয় উপকূলের প্রত্নতত্ত্ব বিষয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধে জয়নাগের তাম্রশাসনটি উল্লেখ করে বলেন এটি সংগৃহীত হয়েছিল ডায়মন্ড হারবার থেকে ১৫ মাইল দক্ষিণ-পূর্বের মলয় গ্রাম থেকে: copper plate of Jaynaga (about 600 A.D.) from Malaya, 15 miles south-east of Diamond Harbour।৭ ভট্টশালীর এই তথ্যকে অস্বীকার করার মতো কোনো রকম অবিতর্কিত মান্য তথ্য এখনো কোনো গবেষক সম্মুখে আনতে পারেননি।
মহারাজ জয়নাগ যখন কর্ণসুবর্ণের স্কন্ধাবারে আসীন তখন ঔদম্বরিক বিষয়পতি সামন্ত নারায়ণ ভদ্র মহারাজের গোচরে আনেন যে, মহাপ্রতিহার সূর্যসেন ‘বপ্পঘোষবাট’ নামক একটি গ্রাম ব্রহ্মবীর স্বামী নামের এক ব্রাহ্মণকে দান করেছেন। তখন মহারাজ জয়নাগ সূর্যসেনের প্রার্থনায় ওই গ্রামদানের আদেশ উক্ত তাম্রশাসন দ্বারা মঞ্জুর করেন। ওই দানকৃত গ্রামের উত্তরে প্রবাহিত ছিল গঙ্গিনিকা, দক্ষিণে ব্রাহ্মণ ভরণীস্বামীর ক্ষেত্রসীমা, পূর্বে অবস্থিত ছিল একই গঙ্গিনিকা এবং পশ্চিমে অবস্থিত ছিল ইতিপূর্বে ব্রাহ্মণদের দান করা কুক্কুটগ্রাম/ কুটকুটগ্রাম। পূর্বদিগস্থ গঙ্গিনিকার বাঁধের উপর দিয়ে নির্মিত ‘সর্ষপ-যানক’ নামের একটি সড়ক উক্ত গঙ্গিনিকা বরাবর বাহিত হয়ে আমলপৌতিকা গ্রামের পশ্চিমসীমা স্পর্শ করে; সেখান থেকে উক্ত সর্ষপ-যানক দ্বারা সীমানা-বদ্ধ ভট্ট উন্মীলন স্বামীর ক্ষেত্র-সীমানায় উপনীত হয়; সেখান থেকে দক্ষিণে পরিবাহিত হয়ে আবার উত্তরে ঘুরে একই সীমা বরাবর প্রলম্বিত হয়ে ভরণীস্বামীর ক্ষেত্র-সীমায় পৌঁছায় (দানকৃত গ্রামের দক্ষিণ সীমানা), সেখান থেকে সরলরেখায় ভখট সুমালিকার পুষ্করিণী পর্যন্ত প্রসারিত হয়; উক্ত ভঘট সুমালিকার পুষ্করিণী ভট্ট উন্মীলন-স্বামীর ক্ষেত্র-সীমানার উপর অবস্থিত ছিল; এবং এখান থেকে উক্ত সর্ষপ-যানক কুক্কুটগ্রামের বা কুটকুটগ্রামের ব্রাহ্মণদের সীমানা (দানকৃত গ্রামের পশ্চিমসীমা) পর্যন্ত প্রসারিত।
লিপিবিদগণ ভাষা ও লিপি বিচার করে এই তাম্রশাসনটি ষষ্ঠ শতক বা সপ্তম শতকের প্রথমার্ধে উৎকীর্ণ বলে অনুমান করেন। সুতরাং দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা থেকে এ যাবৎ আবিষ্কৃত তাম্রশাসনগুলির মধ্যে এটিই প্রাচীনতম। কিন্তু মুসকিল হয়েছে অন্য জায়গায়। প্রথিতযশা ইতিহাস গবেষক ও অধ্যাপকগণ যখন দেখলেন, তাম্রশাসনের বক্তব্যকে মহারাজ জয়নাগের গোচরে এনেছেন ঔদম্বরিক বিষয়পতি, তখন তাম্রশাসন প্রাপ্তি-স্থানের গুরুত্ব অগ্রাহ্য করে এটিকে মুর্শিদাবাদ ও তৎসংলগ্ন অঞ্চলের ভূমির সঙ্গে প্রতিস্থাপিত করতে তাঁরা সচেষ্ট হলেন। ফলে ধামাচাপা পড়তে শুরু করলো অবহেলিত দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার যে স্থল থেকে পাওয়া গিয়েছিল এই শাসন, তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব।
ইতিহাসের পাঠক হিসাবে আমরা জানি, বাংলার সর্বশ্রেষ্ঠ সর্বভারতীয় শৈব মহারাজ শশাঙ্ক ৫৯০ খ্রিস্টাব্দের পরবর্তী কোনো এক সময় থেকে অন্তত ৬৩৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত কর্ণসুবর্ণের সিংহাসনে (?) আসীন ছিলেন। জয়নাগের তাম্রশাসনের লিপি, রীতি এবং ঐতিহাসিকতা বিচার করে আধুনিক পণ্ডিতেরা কর্ণসুবর্ণের স্কন্ধাবারে জয়নাগের আসীন থাকার কাল ৬৩৫ খ্রিস্টাব্দের অব্যবহিত পরে ধরে থাকেন। কারণ শশাঙ্কের ঠিক পূর্বে আমরা পূর্ব-ভারতে চারজন রাজার সিংহাসনে আসীন থাকার অকাট্য প্রমাণ পাই। যথা—ধর্মাদিত্য, গোপচন্দ্র, সমাচারদেব এবং দ্বাদশাদিত্য। শশাঙ্কের পূর্বে এঁদের মধ্যে জয়নাগকে স্থান দেওয়া যায় কিনা, এই সম্বন্ধে অনেক গবেষক সন্দিহান। ড. দীনেশচন্দ্র সরকার মনে করতেন, জয়নাগ শশাঙ্কের পূর্ববর্তী। ড. সরকার সুস্পষ্টভাবে লিখেছেন, ষষ্ঠ শতাব্দীতে ধর্মাদিত্য, গোপচন্দ্র, সমাচারদেব এবং জয়নাগ নামক চারজন স্বাধীন রাজা বাংলায় রাজত্ব করেছিলেন; তাঁদের মধ্যে ধর্মাদিত্যের আদিত্য-নামান্ত থেকে তাঁকে গুপ্ত-বংশীয় বলে মনে করা অসম্ভব নয়। কিন্তু গোপচন্দ্র, সমাচারদেব এবং জয়নাগ সম্ভবত গৌড়জাতীয় ছিলেন। সপ্তম শতাব্দীর সুবিখ্যাত গৌড় রাজধানী কর্ণসুবর্ণ নগর থেকেই জয়নাগের তাম্রশাসন প্রদত্ত হয়েছিল।৮ অবশ্য ড. সরকারের সময় দ্বাদশাদিত্য সম্বন্ধে তেমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। আবার রমেশচন্দ্র মজুমদার মনে করতেন, জয়নাগ কর্ণসুবর্ণের সিংহাসনে আসীন ছিলেন ৬৫০ খ্রিস্টাব্দের কাছাকাছি কোনো সময়ে।৯ তাম্রশাসনটি মঞ্জুর হয়েছিল জয়নাগের তৃতীয় রাজ্যবর্ষে। শুধু তাম্রশাসনটি নয়, এই জেলায় তাঁর অনেকগুলি সুবর্ণমুদ্রা উদ্ধারের তথ্য পাওয়া যায়। আসলে প্রকৃত সময় জ্ঞাপক কোনো পাথুরে প্রমাণ পাওয়া না গেলে, এই ধরনের ঐতিহাসিক বিতর্ক চলতেই থাকবে। আর্যমঞ্জুশ্রীমূলকল্পের এবং হিউয়েন সাং এর তথ্য যথেষ্ট নয়। এই সব তথ্যে যেমন ‘জয়’ নামক রাজার নাম পাওয়া যায়, আবার তেমন শশাঙ্কের প্রতি ‘সোম’, ‘গৌড়-ভূজঙ্গ’ প্রভৃতি নাম ও বিশেষণ প্রযুক্ত হতে দেখি। ‘নাগ’ ও ‘ভূজঙ্গ’ এই দুই এর মধ্যে কোনো শাসনতান্ত্রিক বা পরিবারগত সম্পর্ক ছিল কিনা, আমরা জানিনা। আবার কামরূপের দুবী নামক গ্রাম থেকে প্রাপ্ত ভাস্করবর্মার একটি তাম্রশাসন থেকে জানা যায়, রাজা সুস্থিতবর্মার মৃত্যুর সমকালে এক গৌড়রাজ কর্তৃক কামরূপ আক্রান্ত হয় এবং পরাজিত সুপ্রতিষ্ঠিত বর্মা ও ভাস্করবর্মাকে বন্দী করে গৌড়ে আনা হয় এবং পরে আবার দুই ভ্রাতাকে মুক্ত করে দিয়ে কামরূপের পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেন গৌড়রাজ। উক্ত গৌড়রাজ কে ছিলেন, তাও কিন্তু আমরা জানি না।১০ এই ভাস্করবর্মা আবার বেশ পরবর্তী কালে কয়েক বছরের জন্য গৌড় রাজধানী কর্ণসুবর্ণ অধিকার করেছিলেন এবং কর্ণসুবর্ণ জয়স্কন্ধাবার থেকে নিধনপুর তাম্রশাসন প্রদান করেছিলেন। আর একটি তথ্য আমাদের খুব ভাবায়, শশাঙ্কের সময় গৌড়ের রাজধানী কর্ণসুবর্ণরূপে বর্ণিত হলেও তাঁর রাজত্বকালীন উল্লেখযোগ্য কোনো তাম্রশাসন কর্ণসুবর্ণ থেকে প্রচারিত হল না কেন? যদিও জয়নাগের বপ্পঘোষবাট এবং ভাস্করবর্মার নিধনপুর তাম্রশাসন কর্ণসুবর্ণের জয়স্কন্ধাবার থেকে প্রদত্ত হয়। এই সমস্ত তথ্যের আলোকে জয়নাগের তাম্রশাসন প্রাপ্তির স্থান যাচাই হওয়া উচিত।
বার্নেট প্রস্তাব করেছিলেন নবদ্বীপের নিকট জলঙ্গি নদী হতে পারে বপ্পঘোষবাটের গঙ্গিনিকা। বাগোয়ানের ঠিক কাছেই এই জলঙ্গির তীরবর্তী একটি গ্রামের নাম ‘গঙ্গানি’। এটি গঙ্গিনিকার স্মৃতি হতে পারে। আবার নদীয়ার ভাগিরথীর দক্ষিণে ঘোষপাড়া নামক কর্তাভজা সম্প্রদায়ের বিখ্যাত গ্রামটিকে বপ্পঘোষবাট বলে তিনি মনে করেছেন। রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, উদুম্বর বা ঔদম্বরিক বিষয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আইন-ই-আকবরিতে উল্লেখিত ‘সরকার ঔদুম্বর’। এটি মুর্শিদাবাদের উত্তরাংশ নিয়ে গঠিত। আকমহল বা তদানীন্তন রাজমহল এই ঔদম্বর সরকারের অন্তর্গত। তাই আধুনিক রানাঘাটার কাছে জয়নাগের তাম্রশাসনোক্ত গ্রাম থাকার সম্ভাবনা নেই।১১ সাম্প্রতিক একটি প্রবন্ধে অধ্যাপক ড. রজত সান্যাল মুর্শিদাবাদের সাগরদীঘি থানার অন্তর্গত মালিয়াডাঙা গ্রামকে স্মিথের নীল এস্টেট রূপে শনাক্তকরণের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরতে চেয়েছেন।১২ ড. সান্যাল উক্ত প্রবন্ধে বীরভূম জেলার রামপুরহাট থানার অন্তর্গত কুটিগ্রাম-ভাবকি-অম্ভ এই তিনটি গ্রামকে যথাক্রমে জয়নাগের তাম্রশাসনোক্ত কট্কুট, বপ্পঘোষবাট এবং আমলপৌতিকা গ্রামরূপে শনাক্ত করা যায় বলে মন্তব্য করেন; কিন্তু তার জন্য ব্যাপক ক্ষেত্রানুসন্ধানের প্রয়োজন আছে বলে মনে করেন।১৩ এই পর্যন্ত আলোচনায় আমরা দেখি, জয়নাগের তাম্রশাসনোক্ত গ্রামকে শনাক্তকরণের প্রত্যেকটি প্রচেষ্টা ঔদম্বরিক বিষয়কে সামনে রেখে করা হয়েছে। ঔদম্বরিক বিষয়পতি সংক্রান্ত বলে তাঁরা সবাই ধরেই নিয়েছেন, দানকৃত গ্রামটি ছিল উক্ত বিষয়ের অন্তর্গত। এই সম্বন্ধে আমাদের কিছু বলার আছে।
জয়নাগের প্রায় সমসাময়িক মেদিনীপুর থেকে প্রাপ্ত মহারাজ শশাঙ্কের শাসনকালের তিনটি তাম্রশাসনের সঙ্গে আমাদের আলোচ্য তাম্রশাসন বিচার করলে সমকালের প্রশাসনিক বিভাগ সম্পর্কিত কৌতূহলোদ্দীপক তথ্য পাওয়া যায়। মেদিনীপুরের তৎকালীন (১৯৩৭ খ্রি.) ম্যাজিস্ট্রেট বিনয়রঞ্জন সেন সংগৃহীত দুটি তাম্রশাসনের প্রথমটি হল ‘কুম্ভারপদ্রক’ তাম্রশাসন। এটি মহারাজ শশাঙ্কের রাজত্বের অষ্টম বর্ষে প্রদত্ত হয়েছিল। উক্ত তাম্রশাসনে লিখিত হয়েছে, মহাপ্রতিহার শুভকীর্তি যখন দণ্ডভুক্তির শাসক ছিলেন, তখন ‘তাবীরাধিকরণের নিকট থেকে কেতকপদ্রিকা অঞ্চলে অবস্থিত কুম্ভারপদ্রক গ্রামে ৪০ দ্রোণবাপ কর্ষণযোগ্য ভূমি এবং এক দ্রোণবাপ বাস্তুভূমি ক্রয় করে ভরদ্বাজ গোত্রীয় মাধ্যন্দিন শাখার ব্রাহ্মণ দাম্যস্বামীকে দান করেন’।১৪ দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার আঞ্চলিক ইতিহাস পাঠকের কাছে ‘তাবীর’ অধিকরণ খুব একটা পরিচিত নাম নয়। আজকের প্রেক্ষিতে সেকালের তাবীরকে একটি মণ্ডল অর্থাৎ জেলার নামরূপে বিবেচনা করা যায়। এটি তদানীন্তন উৎকল দেশে অবস্থিত। শশাঙ্কের অষ্টম বর্ষে এই অধিকরণ বিপ্র-প্রধানদের দ্বারা গঠিত ছিল। এই অধিকরণের প্রতীক হল স্ফীতোদর মঙ্গলকলস। উদরের মাঝখানে দুটি মালা জড়ানো। কলসের মুখে পদ্মফুল এবং দুই দিকে পুষ্পলতার অনুকৃতি। লক্ষ্যণীয় যে—(১) আমরা জানি, মহাপ্রতিহার একজন প্রধান রাজকর্মচারী। তাঁকে এখানে দণ্ডভুক্তির (প্রদেশ) প্রশাসনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। (২) তৎকালীন দণ্ডভুক্তি উৎকল দেশের তাবীর অধিকরণের অন্তর্গত এবং গৌড়রাজ শশাঙ্কের রাষ্ট্রসীমার অধীন। (৩) যে ব্রাহ্মণকে ভূমি দান করা হয়েছে তাঁর নামান্ত হল ‘স্বামী’।
বিনয়রঞ্জন সেন সংগৃহীত দ্বিতীয় তাম্রশাসনটি মহাকুম্ভারপদ্রক গ্রাম দান বিষয়ক। এটি প্রথম তাম্রশাসনোক্ত গ্রামের সংলগ্ন গ্রাম বলেই গবেষকদের ধারণা। এই তাম্রশাসন অনুযায়ী মহারাজ শশাঙ্কের শাসনের ঊনবিংশ রাজ্যবর্ষে তাঁর অধীনস্থ সামন্ত-মহারাজ সোমদত্ত উৎকলদেশের সঙ্গে সংযুক্ত দণ্ডভুক্তির শাসক থাকা কালীন ভট্টেশ্বর নামক কাশ্যপগোত্রীয় অধ্বর্যুকে মহাকুম্ভারপদ্রক গ্রাম দান করেন।১৫ তখনো দণ্ডভুক্তি তাবীরাধিকরণের অন্তর্ভূক্ত এবং তাবীরমণ্ডলের শাসক বা সরকারী কর্মচারী ছিলেন সোমদত্তের অমাত্য প্রকীর্ণদাস। তিনি তাবীর অধিকরণকে জানিয়েছেন, প্রদত্ত গ্রাম মণ্ডল থেকে পৃথক করে দান করার অনুমতি প্রদত্ত হয়েছে।
আরো কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় অবগত হওয়া যায় শশাঙ্কের এগরা তাম্রশাসন থেকে। পরমদৈবত, পরমমাহেশ্বর মহারাজাধিরাজ শশাঙ্কদেবের এক অজ্ঞাত রাজ্যবর্ষকালে দেখা যাচ্ছে, খড়্গপুরের এগরা অঞ্চল একতাকক্ষ বিষয়ের অন্তর্গত। এই বিষয়াধিকরণের যে প্রতীক ব্যবহৃত হয়েছে, সেটি একটি পূর্ণকুম্ভ। এই অধিকরণের সভ্যগণের একটি বিবৃতি এখানে উৎকীর্ণ হয়েছে। এই বিবৃতি বর্তমান ও ভবিষ্যৎ রাজপুরুষের বা রাজকর্মচারীর জ্ঞাতার্থে লিখিত হয়েছে। তাঁরা হলেন, কার্তাকৃত্তিক, উপরিক, ভুক্তিপত্তলিক, কুমারামাত্য, বিষয়পতি এবং ভাণ্ডারাধিকৃতগণ। একতাকক্ষ বিষয়াধিকরণের ৩৫ জন কর্মচারী দ্বারা বিবৃতিটি প্রদত্ত হয়েছে। উল্লেক্ষ্য যে, বিবৃতিকারী আধিকারিকদের মধ্যে ছিলেন জনৈক মহাদেব, যিনি সর্ষপবাসিনী অর্থাৎ সর্ষপ নামক গ্রামে থাকতেন। বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, অন্তরঙ্গ বা পরামর্শদাতা জনৈক দোষতুঙ্গ অধিকরণের কাছে প্রার্থনা করেছেন যে, তাঁর ও তাঁর পিতামাতার পুণ্যের জন্য কৌশিকগোত্রীয় ত্রিবেদাধ্যায়ী (ঋক, সাম ও যজুর্বেদ অধ্যায়কারী) ত্রিপ্রবর (কৌশিক, অঘমর্ষণ ও বৈশ্বামিত্র) ভট্ট দামস্বামীকে অক্ষয়নীবী দানের নিমিত্ত কপর্দিপদ্রকগ্রামে একশত দ্রোণবাপ ভূমি মঞ্জুর করা হোক। এই প্রার্থনায় বিবৃতিকারী আধিকারিকগণের সিদ্ধান্ত হল যে, ধর্ম সংহিতাবচনানুসারে অনুসন্ধানে দেখা গেল, দোষতুঙ্গের আবেদন সঙ্গত। কারণ চিরদিনের পতিত ক্ষেত্র বৃক্ষাদিহীন ভিটা অবস্থায় পড়ে থাকলে রাজার কোনো অর্থলাভ হয় না। কিন্তু সেই ভূমির দানের ব্যবস্থা হলে রাজার এক-ষষ্ঠাংশ পুণ্যলাভ হয়। তাই রাজার কপর্দিপদ্রকগ্রামে পশ্চিমোত্তরদিকে প্রতি দ্রোণবাপের মূল্য চার পণের হিসাবে তাম্রপট্টদানধর্মানুসারে একশত দ্রোণবাপ ভূমি ভস্ম, অঙ্গার প্রভৃতি দ্বারা পৃথক করে দান করার প্রার্থনা শাসন অনুযায়ী মঞ্জুর করা হল।
প্রথম দু’টি তাম্রশাসনের আলোচনা থেকে আমরা সুস্পষ্টভাবে জানলাম যে, মহারাজ শশাঙ্কের রাজ্যবর্ষের গোড়ার দিকে অন্তত ৮ম বর্ষ থেকে ১৯তম বর্ষ পর্যন্ত মেদিনীপুর অঞ্চল দণ্ডভুক্তির অধীন ছিল। উৎকল দেশের রাজপুরুষের অতিরিক্ত দায়িত্ব অর্পণ করে দণ্ডভুক্তি শাসিত হতো। বিপ্র বা অভিজাতদের তাবীর নামক একটি অধিকরণ দ্বারা জমি বন্টন নিয়ন্ত্রিত হতো। কিন্তু এগরা তাম্রশাসনের ক্ষেত্রে ওই মেদিনীপুর অঞ্চলের ভূমিব্যবস্থার প্রশাসনিক স্তরে ব্যাপক উৎকর্ষ লক্ষ্য করি। তাবীরের পরিবর্তে তাবীরের অনুরূপ একতাকক্ষ নামক একটি বিষয় বা পরিষদ ভুমি-ব্যবস্থায় সক্রিয়। তাবীরের মতো এই অধিকরণের প্রতীক পূর্ণকুম্ভ। কিন্তু জানা যায় না, তখন এটি উৎকল রাজপুরুষের অতিরিক্ত দায়িত্বে ছিল কিনা। অন্তরঙ্গ বা পরামর্শদাতার প্রার্থনা এবং অধিকরণের সিদ্ধান্ত যে রাজপুরুষের জানানো হচ্ছে, তাঁদের মধ্যে ছিলেন উপরিক মহারাজ, কুমারামাত্য এবং বিষয়পতি। সাধারণভাবে উপরিক মহারাজ ভুক্তির শাসনকর্তা এবং কুমারামাত্য বিষয়ের শাসনকর্তাকে বোঝানো হতো। কিন্তু এখানে একতাকক্ষ বিষয়ের বিষয়পতি উল্লেখিত হয়েছে। তাই মনে হয়, সমকালে একতাকক্ষ বিষয়ের মতো অনেকগুলি বিষয় নিয়ে আর একটি প্রশাসনিক বিভাগ ছিল এবং তার শাসককে কুমারামাত্য বলা হয়েছে। যদি তাম্রশাসনে এঁদের নামগুলি উল্লেখিত হতো, তাহলে সমস্ত সমস্যার প্রায় সমাধান হয়ে যেতো। আবার একতাকক্ষের ক্ষেত্রে ব্রাহ্মণদের সঙ্গে গ্রামপতি, কৃষক এবং নিম্নপ্রশাসনের যে মেলবন্ধন ঘটানো হয়েছে, তা সেকালের নিরিখে বৈপ্লবিক। শাসক হিসাবে শশাঙ্ক কতটা বিকেন্দ্রীকরণে বিশ্বাসী ছিলেন, এই শাসনটি তার প্রমাণ। এখানে ভূমিবন্টন ও গ্রামদানের নির্বাচনের ক্ষেত্রে রাজার ভূমিকার থেকে পরিষদ বা অধিকরণের ভূমিকা সর্বোচ্চ। ‘একতাকক্ষ’ নামটিও বেশ অর্থব্যঞ্জক। আমরা জানি না, এই শাসনটি শশাঙ্কের কোন্ রাজ্যবর্ষে উৎকীর্ণ হয়েছিল। তাই শশাঙ্কের শাসনের একদম প্রথমদিকে অর্থাৎ তাঁর রাজ্যবর্ষের অন্তত সপ্তম বর্ষের মধ্যে, নাকি বিংশ বা তার পরবর্তী বর্ষ থেকে মেদিনীপুর অঞ্চল একতাকক্ষ বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত করা হয়? ড. সরকার মনে করতেন, ‘রচনারীতির দিক থেকে এগরা তাম্রশাসন শশাঙ্কের পূর্ববর্তী রাজা গোপচন্দ্রের রাজত্বকালীন মল্লসারুল তাম্রশাসনের অনুরূপ’১৬। এই সাক্ষ্য অনুসারে, যদি আমরা ধরে নিই যে এগরা তাম্রশাসন প্রদত্ত হয়েছিল শশাঙ্কের অষ্টম রাজ্যবর্ষের পূর্বের কোনো এক সময়, তাহলে বলতে হবে, মেদিনীপুরের এগরা অঞ্চল একতাকক্ষ বিষয় থেকে বের করে শশাঙ্ক উৎকলদেশীয় রাজ্যবিভাগের অন্তর্গত তাবীর মণ্ডলে অন্তর্গত করেন। কিন্তু এগরা তাম্রশাসনের প্রশাসনিক বিভাগের বিবর্তন দেখে আমাদের ধারণা, এটি প্রদত্ত হয়েছিল, শশাঙ্কের ঊনবিংশতম বর্ষ শাসনের পরবর্তী শেষের দিকের কোনো রাজ্যবর্ষে।
জয়নাগের তাম্রশাসনে আমরা দেখি, তাঁর সামন্ত নারায়ণ ভদ্র ঔদম্বরিক বিষয়ের অধিপতি ছিলেন এবং তিনি বপ্পঘোষবাট নামক গ্রামদান মঞ্জুরের জন্য মহারাজের গোচরে আনেন। গ্রামটি দান করছেন মহাপ্রতিহার সূর্যসেন। সম্ভবত তিনি শশাঙ্কের শাসনকালের মতো কোনো ভুক্তির শাসন কর্তার দায়িত্বে ছিলেন। সেই ভুক্তি এখানে উল্লেখিত হয়নি। এটা কি দণ্ডভুক্তি হতে পারে? তার স্বপক্ষে এবং বিপক্ষে কোনো প্রমাণ নেই। সে সময় তাবীর কিংবা একতাকক্ষ ঔদম্বরিক বিষয়ের মধ্যে আত্মগোপন করেনি তো? মনে রাখতে হবে মহারাজ শশাঙ্কের সময় এই ধরনের গ্রামদান করার জন্য মহারাজের গোচরে আনার প্রয়োজন হতো না। কিন্তু এখানে করা হয়েছে। আবার মহারাজ গ্রামদানটি করেছেন কর্ণসুবর্ণ জয়স্কন্ধাবার থেকে। অর্থাৎ কামরূপরাজ ভাস্করবর্মার মতো তিনি কোনো যুদ্ধঘটনার প্রভাবে সাময়িকভাবে কর্ণসুবর্ণের সিংহাসনে আসীন হওয়ার পর তাঁর সামন্তের প্রার্থনায় এই দান মঞ্জুর করেন। তখন আপৎকালীন সময়। আবার পরবর্তীকালের আইন-ই-আকবরি এবং প্রত্নবস্তুগত সমীক্ষায় ধারণা হয়, শুহ্ম থেকে গঙ্গাসাগর সন্নিহিত দ্বীপাঞ্চল মাঝেমধ্যেই ঔদম্বরিক বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়েছে। মাননীয় নীহাররঞ্জন রায় লিখেছেন—“সপ্তম শতকে রাজা জয়নাগের (রাজধানী কর্ণসুবর্ণ?) বপ্পঘোষবাট পট্টোলীতে ঔদুম্বরিক বিষয় নামে একটি ক্ষুদ্র জনপদের উল্লেখ আছে। আবুল ফজলের ‘আইন-ই-আকবরী’ গ্রন্থে ঔদম্বর সরকার পূর্ণিয়া-সরকারের দক্ষিণ সীমা হইতে আরম্ভ করিয়া একেবারে মুরশিদাবাদ-বীরভূম পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। রাজমহল (তদানীন্তন আকমহল) এই ঔদম্বর সরকারের অন্তর্গত ছিল। বস্তুত, রাজমহল ও সাঁওতাল পরগনার কিয়দংশ যে বাঙলার অন্তর্গত ছিল, এ সম্বন্ধে সন্দেহ থাকিতে পারে না। সম্প্রতি মেদিনীপুর সাহিত্য-পরিষদে রক্ষিত মহারাজ শশাঙ্কের যে তাম্রশাসনের পাঠোদ্ধার হইয়াছে তাহাতে দেখা যাইতেছে উৎকল দেশও সপ্তম শতকে দণ্ডভুক্তির (বর্তমান দাঁতনের) অন্তর্গত ছিল। যে কোনও প্রাকৃতিক ভূমি নকশা বিশ্লেষণ করিলেই দেখা যাইবে রাজমহল হইতে এক অনুচ্চ শৈলশ্রেণী এবং গৈরিক পার্বত্যভূমি দক্ষিণে সোজা প্রসারিত হইয়া একেবারে ময়ূরভঞ্জ-কেওঞ্জর-বালেশ্বর স্পর্শ করিয়া সমুদ্র পর্যন্ত বিস্তৃত হইয়াছে।”১৭
এখানে ড. রায়কে ঔদম্বরিক বিষয়ের সঙ্গে দণ্ডভুক্তির প্রাকৃতিক বাস্তবতার সমন্বয় সাধন করতে দেখি। দাঁতন যদি দণ্ডভুক্তির দ্যোতক হয়, তাহলে সমকালে দাঁতনের লাগোয়া পূর্বদিগস্থ গঙ্গাসাগর ও তৎসংলগ্ন অঞ্চল অর্থাৎ প্রাচীন শুহ্ম ও বঙ্গের সন্ধিস্থল প্রাকৃতিক ও ঐতিহাসিকভাবে সমকালের ক্রান্তিকালে দণ্ডভুক্তি বা ঔদম্বরিক বিষয়ের প্রশাসনিক আওতায় কিছু কালের জন্য থাকা অসমীচীন চিন্তা নয়। যখন আমরা জানি, গঙ্গাসাগর সর্বভারতীয় তীর্থক্ষেত্র ও সমকালীন বন্দরকেন্দ্রিক বাণিজ্য-নগর হওয়ায় শুহ্ম ও বঙ্গের প্রশাসনের মধ্যে বহুবার টানাপোড়েন এবং সাথে সাথে ওড়িশার সঙ্গে যুদ্ধের মতো ঘটনা ঘটেছে। দ্বাদশ শতকের প্রথমার্ধের একটি ঐতিহাসিক ঘটনার বিবরণ প্রদত্ত হলে ব্যাপারটি সুস্পষ্ট হবে। আনুমানিক ১১৩২-৩৩ খ্রিস্টাব্দে ওড়িশার গঙ্গ-বংশীয় রাজা অনন্তবর্মা চোড়গঙ্গদেব মেদিনীপুরের মধ্য দিয়ে সাগরসঙ্গম ও তৎসংলগ্ন অঞ্চলে অভিযান চালিয়ে আদিগঙ্গার পশ্চিমপার্শ্বস্থ পশ্চিমখাড়ি নিজ অধিকারে বহুদিন রাখেন (শ্রীকূর্মম লেখ)। ওড়িশার স্বনামধন্য প্রত্নতাত্ত্বিক ড. হরিহর কানুনগো তাঁর ‘Origin of Ganga Dynasty’ নামক গ্রন্থে গঙ্গ-বংশীয়দের উৎসভূমি মেদিনীপুর সাগরসঙ্গম অঞ্চল হতে পারে বলে মত প্রকাশ করেছেন। মহারাজ লক্ষ্মণসেনদেবের গোবিন্দপুর তাম্রশাসনে আমরা দেখি, একদা প্রবাহিত আদিগঙ্গার পশ্চিমদিগস্থ দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার ভূমিভাগ বর্ধমানভুক্তির অন্তর্গত ছিল।১৮ শশাঙ্কের সময়ে উৎকল ছিল গৌড় বা কর্ণসুবর্ণের অন্তর্গত। তাই পালপূর্ব যুগে পূর্বোল্লিখিত সাগরস্পর্শিত প্রান্তীয় অংশ দণ্ডভুক্তির কিংবা তাবীর বা একতাকক্ষ বিষয়ের বা ঔদুম্বরিক প্রশাসনের কর্তৃত্বে থাকার সম্ভাবনা একেবারে অগ্রাহ্য করা যায় না; বিশেষ করে এই অঞ্চলবাসীদের প্রকৃতিগত ঐতিহ্যের সুবাদে। মনে রাখতে হবে মধ্যযুগীয় কোনো কোনো পুঁথিতে (দেশাবলী, জগমোহন পণ্ডিত) দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার আদিগঙ্গার পশ্চিমবর্তী ভূভাগকে ‘তাম্রলিপ্ত’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। ঔদম্বরিক বা উদুম্বর ভূভাগ বলতে ডুমুরের মতো ঈষৎ উপবৃত্তাকার একটি দ্বীপাঞ্চলকে বোঝায়, যার মধ্যে শিরা উপশিরার মতো ছেয়ে থাকে নদী-উপনদী-শাখানদী এবং নিম্নে অবস্থিত ধূ ধূ সমুদ্র। সেই দিক দিয়ে আমাদের এই আলোচ্য অঞ্চল ভৌগোলিক দৃষ্টিকোণে আদর্শ উদুম্বর।
আমরা ইতিপূর্বে উল্লেখ করেছি, আলোচ্য তাম্রশাসনটি সংগৃহীত হয়েছিল সাবেক হাতিয়াগড় পরগনার মেজর স্মিথ সাহেবের নীল এস্টেট থেকে। প্রাপ্ত স্থানটির পরিচয় দেওয়া আবশ্যক। সাবেক হাতিয়াগড় পরগনা গঠিত ছিল একদা বহমান আদিগঙ্গার পূর্ব তীরবর্তী মথুরাপুর, রায়দীঘি, মন্দিরবাজার, ডায়মণ্ডহারবার, কুল্পী এবং পাথরপ্রতিমা থানার অন্তর্গত লাগোয়া ভূমিভাগ নিয়ে। এই পরগনার পশ্চিমে এবং কিছুটা উত্তরেও মুড়াগাছা পরগনা। মোটামুটিভাবে তৎকালীন বানাই নদী মুড়াগাছা ও হাতিয়াগড়কে দ্বিধাবিভক্ত করেছে। সূর্যপুর নাচনগাছার কাছে আদিগঙ্গার পশ্চিম গায়ে যেখানে পিয়ালীর একটি ধারা যুক্ত হয়েছিল, সেই অংশের পূর্ব দিক দিয়ে বানাই নদী উত্থিত হয়ে বড়দুর্গ ঘুরে মগরাহাটের মধ্য দিয়ে মন্দিরবাজার জগদীশপুর রামনাথপুর, লক্ষ্মীকান্তপুর হয়ে কুল্পীর কাছে এসে দুটি ধারায় বিভক্ত হয়েছে। একটি পশ্চিমে হুগলী নদীতে পড়েছে এবং অপরটি পূর্ব-দক্ষিণে কিছুটা প্রবাহিত হয়ে আবার দুটি ধারায় বিভক্ত হয়েছে। একটি পূর্বমুখে চলে গিয়েছে (২ নং ধারা); এবং অপরটি সরাসরি দক্ষিণে নেমে করঞ্জলী, কাঁটাবুনি বা কাঁটাবেনিয়া হয়ে আবার দুটি ধারায় বিভক্ত হয়ে একটি পশ্চিমের ট্যাংরা, রাঙাতলা হয়ে হুগলীতে পড়েছে এবং অপরটি কাঁটাবুনি থেকে দক্ষিণে প্রবাহিত হয়ে বেলপুকুরিয়ার পূর্বপাশ দিয়ে ১০ নং লট নেবুতলা, পাকুড়তলা, রামরতনপুর, ১৩ নং লট, ১২ নং লট তক্তিপুরের মধ্য দিয়ে গণেশপুরকে পশ্চিমে এবং থানগড়া গ্রামকে পূর্বে রেখে দক্ষিণে কালনাগিনী-ঘৃতবতী নদীতে পড়েছে। বানাই-এর প্রাচীন এই ধারাটিকে গঙ্গারিডি গবেষক নরোত্তম হালদার মহাশয় মনে করতেন এটি আসলে কালনাগিনী। উপরে উল্লেখিত ২ নং ধারাটি চণ্ডীপুরকে দক্ষিণে রেখে কোয়াবেড়িয়ার পশ্চিম পার্শ্ব দিয়ে মন্মথপুরকে পূর্বদিকে রেখে পূর্বোল্লিখিত কালনাগিনী-ঘৃতবতী নদীতে পড়েছে। এই শাখাটি বাঁশতলা নদী নামে স্থানিকভাবে পরিচিত। উক্ত শাখা থেকে একটি ধারা বেরিয়ে ঢোলার দিক দিয়ে রামচন্দ্রপুরের (সাবেক জে-এল-নং ৮৩) উত্তর মাথা দিয়ে ভীমপুরের (সাবেক জে-এল-নং ৮২) মধ্য দিয়ে ব্রহ্মপুরের (সাবেক জে-এল-নং ৮০) উত্তর সীমা তৈরি করে উত্তরে রাজারামপুর (সাবেক জে-এল-নং ৭৭) এবং দক্ষিণে আবাদ-ভগবানপুরকে (সাবেক জে-এল-নং ৭৯) রেখে আদিগঙ্গায় পড়তো। আমাদের প্রবন্ধের প্রেক্ষিতে এই নদীটি অতি গুরুত্বপূর্ণ। এককালে এই শাখাটি অন্যতম প্রধান ও প্রবল ছিল। অপরদিকে বানাই এর আর একটি শাখা জগদীশপুর থেকে উত্থিত হয়ে উত্তরদিক দিয়ে প্রবাহিত হয়ে মলয়া গ্রামকে পূর্বদিকে রেখে ভাজনার উত্তরদিক দিয়ে শ্রীনারায়ণপুর এবং দক্ষিণের তারানগরকে পূর্বদিকে রেখে গণ্ডকাটা নদীর সঙ্গে মিলিত হয়ে যথারীতি ঘৃতবতী-কালনাগিনী নদীতে পড়েছে। আবার একইভাবে উত্তরের মূল বানাই নদীর আবাদ-গঙ্গাধরপুরের পূর্বপার্শ্ব দিয়ে দক্ষিণ দুর্গাপুরকে পূর্বে রেখে মেহেরপুরের মধ্য দিয়ে পূর্ণচন্দ্রপুরকে পূর্বে রেখে তারানগরের পূর্বপার্শ্ব দিয়ে গণ্ডকাটা নদীর সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে উত্তর পূর্ব থেকে প্রবাহিত হয়ে আসা গোবধিয়া গাঙের নিম্ন আনুভূমিক দক্ষিণ-পশ্চিম প্রবাহ তথা ঘৃতবতী-কালনাগিনী নদীতে মিশেছে। এই গোবধিয়া গাঙ উত্থিত হয়েছে ১৯, ২১, ২২ নং লটের প্রান্ত সীমানায় আদিগঙ্গা থেকে। এই একই উৎস-স্থল থেকে উদ্ভব ঘটেছে গোবধিয়ার পূর্ব দিক দিয়ে দক্ষিণে এঁকেবেঁকে সমান্তরালে বয়ে নামা মৃদঙ্গভাঙা নদী। গোবধিয়া ১৬, ১৭ এবং ১৫ নং লটকে পশ্চিমে রেখে এবং ১৫ নং লটের দক্ষিণ সীমা নির্দেশ করে কাশিয়াবাদ ও হরেন্দ্রনগরকে উত্তরে রেখে সপ্তমুখী নদীতে পড়েছে। ওই একই স্থান থেকে শুরু হয়েছে কালনাগিনী-ঘৃতবতী নদী, যে সংযুক্ত ধারা সরাসরি পশ্চিম মুখে বাহিত হয়ে হুগলী নদীর পশ্চিম প্রান্তে চ্যানেল ক্রিক বা বারাতলা বা মরিগঙ্গা নদীতে পড়েছে। এই বিবরণ থেকে দেখা যাচ্ছে হাতিয়াগড় অঞ্চলে আদিগঙ্গা এবং হুগলী বা সরস্বতী নদীর অনেকগুলি শাখা উপশাখা বিভিন্ন নামে প্রবাহিত হতো। বানাই যে বহুবার খাত পরিবর্তন করেছে এবং আদিধারা শুকিয়ে গেছে তার বড় প্রমাণ হল—করঞ্জলীর (কুল্পি থানা, সাবেক জে-এল-নং ২৩৪) নিকটবর্তী একটি গ্রামের নাম ‘বানাইনদী’ (সাবেক জে-এল-নং-১৯৬)। এককালে বানাই নদী এখানে প্রবাহিত ছিল এবং এখন শুকিয়ে এই গ্রাম সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু এটি যে শেষ মধ্যযুগে আরো পূর্বদিকে সরে এসে প্রবাহিত থেকে এখনো একটু জীবিত রয়েছে, তার প্রমাণ মলয়া গ্রামের পশ্চিম দিকে বানাই-এর সর্পিল নদীখাত, যেটি এখনো বানাই নদী নামে উল্লিখিত। আবার করঞ্জলীর পাশের নয়ানজুলি আদিকালের বানাই নদীর খাতের স্মৃতি। আদিগঙ্গার পর বানাই এই অঞ্চলের অন্যতম উল্লেখযোগ্য নদী। সে যখন ছিল যৌবনবতী তখন ক্ষণে ক্ষণে তার রূপ বদল করতো। এই হয়তো সে স্নিগ্ধ শান্ত, পরক্ষণে সে হঠাৎ ফুঁসে উঠলো, তার দু’কূল ছাপিয়ে উঠলো বন্যা, ডাকলো বান। অনুমান করি, এই নদীর নাম তাই ‘বানাই’। অনেক পুরোনো পন্থী প্রবৃদ্ধেরা বলেন, এই নদীর তীরে রাজা বাণ পুরাকালে গড়ে তুলেছিলেন নিজ নামিত শিবলিঙ্গের মন্দির। তাই নদীর নাম বাণগঙ্গা; তা থেকে বানাই। প্রাকৃতিক ভূগোলের দৃষ্টিকোণে, এই নদীর তীরে একদা ‘বাইন’ নামক লবনাম্বু বনভূমির আধিক্যের জন্য বাইন > বান > বানাই নদী নামকরণ হতে পারে।
ইতিপূর্বে আমরা উল্লেখ করেছি পাথরপ্রতিমা ব্লকের মলয়া গ্রাম থেকে জয়নাগের তাম্রশাসনটি পাওয়া গিয়েছিল। ব্রিটিশ আমলে এই অঞ্চল ছিল বাইন সহ অন্যান্য গাছের ঘন জঙ্গলে ঢাকা। ১৮৪৬-৪৭ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ আবাদি পত্তনের শর্তে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার এই অঞ্চলে পত্তনী দিতে শুরু করে। সাবেক মথুরাপুর অঞ্চলের ১৭ নং লট, যেটি পরে পাথরপ্রতিমা ব্লক সৃষ্টি হলে উক্ত ব্লকের অন্তর্ভুক্ত হয়, সেই লটের মধ্যেই ছিল মলয়া বা মলয় গ্রাম, আজকের মথুরাপুর ১ নং ব্লকের একদম দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে। ১৭ নং লট প্রথমে ইজারা নিয়েছিলেন জেম্স স্মিথ নামের ইংরেজ রাজকর্মচারী বা কালেক্টার নীলআবাদ ও ব্যবসার স্বার্থে, যা আমরা আগেই উল্লেখ করেছি। মলয় (সাবেক জে-এল-নং ৯৮ এবং হাল ০২) খুব প্রাচীন গ্রাম, আবাদিকরণের আগে এখানে কয়েকঘর মৎসজীবী বাস করতেন বলে গ্রামশ্রুতি রয়েছে। এখানে জঙ্গল হাসিল করার জন্য রাঁচি থেকে একটি আদিবাসী দল আনা হয়েছিল। একটি ঢিবি উৎখনন কালে স্বর্ণমুদ্রা সহ তাম্রশাসনটি পাওয়া যায় বলে ইতিপূর্বে আমরা উল্লেখ করেছি। স্মিথ সাহেব কিন্তু এই এস্টেট পরে সরকারকে ফেরত দেন এবং জনৈক মধুসূদন ইজারা নেন। এই গ্রামের দক্ষিণে লাগোয়া গ্রামটি হল নীলেরাট (সাবেক জে-এল-নং ১০০, হাল ০৩)। স্মিথ সাহেবের নীল এস্টেটের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এই অঞ্চলে ‘রাট’ নামান্ত গ্রামনাম প্রচুর রয়েছে। রাট = আট = চতুঃসীমানা বেষ্টিত ক্ষেত্র। যে ক্ষেত্র-বন্ধে নীল প্রক্রিয়াজাত হতো, তার নাম নীলেরাট। লোকায়ত স্তরের এক দেবতার নাম আটেশ্বর। দক্ষিণরায়ের সহচর এবং আটের রক্ষাকর্তারূপে বন্দিত। নীলেরাটের ঠিক দক্ষিণে রয়েছে দক্ষিণ মধুসূদনপুরগ্রাম (সাবেক জে-এল-নং ১০১, হাল ০৪)। সুলতানি যুগে এখানে গোপপুর (ঘোষপাড়া) বলে একটি গ্রাম ছিল। হজরত আব্বাস আলি রাজি ওরফে গোরাইগাজি যখন হাতিয়াগড়ে ইসলাম ধর্ম সম্প্রসারণে সমর অভিযানে আসেন, তখন উক্ত গোপপুরের জনৈক, রামলোচন ঘোষ, তাঁর স্ত্রী কালীতারা দাসী, তাঁদের পুত্র কেদারনাথ ঘোষ এবং তাঁদের ঘনিষ্ঠ বুনো সরদার ও তাঁর স্ত্রী প্রথম তাঁর কাছ থেকে ইসলাম কবুল করেন। তারপর ভয়ঙ্কর যুদ্ধে হাতিয়াগড়ের পতন হয়। কিন্তু ঘাড়ে গভীর অস্ত্রাঘাতে গুরুতর আহত হন পীর। উক্ত ঘোষ পদবির পীরভক্তরা পীরকে নিয়ে তখন বালান্দায় চলে যান এবং সেখানে তাঁর মৃত্যু হয় (বালাণ্ডার পীর হজরত গোরাচাঁদ রাজী, ডক্টর আবদুল গফুর সিদ্দিকী, পুনর্মুদ্রণ-২০০৬, খাসপুর, উত্তর ২৪ পরগনা)। এরপর সাহাচাঁদ নামে পীরের এক ভাই বিপুল সৈন্যবাহিনী সহায়ে হাতিয়াগড় ধ্বংস করেন। সে সময় এই অঞ্চল আতঙ্কে সম্পূর্ণ জনশূন্য হয়ে পড়ে এবং ষোড়শ শতকের একটি জলপ্লাবনে ও মগের অত্যাচারে অরণ্য কবলিত হয়। এখানকার বহু ঘোষ পদবির লোক এবং অন্যেরা উত্তরের দিকে চলে যান। সেখানেও একটি গ্রামের নাম হল মলয়া (উস্থি থানা, সাবেক জে-এল-নং ১৪৩)। আছে একটি ঘোষপাড়াও পার্শ্ববর্তী একতারা মৌজাগ্রামে (সাবেক জে-এল-নং ১৪৫)। এই একতারা কী অতীতে একতাকক্ষের অন্তর্ভূক্ত থাকার ইঙ্গিত? আমরা জানি না। যাইহোক, ব্রিটিশ কালে নীলের বাজার মন্দা হলে স্মিথ সাহেব নীলেরাট, মলয়া-মধুসূদনপুরের জমিদারী ত্যাগ করেন এবং আনুমানিক ১৮৮৫-৮৬ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ এই জঙ্গলাকীর্ণ বাদাভূমি ইংরেজ কালেক্টরের থেকে ইজারা নেন জনৈক ধনাঢ্য মধুসূদন মণ্ডল। তাঁর নামানুসারে গ্রামের নাম হয় মধুসূদনপুর। এই মৌজার দক্ষিণ ও পূর্ব প্রান্ত দিয়ে শুরু হয়েছে একটি বিশাল দীঘি। এই দীঘিটি পার্শ্ববর্তী দক্ষিণ গঙ্গাধরপুর মৌজা (সাবেক জে-এল-নং ১০২, হাল ০৫) গ্রামের মধ্যে প্রসারিত। এই বিশাল পুষ্করিণীর পোষাকী নাম ‘মলয়ার দীঘি’। স্মিথ সাহেব এই দীঘির পাড়ে তাঁর নীলকুঠি বেঁধেছিলেন। বহুদিন সেই কুটিরের অস্তিত্ব ছিল। পাশেই ছিল তাঁর ঘোড়ার আস্তাবল। গ্রামের লোকেরা বলতো পিলখানা। মধুসূদনবাবুও এই আস্তাবলের সন্নিকটে তাঁর কাছারি বাড়ি স্থাপন করেছিলেন। এই গ্রামের আটেশ্বরের থান সংলগ্ন ভূমি প্রত্নতত্ত্বের দিক দিয়ে খুব তাৎপর্যপূর্ণ। এককালের বিশাল দীঘিটির মলয় গ্রামের মধ্যের অংশটি পলি জমে বাদার সঙ্গে মিশে যায়। অবশিষ্ট অংশটি পূর্বোল্লিখিত দক্ষিণ গঙ্গাধরপুর গ্রামের মধ্যে সাতটি খণ্ডে বিভক্ত হয়ে এখানো মোট প্রায় ৩৪ বিঘা পাড়সহ জলাশয় রূপে অবশিষ্ট রয়েছে। সর্বাপেক্ষা বড় খণ্ডটি জেলা পরিষদের অধীনস্থ; কিন্তু অবশিষ্ট ছয়টি জলাশয় খণ্ড ব্যক্তি মালিকানায় রয়েছে। ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দের একটি তথ্য থেকে জানা যায়, সে-সময় এই জলাশয়ের জলকর প্রায় ৪৩ বিঘা ছিল। দক্ষিণ গঙ্গাধরপুর মৌজায় সর্বোত্তম প্রত্নসমৃদ্ধ গ্রাম হল দুর্গানগর, তেলটুকারি এবং পাইকপাড়া। একটি মাউন্ড এবং সেখানকার প্রত্নাবশেষ দেখে মনে হয়েছিল হয়তো শেষ মধ্যযুগের দুর্গনগর থেকে দুর্গানগর নামকরণ ঘটেছে। এই দুর্গনগরের পরিখাখাত দক্ষিণ সীমান্তে এবং মধুসূদনপুরের লাগোয়া দক্ষিণে ভাজনা গ্রামের (সাবেক জে-এল-নং ১০৩ এবং হাল ০৬) পশ্চিমপ্রান্ত পর্যন্ত প্রসারিত। ভাজনার উত্তর-পশ্চিমে একটি গ্রামের নাম দুর্গানগর, যেটিকে সাধারণভাবে ভাজনা দুর্গানগর নামে উল্লেখ করা হয়। এখান থেকে আরো একটু পশ্চিমে কুল্পি থানায় একটি দুর্গানগর রয়েছে (সাবেক জে-এল-নং ১৮৫), যেগুলি এককালের একটি পরিখা বেষ্টিত দুর্গ-নগরের মধ্যেই ছিল বলে মনে হয়। আবার ভাজনা গ্রাম স্থানিকভাবে মলয়া-মধুসূদনপুরের মতো ‘নাকালি ভাজনা’ নামে ডাকা হয়। নাকালি নামের একটি গ্রাম (সাবেক জে-এল-নং ২৫৫) ভাজনার সন্নিকটে রয়েছে, সেটি কুল্পি ব্লকের অন্তর্ভুক্ত। এটিও একটি সমৃদ্ধ প্রত্নস্থল। এখান থেকে পোড়ামাটির কিছু প্রত্নবস্তুর সঙ্গে একটি প্রস্তরের বিষ্ণুমূর্তি পাওয়া গিয়েছে বলে খবর ছড়ায় (১৯৮০―৮১ খ্রি.)। কিন্তু সেটি এখন কোথায় রয়েছে আমাদের জানা নেই। কুল্পি ব্লকের নাকালি সংলগ্ন আর একটি গ্রামের নাম শিমুলবেড়িয়া (জে-এল-নং ২৫৬)। এখানে একটি পরিখা বেষ্টিত গড়ের ধ্বংসস্তূপ রয়েছে। ভাজনার সবথেকে উল্লেখযোগ্য মেলা হল গোরাচাঁদের মেলা। হজরত আব্বাস আলি রাজি ওরফে গোরাচাঁদ ভাজনা-দুর্গানগরের নিকটবর্তী বানাই-এর তীরে আকানন্দ-বাকানন্দের সঙ্গে যুদ্ধে গুরুতর আহত হয়ে শেষ পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করতে হয়েছিল। এখান থেকে বহুকাল আগে পাওয়া গিয়েছিল একটি ক্ষতিগ্রস্থ হরিহর মূর্তি। স্থানীয় কোনো গৃহে সেটি এখন সংরক্ষিত। শিমুলবেড়িয়ার উত্তরে বিস্তৃত ভূমিভাগের নাম ছিল কাটুলিয়া। কিন্তু এখানে একাধিক ব্যক্তি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি থেকে ইজারা নেওয়ার ফলে তাদের নামে গ্রামগুলি নামিত হয়। কিন্তু জনৈক কৃষ্ণরাম বেজের গৃহীত একটি গ্রাম কাটুলিয়া সংযুক্ত রয়েছে। গ্রামটির নাম কাটুলিয়া-কৃষ্ণরামপুর (জে-এল-নং ২৪৫)। যদিও তাঁর নিজের নামেও একটি গ্রাম রয়েছে (জে-এল-নং ২৪৮)। কাটুলিয়া গ্রামের উত্তরে বেলুনী গ্রাম। এটি একটি প্রত্নসমৃদ্ধ গ্রাম। এর ভূ-নিম্নে ইটের প্রাকার ও ঘর-দালান লক্ষ্য করা যায়। জনশ্রুতি হল এখানে গোরাচাঁদের হাতে মহিদানন্দের জ্যেষ্ঠ পুত্রের মৃত্যু হয়। ভাজনা গ্রামের দক্ষিণে রয়েছে ১৬ নং লটের শ্রীনারায়ণপুর (সাবেক জে-এল-নং ১০৫, হাল ০৮)। জনৈক শ্রীনারায়ণ চক্রবর্তী ১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ ইজারাদার উপেন্দ্রকুমার বোসের নিকট থেকে স্বত্ব কিনে নিয়ে আবাদি পত্তনের কারণে মৌজানাম শ্রীনারায়ণপুর হয়। এই গ্রামের মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে পানপুকুরিয়া বা পানিপুকুরিয়া নদী। এই নদীর উত্তর তীরে একটি বিশাল গড় সমৃদ্ধ নগরের ধ্বংসাবশেষ রয়েছে। স্থানীয় নাম পাণ্ডুলী বাড়ির ঢিবি। কয়েকটি প্রাচীন আদিগঙ্গার অববাহিকা মানচিত্রে এটি হাতিয়াগড় নামে উল্লেখিত। বিপুল আকারের পরিখা বেষ্টিত গড়, রাজপ্রাসাদ, মন্দিরের অবশেষ এখানে রয়েছে। বিশাল আকারের শিবলিঙ্গ, বুদ্ধ, বিষ্ণু প্রভৃতি ভাস্কর্য এখান থেকে পাওয়া গেছে। সিল সিলিং এবং ‘শ্রী স্নাগ’ লেখ উৎকীর্ণ একটি পোড়ামাটির ভাঙা ব্লকও পাওয়া গেছে। কিন্তু আদিগঙ্গা নদীপথের আবিষ্কর্তা কালিদাস দত্ত মহাশয় প্রাচীন মানচিত্রে শ্রীনারায়ণপুরের সরাসরি পশ্চিমে পাথরপ্রতিমা ব্লকের সীমানা পেরিয়ে কুল্পি ব্লকের অন্তর্গত ১০ নং লট রামরতনপুর (সাবেক জে-এল-নং ১২) এবং নেবুতলা (সাবেক জে-এল-নং ১৩) অঞ্চলকে প্রাচীন হাতিয়াগড়রূপে নির্দেশ করতে চেয়েছেন। নির্মলেন্দু মুখার্জীও এই মত পোষণ করতেন। তিনি এখান থেকে বেলেপাথরের একটি বুদ্ধমূর্তি সহ অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নবস্তু সংগ্রহ করেন। নিশ্চিতভাবে এটি হাতিয়াগড়ের অন্তর্গত; কিন্তু এখানে মধ্যযুগের বিখ্যাত হাতিয়াগড়ের গড় ছিল না। প্রত্নতত্ত্বের নিরিখে এটি অতি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। নেবুতলা মৌজার পাকুড়তলা এবং তৎসংলগ্ন অঞ্চল থেকে আদি-ঐতিহাসিককালের বিপুল প্রত্নসম্ভার উদ্ধার হয়েছে। উত্তরের কৃষ্ণচিক্কন মৃৎপাত্র (NBPW), কাস্ট কয়েন, অ্যামফোরা, উপরত্নের পুঁতি, যক্ষিণী থেকে আরম্ভ করে আদিমধ্যযুগের গণেশ, বিষ্ণু প্রভৃতি ভাস্কর্য আবিষ্কৃত হয়েছে। এই সমুদয় প্রত্নবস্তু গঙ্গারিডি গবেষণা কেন্দ্রের সংগ্রহশালায় রক্ষিত ছিল। পাকুড়তলার পূর্ব দিকে কাকদ্বীপ ব্লকের অন্তর্গত বাঁশতলা নদীর পশ্চিম পার্শ্বে চণ্ডীপুরে (জে-এল-নং ১৪) কিন্তু একটি গড়ের ধ্বংসস্তূপ রয়েছে। এই গ্রাম থেকে শক্তিমুখলিঙ্গ সহ গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নবস্তু প্রাপ্তির সংবাদ রয়েছে।
মলয়ার পশ্চিম দিকে বর্তমান বানাইনদী পেরিয়ে পশ্চিম-দক্ষিণে কুল্পি থানার পূর্বোল্লিখিত কাঁটাবুনিয়া (সাবেক জে-এল-নং ২৩২) বা কাঁটাবেনিয়া বা কন্টকবেনি গ্রাম। তার পূর্ব-দক্ষিণ সংলগ্ন একটি গ্রাম বামনপাড়া (সাবেক জে-এল-নং ২৩১)। আমাদের প্রবন্ধের প্রেক্ষিতে মলয়ের পশ্চিম দিকের এমন গ্রামের অবস্থিতি বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। মলয়ার লাগোয়া পশ্চিমপার্শ্বস্থ গ্রামের নাম রামদেবপুর (সাবেক জে-এল-নং ৯৮, হাল ০১)। এই গ্রামের পশ্চিমদিক দিয়ে কুল্পি ব্লক শুরু এবং উত্তর-পূর্বদিক দিয়ে মথুরাপুর ১ নং এবং পূর্বপার্শ্ববর্তী মথুরাপুর ২-নং ব্লক শুরু। সুন্দরবনের ইতিহাসের দৃষ্টিকোণে রামদেবপুর অবস্থানের দিক দিয়ে খুব উল্লেখযোগ্য গ্রাম। এই গ্রামের উত্তরে রয়েছে কন্দর্পপুর (সাবেক জে-এল-নং ৯৭), কন্দর্পপুরের পূর্বে কিসমত সারসবেড়িয়া (সাবেক জে-এল-নং ৯৬), সারসবেড়িয়ার উত্তর অদূরে ব্রহ্মপুর গ্রাম (সাবেক জে-এল-নং ৮০) ঢোলাহাটের নিকটবর্তী এই বিশাল মৌজাগ্রামে একটি গ্রাম বা পাড়া দূরঅস্ত একটি পরিবারও বাস করে না। এককালে এটি বিস্তৃত একটি ক্ষেত্রভূমি ছিল বলে মনে হয়। ব্রহ্মপুরের পশ্চিমে পূর্বোল্লেখিত বেলুনী গ্রাম। কিসমত সারসবেড়িয়া গ্রামের লাগোয়া দক্ষিণপূর্বে রয়েছে সারসবেড়িয়া গ্রাম (সাবেক জে,এল,নং ৯৫)। সারসবেড়িয়ার লাগোয়া দক্ষিণে এবং দক্ষিণ গঙ্গাধরপুরপুরের পূর্বে আমিরপুর সাবেক জে-এল-নং ১১২ অবস্থিত। কিসমত সারসবেড়িয়ার পূর্বে ভগবানপুর (জে-এল-নং ৯৫) এবং তার দক্ষিণ-পূর্বে পয়লা ভগবানপুর (সাবেক জে-এল-নং ১১৩) অবস্থিত। পূর্বোল্লিখিত আমিরপুরের অদূরবর্তী দক্ষিণে ঘাটবকুলতলা এবং বকুলতলা-দীঘিরপাড় গ্রাম, এই সেই গ্রাম যেখান থেকে মহারাজ লক্ষ্মণসেনদেবের সুন্দরবন তাম্রশাসন পাওয়া গিয়েছিল। উক্ত তাম্রশাসন দ্বারা দানকৃত গ্রামের পশ্চিমে শান্ত্যাগারিক রামদেব শাসনের পূর্ব পার্শ্বসীমা ছিল। সেন আমলে এই রামদেব শাসন আদিগঙ্গার পশ্চিম দিকে বিস্তৃত ছিল। কিন্তু আদি গঙ্গার পূর্বদিকের ঘাট সংলগ্ন (ঘাটবকুলতলা) ভূমিও রামদেব শাসনের অন্তর্ভুক্ত ছিল বলে লক্ষ্মণসেনের বকুলতলা তাম্রশাসন থেকে জানা যায়।
হাতিয়াগড়ের মধ্য দিয়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলের একটি সড়কের বিবরণ দেওয়া জরুরি। রাস্তাটা শুরু হয়েছিল কাঁটাবেনিয়ার পূর্বপার্শ্ব দিয়ে। অনেকগুলো নদীর পাড় ঘুরে ঘুরে এবং প্রয়োজনে কোথাও বাঁধ বা সেতু নির্মাণ করে বহুকাল আগে এই রাস্তাটি শুরু হয়েছিল। স্থানে স্থানে গাঙের ধারে ধারে এই প্রাচীন রাস্তার ধ্বংসাবশেষও নজরে আসে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাণিজ্য ও নতুন করে আবাদি পত্তনের কারণে জঙ্গলে ঢাকা ও ধ্বংস হয়ে যাওয়া রাস্তাটিকে সংস্কার করেন। তখন এই সড়কের নাম হয় কোম্পানির রাস্তা বা কোম্পানির বাঁধ। এটি নাকালি ভাজনা গোরাচাঁদের মেলার মাঠ হয়ে শিমুলবেড়িয়া, উত্তরে কাটুলিয়া, ঢোলার কাছে বেলুনী ব্রহ্মপুর মৌজার পাশ দিয়ে দক্ষিণে নেমে এসে রামদেবপুর, মলয়া নীলেরাট হয়ে একটি পথ মেহেরপুর মৌজার মধ্য দিয়ে এবং আর একটি সড়ক সরাসরি মথুরাপুর ব্লকের অপর দিয়ে সারসবেড়িয়া, তার নিচে আমিরপুর হয়ে আবার উত্তর-পূর্বমুখী হয়ে পিঁপড়েখালির প্রান্ত দিয়ে ঘাটবকুলতলা, দীঘিরপাড়, বকুলতলা হয়ে প্রাচীন দ্বারির জাঙ্গাল বা পিলগ্রিম রাস্তাকে সংযুক্ত করে রায়দীঘি ব্লকের কম্পানির ঠেকে শেষ হয়েছিল। অপরদিকে মেহেরপুর মৌজার দিকের সড়কটি গোবোধিয়া নদীর উপর দিয়ে গদামথুরা দিয়ে ঢোলা কিংবা রায়পুর দিয়ে কোম্পানির ঠেকে উঠতো। প্রাচীনকালে এই রাস্তার নিচ দিয়ে বহু স্থানে জলপথ থাকতো। এখনো এই জলপথগুলিকে ‘যান’ বলে। বাঁধ বা যানের উপর দিয়ে নির্মিত এই সড়ককে ‘যানক’ বলা হতো। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সময় হাতিয়াগড় অঞ্চলে তাঁরা গড়ে তুলেছিলেন নীল নিষ্কাশনের বাণিজ্যিক কেন্দ্র, লবন বা সল্ট কারখানা, ইট তৈরির কারখানা বা পগমিল এবং আরো এই ধরনের ব্যাবসা। ছত্রভোগ, কাটানদীঘি কম্পানির ঠেক, মলয়া-মধুসূদনপুর নীলেরাট যেমন ছিল সেকালের নামকরা নীল বাণিজ্যকেন্দ্র, তেমনি মেহেরপুরে এককালে তৈরি হয়েছিল কোম্পানির একটি সল্টফার্ম। আর একটি তথ্য এখানে জানিয়ে রাখা ভালো। এখনোও হাতিয়াগড়ের মলয়া-মধুসূদনপুর অঞ্চলে ব্যাপকভাবে মাঠকে মাঠ সরিষার চাষ হয়।
চলুন এবার জয়নাগের তাম্রশাসনের চৌহদ্দির সঙ্গে উপরোক্ত ক্ষেত্রগত সমীক্ষার সাদৃশ্য পাওয়া যায় কিনা দেখা যাক। বপ্পঘোষবাটের উত্তর দিক দিয়ে চলে গিয়েছিল একটি গঙ্গিনিকা। গঙ্গিনিকার অর্থ গঙ্গানদী থেকে উদ্ভূত ছোট নদী। যাকে আমরা আঞ্চলিক ভাষায় আজ গাঙ্গ্ বা গাঙ্ বলি। আজকের মলয়া-মধুসূদনপুরের উত্তর মাথা দিয়ে আদিগঙ্গা থেকে উদ্ভূত বানাই নদী পশ্চিমমুখী বাহিত হয়ে আবার দক্ষিণমুখী হয়েছে, সেটিই ছিল উক্ত তাম্রশাসনে উল্লেখিত উত্তরসীমার গঙ্গিনিকা। বপ্পঘোষবাটের পূর্বেও ছিল গঙ্গিনিকা। সেটি আমাদের পূর্বালোচিত গোবোধিয়া গাঙ্গ্। প্রাচীন আদিগঙ্গার এই শাখানদীর তীরে এক পৌরাণিক রাজা গোমেধ যজ্ঞ করেছিলেন বলে কিংবদন্তি রয়েছে। তাই এই নদীর নাম গোবধিয়া। প্রচলিত নাম গোবদিয়া। ইতি পূর্বে বলা হয়েছে এটি আদিগঙ্গার শাখা এবং একদা আদিগঙ্গার প্রাচীন প্রবাহপথ। তাহলে লেখা যাচ্ছে এই অঞ্চল আদিগঙ্গার পশ্চিমদিকে অবস্থিত। সুতরাং এটি পৌন্ড্রবর্ধনভুক্তির অন্তর্গত নয়। হয় বর্ধমানভুক্তি কিংবা দণ্ডভুক্তির অন্তর্ভুক্ত থাকা ছিল অবশ্যম্ভাবী। দানকৃত গ্রামের দক্ষিণে ছিল ভরণীস্বামীর ক্ষেত্রসীমা। আজকের মলয়ার দক্ষিণে নীলেরাট, তার দক্ষিণে মধুসূদনপুর এবং তার দক্ষিণে ভাজনা। দানকৃত ভূমি অনুযায়ী এই ভাজনা হল ভরণীস্বামীর ক্ষেত্রসীমা। এখান থেকে শুরু ভরণীস্বামীর শাসনের উত্তর সীমা এবং শেষ দক্ষিণপ্রান্তের ঘৃতবতী-কালনাগিনী নদীরেখায়। দানকৃত ভূমির পশ্চিম সীমায় ছিল কুটকুট কিংবা কুক্কুট গ্রাম, যে গ্রামে ইতিপূর্বে জনৈক ব্রাহ্মণকে দান করা হয়েছিল কিংবা ব্রাহ্মণেরা বাস করছেন। মলয়ার পশ্চিমে রামদেবপুর। এটি লক্ষণসেনের রাজত্বকালে সুন্দরবন তাম্রশাসন দ্বারা দানকৃত গ্রামের পশ্চিমসীমায় রামদেবের শাসনের পশ্চিমসীমা হতে পারে। তাঁর পূর্বপুরুষরা লক্ষ্মণসেনের বহু পূর্ব থেকে রাজার কাছ থেকে ভূমি পেয়ে নিম্নাঞ্চলে শান্ত্যাগারিকের কার্য করতে পারেন। যাইহোক, রামদেবপুরের উত্তর-পশ্চিম ঘেঁসে রয়েছে কন্দর্পপুর (সাবেক জে-এল-নং ৯৭)। এই দুই গ্রামের দক্ষিণে বিস্তীর্ণ ভূমির নাম ছিল কাটুলিয়া। সেই স্মৃতি রয়েছে একটি মৌজাগ্রামের নামে, কাটুলিয়া কৃষ্ণরামপুর (সাবেক জে-এল-নং ২৪৫)। এই কাটুলিয়া দানকৃত ভূমির পশ্চিমদিকের ক্ষেত্রসীমা কুক্কুট বা কুটকুট হতে পারে। এছাড়া আরো পশ্চিমে কাঁটাবেনিয়া গ্রামও প্রাচীন কুটকুট গ্রামের স্মৃতিবাহী হতে পারে। এই গ্রামের পূর্বদিকে রয়েছে বামুনপাড়া বা ব্রাহ্মণপাড়া, যা তাম্রশাসনোক্ত ব্রাহ্মণ বসতির স্মৃতিচিহ্ন হতে পারে। বপ্পঘোষবাটের সীমান্তে ভখট সুমালিকার পুষ্করিণী নামে একটি জলাশয়ের উল্লেখ করা হয়েছে। ইতিপূর্বে আলোচিত মধুসূদনপুরের দক্ষিণ প্রান্ত থেকে দক্ষিণ গঙ্গাধরপুরের মধ্যের বিশাল জলাশয়, যেটি মলয়ার দীঘি নামে পরিচিত, সেটিই ছিল দানকৃত বপ্পঘোষবাটের পূর্ব-দক্ষিণদিকের জলাশয়। সুমালিকা > সুমলয় > মলয় কিংবা সুমালিকা > মালিকা > মলয়; এইভাবে আজকের মলয় বা মলয়া গ্রামনামের ব্যুৎপত্তি ঘটতে পারে। ভখট সুমালিকার পুষ্করিণী ভট্ট উন্মীলন স্বামীর ক্ষেত্র-সীমার মধ্যে অবস্থিত ছিল। এই মৌজার অন্তর্গত দুর্গানগরের একটি ঢিবিকে লোকে বলতো বামুনবাড়ি। এটি ভট্টের স্মৃতিবাহী হতে পারে। ভখট সুমালিকার নিজস্ব ক্ষেত্রও বোধহয় বপ্পঘোষবাটের উত্তরপূর্বে ছিল। মলয়ার উত্তর-পূর্ব থেকে ভগবানপুর (সাবেক জে-এল-নং ৯৪) পয়লা ভগবানপুর (জে-এল-নং ১১৩), আবাদ-ভগবানপুর (জে-এল-নং ৭৯), চক ভগবানপুর (জে-এল-নং ৭৮), নামগুলি ভখট থেকে ব্যুৎপত্তি লাভ করতে পারে। দানকৃত গ্রামের চৌহদ্দি ও চারিদিকের রাস্তার বিবরণ থেকে ধারণা হয়, বপ্পঘোষবাটের পূর্বদিকে ছিল আমলপৌতিকা গ্রাম। যেটি আজকের মলয়া ও দক্ষিণ গঙ্গাধরপুরের লাগোয়া পূর্বদিগস্থ গ্রাম আমিরপুর হতে পারে। গ্রামগুলির চৌহদ্দি থেকে ধারণা হয়, বপ্পঘোষবাট গ্রাম যেটি, ব্রহ্মবীর স্বামী নামক এক ব্রাহ্মণকে দান করা হয়েছিল, সেটির অবস্থান ছিল মলয়া-মধুসূদনপুরের মধ্যেই। ইতি পূর্বে এখানে একটি গোপপুর বা ঘোষপাড়া থাকার তথ্য প্রদান করেছি। কিন্তু অনুমান হয়, প্রদত্ত গ্রামের উত্তরসীমা আরো উত্তরে বিস্তৃত ছিল। মলয়ার উত্তরে আবাদ-ভগবানপুরের উত্তর-পশ্চিম লাগোয়া ব্রহ্মপুর (সাবেক জে-এল-নং ৮০) নামে একটি মৌজা-গ্রাম রয়েছে। নামেই গ্রাম। আসলে এটি একটি জনশূন্য ধূ ধূ বিস্তৃত ‘তেপান্তরের মাঠ’। গ্রাম বৃদ্ধরা বলতেন ‘বাপুর বাদা’। এই বাপু বপ্পঘোষ থেকে আসতে পারে। এখান থেকে সমীক্ষার সময় ইটের যজ্ঞবেদির অবশেষ লক্ষ্য করেছি। পোড়ামাটির ভৃঙ্গার, প্রদীপ, তৈজস পত্র সহ বেশ কিছু প্রত্নসম্ভার এখান থেকে উদ্ধার হয়েছে। এই ব্রহ্মপুর বানাই-এর খাতের ঠিক দক্ষিণে অবস্থিত। এই গ্রাম ব্রহ্মবীর স্বামীর স্মৃতিবাহী হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা। এই গ্রামের মধ্য দিয়ে বয়ে গিয়েছিল সর্ষপ-যানক নামে একটি পথ। খাড়ি-খন্দ-যানের উপর দিয়ে নির্মিত পথ তাই যানক। এই যানক দিয়ে সেকালে এখানকার ক্ষেতগুলিতে ব্যাপকভাবে উৎপন্ন সরিষা বাহিত হতো। তাই ‘সর্ষপ-যানক’। এই পথটি যে এখনো রয়েছে এবং কোম্পানির আমলে এটির যে সংস্কার করা হয়েছিল, ইতিপূর্বে আমরা তা আলোচনা করেছি। মলয়ার উত্তর-পূর্বে এবং আমিরপুরের উত্তরে কিসমত সারসবেড়িয়া (সাবেক জে-এল-নং ৯৬), সারসবেড়িয়া (সাবেক জে-এল-নং ৯৫), উত্তর সারসবেড়িয়া (সাবেক জে-এল-নং ৯২) গ্রামগুলির উপর এই পথের সুস্পষ্ট সাক্ষ্য রয়েছে। এই সারসবেড়িয়া গ্রামবৃদ্ধ-বৃদ্ধারা উচ্চারণ করেন সরসবেড়ে। অনুমান হয় সর্ষপ > সরিষা > সরসবেড়ে থেকে সেনসাস হ্যান্ডবুকে সারসবেড়িয়া লিখিত হয়েছে। এই সর্ষপ-যানক শেষ পর্যন্ত আমলপৌতিকার পশ্চিম প্রান্ত থেকে নেমে এসে ভখট সুমালিকার পুকুরের পাশ দিয়ে কুটকুট বা কক্কুট গ্রামের দিকে চলে গিয়েছিল। এখানেও উত্তরের ব্রহ্মপুর থেকে নেমে এসে আমিরপুরের পাশ দিয়ে ভাজনা (ভরণীস্বামীর ক্ষেত্রসীমা) দিয়ে পশ্চিমে কাটুলিয়া (কুটকুট / কুক্কুট গ্রাম) হয়ে কাঁটাবেনিয়ার দিকে চলে গিয়েছে।
পাঠক মাত্রেই লক্ষ্য করেছেন, শশাঙ্কের সমসময়ে যেসব তাম্রশাসন প্রদত্ত হয়েছে এবং জয়নাগ প্রচারিত তাম্রশাসন দ্বারা যে সকল ব্রাহ্মণদের গ্রাম ও ভূমি দান করা হয়েছে, তাঁদের প্রায় সবার পদবি বা বিশেষণ হল ‘স্বামী’। পূর্বের আলোচনায় শশাঙ্কের সময়ের তাম্রশাসনে উৎকীর্ণ ব্রাহ্মণের নামগুলি দেখলে এই বক্তব্যের সুস্পষ্টতা বোঝা যাবে। আরো কিছু উদাহরণ নেওয়া যাক—ষষ্ঠ শতকের বিজয়সেনের মল্লসারুল শাসন দ্বারা ভূমি পেয়েছেন বৎসস্বামী। গোপচন্দ্র ভূমি দান করেছেন বারকমণ্ডলে ভট্টগোমীদত্ত স্বামীকে। ধর্মাদিত্য তাঁর, তাম্রশাসণগুলি দ্বারা ভূমি প্রদান করেছেন ব্রাহ্মণ চন্দ্রস্বামী, বসুদেব স্বামী ইত্যাদি। সমাচারদেবের ঘুগ্রাহাটি তাম্রশাসন দ্বারা ভূমি দান করা হয়েছে সুপ্রতীক স্বামী নামক ব্রাহ্মণদের। শুধু তাই নয় এই সমুদয় তাম্রশাসন থেকে যে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে তা থেকে জানা যাচ্ছে যে, এই ব্রাহ্মণদের পূর্বে এই সব অঞ্চলে অনেক ব্রাহ্মণ বাস করছেন এবং তাঁদের প্রায় সবার পদবি স্বামী। জয়নাগের তাম্রশাসন থেকে একথা স্পষ্ট হবে। কিন্তু পরবর্তী সময়ের রাজারা যে ব্রাহ্মণদের গ্রামদান করেছেন তাঁদের প্রায় সবার পদবি শর্মণ বা দেবশর্মণ। কিন্তু এখন প্রশ্ন এই স্বামী পদবি বিশিষ্ট ব্রাহ্মণগণ কি উদ্দেশ্যে বিপুলভাবে জমি দান হিসাবে পেতেন? তাঁরা নিজে কৃষিকাজ করতেন না। জমির রাজস্ব দিতে হতো না। কিন্তু জমির মালিক হয়ে অন্যকে দিয়ে জমি চাষ করাতে পারতেন কিংবা শুল্ক নিয়ে অন্যকে জমি ইজারা দিতে পারতেন। এর পরিবর্তে তাঁরা রাজা ও প্রজার শুভার্থে বেদোক্ত ধর্মাচারণ করতেন। বৈদিক ধর্মশাস্ত্র থেকে যে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে তা থেকে জানা যায়, দৈনিক পঞ্চমহাযজ্ঞ নিষ্পন্ন করতেন এই সমস্ত ব্রাহ্মণগণ এবং এইভাবে রাজার সহায়ে বৈদিক ব্রাহ্মণ্য সমাজ গঠনে ভূমিকা গ্রহণ করতেন। জয়নাগের তাম্রশাসন থেকে আমরা সুস্পষ্ট ধারণা করতে পারি যে, ষষ্ঠ সপ্তম শতকের পূর্বেই সুন্দরবনে গঙ্গাসাগর সন্নিহিত আদিগঙ্গার পশ্চিমদিগস্থ হাতিয়াগড় অঞ্চলে অগ্রহার প্রথার মাধ্যমে বৈদিক ধর্মাচারণের দ্বারা পুরোদস্তুর ব্রাহ্মণ্য সমাজ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। এই অঞ্চল থেকে আবিষ্কৃত যজ্ঞবেদী, বিপুল সংখ্যায় বিষ্ণুমূর্তি, হরিহরমূর্তি, সূর্যমূর্তি, ভাগবতীয় পদবেদিকা, শিবলিঙ্গ, মুখলিঙ্গ, মহিষমর্দিনী, গণেশ, নটরাজ প্রভৃতি ভাস্কর্য সেই সাক্ষ্য প্রদান করে। এই সঙ্গে জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মও খুব একটা পিছিয়ে ছিল না, তা ও প্রত্নসাক্ষ্য থেকে বলা যায়।
স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে গুপ্ত ও গুপ্ত পরবর্তী কেমন ছিল এই উপকূলীয় দেশের বর্ণাশ্রম প্রথা? প্রাগার্য-অবৈদিক জনগোষ্ঠীর সঙ্গে ব্রাহ্মণ্য গোষ্ঠীর অহরহ জীবনচর্চা। অন্তঃপুরের গৃহস্থালীর কাজে ও পারিবারিক উপাসনা গৃহ্যযজ্ঞে তাদের যোগদান না থাকলে ব্রাহ্মণকুলের আদৌ জীবন চলে না; কামনা বাসনা চুলোয় যায়, পঞ্চরিপু সমস্যা তৈরি করে, ধর্মীয় বৈবাহিক সম্পর্কও না পাতালে বংশবৃদ্ধি হয় না, ব্রাহ্মণ্য পরম্পরা স্তব্ধ হয়। এমতাবস্থায় জন্ম নিল মিশ্র জনগোষ্ঠীর দেশীয় বৈদিক ধর্ম ও বিচিত্র দেশাচার। ব্রাহ্মণ্য অগ্রহার প্রথা সংস্কৃতির বৈচিত্র্যের এক বিপুল ভূমিকা নিয়েছিল প্রান্তীয় দেশে। সুন্দরবন থেকে প্রাপ্ত জয়নাগের তাম্রশাসন পরবর্তী সামাজিক ইতিহাসের একটি দিকনির্ণয় হতে পারে বলে আমাদের মনে হয়।
টীকা
- ১.দ্র. L. D. Barnett, ‘Vappaghoshavata Grant of Jayanaga’, ‘Epigraphia Indica’, Vol. XVIII, 1925–26, reprint 1983, H. Krishna Sastri & Hirananda Sastri (editors), Archaeological Survey of India, pp. 60–64.
- ২.দ্র. R. D. Banerji, ‘A Note on the Vappaghoshavata Grant of Jayanaga’, ‘Epigraphia Indica’, Vol. XIX, 1927–28, reprint 1983, Hirananda Sastri (editor), Calcutta: Manager, Government of India Central Publication Branch, pp. 286–287.
- ৩.দ্র. তদেব।
- ৪.দ্র. দেবীশঙ্কর মিদ্যা, ‘জটার দেউল: লোককথা ও প্রত্নতত্ত্ব’, প্যারালাল, ২০২২, পৃ. ৫৪।
- ৫.দ্র. W. W. Hunter (William Wilson Hunter), ‘A Statistical Account of Bengal’, Vol. I: Districts of the 24 Parganas and Sundarbans, London: Trübner & Co., 1875, p. 88.
- ৬.দ্র. B. M. Morrison, ‘Political Centers and Cultural Regions in Early Bengal’, University of Arizona Press, 1970, p. 160.
- ৭.দ্র. তথ্যসূত্র ১। দ্র. N. K. Bhattasali, ‘Antiquity of the Lower Ganges and Its Courses’, ‘Science and Culture’, Vol. VII, No. 5, November 1941, pp. 233–239.
- ৮.দ্র. দীনেশচন্দ্র সরকার, ‘শিলালেখ-তাম্রশাসনাদির প্রসঙ্গ’, কলকাতা: সাহিত্যলোক, নতুন সংস্করণ, মার্চ ২০০৯, পৃ. ৫৩।
- ৯.দ্র. রমেশচন্দ্র মজুমদার, ‘বাংলাদেশের ইতিহাস’, ১ম খণ্ড, কলকাতা: জেনারেল প্রিন্টার্স অ্যান্ড পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, ১৯৮১, পৃ. ৪৮।
- ১০.দ্র. তদেব, পৃ. ৬৩–৬৫।
- ১১.দ্র. B. C. Sen, ‘Some Unsolved Geographical Problems’, ‘Some Historical Aspects of the Inscriptions of Bengal Pre-Mahammadan Epochs’, Calcutta, 1942, p. 145.
- ১২.দ্র. Rajat Sanyal, ‘Copperplate Inscriptions of West Bengal: Finding Find-Spots and Locating Localities’, ‘Pratna Samiksha’, New Series, Vol. 1, 2010, p. 115.
- ১৩.দ্র. তদেব, পৃ. ১১৬।
- ১৪.দ্র. দীনেশচন্দ্র সরকার, ‘শশাঙ্কের রাজত্বকালীন মেদিনীপুর তাম্রশাসন’, ‘শিলালেখ ও তাম্রশাসনাদির প্রসঙ্গ’, কলকাতা: সাহিত্যলোক, নতুন সংস্করণ, মার্চ ২০০৯, পৃ. ৬৯।
- ১৫.দ্র. তদেব, পৃ. ৭০–৭৩।
- ১৬.দ্র. তদেব, পৃ. ৭৪।
- ১৭.দ্র. নীহাররঞ্জন রায়, ‘বাঙ্গালীর ইতিহাস: আদি পর্ব’, কলকাতা: দে’জ পাবলিশিং, ১৪২০ বঙ্গাব্দ, ৮ম সংস্করণ, পৃ. ৭০।
- ১৮.দ্র. N. G. Majumdar, ‘Inscriptions of Bengal: Containing Inscriptions of the Candras, the Varmans and the Senas, and Isvaraghosa and Damodara’, Kolkata: Sanskrit Pustak Bhandar, New Edition, 2003.

লেখক
দেবীশঙ্কর মিদ্যা
দক্ষিণ ২৪ পরগনা তথা সুন্দরবন এলাকার লোক-প্রত্নতত্ত্ব নিয়ে গবেষণায় অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছেন দেবীশঙ্কর মিদ্যা। ফলস্বরূপ তাঁর আবিষ্কৃত নতুন নতুন প্রত্নস্থল জেলার ইতিহাসকে করেছে বর্ণময় ও সমৃদ্ধ। উপকূলীয় প্রত্নতত্ত্ব গবেষণায় মথুরাপুর থানার সরবেড়িয়া গ্রামে নিজ বসতবাটীতে গড়ে তোলা বিপুল প্রত্নসামগ্রীতে সমৃদ্ধ তাঁর ‘সুন্দরবন প্রত্নগবেষণা কেন্দ্র ও সংগ্রহশালা’ আজ দেশ-বিদেশের প্রথিতযশা ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের অন্যতম গন্তব্যস্থলে পরিণত হয়েছে। আঞ্চলিক ইতিহাস উদ্ধারে পিয়ালি নদী অববাহিকায় ধোসা ও তিলপি, হুগলী নদী তীরবর্তী দেউলপোতা ও মণি নদীর উপকূলে কঙ্কণদীঘি উৎখননকার্যে সক্রিয় অংশগ্রহণে তিনি প্রাজ্ঞতার যথার্থ পরিচয় রেখেছেন। ইতিমধ্যে তাঁর বহুমূল্যবান অসংখ্য প্রবন্ধ বিভিন্ন সংকলন গ্রন্থ ও পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়ে অনুসন্ধিৎসু মনে বিপুল সাড়া জাগিয়েছে। বহু সেমিনারে তাঁর যুক্তিপূর্ণ উপস্থাপনা ঐতিহাসিক পরিমণ্ডলে প্রভূত প্রশংসিত হয়েছে। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ ‘সুন্দরবনের শক্তিপীঠ ছত্রভোগ’, প্যারালাল প্রেস প্রকাশিত ‘জটার দেউল: প্রত্নতত্ত্ব ও লোককথা’ জেলার বিস্মৃত ইতিহাসের গৌরবময় অধ্যায় উন্মোচন করেছে।
সব কাজ দেখুন →সংখ্যা ১-এর অন্যান্য লেখা
সংখ্যা ১সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়
“কম্পিউটার, ই-মেল এবং ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট হ্যাক করা নিয়ে অনেক আলোচনা হয়। কিন্তু আমরা এখন এমন এক যুগে প্রবেশ করেছি যেখানে মানুষকেও হ্যাক করা সম্ভব।” ‘উই আর বিকামিং হ্যাকেবল অ্যানিমেলস’—হাড়হিম করে দেওয়া এক বাস্তবতার কথা আমাদের বলেছেন হারারি।
সংখ্যা ১গল্পস্বল্প
বোতাম
সবকিছু যখন এক ক্লিকে বদলে যায়, তখন কিছু মানুষ নিঃশব্দে পাহারা দেয় তাদের চিরপুরাতন বিশ্বাস। সুতো আর মায়া দিয়ে পার্বতীদি কী বুনে চলেছেন দিনরাত? কাগজের মতো সহজে ছিঁড়ে যাওয়া সম্পর্কের ভিড়ে, বুকের ভেতরে সামান্য কাপড় বাঁচিয়ে রাখার এক মায়াবী আখ্যান ‘বোতাম’।
সংখ্যা ১পুরাতনী
ওড়িশা প্রজাতন্ত্র—বিংশ শতাব্দীর ইতিবৃত্তের এক বিস্মৃত পৃষ্ঠা: দ্বিতীয় পর্ব
১৮৪৫ সালে লেখা ১৯২৫ সালের এক কাহিনি। এক বিকল্প ইতিহাস। বিদ্রোহের গল্প। এক ভবিষ্যতের উড়িষ্যার গল্প। যে উড়িষ্যা একদিন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীন প্রজাতন্ত্রে পরিণত হবে। কিন্তু সেই স্বাধীনতার পথ মসৃণ নয়; তার ভিতর লুকিয়ে আছে অরণ্যের গভীরে জমে থাকা ক্ষোভ, হারিয়ে যাওয়া স্বাধীনতার স্মৃতি এবং পাহাড়ি মানুষের অদম্য আত্মমর্যাদা। শশীচন্দ্র দত্তের এই কল্প-ভবিষ্যতের কাহিনি যেন উনিশ শতকের ঔপনিবেশিক বাস্তবতার এক প্রতিবিম্ব; স্বাধীনতার স্বপ্ন কীভাবে প্রতিরোধের ভাষা খুঁজে পায়, তার এক রোমাঞ্চকর আখ্যান।
আরও পড়ুন
সংখ্যা ১গবেষণামূলক প্রবন্ধ
তমাল-রহস্য
আমাদের প্রাচীন সাহিত্যে একসময় তমালের ছিল উজ্জ্বল উপস্থিতি—রামায়ণ, মহাভারত থেকে কালিদাস, জয়দেব, শ্রীহর্ষ পর্যন্ত। তার কালো-সবুজ পাতা, সুগন্ধ, কালো রস আর রাধা-কৃষ্ণের লীলার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্মৃতি তমালকে করে তুলেছিল এক বিশেষ পবিত্র বৃক্ষ। অথচ আজ সেই তমালই ঘিরেই ঘনিয়ে উঠেছে এক রহস্য—কোন গাছ ছিল প্রাচীন সাহিত্যের সেই তমাল? সাহিত্য, সংস্কৃত অভিধান, প্রাচীন নিঘণ্টু ও উদ্ভিদবিদ্যার সূত্র মিলিয়ে সেই হারিয়ে-যাওয়া বৃক্ষের খোঁজ করেছে এই লেখা।


