যে ঘরে কেউ ফেরে না

আধুনিক জীবনের ইঁদুরদৌড়ে একে একে হারিয়ে যায় কাজ, সম্পর্ক, বন্ধুত্ব, এমনকি নিজের কাছে ফেরার পথটুকুও। আদিত্যের নিঃসঙ্গ ভাড়াবাড়ি হয়ে ওঠে এক বিপর্যস্ত অন্তর্জগতের প্রতিচ্ছবি।

বাপ্পাদিত্যের প্রতিকৃতি
১২ মিনিট পড়া
শেয়ার করুন
আধুনিক জীবনের ইঁদুরদৌড়ে একে একে হারিয়ে যায় কাজ, সম্পর্ক, বন্ধুত্ব, এমনকি নিজের কাছে ফেরার পথটুকুও।সংখ্যা ১
লেখার আকার
লেখার অবস্থান

রাত তখন কত, আদিত্য জানত না। দেওয়ালে ঝোলানো ঘড়িটা ঠিক কবে থেকে বন্ধ হয়ে পড়ে আছে মনে নেই। তবুও মাঝে মাঝে তার মনে হয়, ঘড়ির কাঁটা দুটো খুব ধীরে ধীরে এগোচ্ছে—এমন একটা সময়ের দিকে যেখানে পৌঁছনোর তার কোনো দায় নেই, তাড়া নেই; যে সময়ের সঙ্গে আদিত্যের কোনও সম্পর্ক নেই।

দু-কামরার ভাড়াবাড়িটায় সে একা থাকে। একটা ঘর শোওয়ার, অন্যটায় টেবিল, চেয়ার, বই আর কয়েকটা কার্টন। কার্টনগুলোর ভিতরে পুরোনো অফিসের কাগজপত্র, বাতিল হয়ে যাওয়া আরও কিছু কাগজপত্র, দুটো কফি মগ, আর কিছু এমন জিনিস—যাদের ফেলে দিতে গেলে মনে হয়, তাদেরও বুঝি কোথাও যাওয়ার কথা ছিল।

আজ সন্ধ্যায় বাড়িওয়ালা ফোন করেছিল। ভাড়া দু-মাস বাকি। আদিত্য ফোনটা ধরেনি। কিছুক্ষণ পরে আবার ফোন এসেছিল। তারপর আবার… আর আসেনি। এই না-আসাটুকুর জন্য তার ভালো লেগেছিল নাকি এই না-আসাটা তাকে স্বস্তি দিয়েছিল! যখন কেউ তাকে ফোন করে না, তখন অন্তত কিছুক্ষণের জন্য মনে হয়, পৃথিবী তার অস্তিত্বের কথা ভুলে গেছে। এটাও কী তার স্বস্তির নাকি ভালো লাগার নাকি অভ্যেস।

শোওয়ার ঘরের জানলার বাইরে একটা কৃষ্ণচূড়া গাছ আছে; গাছটা তার এই বাড়িতে আসার আগেও ছিল, চলে যাওয়ার পরেও থাকবে। যখন নীলা এই বাড়িতে থাকত, তখন গাছটায় ফুল ফুটলে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলত। আদিত্য কখনও গাছটার দিকে বিশেষ মন দিয়ে তাকায়নি। অফিসে বেরোনোর সময় ফুলগুলোকে রাস্তার উপর পড়ে থাকা আবর্জনার মতো মনে হতো তার। বৃষ্টির দিনে লাল পাপড়ি জুতোর তলায় লেগে অফিসের মেঝে পর্যন্ত পৌঁছে যেত।

একদিন নীলা বলেছিল, ‘তুমি কোনও কিছুর দিকেই তাকাও না।’

আদিত্য বলেছিল, ‘তাকানোর সময় কোথায়?’

এই কথাটা বলার সময় সে সত্যিই বিশ্বাস করত, সময় নেই। এখন তার হাতে এত সময় যে, মাঝে মাঝে মনে হয়, সময়গুলো ঘরের মধ্যে জমে জমে আসবাব হয়ে গেছে। চেয়ার সরাতে গেলে ঠেকে যায়, বিছানায় শুতে গেলে পিঠে বিঁধে যায়, একটা ঘর থেকে অন্য ঘরে যাওয়ার সময় হোঁচট খায়।

চাকরিটা চলে যাওয়ার পর প্রথম সপ্তাহে আদিত্য প্রতিদিন সকাল সাড়ে সাতটায় উঠে পড়ত। অভ্যাস। ঘুম থেকে উঠে চা, খবরের কাগজ, স্নান, জামাকাপড়, ব্যাগ। তারপর একদিন ব্যাগটা হাতে নিয়ে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বুঝতে পেরেছিল, কোথাও যাওয়ার নেই। সেদিন সে আবার বিছানায় শুয়ে পড়েছিল।

তারপর থেকে সকালগুলো ক্রমশ ছোট হয়ে এসেছে। ঘুম ভাঙে, কিন্তু ওঠা হয় না। মোবাইল স্ক্রিনে চাকরির বিজ্ঞাপন আসে। সে দেখে। কোনও কোনও বিজ্ঞাপনের নিচে লেখা থাকে, We are looking for dynamic candidates. শব্দগুলো পড়লে তার মনে হয়, পৃথিবী বুঝি একদল বিশেষ ধরনের মানুষ খুঁজছে, যাদের কোনও ক্লান্তি নেই, কোনও প্রশ্ন নেই, কোনও না নেই—যারা প্রতিদিন নতুন করে শুরু করতে পারে, যাদের অতীত বলতে আছে শুধু অভিজ্ঞতার তালিকা। তারও সিভিতে অভিজ্ঞতা আছে। এগারো বছরের।

এগারো বছর আগে যে ছেলেটি প্রথম অফিসে ঢুকেছিল, তার একটা নীল ব্যাগ ছিল। ব্যাগের ভিতর ডায়েরি, দুটো কলম। প্রথম মাইনের টাকায় সে মাকে একটা শাড়ি কিনে দিয়েছিল। বাবা তখন বেঁচে। বাবা শাড়িটা দেখে বলেছিল, ‘নিজের জন্য কিছু কিনলি না?’

‘পরে কিনব।’

সে আর পরে কেনেনি।

অফিসের প্রথম বছরগুলোতে তার বন্ধুও হয়েছিল। ক্যান্টিনে একসঙ্গে চা খাওয়া, শুক্রবারে সিনেমা, কারও জন্মদিনে কেক কাটা। তারপর কাজ বেড়েছে। পদোন্নতি হয়েছে। দুপুরের খাবার খেতে খেতে ল্যাপটপে মেল লিখেছে। বন্ধুরা একে একে অন্য অফিসে গেছে, অন্য শহরে গেছে, কেউ বিয়ে করেছে, কেউ ব্যাবসা শুরু করেছে। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার জন্য যে অবসর লাগে, আদিত্যের সেই অবসর ছিল না। অথবা সে ভেবেছিল, অবসর পরে হবে।

একবার পুরোনো বন্ধু সুমন ফোন করে বলেছিল, ‘কী রে, তোর সঙ্গে তো দেখা করাই যায় না, বড্ড বিজি নাকি!’

আদিত্য হেসে বলেছিল, ‘এই প্রজেক্টটা শেষ হোক, তারপর।’

প্রজেক্টটা শেষ হয়েছিল। তার পরে আরেকটা এসেছিল। তারপর আরেকটা। অবসর আর আসেনি। সুমনও আর ফোন করেনি। আদিত্যও…

আজ দুপুরে হঠাৎ আদিত্যের মনে হয়েছিল, সুমনকে ফোন করবে। নম্বরটা এখনও ফোনে আছে। কিন্তু ফোন খুলে নামটা খুঁজতে গিয়ে তার মনে পড়ল, সুমনের মায়ের ক্যান্সারে মারা যাওয়ার সময় সে যেতে পারেনি। সুমন কিছু বলেনি। শুধু পরে একদিন বলেছিল, ‘তুই খুব ব্যস্ত… তাই আর…’

কথাটার মধ্যে কোনও অভিযোগ ছিল না। অভিযোগ থাকলে হয়তো উত্তর দেওয়া যেত।

আদিত্য ফোনটা বন্ধ করে রেখেছিল।

নীলা চলে যাওয়ার দিন কোনও ঝড়বৃষ্টি হয়নি। আকাশ পরিষ্কার ছিল। জানলার পাশে রাখা মানিপ্ল্যান্টের পাতায় ধুলো জমেছিল, আর রান্নাঘরে আগের রাতের বাসন পড়ে ছিল। নীলা একটা ছোটো স্যুটকেসে জামাকাপড় ভরছিল। আদিত্য তখনও বিশ্বাস করছিল, ব্যাপারটা সাময়িক।

‘কোথায় যাচ্ছ?’

‘জানি না… আপাতত মায়ের কাছে।’

‘কত দিনের জন্য?’

নীলা উত্তর দেয়নি।

আদিত্য বলেছিল, ‘আচ্ছা, কয়েকদিন থাকো। আমার এখন অফিসে একটু চাপ যাচ্ছে। ফিরে এসে আমরা কথা বলব।’

নীলা স্যুটকেসের চেন টেনে বন্ধ করেছিল তারপর খুব শান্ত চোখে তাকিয়ে বলেছিল, ‘আমরা তো অনেকদিন ধরেই কথা বলি না, আদিত্য।’

সে কথাটার উত্তর খুঁজে পায়নি। তার মনে হয়েছিল, কথাটা অন্যায়। সে তো কথা বলত। প্রতিদিনই বলত। বাজারে কী আনতে হবে, গ্যাসের বুকিং হয়েছে কিনা, ইলেকট্রিক বিল জমা পড়েছে কিনা, রবিবারে কার বাড়ি যেতে হবে। তারা তো একসঙ্গে এতোদিন সংসার করছিল।

নীলা দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়েছিল। কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে বলেছিল, ‘তুমি সব সময় ফিরে আসো, কিন্তু কখনও বাড়ি ফেরো না।’ 

তারপর চলে গিয়েছিল।

কথাটার মানে আদিত্য পরে বুঝতে চেয়েছে। কখনও মনে হয়েছে, নীলা কী কোনও বিশেষ দিনের কথা বলেছিল যেটা সে ভুলে গিয়েছে। আদিত্য এর চেয়ে বেশি কিছু বুঝতে চায়নি, বোঝার সাহস করেনি। আজকাল কোনো-কোনো রাতে ঘুম ভেঙে গেলে সে এই কথাটাকে ঘরের মধ্যে হাঁটতে দেখে। দরজা থেকে জানলা, জানলা থেকে শোওয়ার ঘর। কোনো শরীরী অবয়বের মতো নয়, বাতাসের মধ্যে ভাসতে থাকা অক্ষরের মতো।

সেই রাতে সে আলো জ্বালিয়ে রেখেছিল। 

তারপর থেকে বাড়ির দরজায় তালা লাগানোর আগে সে দু-বার ভালো করে দেখে নেয়। অথচ দরজাটা এমনিতেই বন্ধ থাকে। কেউ আসে না।

কাজ চলে যাওয়ার খবরটা এসেছিল এক মঙ্গলবার সকালে। ভিডিয়ো মিটিংয়ে ম্যানেজার ভদ্রলোক বলেছিলেন, কোম্পানির পুনর্গঠন হচ্ছে। কিছু পদ তুলে দেওয়া হচ্ছে। আদিত্যের নামও সেই তালিকায় আছে। ভদ্রলোকের মুখে দুঃখের ছায়া ছিল, কিন্তু ছায়াটা এমনভাবে স্থির হয়ে ছিল যেন সেটাও কোনও প্রশিক্ষণের অংশ।

‘আপনার অবদান আমরা সম্মানের সঙ্গে মনে রাখব।’

মিটিং শেষ হওয়ার পরে আদিত্য অনেকক্ষণ ল্যাপটপের সামনে বসে ছিল। তারপর অফিসের ইমেল এল—চূড়ান্ত হিসাব, বকেয়া বেতন, অভিজ্ঞতার শংসাপত্র। সবকিছু অত্যন্ত সুশৃঙ্খল। এগারো বছরের কাজের শেষে তার জীবনে একটা ফোল্ডার তৈরি হয়েছিল, যার নাম ছিল Exit Documents।

সেই দিন দুপুরে সে ভাত খেতে বসে হঠাৎ লক্ষ করেছিল, প্লেটের ভাতগুলো অদ্ভুতভাবে সরে যাচ্ছে। সে হাত বাড়িয়ে ভাত মেখেছে, কিন্তু একেকটা দানা আঙুলের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে টেবিলে পড়েছে। যতবার সে দানাগুলো একত্র করতে চেয়েছে, ততবারই তারা আরও দূরে ছড়িয়ে পড়েছে।

শেষে সে প্লেটটা সরিয়ে রেখেছিল।

পরে অবশ্য বুঝেছিল, হয়তো তার চোখের ভুল। হয়তো ভাতের উপর পড়া জানলার ছায়াকে সে নড়তে দেখেছিল। কিন্তু টেবিলের উপর পড়ে থাকা একটা দানা সে এখনও দেখতে পায়। রোজ সকালে। এমনকি টেবিল মুছে ফেললেও।

সেই দানাটা কখনও শুকোয় না।

বিকেলের দিকে বৃষ্টি শুরু হল। আদিত্য জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। কৃষ্ণচূড়ার পাতাগুলো ভিজে চকচক করছে। রাস্তার উপর দু-একজন মানুষ ছাতা নিয়ে হাঁটছে। একটা বাস এসে থামল, আবার চলে গেল। বৃষ্টির শব্দে হঠাৎ মনে পড়ল, ছোটবেলায় তাদের বাড়িতে বৃষ্টি হলে মা জানলার পাল্লা বন্ধ করে দিত। বাবা খবরের কাগজ পড়ত। আদিত্য মেঝেতে বসে বই পড়ত। কখনও কখনও মা বলত, ‘যা একটু বাইরে থেকে ঘুরে আয়। সারাদিন বই নিয়ে বসে থাকিস কেন?’

সে বলত, ‘বৃষ্টি থামুক।’

বৃষ্টি থামত। সে আর বেরোত না।

এখন তার মনে হয়, জীবনের বেশিরভাগ দরজার সামনেই সে বৃষ্টি থামার অপেক্ষা করেছে। কিন্তু কোন দরজা দিয়ে সে বেরোতে চেয়েছিল, তা মনে পড়ে না।

রান্নাঘরে একটা কেটলি আছে। চা করার জন্য জল বসাতে গিয়ে সে দেখল, কেটলির ভিতরে একটা ছোটো মাছ সাঁতার কাটছে। রুপোলি রঙের মাছ। জল নেই, তবু মাছটা যেন কোনও অদৃশ্য স্রোতের মধ্যে ঘুরছে। আদিত্য স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল। মাছটা একবার কেটলির মুখের কাছে এসে থামল। তারপর আবার নীচে নেমে গেল।

সে কেটলিটা নামিয়ে রাখল।

পরদিন সকালে দেখল, কেটলি খালি। মাছ নেই। এ-কথা কাউকে বলা যায় না। এমনিতেও বলার মতো কেউ নেই। আর থাকলেও কী বলত? যে লোক চাকরি হারিয়েছে, স্ত্রী হারিয়েছে, বন্ধু হারিয়েছে, সে যদি বলে রান্নাঘরের কেটলিতে মাছ দেখেছে, মানুষ প্রথমে তার দিকে তাকাবে, তারপর অন্য দিকে।

আদিত্য নিজেও এখন নিজের দিকে বেশিক্ষণ তাকাতে পারে না।

সন্ধ্যের পর একটা পুরোনো ডায়ারি বের করল সে। ডায়ারিটা নীলার। নিয়ে যায়নি; রেখে গেছে নাকি ফেলে গেছে… একসময় নীলা কবিতা লিখত। আদিত্য তার কবিতা পড়ত না, সময় পেত না। অনেকদিন আগে একবার ডায়ারিটা এলোমেলো পাতা উলটে একটা পাতায় লেখা একটা লাইন পড়েছিল—‘যে বাড়িতে অপেক্ষা থাকে না, সে বাড়ির জানলাও একদিন বন্ধ হয়ে যায়।’

আদিত্য ডায়ারিটা এখন খুলে দেখল, পাতাগুলো সব ফাঁকা।

প্রথমে ভাবল, হয়তো অন্য ডায়ারি। তারপর পাতা উলটোতে উলটোতে দেখল, প্রতিটি পাতার মাঝখানে খুব হালকা দাগ, যেন কোনও লেখা মুছে ফেলা হয়েছে। আলোয় ধরলে অক্ষরগুলো দেখা যায় না। কিন্তু পাতার উপর আঙুল রাখলে তার মনে হয়, কেউ লিখছে। অদৃশ্য কলমে। একটার পর একটা বাক্য।

সে পড়তে পারে না, শুধু বুঝতে পারে, লেখাগুলো তার সম্পর্কে।

ডায়ারিটা বন্ধ করে সে টেবিলে রেখে দিল।

কিছুক্ষণ পরে তার মনে হল, ডায়ারির ভিতর থেকে পাতার শব্দ আসছে। যেন কেউ একা বসে খুব ধীরে ধীরে পাতা উলটে যাচ্ছে। সে ঘরের দরজা খুলে অন্য ঘরে গেল। সেখানেও শব্দটা এল। তারপর রান্নাঘরে। তারপর বাথরুমের দরজার বাইরে। শেষে সে আবার শোওয়ার ঘরে ফিরে এল। ডায়ারিটা বন্ধই পড়ে ছিল।

আদিত্য জানে না, শব্দটা সত্যিই হচ্ছিল কিনা। তবে সেই রাতে সে আর ঘুমোতে পারেনি।

পরদিন সকালে একটা চাকরির বিজ্ঞাপনে চোখ আটকে গেল। কাজটা তার আগের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মেলে। বেতনও মন্দ নয়। আবেদন করার শেষ তারিখ আজ। সে ল্যাপটপ খুলল, সিভি বের করল, পুরোনো অভিজ্ঞতার তালিকা পড়তে লাগল। সব ঠিক আছে। শুধু নিজের সম্পর্কে কয়েকটি বাক্য লিখতে হবে।

‘I am a motivated professional with a proven ability to work under pressure… বাক্যটা লিখে সে থেমে গেল।

চাপের মধ্যে কাজ করার ক্ষমতা তার ছিল। এতটাই ছিল যে, সে চাপের বাইরে কোনও জীবন আছে কিনা, তা ভুলে গিয়েছিল। এখন চাপ নেই। তবু সে মুক্ত নয়। তার চারপাশে অদৃশ্য একটা অফিস তৈরি হয়েছে, যেখানে কেউ নেই অথচ কাজের পর কাজ জমে থাকে। রাত বাড়লে সে শুনতে পায়, দূরে কোথাও কিবোর্ডে টাইপ হচ্ছে। কখনও মনে হয় পাশের ঘরে কেউ মিটিং করছে। কখনও মনে হয় তার ফোন বেজে উঠল।

ফোনটা নীরব।

আবেদনের ফর্মে নিজের নাম লিখল আদিত্য। তারপর ঠিকানার ঘরে এসে থামল।

এই বাড়ির ঠিকানা লিখতে হবে। এত দিন ধরে এই ঠিকানায় চিঠি এসেছে, বিল এসেছে, ব্যাংকের কাগজ এসেছে। তবু ঠিকানাটা লিখতে গিয়ে তার মনে হল, সে এমন একটা বাড়ির ঠিকানা লিখছে, যেটা ওই কৃষ্ণচূড়ার মতো একা, যেখানে পাখি বাসা বাঁধে আবার উড়ে যায়।

জানলার বাইরে কৃষ্ণচূড়া গাছটা তখনও একা, স্থির দাঁড়িয়ে। তার ডাল থেকে একটা পাতা খসে পড়ল। মাটিতে পড়ার আগে পাতাটা হাওয়ায় কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে রইল। যেন নিচে নামার কথা তার মনে নেই।

আদিত্য স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। ফর্মটা তখনও খোলা। জমা দেওয়ার বোতামটা লাল হয়ে জ্বলছে।

সে জানে, একবার বোতামটা টিপলেই কাজ শেষ। তারপর হয়তো ফোন আসবে, সাক্ষাৎকার হবে, নতুন কোনও অফিস, নতুন কোনও টেবিল, নতুন কোনও পরিচয়পত্র। হয়তো আবার একদিন সে সকালে উঠে ব্যাগ হাতে দরজার সামনে দাঁড়াবে। হয়তো নীলা কোথাও বসে কবিতা লিখবে। হয়তো সুমন কোনওদিন ফোন করবে না। আবার এটাও হতে পারে, কিছুই হবে না।

তার মনে পড়ল, একসময় সে গল্প লিখতে চেয়েছিল। কলেজে পড়ার সময় একটা গল্প শুরু করেছিল, যেখানে একজন মানুষ একদিন ঘুম থেকে উঠে দেখে, তার বাড়ির সমস্ত দরজা খুললে অন্য কোনো ঘরে পৌঁছে যাচ্ছে। গল্পটা শেষ করেনি। খাতাটা কোথায়, মনে নেই। সে ভেবেছিল, চাকরি পেলে লিখবে। বিয়ের পরে লিখবে। একটু স্থির হলে লিখবে।

তারপর আর কখনও সেই স্থির সময় আসেনি। এখন সময় আছে। কিন্তু শুরু করার জায়গাটা নেই।

টেবিলের উপর রাখা ডায়ারিটা আবার খুলে গেল। কোনও হাওয়া ছিল না। প্রথম পাতায় একটা বাক্য ফুটে উঠল, কালির দাগের মতো গাঢ়, অথচ লেখা হল কী দিয়ে বোঝা যায় না।

‘তুমি কি সত্যিই কোথাও যেতে চাও?’ আদিত্য উত্তর দিল না।

ঘড়ির কাঁটা দুটো এবার নড়ছে। সে স্পষ্ট দেখতে পেল, মিনিটের কাঁটাটা একটুখানি এগিয়ে গেল, তারপর আবার পিছিয়ে এল। যেন সময় নিজেই কোথায় যাবে বুঝতে পারছে না।

বাইরে বৃষ্টি থেমে গেছে। রাস্তার বাতিগুলো জ্বলে উঠেছে। দূরে কোথাও একটা ট্রেনের হুইসেল শোনা গেল। ট্রেনটা কোন দিকে যাচ্ছে, আদিত্য জানে না।

সে ল্যাপটপের সামনে বসে রইল। আঙুল দুটো কিবোর্ডের উপর রাখা। পর্দায় লাল বোতামটা জ্বলছে।

তার মনে হল, বোতামটা টিপলে সে কোথাও পৌঁছবে না। আবার না টিপলেও কোথাও পৌঁছবে না। এই দুটোর মধ্যে কোনটা বেশি সত্যি, সে বুঝতে পারল না।

রাত বাড়ল।

কৃষ্ণচূড়া গাছের ছায়া ধীরে ধীরে জানলা পেরিয়ে ঘরের মেঝেতে এসে পড়ল। ছায়াটা তার পায়ের কাছে থামল। আদিত্য একবার পা সরাতে গিয়েও সরাল না। তার মনে হল, ছায়াটা তাকে কোথাও নিয়ে যেতে এসেছে। কিন্তু কোথায়, তা সে জানে না।

হয়তো ছায়াটা শুধু গাছের।

হয়তো নয়।

অনেকক্ষণ পরে ল্যাপটপের স্ক্রিন অন্ধকার হয়ে গেল। ঘরটা নিঃশব্দ, নিস্তব্ধ, নিরুত্তর। আদিত্যের হাত তখনও কিবোর্ডের উপর।

সকালে বাড়িওয়ালা দরজায় কড়া নাড়লে সে উত্তর দেবে কিনা, চাকরির ফর্মটা জমা পড়বে কিনা, পরের দিন সে বিছানা ছেড়ে উঠবে কিনা—কোনও কিছুরই উত্তর তখন আর ঘরের মধ্যে ছিল না।

শুধু জানলার বাইরে কৃষ্ণচূড়া গাছটা তখনও একা, স্থির দাঁড়িয়ে।

আর তার একটা ডালে, যেখানে এতদিন কোনও পাখি বসেনি, ভোরের আগে এসে বসল একটা ছোটো রুপোলি মাছ। অথবা, অন্ধকারে সেটি মাছ বলে মনে হয়েছিল।

আদিত্য তখন ঘুমোচ্ছিল কিনা… তাও নিশ্চিত করে বলা যায় না।

শেয়ার করুন
বাপ্পাদিত্যের প্রতিকৃতি

লেখক

বাপ্পাদিত্য

প্রকাশনা কর্মী।

সব কাজ দেখুন →

সংখ্যা ১-এর অন্যান্য লেখা

সম্পাদকীয় প্রচ্ছদসংখ্যা ১

সম্পাদকীয়

সম্পাদকীয়

“কম্পিউটার, ই-মেল এবং ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট হ্যাক করা নিয়ে অনেক আলোচনা হয়। কিন্তু আমরা এখন এমন এক যুগে প্রবেশ করেছি যেখানে মানুষকেও হ্যাক করা সম্ভব।” ‘উই আর বিকামিং হ্যাকেবল অ্যানিমেলস’—হাড়হিম করে দেওয়া এক বাস্তবতার কথা আমাদের বলেছেন হারারি।

সমান্তর সম্পাদক৪ মিনিট
কাগজের মতো সহজে ছিঁড়ে যাওয়া সম্পর্কের ভিড়ে, বুকের ভেতরে সামান্য কাপড় বাঁচিয়ে রাখার এক মায়াবী আখ্যান ‘বোতাম’।সংখ্যা ১

গল্পস্বল্প

বোতাম

সবকিছু যখন এক ক্লিকে বদলে যায়, তখন কিছু মানুষ নিঃশব্দে পাহারা দেয় তাদের চিরপুরাতন বিশ্বাস। সুতো আর মায়া দিয়ে পার্বতীদি কী বুনে চলেছেন দিনরাত? কাগজের মতো সহজে ছিঁড়ে যাওয়া সম্পর্কের ভিড়ে, বুকের ভেতরে সামান্য কাপড় বাঁচিয়ে রাখার এক মায়াবী আখ্যান ‘বোতাম’।

সত্যসাধন মণ্ডল২ মিনিট
১৮৪৫ সালে লিখিত বিকল্প ইতিহাস। এক ভবিষ্যতের উড়িষ্যা, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীন প্রজাতন্ত্রে পরিণত হবে।সংখ্যা ১

পুরাতনী

ওড়িশা প্রজাতন্ত্র—বিংশ শতাব্দীর ইতিবৃত্তের এক বিস্মৃত পৃষ্ঠা: দ্বিতীয় পর্ব

১৮৪৫ সালে লেখা ১৯২৫ সালের এক কাহিনি। এক বিকল্প ইতিহাস। বিদ্রোহের গল্প। এক ভবিষ্যতের উড়িষ্যার গল্প। যে উড়িষ্যা একদিন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীন প্রজাতন্ত্রে পরিণত হবে। কিন্তু সেই স্বাধীনতার পথ মসৃণ নয়; তার ভিতর লুকিয়ে আছে অরণ্যের গভীরে জমে থাকা ক্ষোভ, হারিয়ে যাওয়া স্বাধীনতার স্মৃতি এবং পাহাড়ি মানুষের অদম্য আত্মমর্যাদা। শশীচন্দ্র দত্তের এই কল্প-ভবিষ্যতের কাহিনি যেন উনিশ শতকের ঔপনিবেশিক বাস্তবতার এক প্রতিবিম্ব; স্বাধীনতার স্বপ্ন কীভাবে প্রতিরোধের ভাষা খুঁজে পায়, তার এক রোমাঞ্চকর আখ্যান।

অনুবাদ: মেঘা সিনহা১২ মিনিট