অট্টহাস
অট্টহাসের পথে হঠাৎ এক ভ্রমণ, যেখানে তীর্থযাত্রার চেয়েও গভীর হয়ে ওঠে অন্তরের খোঁজে ফেরা। সুফি-ফকিরের রহস্য, লটারির আশা আর এক নামহীন পথিকের মুক্তির তৃষ্ণা মিলেমিশে একাকার দক্ষিণডিহির মেঘভাঙা বৃষ্টিতে। সন্ন্যাসীর মরমী উপলব্ধি পেরিয়ে ফেরার পথে জন্ম নেয় এক চিরন্তন আর্তি—মুক্তি খুঁজতে এসে এ কোন সৌন্দর্যের বাঁধনে বাঁধা পড়ল অনিকেত হৃদয়?

সংখ্যা ১আজকের এই অতর্কিত ভ্রম ও ভ্রমণে আমাদের ডেস্টিনেশন অট্টহাস। দেবীর অধঃওষ্ঠের ওপর রচিত এই চরাচর। আজকে আমার সফরসঙ্গী সুফি-বন্ধু বলাই ফকির। সঙ্গে আমাদের ড্রাইভার, সাঁওতাল ছেলেটি। আমাদের তীর্থযাত্রার উদ্দেশ্য ভিন্ন ভিন্ন। বলাই ফকির চলেছেন বাদুড়ের নখের সন্ধানে। সাঁওতাল ছেলেটির স্থির বিশ্বাস দেবীর কৃপায় মেলে ভালো লটারি। আমি চিরকালীন কামনাজ্বরিত হৃদয়, চলেছি মুক্তির অভিলাষে।
দক্ষিণডিহি গ্রামের আকাশ কালো মেঘে ভরে গেছে। সহসা বিদ্যুৎচমক। জগজ্জননীর অট্টহাসিতে ভরে উঠে চরাচর। মুষলধারে বৃষ্টি নামিল। আমাদের গাড়ি ঈশানি নদীর ওপর দ্বিধা-থরথরো সেতুটি পেরিয়ে মন্দির প্রাঙ্গণে।
ভিজে গেছি। মন্দিরের বাহির-চাতালে আসীন সন্ন্যাসীর ইশারায় বসি। তিনি স্নেহভরে বললেন—নাম কী তোমার, বাবা? আমি নিস্তব্ধ পাতাটির মতো। কী নাম বলিব তোমায়? মনে মনে ভাবি।
নাম-ঠিকানা কিছুই নেই আমার। অনিকেত-হৃদয়। মধুময়। এ আমার বানানো নাম। আপনি আমাকে এ নামেই ডাকুন। সন্ন্যাসী হেসে বললেন—সকল নামই বানানো নাম। সকল পরিচয় বানানো পরিচয়।
কথার পিঠে কথা এগিয়ে চলে। বক্তা সন্ন্যাসী ও বলাই ফকির। আমি নীরব শ্রোতামাত্র। বৃষ্টি থেমে এসেছে। চারিদিকে পরিব্যাপ্ত অন্ধকার জননীর অনন্ত গর্ভের জলরাশি। এবার আমাদের উঠতে হবে। ফেরার পথে নদীর সেতু পেরিয়ে গাড়ি বাড়ির দিকে। হোমকামিং। ফেরা কি খুব সহজ?
মুক্তি খুঁজতে এসে ভালোবাসলাম সুন্দর তোমাকে—নদীজল, পাথর, পাখি, ফুল। ঝুমকা ফুটিয়াছে যেন কাহারো বক্ষ-শোভা, রত্নহার। দুটি আশ্চর্য চোখের ক্রমাগত ইশারা ইথারে ভাসে। ত্রিনয়নী আমার!
একান্ন পীঠে ছড়িয়ে আছো তুমি। আমি অনিকেত। অবিশ্রান্ত। তোমাকে খোঁজা আমার ফুরাবে না...

লেখক
রুদ্র কিংশুক
রুদ্র কিংশুক মূলত কবি। ইংরেজি ও বাংলা দুই ভাষাতেই মৌলিক কবিতা লেখেন, লেখেন গল্পও। বাংলা ও ইংরেজিতে লিখেছেন অনেকগুলি প্রবন্ধের বইও। লেখালেখির স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন ভারত সরকারের মানব সম্পদ উন্নয়ন দপ্তর কর্তৃক প্রদত্ত ‘জুনিয়র ফেলোশিপ ইন লিটারেচার’ (১৯৯৭–৯৯)। বিদ্যায়তনিক লেখাপড়ার বাইরে তাঁর গভীর আগ্রহের বিষয় পাখি ও পাখির বই।
সব কাজ দেখুন →সংখ্যা ১-এর অন্যান্য লেখা
সংখ্যা ১সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়
“কম্পিউটার, ই-মেল এবং ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট হ্যাক করা নিয়ে অনেক আলোচনা হয়। কিন্তু আমরা এখন এমন এক যুগে প্রবেশ করেছি যেখানে মানুষকেও হ্যাক করা সম্ভব।” ‘উই আর বিকামিং হ্যাকেবল অ্যানিমেলস’—হাড়হিম করে দেওয়া এক বাস্তবতার কথা আমাদের বলেছেন হারারি।
সংখ্যা ১গল্পস্বল্প
বোতাম
সবকিছু যখন এক ক্লিকে বদলে যায়, তখন কিছু মানুষ নিঃশব্দে পাহারা দেয় তাদের চিরপুরাতন বিশ্বাস। সুতো আর মায়া দিয়ে পার্বতীদি কী বুনে চলেছেন দিনরাত? কাগজের মতো সহজে ছিঁড়ে যাওয়া সম্পর্কের ভিড়ে, বুকের ভেতরে সামান্য কাপড় বাঁচিয়ে রাখার এক মায়াবী আখ্যান ‘বোতাম’।
সংখ্যা ১পুরাতনী
ওড়িশা প্রজাতন্ত্র—বিংশ শতাব্দীর ইতিবৃত্তের এক বিস্মৃত পৃষ্ঠা: দ্বিতীয় পর্ব
১৮৪৫ সালে লেখা ১৯২৫ সালের এক কাহিনি। এক বিকল্প ইতিহাস। বিদ্রোহের গল্প। এক ভবিষ্যতের উড়িষ্যার গল্প। যে উড়িষ্যা একদিন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীন প্রজাতন্ত্রে পরিণত হবে। কিন্তু সেই স্বাধীনতার পথ মসৃণ নয়; তার ভিতর লুকিয়ে আছে অরণ্যের গভীরে জমে থাকা ক্ষোভ, হারিয়ে যাওয়া স্বাধীনতার স্মৃতি এবং পাহাড়ি মানুষের অদম্য আত্মমর্যাদা। শশীচন্দ্র দত্তের এই কল্প-ভবিষ্যতের কাহিনি যেন উনিশ শতকের ঔপনিবেশিক বাস্তবতার এক প্রতিবিম্ব; স্বাধীনতার স্বপ্ন কীভাবে প্রতিরোধের ভাষা খুঁজে পায়, তার এক রোমাঞ্চকর আখ্যান।
আরও পড়ুন
সংখ্যা ২কবিতা ও ছড়া
উইকএন্ড ট্যুর
শুক্রবারেই শ্যামলালের প্ল্যান, টুক করে ট্যুর! একদিনের ছুটিতে হাওয়াবদলের সাধ নিয়ে সপরিবারে বেরিয়ে পড়া। তারপর ট্রেনের সিট, হোটেলের বন্দোবস্ত, গাড়ির জোগাড়, গিন্নির ফরমান আর ফর্দ সামলাতে সামলাতে প্রকৃতি দর্শনের সুযোগটুকুও গেল ফসকে। পকেট হল হালকা, অভিজ্ঞতার ঝুলি হল ভারী! সব মিলিয়ে, এইভাবেই শেষ হল শ্যামলালের উইকএন্ড ট্যুর।
সংখ্যা ১কবিতা ও ছড়া
মায়ের মুখ
শহরের আগুন, ধোঁয়া আর ইগোর তীব্রতা থেকে দূরে এক অন্য জগতের আখ্যান ‘মায়ের মুখ’। মদ্যপানের আসর, শরতের ফাজলামি, শরীরী আকাঙ্ক্ষা আর সামান্য মুড়ি-ঘুগনির গন্ধে মিশে থাকে জীবনের নির্মম বাস্তব। রেস্তোরাঁর এঁটো প্লেট ধোয়া অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলেটির উপার্জন যখন মায়ের হাতে তুলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিতে বাঁধা পড়ে, তখন সমস্ত বিশৃঙ্খলার ভিতরেও জেগে ওঠে মাতৃমুখের চিরন্তন আরাধনা।
সংখ্যা ১কবিতা ও ছড়া
আত্মকথা ও অন্যান্য কবিতা
হারিয়ে যাওয়া, থেকে যাওয়া এবং তাদের মাঝখানে জন্ম নেওয়া স্মৃতির এক অদৃশ্য ভূগোল কখনও শব্দে, কখনও স্বপ্নে, কখনও রাগে, কখনও দাগে—কবি খুঁজে ফেরেন। এখানে সৌন্দর্যের পাশে নিঃশব্দে বসে থাকে বিষণ্ণতা, আকাঙ্ক্ষার পাশে অনিবার্য দূরত্ব, আর শৈল্পিক সৌন্দর্যের আড়ালে উঁকি দেয় জীবনের ক্ষত। সে চলে যায় রেখে যায় ক্ষীণ অথচ গভীর কোনো চিহ্ন। হাঁসের চলে যাওয়া পথের মতো—দাগ মুছে যায়, অথচ কোনো একদিন সেই জলের বুকেই শালুক ফুটে ওঠে।



