শারদোৎসব: একটি নাটকেরও নাম

‘সহজে খুশি হবার বিদ্যে ওদের কাছ থেকে আমরাই শিখব।’—নিত্যদিনের ক্ষুদ্র পরিধি পেরিয়ে বহু মানুষের সঙ্গে মিলে বড় হয়ে ওঠার নামই উৎসব। শান্তিনিকেতনের ‘নাট্যপক্ষ’-এর জন্মমুহূর্ত থেকে শুরু করে উপনন্দের ঋণশোধের দর্শন—রবীন্দ্রনাথের ‘শারদোৎসব’ নাটকের নেপথ্য ইতিহাস ও দর্শনের গভীরে এক অন্তরঙ্গ ভ্রমণ।

অভীক ঘোষের প্রতিকৃতি
৯ মিনিট পড়া
শেয়ার করুন
রবীন্দ্রনাথের ‘শারদোৎসব’ নাটকের নেপথ্য ইতিহাস ও দর্শনের গভীরে এক অন্তরঙ্গ ভ্রমণ।সংখ্যা ১
লেখার আকার
লেখার অবস্থান

“শারদোৎসব থেকে আরম্ভ করে ফাল্গুনী পর্যন্ত যতগুলি নাটক লিখেছি, যখন বিশেষ করে মন দিয়ে দেখি তখন দেখতে পাই প্রত্যেকের ভিতরকার ধুয়োটা ঐ একই।...আত্মার প্রকাশ আনন্দময়, এই জন্যেই সে দুঃখকে মৃত্যুকে স্বীকার করতে পারে; ভয়ে কিংবা আলস্যে কিংবা সংশয়ে এই দুঃখের পথকে যে লোক এড়িয়ে চলে জগতে সেই আনন্দ থেকে বঞ্চিত হয়। শারদোৎসবের ভিতরকার কথাটিই এই।”—রবীন্দ্রনাথ ‘আমার ধর্ম’ প্রবন্ধে এমন কথা বললেন।

১৯০৮-এ ‘শারদোৎসব’ আর ১৯১৬-য় ‘ফাল্গুনী’-তে, মাঝে ‘রাজা’, ‘ডাকঘর’, ‘অচলায়তন’-এও ঐ দুঃখ স্বীকারের আনন্দময় ধুয়োটা সহজেই চিনে নেওয়া যায়।

‘আত্মার প্রকাশ আনন্দময়’ অন্যরকম ভাবে তাঁর কাছে শোনা গেছে, মানুষের প্রতি ঈশ্বরের নাকি একটিই আদেশ, ‘প্রকাশিত হও’। এই শারদোৎসবে একটি পত্রিকা প্রকাশের নতুন উদ্যোগে যোগদানের আহ্বানে, রবীন্দ্রনাথের শারদোৎসব নাটকের কথাই অবধারিত মনে এল।

উৎসবের উপযোগিতা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের পর্যবেক্ষণ হল, প্রতিদিন মানুষ একা, ছোট। উৎসবে মানুষ বড় হওয়ার সুযোগ পায়। রোজকার সংসার-জীবনে নিজের ছোট পরিধির বাইরে একা-মানুষ বহু-মানুষের সঙ্গে মিলে নিজেকে বড় করে উপলব্ধি করতে পারে। শারদোৎসবের একটা নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আমার মনে হয় প্রকৃতির প্রত্যক্ষ প্ররোচনা। বাঙলার বিশ্বপ্রকৃতি তার সোনার আলো ছড়িয়ে, মাথার ওপরের ঘোলাটে চাঁদোয়াটিকে ঝকঝকে নীল করে তুলে, বাতাসে হিমের পরশ ছড়িয়ে উৎসবের বেশ একটা মানানসই মণ্ডপ সাজিয়ে তোলে। বিশেষত বাঙালির তাই এই সময়টি দৈনন্দিন কাজের একঘেয়েমি থেকে ছুটি নিয়ে আনন্দ উদযাপনের সময়।

শান্তিনিকেতন আশ্রম-বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ছুটিতে নিজের নিজের বাড়িতে চলে যাবার আগে আশ্রমের ছোটবড় সকলে মিলে একটি নাটক মঞ্চস্থ করার রীতি ছিল, মহলার মিলিত উচ্ছ্বাসে ধুয়ে যেত প্রাত্যহিক কর্মজীবনে জমতে থাকা মনান্তরের ময়লা। এখনও বিশ্বভারতীর বিভিন্ন ভবনের শিক্ষার্থীরা ছুটিতে বাড়ি যাবার আগে নাটক মঞ্চস্থ করে। যেহেতু এখন সবটাই অনেক বড় হয়েছে, অনেক ভবন, বিভাগ, নাটকের সংখ্যাও তাই বেড়েছে। নাটকের এই উৎসবকে বলা হয় শারদোৎসব। পক্ষকালীন উৎসবটিকে অনেকে নাট্যপক্ষও বলে থাকেন। এই প্রথা শান্তিনিকেতনে আরম্ভ হয়েছিল যে নাটকটির অভিনয় দিয়ে সেই নাটকের নাম ‘শারদোৎসব’। সেই নাটক রচনার প্রেক্ষাপটটি প্রধানত ক্ষিতিমোহন সেনের স্মৃতিচারণ থেকে জেনেছি। সেই ইতিহাসটি আমাকে বারে বারে বিস্মিত করে, অনুপ্রাণিত করে এখনও। নাটকের স্রষ্টা মানুষটির জীবন-সাধনার ‘ভিতরকার ধুয়ো’-টা যেন খানিক ধরতে পারি। সেই ‘গল্প’-ই এখানে বলতে ইচ্ছা হল।

ঋণশোধ (শারদোৎসব) নাটিকার পাণ্ডুলিপি
ঋণশোধ (শারদোৎসব) নাটিকার পাণ্ডুলিপি
পুস্তকাকারে প্রকাশিত ঋণশোধ (শারদোৎসব) নাটিকার প্রচ্ছদ
পুস্তকাকারে প্রকাশিত ঋণশোধ (শারদোৎসব) নাটিকার প্রচ্ছদ

শান্তিনিকেতন আশ্রম-বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা ১৯০১ সালে, রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা সম্পর্কিত নিরবয়ব নাতিস্পষ্ট ধারণা-পরিকল্পনা প্রয়োগের লক্ষ্যে। পাঠ্যপুস্তক অপ্রধান, প্রকৃতির কোলে পর্যবেক্ষণের শিক্ষা আর আনন্দময় জগতের সৌন্দর্যের উপলব্ধি করতে শেখাই ছিল আশ্রমিকদের প্রাত্যহিক জীবনচর্যা। তারই অঙ্গ ছিল ঋতু-উৎসবের উদযাপন।

ক্ষিতিমোহন সেন আশ্রমের কাজে যোগ দিয়েছিলেন ১৯০৮-এর (১৩১৫ বঙ্গাব্দ) গ্রীষ্মাবকাশের পর। তাঁর দেখা প্রথম পরিকল্পিত ঋতু-উৎসবটি হয়েছিল সেই বর্ষায়। নাম দেওয়া হয়েছিল পর্জন্য মহোৎসব। সংস্কৃত সাহিত্য থেকে নির্বাচিত বেশ কিছু শ্লোক স্তোত্র এই উৎসবে সংশ্লিষ্ট ছিল। ক্ষিতিমোহন সেন যদিও ‘আশ্রমগুরু’-র অনুপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত সেই উৎসবকে ‘প্রথম’ স্থানটি পুরোপুরি ছাড়েননি। লিখেছেন—“প্রত্যেকটি ঋতুকে উৎসবের দ্বারা অভিনন্দিত করিবার চিন্তা রবীন্দ্রনাথের ছিল। বিদ্যায়তনের পক্ষে কেহ কেহ ব্যাপারটাকে একটু বাড়াবাড়ি বলিয়া মনে করিলেন। এমন কি একটু পাগলামি বলিতেও ছাড়েন নাই। আশ্রমগুরু সর্বপ্রথম আয়োজন করিয়াছিলেন বর্ষা উৎসবের। কিন্তু সে অনুষ্ঠানের সময় তিনি নিজেই আশ্রমে উপস্থিত থাকিতে পারিলেন না। সেইদিক দিয়া দেখিলে শারদোৎসব নাটকই আশ্রমের আদিতম ঋতু-উৎসবের পুস্তক এবং উৎসবও। বর্ষা উৎসব বা পর্জন্য মহোৎসব নহে।” জমিদারীর জটিল কাজে শিলাইদহে আটকে থেকে রবীন্দ্রনাথ লিখে জানাতে বাধ্য হয়েছিলেন—“বর্ষার ঋতু-উৎসবে এবারে আমাকে বাদ দিন। বর্ষা-উৎসবে আপনাদের নিরাশ করিতেছি বটে, কিন্তু পরে শরতের উৎসবে এর ক্ষয়-ক্ষতি পূরণ করিয়া দেওয়া যাবে।” রবীন্দ্রনাথ কিন্তু জাগতিক কাজের ব্যস্ততার মধ্যেও সৃজনের আনন্দে শামিল ছিলেন। ক্ষিতিমোহন লিখছেন—“শিলাইদহ হইতে প্রস্তুতির বিবরণী পড়িয়া তাহার উত্তরে গুরুদেব দূর হইতে আশ্রমের সকলেরই সহিত যোগ রাখিয়া চলিতেছিলেন। সব দিক দিয়া পর্জন্য মহোৎসব বা বর্ষা-উৎসব সফল হইল। ইহার পর আকাশে বাতাসে সর্বত্র তাহার জয়বার্তা ঘোষণা করিয়া শরৎ আসিল। এমনি একটি দিনে শরতের জন্য রচিত বহু গান সঙ্গে লইয়া জমিদারী হইতে রবীন্দ্রনাথ আশ্রমে ফিরিলেন। সমস্ত গান তিনি ছেলেদের মধ্যে উজাড় করিয়া দিলেন। তাঁহার ধারণা হইয়াছিল, এত গান পাইয়া ছেলেরা খুবই উৎসাহিত হইবে এবং গানের সাহায্যেই শরৎ-উৎসব সমাধা করা যাইবে, কিন্তু ছেলেদের আশার অন্ত নাই।”

ক্ষিতিমোহনের লেখনীতে ছেলেদের আশার অন্তহীনতার কথা দেখে প্রথমেই আমার মনে হয়, তাই তো, তিনি তো আশ্রমে এসে শমীকে দেখেননি। শুনেছিলেন কতটা, তাও তো আমার কিছু জানা নেই। আশ্রমের সকলেই কি সচেতনভাবে ভুলতে চেয়েছিলেন শমীর অনুপস্থিতি? যে ছেলেদের অন্তহীন আশা দেখে ক্ষিতিমোহন অবাক হলেন, সেই ছেলেদের মধ্যে এক পিতার সত্তা কি প্রিয় শমীকে অনুভব করতে পারতেন? আদৌ কি চাইতেন? আমার নিজেরই মনে হয় এ প্রশ্ন অর্থহীন। ছেলেরা তো নিজগুণেই কবির খেলার সঙ্গী।

ছেলেরা আশ্রমগুরুকে ঘিরে ধরে আব্দার জানিয়েছিল, এবার তারা নাটক অভিনয় করতে চায়, গুরুদেবকে নাটক লিখে দিতে হবে। রবীন্দ্রনাথের মুখ ফুটে বেরিয়েছিল স্বতঃস্ফূর্ত একটি শব্দ ‘সর্বনাশ’। কারণ সময় বড্ড কম। মহালয়ার পরেই তো ছুটি শুরু। ক্ষিতিমোহন লিখছেন—“আমাদিগের অনেকেরই ধারণা ছিল, কিছুতেই নাটক লিখিবার জন্য গুরুদেব এক মুহূর্ত সময় দিতে পারিবেন না। এদিকে জমিদারির জটিল কাজ, অপরদিকে বিদ্যালয় পরিচালনায় তিনি, শিলাইদহ-কলিকাতা-বোলপুর ঘুরিয়া অস্থির হইতেছেন। ছাত্রদের সেদিকে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নাই।”

ছাত্রদের সেই অবিবেচক ছেলেমানুষি ইচ্ছাপ্রকাশের থেকে বছরখানেক পিছিয়ে আশ্রমের প্রথম ‘ঋতু-উৎসব’-কে জানতে পারি প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের বর্ণনা থেকে। সেই উৎসবেও রবীন্দ্রনাথ অনুপস্থিত ছিলেন। উৎসব আয়োজনে সবচেয়ে বেশী উৎসাহ ছিল রবীন্দ্রনাথের কনিষ্ঠ পুত্র শমীন্দ্রনাথের। পরিকল্পনাও প্রধানত তাঁরই। নিজে সেজেছিলেন বসন্ত, গান গেয়েছিলেন ‘একি লাবণ্যে পূর্ণ প্রাণ, প্রাণেশ হে আনন্দ বসন্ত সমাগমে’। বন্ধুরা কেউ সেজেছিলেন বর্ষা, কেউ শরৎ। ছ’বছর বয়সে মাকে হারানো সেই শমী বারো বছর বয়স পূর্ণ হবার আগেই নিজেও প্রয়াত হয়েছিলেন ১৯০৭ সালেই। জানুয়ারিতে শ্রীপঞ্চমীর দিনে আশ্রমের প্রথম ঋতু-উৎসব আয়োজন, আর নভেম্বরে প্রয়ান। কবির জীবনে শোকের প্রবাহে বেদনার আরও একটি আঘাত। ‘তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে’।

ছেলেদের আব্দারের কাছে ফিরি, ক্ষিতিমোহনের কাছে। ‘পরের দিনের কথা। প্রতিদিন প্রভাতে কবি তাঁহার আহ্নিক শেষ করিয়া আশ্রমের চারিদিকটা একবার ঘুরিয়া বেড়াইয়া যান। ইহা তাঁহার দীর্ঘদিনের নিয়ম।’ নিয়ম ভাঙল। আলো ফুটল, সকাল হল, বেলা বাড়ল, তাঁর দেখা নেই। সকলে চিন্তিত। ভৃত্য উমাচরণের কাছে খোঁজ নিয়ে জানা গেল, তিনি লিখে চলেছেন। সকালের জলখাবার পাশে রাখাই আছে, ছুঁয়েও দেখেননি। রাতে আদৌ ঘুমিয়েছিলেন কিনা বোঝা গেল না। দুপুর গড়িয়ে বিকেল। লেখার মধ্যেই ডুবে রইলেন স্রষ্টা। বিকেলের পর সকলকে খবর পাঠালেন সমবেত হতে, নাটক লেখা শেষ, সকলকে পড়ে শোনাবেন। “এই প্রস্তাবের উত্তরে শিশুবিভাগের একটি ছাত্র বলিল, আপনি এখনও আহার করেন নাই; স্নান-খাওয়া সারিয়া আপনি বরং সোজা বীথিকায় গিয়া বসুন। আপনার তৈয়ারি হইতে হইতে আমরা ছেলের দল ভালো করিয়া বসিতে পারিব। এই প্রস্তাবে সকলে রাজী হইলেন। গুরুদেব তাঁহার আসনে বসিয়া শারদোৎসব পাঠ করিতে আরম্ভ করিলেন। কী অপূর্ব তাঁহার পড়া। আর সঙ্গে সঙ্গে গান। কবির কণ্ঠস্বরে সমস্ত বীথিকাগৃহটি ধ্বনিত হইতেছিল। নাটক পড়া চলিতেছে। অভিনয়ের এক একটি পাত্র ‘প্রবেশ’ করিতেছে আর সঙ্গে সঙ্গে পাত্রের দুই চারিটি কথা শুনিয়াই, শ্রোতার দল ঠিক করিয়া লইতেছে আশ্রমে কাহাকে কোন ভূমিকায় নামানো হইবে।” শ্রোতার দলের এই অসাধারণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার কথা ভাবলেই আমার কেমন মনে হতে থাকে, নাট্যকার নাটকের সংলাপ পড়ছেনই এমন ভঙ্গিমায়, অবধারিতভাবে শ্রোতাদের মনে ফুটে উঠছে পরিচিত কোনও বিশেষ মানুষের কথা। এ অবশ্য আমার নিতান্তই অনুমান। রবীন্দ্রনাথের ‘মিলনের শক্তিই সৃজনের শক্তি’ কথাটি আমি আন্তরিক বিশ্বাস করি অভিজ্ঞতা থেকেই।

শারদোৎসব নাটকে এক চক্রবর্তী সম্রাট, সন্ন্যাসীর ছদ্মবেশে পথে বেরিয়েছিলেন আশ্বিনের সোনার আলোয় আলোকিত বিশ্বপ্রকৃতির আঙিনায়, একটি প্রশ্ন মনে নিয়ে। জগৎ এমন আশ্চর্য সুন্দর কেন? ছুটির আনন্দে মাতোয়ারা ছেলের দলের মধ্যে তিনি আবিষ্কার করলেন উপনন্দকে। ছেলেদের আহ্বান উপেক্ষা করে সে গাছতলায় বসে পুঁথি নকল করছে। এই কাজের উপার্জিত অর্থে সে তার প্রয়াত আশ্রয়দাতা প্রভুর ঋণ শোধ করবে। সন্ন্যাসী তাঁর প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেলেন। রবীন্দ্রনাথের ভাষাতেই বলি—“তাঁর তখনই মনে হইল, শারদোৎসবের মূল অর্থটি এই ঋণশোধের সৌন্দর্য। শরতে এই যে নদী ভরিয়া উঠিল কূলে কূলে, এই যে খেত ভরিয়া উঠিল শস্যের ভারে, ইহার মধ্যে একটি ভাব আছে, সে এই প্রকৃতি আপনার ভিতরে যে অমৃতশক্তি পাইয়াছে সেটাকে বাহিরে নানা রূপে নানা রসে শোধ করিয়া দিতেছে। সেই শোধ করাটাই প্রকাশ। প্রকাশ যেখানে সম্পূর্ণ হয় সেইখানেই ভিতরের ঋণ বাহিরে ভালো করিয়া শোধ করা হয়, সেই শোধের মধ্যেই সৌন্দর্য। মানুষের ক্ষেত্রেও সেই একই কথা। যেখানে মানুষ জ্ঞানে প্রেমে কর্মে দেবতা হইয়া উঠিতে সর্বপ্রযত্নে প্রয়াস না পায় সেখানে নিজের মধ্যে সে দেবত্বের ঋণ অস্বীকার করে। যেখানে ধনকে সে আঁকড়িয়া থাকে, স্বার্থকেই চরম আশ্রয় বলিয়া মনে করে, সেখানে দেবতার ঋণকে সে নিজের ভোগে লাগাইয়া একেবারে ফুঁকিয়া দিতে চায় তাহাকে যে অমৃত দেওয়া হইয়াছিল, যে অমৃতের উপলব্ধিতে মৃত্যুকে তুচ্ছ করিতে পারে, ক্ষতিকে অবজ্ঞা করিতে পারে, দুঃখকে গলার হার করিয়া লয়, জীবনের প্রকাশের মধ্য দিয়া সেই অমৃতকে তখন সে শোধ করিয়া দেয় না। বিশ্বপ্রকৃতিতে ও মানবপ্রকৃতিতে এই অমৃতের প্রকাশকেই বলে সৌন্দর্য: আনন্দরূপমমৃতম্।”

নাটকের এই মূল সুরটিকে নাট্যকারের রাত-জাগানিয়া সাধনায় বাজতে শুনি আর রোমাঞ্চিত হই এখনও। শান্তিনিকেতন আশ্রমের প্রবেশপথের উপরে লেখা আছে ঠিকই ‘আনন্দরূপম্ অমৃতম্ যদ্বিভাতি’, কিন্তু মন্ত্রের এমন জাগ্রত প্রকাশে শ্রদ্ধাবনত না হয়ে পারি না। শারদোৎসবের গান ‘আনন্দেরি সাগর হতে এসেছে আজ বান’ নিজেই মন্ত্র হয়ে ওঠে। বছর পনের পরে কলকাতায় একবার শারদোৎসব অভিনয়ের আগে রবীন্দ্রনাথ একটি ভূমিকা লেখেন, যেটি অভিনয়-পত্রীতে ছাপা হয়েছিল। ভূমিকাটি লিখেছিলেন রাজা-মন্ত্রীর কথোপকথনের চেহারায়। আমার নিজের কাছে সেও আর এক মন্ত্র।

শারদ-উৎসবের প্রস্তুতির ব্যাপারে রাজার প্রশ্নের উত্তরে মন্ত্রী জানান, কবি নিজের পছন্দ মতো একটি পালা রচনা করেছেন এবং জানিয়েছেন সেটা ‘কিছুই-না-গোছের জিনিষ’। সেটি শরতের উপযোগী। কবির ব্যাখ্যা হল, শরতের মেঘ হালকা, জলভারহীন নিঃসম্বল সন্ন্যাসী। নিরাসক্ত শিউলি ফুটতে না ফুটতে ঝরে পড়ে। কাশের স্তবক না বাগানের, না বনের। মাঠে-ঘাটে অকিঞ্চন। কাঁচা ধানের ক্ষেতের আছে শুধু রঙ আর দোলা, আর কোনও দায় থাকলেও সেটা অপ্রকাশিত। পালাটিও সেরকম হালকা নিরর্থক। কাজের কথা নেই আছে ছুটির খুশি। নাটকের পাত্রদের মধ্যে আছে ছেলের দল, কারণ তাদের প্রাণের মধ্যেই আছে আসল ছুটির চেহারা। তারা অজান্তেই সেই ছুটির ভিতর ফসলের আয়োজন করে চলেছে।

ছেলের দলকে ভাল করে শেখানো হয়েছে কিনা জানতে চেয়ে রাজা শোনেন ‘একেবারেই না।’ কারণ ‘কবি বলেন, বুড়োরা ছেলেদের যদি শেখাতে যায়, তা হলে তো ছেলেরা পেকে যাবে ছেলেই থাকবে না। সহজে খুসি হবার বিদ্যে ওদের কাছ থেকে আমরাই শিখব।’

আমার নিজের এখন কেমন যেন মনে হয়, জীবনে এই সহজে খুশি হবার বিদ্যে শেখার কথাটা আর ওই ঋণশোধের মনুষ্যত্বসাধনার কথাটা, এই দুটো কথা শেখানোর জন্য রবীন্দ্রনাথকে হয়তো ‘গুরুদেব’ বলে ফেলাই যায়।

শেয়ার করুন
অভীক ঘোষের প্রতিকৃতি

লেখক

অভীক ঘোষ

কলকাতায় শৈশব কাটিয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে শান্তিনিকেতনের পাঠভবনে আবাসিক ছাত্র হিসেবে যোগদান। এরপর স্নাতক স্তরের তিন বছর প্রেসিডেন্সি কলেজ আর কর্মসূত্রে বছর-খানেক কলকাতার জীবন বাদ দিলে বাকি সময় সম্পূর্ণই শান্তিনিকেতনে। পাঠভবনের আবাসিক ছাত্রদের গৃহাধ্যক্ষ, শিক্ষাসত্র ও পাঠভবন—শান্তিনিকেতনের দুই স্কুলেরই ভূগোল-শিক্ষক অভীক ঘোষ এখন অবসর জীবনে ‘চিলড্রেন্স থিয়েটার অ্যাকাডেমি শান্তিনিকেতন’-এ বাচ্চাদের সঙ্গে হৈচৈ করেন, খেলেডাঙ্গা গ্রামের বাচ্চাদের পড়ান আর সব বয়সী বন্ধুদের সঙ্গে গান গেয়ে আনন্দের ধারা সকলের সঙ্গে ভাগ করে নেন।

সব কাজ দেখুন →

সংখ্যা ১-এর অন্যান্য লেখা

সম্পাদকীয় প্রচ্ছদসংখ্যা ১

সম্পাদকীয়

সম্পাদকীয়

“কম্পিউটার, ই-মেল এবং ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট হ্যাক করা নিয়ে অনেক আলোচনা হয়। কিন্তু আমরা এখন এমন এক যুগে প্রবেশ করেছি যেখানে মানুষকেও হ্যাক করা সম্ভব।” ‘উই আর বিকামিং হ্যাকেবল অ্যানিমেলস’—হাড়হিম করে দেওয়া এক বাস্তবতার কথা আমাদের বলেছেন হারারি।

সমান্তর সম্পাদক৪ মিনিট
কাগজের মতো সহজে ছিঁড়ে যাওয়া সম্পর্কের ভিড়ে, বুকের ভেতরে সামান্য কাপড় বাঁচিয়ে রাখার এক মায়াবী আখ্যান ‘বোতাম’।সংখ্যা ১

গল্পস্বল্প

বোতাম

সবকিছু যখন এক ক্লিকে বদলে যায়, তখন কিছু মানুষ নিঃশব্দে পাহারা দেয় তাদের চিরপুরাতন বিশ্বাস। সুতো আর মায়া দিয়ে পার্বতীদি কী বুনে চলেছেন দিনরাত? কাগজের মতো সহজে ছিঁড়ে যাওয়া সম্পর্কের ভিড়ে, বুকের ভেতরে সামান্য কাপড় বাঁচিয়ে রাখার এক মায়াবী আখ্যান ‘বোতাম’।

সত্যসাধন মণ্ডল২ মিনিট
১৮৪৫ সালে লিখিত বিকল্প ইতিহাস। এক ভবিষ্যতের উড়িষ্যা, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীন প্রজাতন্ত্রে পরিণত হবে।সংখ্যা ১

পুরাতনী

ওড়িশা প্রজাতন্ত্র—বিংশ শতাব্দীর ইতিবৃত্তের এক বিস্মৃত পৃষ্ঠা: দ্বিতীয় পর্ব

১৮৪৫ সালে লেখা ১৯২৫ সালের এক কাহিনি। এক বিকল্প ইতিহাস। বিদ্রোহের গল্প। এক ভবিষ্যতের উড়িষ্যার গল্প। যে উড়িষ্যা একদিন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীন প্রজাতন্ত্রে পরিণত হবে। কিন্তু সেই স্বাধীনতার পথ মসৃণ নয়; তার ভিতর লুকিয়ে আছে অরণ্যের গভীরে জমে থাকা ক্ষোভ, হারিয়ে যাওয়া স্বাধীনতার স্মৃতি এবং পাহাড়ি মানুষের অদম্য আত্মমর্যাদা। শশীচন্দ্র দত্তের এই কল্প-ভবিষ্যতের কাহিনি যেন উনিশ শতকের ঔপনিবেশিক বাস্তবতার এক প্রতিবিম্ব; স্বাধীনতার স্বপ্ন কীভাবে প্রতিরোধের ভাষা খুঁজে পায়, তার এক রোমাঞ্চকর আখ্যান।

অনুবাদ: মেঘা সিনহা১২ মিনিট

আরও পড়ুন

ছবি আঁকার রাজ্যে অবনীন্দ্রনাথ যেমন চিত্রবিদ্যার প্রতিটি শাখায় তাঁর তুলির আঁচড় কেটেছেন এবং প্রমাণ করেছেন আপন অন্তরের শিল্প সসংখ্যা ১

সংস্কৃতি

তুলি-কলমের জাদুকর অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ছবি আঁকার রাজ্যে অবনীন্দ্রনাথ যেমন চিত্রবিদ্যার প্রতিটি শাখায় তাঁর তুলির আঁচড় কেটেছেন এবং প্রমাণ করেছেন আপন অন্তরের শিল্প সুষমা। লেখার আঙিনায় এসেও সাহিত্যের প্রতিটি শাখায় তিনি তাঁর মনের মত ফুল ফুটিয়েছেন। শিশুদের মনের অন্দরে এতো গভীর তল্লাশি অবনীন্দ্রনাথ ছাড়া কেউ আগে করেননি।

আবীর কর১০ মিনিট