ওড়িশা প্রজাতন্ত্র—বিংশ শতাব্দীর ইতিবৃত্তের এক বিস্মৃত পৃষ্ঠা: প্রথম পর্ব
১৮৪৫ সালে লেখা ১৯২৫ সালের এক কাহিনি। এক বিকল্প ইতিহাস। বিদ্রোহের গল্প। এক ভবিষ্যতের উড়িষ্যার গল্প। যে উড়িষ্যা একদিন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীন প্রজাতন্ত্রে পরিণত হবে। কিন্তু সেই স্বাধীনতার পথ মসৃণ নয়; তার ভিতর লুকিয়ে আছে অরণ্যের গভীরে জমে থাকা ক্ষোভ, হারিয়ে যাওয়া স্বাধীনতার স্মৃতি এবং পাহাড়ি মানুষের অদম্য আত্মমর্যাদা। শশীচন্দ্র দত্তের এই কল্প-ভবিষ্যতের কাহিনি যেন উনিশ শতকের ঔপনিবেশিক বাস্তবতার এক প্রতিবিম্ব; স্বাধীনতার স্বপ্ন কীভাবে প্রতিরোধের ভাষা খুঁজে পায়, তার এক রোমাঞ্চকর আখ্যান।
ওড়িশা প্রজাতন্ত্র—বিংশ শতাব্দীর ইতিবৃত্তের এক বিস্মৃত পৃষ্ঠাপর্ব ১/২
সংখ্যা ১সূচিপত্র
অনুবাদকের কথা
শশী চন্দ্র দত্ত (১৮২৪―১৮৮৫) ছিলেন উনিশ শতকের কলকাতার বিশিষ্ট দত্ত পরিবারের একজন সাহিত্যিক। হিন্দু কলেজে পড়ার সময় অধ্যাপক ডি. এল. রিচার্ডসনের প্রভাবে তাঁর সাহিত্যিক মানস গড়ে ওঠে। পরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধীনে কর্মজীবন শুরু করে তিনি বেঙ্গল সেক্রেটারিয়েটে রেজিস্ট্রার পদে উন্নীত হন এবং অবসরের পর ‘রায়বাহাদুর’ উপাধি লাভ করেন। সাহিত্য, ইতিহাস, সমাজ ও নৃতত্ত্ব—বিভিন্ন ক্ষেত্রেই তাঁর অবদান ছিল। তাঁর লিখিত অনেকগুলি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল। ইংরেজিতেই লিখতেন তিনি। তাঁর রচিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলি হল: ‘Stray Leaves—Essays, Poems and Tales’ (১৮৬৪), ‘Bengaliana: A Dish of Rice and Curry, and Other Indigestible Ingredients’ (১৮৭৮), ‘India; Past and Present’, ‘The Great Wars of India’, ‘The Wild Tribes of India’, ‘British Opium Policy, and its Results’। ১৮৮৪ ও ১৮৮৫ সালে শশী চন্দ্রের রচনাবলী দু-ভাগে প্রকাশিত হয়—‘The Works of Shoshee Chunder Dutt, First Series: Historical and Miscellaneous' (১৮৮৪) এবং ‘The Works of Shoshee Chunder Dutt, Second Series: Imaginative, Descriptive and Metrical’ (১৮৮৫)। Horatio Bickerstaffe Rowney এবং J. A. G. Barton ছদ্মনামে লিখতেন শশী চন্দ্র।

১৮৪৫ সালে প্রকাশিত ‘The Republic of Orissá’ শশী চন্দ্র দত্তের অন্যতম সাহসী রচনা। ভবিষ্যতের (১৯২২ সালের) ওড়িশাকে কেন্দ্র করে রচিত এই কাহিনিতে দেখা যায় যে, ব্রিটিশরা ভারতে পুনরায় দাসপ্রথা চালু করলে ওড়িশার বিভিন্ন উপজাতি ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিদ্রোহ করে এবং শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ শাসন উৎখাত করে স্বাধীন প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে। গল্পটি কেবল কল্পিত ভবিষ্যতের এক বিদ্রোহের কাহিনি নয়; এর মধ্য দিয়ে দাসপ্রথা, ঔপনিবেশিক শোষণ ও ব্রিটিশ প্রশাসনের ঔদ্ধত্যের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদও প্রকাশ পেয়েছে। একই সঙ্গে উপজাতি জনগোষ্ঠীর মানুষের স্বাধীনতাপ্রিয়তা ও স্বাধিকারচেতনারও শক্তিশালী প্রকাশ ঘটেছে। বস্তুত ‘The Republic of Orissá’ কেবল ভবিষ্যৎ-নির্ভর একটি কল্পকাহিনি নয়, বরং ঔপনিবেশিক শোষণ ও দাসপ্রথার বিরুদ্ধে এক সুদূরপ্রসারী প্রতিবাদী কল্পনা। স্বাধীনতাকামী উপজাতি জনগোষ্ঠীর সফল বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে শশী চন্দ্র দত্ত এমন এক ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখিয়েছেন, যেখানে সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যের পরিবর্তে স্বাধীনতা ও আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকেই রচনাটি উনিশ শতকের বাংলা সাহিত্যে এক সাহসী ঔপনিবেশিকতা-বিরোধী কল্পনার গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।
এই অনুবাদের কাজে Mary Ellis Gibson-এর ‘Science Fiction in Colonial India, 1835–1905: Five Tales of Speculation, Resistance and Rebellion’ গ্রন্থটির সাহায্য নিয়েছি। সম্পূর্ণ গ্রন্থটির উৎসনির্দেশ দেওয়া হল—Mary Ellis Gibson (ed.), ‘Science Fiction in Colonial India, 1835–1905: Five Tales of Speculation, Resistance and Rebellion’, London and New York: Anthem Press, 2019।
প্রথম পর্ব
খুব বেশি দিনের কথা নয়। অতি সাম্প্রতিক কাল পর্যন্তও ওড়িশা প্রজাতন্ত্র ছিল ব্রিটিশ রাজমুকুটের অধীনে থাকা একটি ভূখণ্ড। উত্তরে বাংলার সীমান্ত থেকে দক্ষিণে সার্কার্সের প্রান্তসীমা পর্যন্ত তার বিস্তার; পশ্চিমে বেরার১, আর পূর্বে বঙ্গোপসাগরের বিস্তৃত জলরাশি ছিল তার স্বাভাবিক সীমানা। কিন্তু তখনকার সেই মানচিত্র আর আজকের মানচিত্র এক ছিল না। বহুদিন ধরেই ওড়িশার ভাগ্য যেন অন্যের হাতে লেখা হচ্ছিল। কখনও এক শাসকের অধীনে, কখনও অন্যের—তার বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে টুকরো টুকরো করে পার্শ্ববর্তী প্রশাসনের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছিল। ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সেই বিভাজন আরও সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। উপকূলের জনপদ, পাহাড়ি অঞ্চল আর অরণ্যবেষ্টিত দেশীয় রাজ্য—সব মিলিয়ে একটিমাত্র ভূখণ্ড হয়েও তারা যেন একই দেশের সন্তান বলে স্বীকৃতি পেত না। তবু দেশের স্মৃতি তো এত সহজে মুছে ফেলা যায় না। গ্রামের বৃদ্ধেরা তখনও পুরোনো দিনের কথা বলতেন, তাঁদের ছেলেবেলার। পাহাড়ের গায়ে, ধ্বংসপ্রায় দুর্গের প্রাচীরে, মন্দিরের পাথরে সর্বত্র যেন অতীতের কোনো হারিয়ে-যাওয়া স্বাধীনতার ছাপ লেগে ছিল। আর অরণ্যের গভীরে যারা বাস করত, সেই পার্বত্য মানুষদের মধ্যে বিদেশি শাসনের প্রতি বিরাগ কখনও সম্পূর্ণ নিভে যায়নি। এক বিদ্রোহ স্তিমিত হলে অন্য কোথাও আবার আগুন জ্বলে উঠত। প্রশাসনের নথিতে তাদের কেউ ছিল দস্যু, কেউ বিদ্রোহী, কেউ অশান্ত প্রজা। কিন্তু নিজেদের চোখে তারা ছিল কেবল পাহাড় ও অরণ্যের স্বাধীন মানুষ।
১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে প্রজাতন্ত্রের কংগ্রেসে একটি আইন পাশ হওয়ার পর দেশের সেই পুরোনো সীমারেখাও আর রইল না। পশ্চিম ও দক্ষিণ দিকে রাজ্যের সীমানা বহুদূর প্রসারিত হল—বেরারের বিস্তীর্ণ অঞ্চল এবং সমগ্র সার্কার্স এসে যুক্ত হল তার অধিকারে। পুর্বদিকেও সমুদ্রের পশ্চাদপসরণে জেগে ওঠা পলিমাটির নতুন ভূখণ্ড নিজের সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করে নিল ওড়িশা। যে দেশকে একদিন টুকরো টুকরো করে অন্যের শাসনের অধীনে পাঠানো হয়েছিল, সেই দেশই যেন এবার নিজের হারানো অঙ্গগুলি একে একে ফিরিয়ে নিচ্ছিল। অথচ আজ থেকে মাত্র সত্তর বছর আগেও এই দেশের চেহারা ছিল একেবারেই অন্যরকম। তখন এই মনোরম ভূখণ্ডে মানুষের চেয়ে অরণ্যেরই আধিপত্য বেশি ছিল। বিস্তীর্ণ বনভূমির মধ্যে বাস করত এক দুর্বল ও কৃপণ আদিবাসী জাতি। এখানে-সেখানে ছড়িয়ে ছিল অল্প কয়েকজন শ্বেতাঙ্গ বসতি-স্থাপনকারী, সঙ্গে দু-চারজন এশীয় বিদেশি। আর তাদের চারপাশের অন্তহীন অরণ্য জুড়ে ছিল বন্যপ্রাণীর অবাধ রাজত্ব। দিনের আলোয়ও সেই অরণ্যের পথ সহজে পাড়ি দেওয়া যেত না; সন্ধ্যা নামলে তো কথাই নেই। কোথাও হাতির পাল, কোথাও হিংস্র জন্তু, কোথাও অচেনা পাহাড়ি পথ—মানুষের পদচিহ্নের চেয়ে পশুর পদচিহ্নই ছিল সেখানে বেশি পরিচিত। জনপদ থেকে দূরে সরে গেলে সভ্যতার সমস্ত চিহ্ন যেন একে একে পিছনে পড়ে যেত।
তারপর এল ১৮৯৯ সালের সেই ভূমিকম্প। ইউরোপের কুসংস্কারাচ্ছন্ন জাতিগুলি বিশ্বাস করত, সেই ভূমিকম্প শুধু পৃথিবীর মাটিকেই কাঁপিয়ে দেয়নি—তার স্বভাব ও গঠনকেও আমূল বদলে দিয়েছিল। আর সত্যিই, সেই সময়ের পর থেকেই ওড়িশার অরণ্যে এক অদ্ভুত পরিবর্তন দেখা দিতে লাগল। বছরের পর বছর ধরে বনের বিপুল পশুপাল এমন দুর্বার গতিতে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে লাগল, যেন অরণ্যের নিজস্ব কোনো অদৃশ্য বিধান তাদের পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিচ্ছে। একসময় যে পথ দিয়ে বন্য পশুর পাল চলত, সেখানে মানুষের পদশব্দ শোনা যেতে লাগল। যে উপত্যকায় সন্ধ্যার পর কেউ যেতে সাহস করত না, সেখানেই ধীরে ধীরে গড়ে উঠল নতুন বসতি। কিন্তু মানুষ যত এগিয়ে এল, অরণ্য তত পিছিয়ে গেল—আর তার জায়গা নিল এমন এক জাতের মানুষ, যাদের সভ্যতার নিয়মে বেঁধে রাখা সহজ ছিল না।
ওড়িশার অন্তর্দেশে তখন নানা উপজাতির বিচরণ। তাদের মধ্যে কিংগারি২ অর্থাৎ এক বিশেষ পার্বত্য জাতি―যাদের নামই প্রতিবেশী কিংবা রাষ্ট্রশক্তির কাছে যথেষ্ট ছিল। পাহাড়ের গায়ে, ঘন অরণ্যের আড়ালে, দুর্গম উপত্যকায় তাদের ছোট ছোট বসতি। বাইরের মানুষের কাছে তারা ছিল রহস্যময় আর শাসকদের কাছে এক স্থায়ী আশঙ্কা। তাদের শক্তি কেবল সংখ্যায় ছিল না। অসাধারণ দৈহিক বলের সঙ্গে তাদের স্বভাবের মধ্যে ছিল এমন এক দুর্ধর্ষ সাহস ও নির্ভীকতা, যার তুলনা পৃথিবীর অন্য কোনো জাতির মধ্যে সহজে মেলে না। বৃহৎ দলে তারা অরণ্যপথে ঘুরে বেড়াত। কুঠার ও বর্শাই ছিল তাদের প্রধান অস্ত্র। তবে আশ্চর্যের বিষয়, নাগপুর রাইফেলের৩ মারণক্ষম ব্যবহারও তাদের অজানা ছিল না। কারও অসতর্কতা তাদের লোভকে প্ররোচিত করলেই হঠাৎ নেমে আসত তাদের আক্রমণ। ধনসম্পদ লুঠ হত, জনপদে আতঙ্ক ছড়াত, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা আবার অরণ্যের অন্ধকারে মিলিয়ে যেত। তাদের নামের সঙ্গে তাই ভয় জড়িয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ভয়ের আড়ালে আর-একটি সত্য ধীরে ধীরে জন্ম নিচ্ছিল। যে মানুষ নিজের পাহাড়, নিজের অরণ্য, নিজের স্বাধীনতাকে এত সহজে ছেড়ে দিতে জানে না, তাকে চিরদিন পরাধীন করে রাখার সাধ্য কার? কিংগারিদের নামের সঙ্গে নিষ্ঠুরতা, লুঠতরাজ ও রক্তপাতের কত কাহিনিই না জড়িয়ে ছিল। তবু ইতিহাসের কি বিচিত্র পরিহাস—যাদের নামেই আতঙ্ক, সেখানে স্বাধীনতার বিজয়পতাকায় তাদের নামই আজ গৌরবের সঙ্গে অঙ্কিত। কারণ ওড়িশা তার স্বাধীনতার জন্য ঋণী এই দুর্ধর্ষ কিংগারিদের কাছেই। তাদের দুঃসাহসিক অভিযানই একদিন এই দেশকে স্বাধীনতার পথে এগিয়ে দিয়েছিল।
সালটা ১৯১৬ সালের ২৫ জুন, ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী ফিলিবীটের৪ কাউন্সিল-চেম্বারে এমন একটি আইন পাশ হয়েছিল, যা ভারতীয় জনসাধারণের পরিশীলিত বিবেকের কাছে ছিল এক ঘৃণ্য অত্যাচারের নিদর্শন। আইনটির উদ্দেশ্য ছিল আপাতদৃষ্টিতে অত্যন্ত সরল। এই আইনানুযায়ী, ভারতীয় শ্রমিকদের নির্দিষ্ট মজুরি দিয়ে কাজে নিযুক্ত রাখার চেয়ে তাদের দাস হিসেবে প্রতিপালন করা সস্তা। এই হিসাবই নাকি তার ভিত্তি। অতএব সেই দিন থেকে ব্রিটিশ ভারতে আবার ফিরিয়ে আনা হবে দাসপ্রথা, পূর্বে প্রণীত সমস্ত নিষেধাজ্ঞা ও বিধানকে একপ্রকার অগ্রাহ্য করেই।
আইনের কাগজটিতে লেখা একবারে শুকিয়ে যাওয়া নদীর মতো কয়েকটি শুষ্ক বাক্য। কিন্তু সেই বাক্যগুলির আড়ালে ছিল অসংখ্য মানুষের জীবন। বাক্যগুলি খানিক এমন—
(১) কোনো ব্যক্তি ‘দাস’ এই দাবি তখনই আইনসম্মত বলে বিবেচিত হবে, যখন প্রমাণ করা যাবে যে সে এমন পিতা-মাতার সন্তান, যারা জন্মসূত্রে হিন্দু বলে পরিচিত ও স্বীকৃত এবং সে নিজের স্বেচ্ছায় তার স্বাধীনতা বিক্রি করেছে, অথবা তার পিতা-মাতা তার হয়ে সেই স্বাধীনতা বিক্রি করেছেন।
(২) পিতা-মাতাদের নিজের সন্তানকে বিক্রি করার অধিকার থাকবে এবং এইভাবে বিক্রি করা প্রত্যেক সন্তানকে দাস হিসেবেই গণ্য করা হবে।
(৩) আইনটির নিষ্ঠুরতা এখানেই শেষ হয়নি। এর পরের ধারাগুলিতে মানুষের স্বাধীনতাকে এমনভাবে পদদলিত করা হল, যেন একজন মানুষ আর মানুষ নয়—সে কেবল তার মালিকের সম্পত্তি।
(৪) দাসকে মালিকের ব্যক্তিগত সম্পত্তি বলেই গণ্য করা হবে। মালিক তার কাছ থেকে নিজের ইচ্ছামতো যে-কোনো কাজ আদায় করে নিতে পারবেন। তাকে কোথায়, কীভাবে, কার কাছে বা কোন কাজে ব্যবহার করবেন—সে সিদ্ধান্তও সম্পূর্ণ তাঁরই। দাসের নিজের ইচ্ছা, পছন্দ কিংবা আপত্তির সেখানে কোনো মূল্য নেই।
(৫) শাস্তির বিধানটিও ছিল তেমনি ভয়াবহ। কোনো মালিক যদি বিনা গুরুতর কারণে তার দাসকে প্রহার করেন, কিংবা তার সঙ্গে চরম দুর্ব্যবহার করেন, তবে সেই মালিকের শাস্তির ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু দাসের অপরাধ যদি সরকারের চোখে যথেষ্ট গুরুতর বলে বিবেচিত হয়, তবে তার জন্য অপেক্ষা করত আরও নির্মম পরিণতি—তাকে জ্বলন্ত লাল-গরম লোহা দিয়ে নির্যাতন করার অনুমতিও আইনে রাখা হয়েছিল। অর্থাৎ দাসের শরীরের ওপর মালিকের অধিকার ছিল, কিন্তু সেই শরীরের যন্ত্রণার কোনো অধিকার ছিল না।
(৬) আর মৃত্যুর পরেও সেই মানুষটির মুক্তি ছিল না। কোনো দাস যদি উত্তরাধিকার সংক্রান্ত কোনো লিখিত ব্যবস্থা না রেখেই মারা যেত, তবে তার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে তার সমস্ত সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়ে উঠত তার মালিক। তার জমি, ঘরবাড়ি, সঞ্চয়—জীবদ্দশায় যা কিছু তার নিজের বলে মনে করার সামান্য অধিকার ছিল, মৃত্যুর পর তার সবই চলে যেত সেই ব্যক্তির হাতে, যে তাকে জীবিত অবস্থায় নিজের সম্পত্তি বলে দাবি করত।
এই ছিল সেই নতুন আইনের বিধান। সেদিন কাউন্সিল-চেম্বারের ভিতরে হয়তো আইন পাশ হওয়ার পর কাগজে কলমে আর বিশেষ কিছুই ঘটেনি বা বদলায়নি। কিন্তু দেশের দূরবর্তী গ্রামগুলিতে, পাহাড়ের নিভৃত কুটিরে, অরণ্যের অন্ধকার পথের ধারে সেই খবর যখন পৌঁছল, তখন তার অর্থ মানুষ অন্যভাবে বুঝল।
তারা বুঝল, এবার শুধু জমি নয়, শুধু শ্রম নয়—মানুষের নিজের স্বাধীনতাটুকুও বিক্রির পণ্য হয়ে গেছে। আর তখনই, বহুদিন ধরে নিভু-নিভু জ্বলতে থাকা ক্ষোভের ভিতর কোথাও যেন প্রথম স্ফুলিঙ্গটি জ্বলে উঠল।
বিজয়ী আর বিজিতের মধ্যে যে ঘৃণ্য বিভাজন এই আইনের মাধ্যমে প্রকাশ্যে প্রতিষ্ঠিত হল, তা ভারতবাসীর আত্মমর্যাদায় গভীর আঘাত করল। অবশ্য ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ তখন নতুন কিছু ছিল না। বহুদিন ধরেই মানুষের মনে অসন্তোষ জমছিল। বিচারব্যবস্থার অসততা ও অদক্ষতা, সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের সীমাহীন দুর্নীতি, আর ভারতীয়দের সামনে সম্মানজনক চাকরি ও উচ্চপদে ওঠার পথ প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ করে রাখা—সব মিলিয়ে শাসকদের প্রতি মানুষের বিশ্বাস অনেক আগেই ক্ষয়ে গিয়েছিল। তবু এত কিছুর পরেও কোনো ঘটনা মানুষের মনে এমন তীব্র অসন্তোষ জাগাতে পারেনি, যা জাগাল এই অবিবেচনাপ্রসূত ও লজ্জাজনক আইনটি।
প্রথমে মানুষ প্রতিবাদ করল শান্তভাবে। দেশের নানা প্রান্ত থেকে সরকারের কাছে আবেদন যেতে লাগল। কোথাও অনুরোধ, কোথাও যুক্তি, কোথাও মানবিকতার দোহাই। সংবাদপত্রগুলিও এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে কলম ধরল। ‘Morning Star’, ‘Bengal Hurkaru’ এবং ‘Agra Gazette’ একসঙ্গে তুলে ধরল সেই ‘অসহায়, নিপীড়িত ভারত’-এর কথা। কিন্তু শাসকের দরবারে মানুষের আর্তি পৌঁছালেও তার প্রতিধ্বনি ফিরে এল না। আবেদন ব্যর্থ হল। অনুরোধ ব্যর্থ হল। সংবাদপত্রের তীব্র প্রতিবাদও ব্যর্থ হল। কিন্তু অনুরোধে যখন কোনো ফল হল না, তখন প্রতিবাদের ভাষাও ধীরে ধীরে বদলে গেল।
এবার সামনে এল ‘Indian Patriot’৫। এই পত্রিকা আর শাসকের বিবেকের কাছে করুণ আবেদন জানাল না। সরাসরি প্রশ্ন তুলল ব্রিটিশ সরকারের স্বেচ্ছাচারিতা নিয়ে। তাদের শাসনের অন্যায়, তাদের ক্ষমতার ঔদ্ধত্য—সবকিছুর বিরুদ্ধে উচ্চারিত হল তীব্র প্রতিবাদ। এমনকি ভবিষ্যতের দিকেও তাকিয়ে পত্রিকাটি ঘোষণা করল যে এই বিদেশি শাসনের পতন একদিন অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু সে শুধু পতনের ভবিষ্যদ্বাণী করেই থামল না। ভারতের ভবিষ্যৎ নিয়ে তার পাতায় শুরু হল এক নতুন চিন্তার সুর। অতীতের দিকে ফিরে তাকিয়ে পত্রিকাটি যেন দেশের বিস্মৃত শক্তিকে স্মরণ করিয়ে দিল। বহু যুগের ইতিহাসের গভীরে যে অদম্য প্রাণশক্তি সুপ্ত হয়ে আছে, তাকে জাগিয়ে তোলার আহ্বান জানানো হল। 'নিদ্রিত ভারত' এর প্রতিভা ও শক্তির প্রতি ছুড়ে দেওয়া হল সেই ডাক— “জেগে ওঠো, এই মাটিতে যে বিদেশি আধিপত্য শিকড় গেড়েছে, তাকে উপড়ে ফেলো।”
এই প্রতিটি অক্ষর, ভাষা ব্রিটিশ সরকারের সহ্য হল না। সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ওপর নেমে এল স্বৈরাচারী শাসকের কঠোর হাত। ‘Indian Patriot’-এর সম্পাদক, মালিক এবং মুদ্রাকর—তিনজনের বিরুদ্ধেই কারাবাসের আদেশ জারি হল। সরকার হয়তো ভেবেছিল, সম্পাদককে বন্দি করলেই তাঁর লেখা থেমে যাবে, ছাপাখানা স্তব্ধ হলেই মানুষের কণ্ঠও স্তব্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু তারা বুঝতে পারেনি—কিছু কথা কাগজে লেখা হলেও তা জীবন কাগজের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এই গ্রেপ্তারই যেন মানুষের দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভের বাঁধ ভেঙে দিল। এতদিন যে অসন্তোষ নিঃশব্দে মানুষের মনের মধ্যে ঘুরে বেড়িয়েছিল, এবার তা প্রকাশ্যে রাজপথে এসে দাঁড়াল। উত্তরে উঠল বিদ্রোহের ধ্বনি, দক্ষিণে তার প্রতিধ্বনি ফিরে এল। পূর্ব থেকে পশ্চিম—দেশের প্রায় সর্বত্র স্থানে একই সঙ্গে জেগে উঠল প্রতিরোধের আহ্বান। শুধু ফিলিবীট—সাম্রাজ্যের কেন্দ্র, শাসকের আসন—তখনও নীরব। কিন্তু রাজধানীর বাইরে ভারত আর স্থির নেই। প্রদেশের পর প্রদেশ আন্দোলিত হতে লাগল। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এসে দাঁড়াতে লাগল বিদ্রোহের পতাকার নীচে। যে আগুন এতদিন বিচ্ছিন্ন কয়েকটি হৃদয়ে জ্বলছিল, তা এবার এক বৃহৎ অগ্নিস্রোতের মতো ছড়িয়ে পড়তে শুরু করল। কৃষক, শ্রমিক, পাহাড়ি মানুষ—যে যার মতো করে সেই স্রোতে এসে মিশতে লাগল। আর সেই অগ্নিস্রোতের সম্মুখভাগে ছিল সেই নিবিড়, শান্ত, সুপ্তপ্রায় ওড়িশা।
সবার আগে এগিয়ে এল কিংগারিরা। যাদের নাম এতদিন উচ্চারিত হত আতঙ্কের সঙ্গে, সেই পাহাড়ি মানুষগুলিই এবার হয়ে উঠল বিদ্রোহের অগ্রদূত। সেই নামই এবার স্বাধীনতার সংগ্রামের প্রথম সারিতে উচ্চারিত হতে লাগল। অরণ্যের নিভৃত পথ পেরিয়ে তারা নেমে এল বৃহত্তর সংগ্রামের ময়দানে। ওড়িশার পাহাড়ে যে আগুন এতদিন গোপনে জ্বলছিল, এবার তার শিখা আর পাহাড়ের গণ্ডিতে আবদ্ধ রইল না। তার আলো দেখা গেল দূর-দূরান্তে।
দেশের বাতাস বিদ্রোহের গন্ধে ভারী হয়ে উঠলেও, ভারতীয় সেনাবাহিনীরা উপযুক্ত শর্তে সেই ভাঙন মেরামত করতে প্রস্তুত ছিল। অর্থাৎ, সামান্য কিছু ছাড়, সামান্য কিছু সমঝোতা—এইটুকুই হয়তো তখনও পরিস্থিতিকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে পারত। কিন্তু সরকারের মন তখন অন্যরকম। কুচবিহারের৬ সীমান্তে কয়েকটি বীরত্বপূর্ণ সাফল্য অর্জন করে তারা আত্মবিশ্বাসে এতটাই উজ্জীবিত হয়ে উঠেছিল যে দেশবাসীর দাবির সামনে সামান্যতম নতি স্বীকার করতেও তারা রাজি নয় একেবারেই। আর সেই প্রত্যাখ্যানের ক্ষত আরও গভীর করে দিল Government Advocate-এ প্রকাশিত একটি উদ্ধত প্রবন্ধ। সেখানে দেশপ্রেমিকদের সমস্ত চেষ্টা ও আত্মত্যাগকে কেবল অস্বীকারই করা হয়নি—তাদের আন্দোলনকে উপহাস করে এমনভাবে তুলে ধরা হয়েছিল, যেন স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাই তাদের অজ্ঞতা ও নির্বুদ্ধিতার প্রমাণ।
ভারতের দেশপ্রেমিকেরা যে সরকারের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তার চেয়ে সুস্পষ্ট নির্বুদ্ধিতার পরিচয় আর কী হতে পারে? চোখ-কান খোলা, বিবেচনাবোধসম্পন্ন যে কোনো মানুষই নিশ্চয় স্বীকার করবেন—এই বিদ্রোহের পথ কতখানি নিরর্থক। কেউ কি সত্যিই মনে করতে পারেন, আগামী বহু শতাব্দীর মধ্যেও ভারত তার বিজয়ীদের হাত থেকে সর্বময় ক্ষমতা ছিনিয়ে নিতে পারবে? কৃষ্ণাঙ্গ ও শ্বেতাঙ্গ জনসংখ্যার সংখ্যাগত পার্থক্য দেখলে বিদ্রোহের পরিণতি নিয়ে আশঙ্কা হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু সংখ্যার কথা বাদ দিলেও, যে দুই পক্ষ আজ পরস্পরের মুখোমুখি, তাদের দৈহিক ও মানসিক সাহসের তুলনা করলেই বোঝা যায়, ভারতীয়দের জন্য আমাদের ভয় পাওয়ার বিশেষ কারণ নেই। এক পাল ভেড়া যেমন ছুটে আসা চিতাবাঘকে পরাস্ত করতে পারে না, তেমনি একশো অশ্বারোহীকে সঙ্গে পেলেও ভীকু বারিকের৭ পক্ষে একা দুর্ধর্ষ ইংরেজের মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। কিন্তু ধরেই নেওয়া যাক, অসম্ভব কোনো উপায়ে ভারতীয়রা এই সংগ্রামে সফল হল। তাতেই বা কী লাভ? তাদের কি উচিত নয়, বরং ধৈর্য ধরে এমন একটি পথ বেছে নেওয়া, যে পথে অগ্রসর হতে হতে তারা একদিন জ্ঞানচর্চা, বুদ্ধিবৃত্তি এবং সভ্য সমাজের নিয়মকানুনে তাদের বিজয়ী শাসকদের সমকক্ষ হয়ে উঠতে পারে? স্বাধীনতা অর্জনের আগে সেই স্বাধীনতাকে কীভাবে শাসন ও রক্ষা করতে হয়—তার প্রাথমিক শিক্ষাটুকুও না নিয়ে সরাসরি স্বাধীনতার দাবি তোলা কি বুদ্ধিমানের কাজ? নাকি তারা আলাদিনের প্রদীপের দৈত্যদের মতো কল্পনা করছে যে, এক রাতের মধ্যেই তাদের প্রভুর জন্য এক রাজপ্রাসাদ গড়ে তোলা সম্ভব? জগমোহন, গোকুলদাস, ওপের্তি (Operti) কিংবা বৃন্দাবন সর্দারের৮ মতো লোকদের হাতে কি সত্যিই একটি সুবিশাল সাম্রাজ্যের শাসনভার তুলে দেওয়া যায়? ভারতের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা যে মহৎ—এ কথা অস্বীকার করা যায় না। এমন একটি আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হোক, এ প্রার্থনা করাও স্বাভাবিক। কিন্তু সেই স্বাধীনতার ভিত্তি গড়ে তুলতে সময়ের প্রয়োজন। একটি সুদৃঢ় রাষ্ট্র একদিনে তৈরি হয় না। বহুল চর্চিত প্রবাদ আছে ‘Rome was not built in a day’। ব্রিটিশ শাসনের অধীনে হিন্দুরা যে উন্নতি করেছে এবং ভবিষ্যতেও করবে—তাদের অকৃতজ্ঞতা সত্ত্বেও এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। একশো বা দুশো বছর পিছিয়ে তাকান সেই সময়ের ভারতকে আজকের ভারতের সঙ্গে তুলনা করুন। তখন নিজের চোখেই দেখতে পাবেন, ব্রিটিশ শাসন এ দেশের জন্য কতখানি পরিবর্তন নিয়ে এনেছে। অতএব, এখনও ভারতীয়রা স্বাধীন জাতি হওয়ার উপযুক্ত হয়ে ওঠেনি। হয়তো সময়ের স্রোত একদিন এমন একটি মুহূর্ত নিয়ে আসবে, যখন ভারতীয়দের স্বাধীনতার অধিকার অস্বীকার করা অন্যায় হবে। হয়তো তখন তাদের সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত করে রাখাও আর সম্ভব হবে না। আর সেদিন ইংল্যান্ডও হয়তো ন্যায়সঙ্গত ও যথোচিত মনে করে ভারতের ওপর থেকে তার সার্বভৌম অধিকার প্রত্যাহার করে নেবে। আসলে হিন্দুরা শিশুর মতো। তারা এমন সব জিনিস চায়, যার প্রকৃত অর্থ বা প্রয়োজন তারা নিজেরাই বোঝে না। আর যখন তাদের সেই ইচ্ছা পূরণ করা হয় না, তখন তারা অভিমান করে, বিরক্ত হয়; কেউ তাদের কথায় কান না দিলে শেষে শিশুর মতোই কেঁদে ওঠে।
সরকারের মুখপত্রের এই কথাগুলির মধ্যে যে আত্মতুষ্টি ও অবজ্ঞা মিশে ছিল, তা দেশবাসীর ক্ষোভকে আরও উসকে দিল। তারা বুঝতে পারল—যে শাসককে এতদিন অনুরোধ করে, যুক্তি দিয়ে, ন্যায়বিচারের কথা স্মরণ করিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে, তার চোখে প্রজাদের দাবি কেবল শিশুর আবদারমাত্র।
সরকারি আইনটির কোন অংশটি এতখানি আপত্তিকর—এই প্রশ্নও তোলা হল। বলা হল, দাসত্বের সেই কঠোরতম রূপ তো আর আইনে রাখা হয়নি; সাধারণ শ্রমিকের যে দুর্দশা, একজন দাসের অবস্থাও নাকি তার চেয়ে খুব বেশি নিকৃষ্ট নয়। এমনকি তাকে প্রায় স্বাধীন শ্রমিকের মতোই বিবেচনা করা হয়েছে—তাহলে এত ক্ষোভ কেন? আর ইউরোপীয়দের দাস করা হল না কেন? তার উত্তরটিও যেন সেই ঔদ্ধত্যের সঙ্গেই দেওয়া হল—কারণ ‘তোমরা বিজিত আর আমরা বিজয়ী।’
এই একটি বাক্যেই যেন সমগ্র শাসনব্যবস্থার অন্তর্নিহিত সত্যটি নগ্ন হয়ে উঠেছিল। এতদিন যে বৈষম্য নানা আইন, বিধি ও প্রশাসনিক রীতির আড়ালে ঢাকা ছিল, এবার তা সরাসরি উচ্চারিত হল। শাসক ও শাসিতের মধ্যে যে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তার ভিত্তি ন্যায় নয়—বিজয় এবং পরাজয়। তবু বিদ্রোহী নেতাদের উদ্দেশে শেষবারের মতো এক অদ্ভুত প্রস্তাব রাখা হল। তাঁদের আদেশ দেওয়া হল—বিদ্রোহের পতাকা নামিয়ে সৈন্যদল ভেঙে দিতে ও রাজধানীতে এসে সরকারের সামনে নতজানু হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করতে। হয়তো তখন গভর্নর-জেনারেল-ইন-কাউন্সিল তাঁদের অপরাধ ক্ষমা করার কথা বিবেচনা করবেন। তবে তারও একটি শর্ত ছিল। গভর্নর-জেনারেলের পরিবারের জন্য একটি নতুন প্রাসাদ নির্মাণের ব্যয়ভার বহনের মতো যথেষ্ট অর্থ যদি তাঁরা সংগ্রহ করে দিতে পারেন, তবে তাঁদের অপরাধ ক্ষমার সম্ভাবনা নাকি একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না! এই প্রস্তাবের মধ্যে যে বিদ্রূপ, যে নির্মম অবমাননা, তা আর কারও বুঝতে বাকি রইল না। স্বাধীনতার জন্য যারা প্রাণপণ লড়ছে, তাদের কাছে ক্ষমার মূল্য নির্ধারিত হচ্ছে শাসকের প্রাসাদের ইট-পাথরে। তারপরও তাদের সতর্ক করা হল—সময় থাকতে আত্মসমর্পণ করাই ভালো। কারণ বেশি দেরি হলে আর ক্ষমার সুযোগ থাকবে না। স্যার জর্জ প্রাউডফুট তখন কুচবিহারের সীমান্তে সৈন্যসমাবেশ করছেন। সেখান থেকে তাঁর বাহিনী যেকোনো মুহূর্তে বীরভূমের৯ দিকে অগ্রসর হতে পারে।
এরপর ২৯ ডিসেম্বর, ১৯১৭ তারিখে প্রকাশিত এই নিবন্ধটি বিদ্রোহী নেতাদের মনে যে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল, তার আঁচ শীঘ্রই চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। দেশের অন্যতম প্রধান দেশপ্রেমিক ও সেই কিংগারীদের নেতা ভীকু বারিক আর নিজেকে সংযত রাখতে পারলেন না। তীব্র বিদ্রূপের সুরে তিনি বললেন—“আমার সওয়াররা যদি পাগল হয়ে ওঠা শয়তানের মুখোমুখি হতে পারে, তবে মাতাল ইংরেজের সামনে দাঁড়াতে ভয় পাবে কেন? সে ইংরেজ হোক, স্কচ হোক কিংবা আইরিশ—তাতে আমাদের কিছু এসে যায় না!”
—
শশীচন্দ্র দত্তের ছবি: https://en.wikisource.org
টীকা
- ১.এই সময়ে বেরার ছিল ব্রিটিশ শাসিত সেন্ট্রাল প্রভিন্সেসের অন্তর্ভুক্ত। ১৮৫৩ সাল পর্যন্ত অঞ্চলটি হায়দরাবাদের নিজামের অধীনে ছিল; এরপর ব্রিটিশরা এর প্রশাসনিক ভার নিজেদের হাতে তুলে নেয়। বর্তমানে বেরার মহারাষ্ট্র রাজ্যের অন্তর্গত। এখানে মূলত বোঝানো হয়েছে যে, ভবিষ্যতের ওড়িশা প্রজাতন্ত্রের বিস্তৃতি তার ঔপনিবেশিক পূর্বসূরি ওড়িশার তুলনায় অনেক বেশি। ‘সার্কার’—অর্থাৎ নর্দার্ন সার্কারস বা ‘সারকার’ নামে পরিচিত অঞ্চলগুলি ছিল সমুদ্রতীরবর্তী এক দীর্ঘ ভূখণ্ড, যা অষ্টাদশ শতাব্দী থেকে শুরু হওয়া একাধিক সন্ধি, চুক্তি ও কূটনৈতিক আলোচনার ধারাবাহিকতায় শেষ পর্যন্ত হায়দরাবাদের নিজামের কাছ থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সরাসরি নিজেদের অধিকারে নিয়ে আসে; ১৮২৩ সালে সেই অধিকার সম্পূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠিত হয়।
- ২.২০০১ সালের জনগণনা অনুযায়ী, ওড়িশার জনসংখ্যার এক-পঞ্চমাংশ ছিল তফসিলভুক্ত জনজাতি। তবে ‘কিংগারী’ নামে কোনো জনজাতির উল্লেখ সরকারি তালিকায় নেই। শশীচন্দ্র দত্তের ‘Wild Tribes of India’ (লন্ডন, Thomas de la Rue, ১৮৮২) গ্রন্থেও তাদের উল্লেখ নেই। তবে তাঁর বর্ণিত ‘wild tribes’-দের সঙ্গে এখানকার জনজাতিদের মিল আছে। শশীর মতে, তারা অত্যাচার ঘৃণা করত। দাসত্ব ও স্বৈরাচারের প্রতি তাদের ছিল প্রবল বিরাগ। শশী হয়তো কিংগারীদের পিণ্ডারিদের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। পিণ্ডারিরা ছিল বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর অনিয়মিত অশ্বারোহী বাহিনী। অষ্টাদশ শতকে তারা মারাঠা সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুক্ত ছিল। লুঠতরাজ করে তারা নিজেদের সমৃদ্ধ করত এবং মারাঠা বাহিনীকে রসদ জোগাত।
- ৩.‘নাগপুর রাইফেল’ শশীচন্দ্র দত্তের কল্পিত অস্ত্র। মহারাষ্ট্রের নাগপুর শহরের নামে এর নামকরণ। ১৮৪৫ সালে ব্রিটিশ সেনাবাহিনী ব্রিটেনে তৈরি মাস্কেট ও রাইফেল ব্যবহার করত। রাইফেল ছিল বেশি নির্ভুল। ছোটখাটো সংঘর্ষ ও দূরপাল্লার নিশানায় তা কার্যকর ছিল। জনজাতীয় যোদ্ধাদের যুদ্ধকৌশলের সঙ্গেও এটি মানানসই। শশী হয়তো টিপু সুলতানের উন্নত রকেট-প্রযুক্তির কথাও মনে রেখেছিলেন। ১৭৬৭–১৭৯৯ সালের চারটি মহীশূর যুদ্ধে টিপুর রকেট ছিল বিখ্যাত। ইউরোপীয় প্রযুক্তির তুলনায় তা যথেষ্ট উন্নত ছিল।
- ৪.ফিলিবিট (Philibit) বর্তমানে উত্তরপ্রদেশের অন্তর্গত। এখানে বিস্তীর্ণ বনভূমি রয়েছে। জনজাতীয় মানুষের সংখ্যাও এখানে বেশি। বর্তমান জেলার উত্তর সীমান্ত নেপালের সঙ্গে যুক্ত।
- ৫.এই কাহিনি ১৮৪৫ সালে লেখা ও প্রথম প্রকাশিত হয়। অর্থাৎ ‘Hindu Patriot’ পত্রিকার অস্তিত্বেরও অনেক আগে। তাই এখানে সেই পত্রিকার উল্লেখ থাকার কথা নয়।
- ৬.কুচবিহার (Cooch Behar) ব্রিটিশ আমলে একটি দেশীয় রাজ্য ছিল। বর্তমানে এটি পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্গত। রাজ্যটি হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত।
- ৭.ওড়িশার কিংগারীদের প্রধান। সওয়ার বলতে এখানে অশ্বারোহী বা দেশীয় অশ্বারোহী বাহিনীর কর্মকর্তাকে বোঝানো হয়েছে।
- ৮.‘জুগ্গোমোহুন’ বলতে জগমোহন এবং ‘গোকুলদাসেস’ বলতে গোকুল দাসকে বোঝানো হয়েছে। ‘ওপের্তি’ সম্ভবত পর্তুগিজ বংশোদ্ভূত ভারতীয়দের ইঙ্গিত করে। ‘বিন্দাবুন’ হল মথুরার বৃন্দাবন। বাংলায় ‘সর্দার’ বলতে ভৃত্য বা পালকি-বাহকদের দলনেতাকেও বোঝানো হতে পারে। তবে সামরিক ক্ষেত্রে এটি সেনানায়ক বা দলনেতার অর্থেও ব্যবহৃত হয়। শশী এখানে ভারতীয় নামের ব্রিটিশ বিকৃত উচ্চারণ এবং বাঙালিদের প্রতি ব্রিটিশ ঔদ্ধত্য—দুটিকেই ব্যঙ্গ করেছেন। যেন বাঙালিরা কেবল ভৃত্য, আর অন্যান্য ভারতীয়ও তাদের চোখে তুচ্ছ।
- ৯.বাংলার বীরভূম জেলা।

অনুবাদক
মেঘা সিনহা
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০২৪ সালে তুলনামূলক সাহিত্য বিষয়ে স্নাতক এবং ২০২৬ সালে সদ্য স্নাতকোত্তর সম্পন্ন হয়েছে। বিভিন্ন ভাষার সাহিত্য পড়ার পাশাপাশি ভারতীয় নানা ভাষার আঞ্চলিক বই সংগ্রহ ও অনুবাদের প্রতি তার ঝোঁক। বিশ্ব সাহিত্য, বিভিন্ন দেশি-বিদেশী ভাষা ও সংস্কৃতির বিশাল পরিসরই মূলত তাঁর আগ্রহের বিষয়। বিভিন্ন ভাষার সাহিত্য পড়া, সংগ্রহ করা ও অনুবাদের মধ্য দিয়েই নিজের পাঠ ও লেখার জগৎকে ক্রমশ বিস্তৃত করতে উৎসুক।
সব কাজ দেখুন →সংখ্যা ১-এর অন্যান্য লেখা
সংখ্যা ১সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়
“কম্পিউটার, ই-মেল এবং ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট হ্যাক করা নিয়ে অনেক আলোচনা হয়। কিন্তু আমরা এখন এমন এক যুগে প্রবেশ করেছি যেখানে মানুষকেও হ্যাক করা সম্ভব।” ‘উই আর বিকামিং হ্যাকেবল অ্যানিমেলস’—হাড়হিম করে দেওয়া এক বাস্তবতার কথা আমাদের বলেছেন হারারি।
সংখ্যা ১গল্পস্বল্প
বোতাম
সবকিছু যখন এক ক্লিকে বদলে যায়, তখন কিছু মানুষ নিঃশব্দে পাহারা দেয় তাদের চিরপুরাতন বিশ্বাস। সুতো আর মায়া দিয়ে পার্বতীদি কী বুনে চলেছেন দিনরাত? কাগজের মতো সহজে ছিঁড়ে যাওয়া সম্পর্কের ভিড়ে, বুকের ভেতরে সামান্য কাপড় বাঁচিয়ে রাখার এক মায়াবী আখ্যান ‘বোতাম’।
সংখ্যা ১পুরাতনী
ওড়িশা প্রজাতন্ত্র—বিংশ শতাব্দীর ইতিবৃত্তের এক বিস্মৃত পৃষ্ঠা: দ্বিতীয় পর্ব
১৮৪৫ সালে লেখা ১৯২৫ সালের এক কাহিনি। এক বিকল্প ইতিহাস। বিদ্রোহের গল্প। এক ভবিষ্যতের উড়িষ্যার গল্প। যে উড়িষ্যা একদিন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীন প্রজাতন্ত্রে পরিণত হবে। কিন্তু সেই স্বাধীনতার পথ মসৃণ নয়; তার ভিতর লুকিয়ে আছে অরণ্যের গভীরে জমে থাকা ক্ষোভ, হারিয়ে যাওয়া স্বাধীনতার স্মৃতি এবং পাহাড়ি মানুষের অদম্য আত্মমর্যাদা। শশীচন্দ্র দত্তের এই কল্প-ভবিষ্যতের কাহিনি যেন উনিশ শতকের ঔপনিবেশিক বাস্তবতার এক প্রতিবিম্ব; স্বাধীনতার স্বপ্ন কীভাবে প্রতিরোধের ভাষা খুঁজে পায়, তার এক রোমাঞ্চকর আখ্যান।
ওড়িশা প্রজাতন্ত্র—বিংশ শতাব্দীর ইতিবৃত্তের এক বিস্মৃত পৃষ্ঠা ধারাবাহিকের অন্যান্য পর্ব
সংখ্যা ১পুরাতনী
ওড়িশা প্রজাতন্ত্র—বিংশ শতাব্দীর ইতিবৃত্তের এক বিস্মৃত পৃষ্ঠা: দ্বিতীয় পর্ব
১৮৪৫ সালে লেখা ১৯২৫ সালের এক কাহিনি। এক বিকল্প ইতিহাস। বিদ্রোহের গল্প। এক ভবিষ্যতের উড়িষ্যার গল্প। যে উড়িষ্যা একদিন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীন প্রজাতন্ত্রে পরিণত হবে। কিন্তু সেই স্বাধীনতার পথ মসৃণ নয়; তার ভিতর লুকিয়ে আছে অরণ্যের গভীরে জমে থাকা ক্ষোভ, হারিয়ে যাওয়া স্বাধীনতার স্মৃতি এবং পাহাড়ি মানুষের অদম্য আত্মমর্যাদা। শশীচন্দ্র দত্তের এই কল্প-ভবিষ্যতের কাহিনি যেন উনিশ শতকের ঔপনিবেশিক বাস্তবতার এক প্রতিবিম্ব; স্বাধীনতার স্বপ্ন কীভাবে প্রতিরোধের ভাষা খুঁজে পায়, তার এক রোমাঞ্চকর আখ্যান।
আরও পড়ুন
সংখ্যা ১পুরাতনী
ওড়িশা প্রজাতন্ত্র—বিংশ শতাব্দীর ইতিবৃত্তের এক বিস্মৃত পৃষ্ঠা: দ্বিতীয় পর্ব
১৮৪৫ সালে লেখা ১৯২৫ সালের এক কাহিনি। এক বিকল্প ইতিহাস। বিদ্রোহের গল্প। এক ভবিষ্যতের উড়িষ্যার গল্প। যে উড়িষ্যা একদিন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীন প্রজাতন্ত্রে পরিণত হবে। কিন্তু সেই স্বাধীনতার পথ মসৃণ নয়; তার ভিতর লুকিয়ে আছে অরণ্যের গভীরে জমে থাকা ক্ষোভ, হারিয়ে যাওয়া স্বাধীনতার স্মৃতি এবং পাহাড়ি মানুষের অদম্য আত্মমর্যাদা। শশীচন্দ্র দত্তের এই কল্প-ভবিষ্যতের কাহিনি যেন উনিশ শতকের ঔপনিবেশিক বাস্তবতার এক প্রতিবিম্ব; স্বাধীনতার স্বপ্ন কীভাবে প্রতিরোধের ভাষা খুঁজে পায়, তার এক রোমাঞ্চকর আখ্যান।
সংখ্যা ১পুরাতনী
১৯৪৫ সালের এক ৪৮ ঘন্টার জার্নাল: অন্তিম পর্ব
বিশ্বাসঘাতকতার ছায়া, এসপ্ল্যানেডে কামানের গর্জন আর বধ্যমঞ্চে এক অমর বিপ্লবীর শেষ বার্তা! প্রথম লড়াইয়ের প্রাথমিক জয় কি শেষ পর্যন্ত টিকবে? একদিকে ভাইসরয়ের গোপন সামরিক চক্রান্ত ও অতিরিক্ত সেনার আক্রমণ, অন্যদিকে সহযোদ্ধাদের একের পর এক মৃত্যুবরণ— এমনই এক সঙ্কটময় মুহূর্তে গর্জে উঠল কেল্লার কামান। রক্তক্ষয়ী এক অসম যুদ্ধ আর শিরশ্ছেদের মঞ্চে দাঁড়িয়েও এক তরুণের কণ্ঠে স্বাধীনতার জয়গান। পরাধীন ভারতে লেখা ভবিষ্যৎ-বিপ্লবের এক বিস্মৃত আখ্যানের মর্মস্পর্শী অন্তিম পর্ব।
সংখ্যা ১পুরাতনী
১৯৪৫ সালের এক ৪৮ ঘন্টার জার্নাল: প্রথম পর্ব
১৮৩৫ সালে বসে এক অষ্টাদশবর্ষীয় তরুণের কল্পনায় দেখা ১৯৪৫-এর ভারত! ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সূচনাপর্বের বহু আগেই কল্পবিজ্ঞানের ধাঁচে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে এক দুঃসাহসিক বিদ্রোহের স্বপ্ন দেখেছিলেন হিন্দু কলেজের কৃতী ছাত্র কৈলাস চন্দ্র দত্ত। ঔপনিবেশিক শৃঙ্খল চূর্ণ করবার সশস্ত্র সংকল্পে গর্জে উঠেছিল গল্পের নায়ক ভুবনমোহনের কণ্ঠ। রক্তক্ষয়ী সংঘাত আর এক অসম যুদ্ধের সূচনা—কী ঘটেছিল সেই ঐতিহাসিক সন্ধ্যায়? পরাধীন ভারতের প্রথম বিদ্রোহী কল্পকাহিনীর শ্বাসরুদ্ধকর সূচনা পড়ুন প্রথম পর্বে।

