আত্মকথা ও অন্যান্য কবিতা
হারিয়ে যাওয়া, থেকে যাওয়া এবং তাদের মাঝখানে জন্ম নেওয়া স্মৃতির এক অদৃশ্য ভূগোল কখনও শব্দে, কখনও স্বপ্নে, কখনও রাগে, কখনও দাগে—কবি খুঁজে ফেরেন। এখানে সৌন্দর্যের পাশে নিঃশব্দে বসে থাকে বিষণ্ণতা, আকাঙ্ক্ষার পাশে অনিবার্য দূরত্ব, আর শৈল্পিক সৌন্দর্যের আড়ালে উঁকি দেয় জীবনের ক্ষত। সে চলে যায় রেখে যায় ক্ষীণ অথচ গভীর কোনো চিহ্ন। হাঁসের চলে যাওয়া পথের মতো—দাগ মুছে যায়, অথচ কোনো একদিন সেই জলের বুকেই শালুক ফুটে ওঠে।

সংখ্যা ১আত্মকথা
যৌবনের শুরুর দিনগুলোতে কীভাবে যেন নিয়তি-নির্দেশিত কুহকে পথ-ভুলে একটা যাদু-জগতে ঢুকে পড়েছিলাম। তারপর থেকে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সবকিছুই কেমন রঙ পাল্টে পাল্টে বে-চ্যান করে তোলে। দেখি ধ্বনির ভেতরে স্বর-ব্যঞ্জন ঘুমিয়ে থাকে। সোনার কাঠি খুঁজে এনে ছুঁইয়ে দিতে হয়। সে এক অতলপুরী। সেখানে শব্দের ভেতরে থাকে জল। কলসি ডুবিয়ে দেখি কলসির ভেতরে জল বাইরেও জল। এই মায়া নিরন্তর আচ্ছন্ন করে রাখে। দুটিমাত্র কান সহস্র শ্রুতিসামর্থ্যে প্রখর হয়ে থাকে। শুনতে পাই বহুচারিণী কবিতার সঙ্গলিপ্সার আর্তি। মুক্তি কীসে? মাটি নিয়ে লীলাখেলা-করা কাজ। তাই মৃণ্ময়ী প্রতিমা নির্মাণে প্রতিটি খাঁজ রচনায় শিল্পী কীভাবে দমন করে শ্বাস—সে কৌশল আমি বুঝতে চেষ্টা করেছি। চোখ বন্ধ করলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে মূর্তির নিকট রূপ। ভয় পেয়ে চোখ খুলে ফেলি। তারপর রক্ত-মাংস-স্বেদ-এর উপর অঞ্চল টেনে দিই, দিব্য-তিলকে ললাট লিখি। এর বাইরে আর কিছু দেখিনি আমি। কিছুই দেখিনি আর।
ময়ূর
সব ধান কেটে নেওয়ার পর ধানক্ষেত ভরে ওঠে সোনালী অভাবে—সেইটুকু আমার কথা; পাখপাখালি খুঁটে খুঁটে খায়। গতজন্ম থেকেই আমি কথা বলতে পারিনা সেভাবে। যা-কিছু বাকি রয়ে গেছে তা সুগন্ধি ক্ষমার মতো সন্ধের আকাশ। ওই আকাশে তোমার মৃতবৎ মুখের আদলে একটা ফোলা-ফাঁপা চাঁদ ওঠে। স্বপ্নে তোমার মৃত্যুর কথা আমি কাউকে বলতে পারিনা।
বলতে পারিনা স্বপ্নে কেমন করে দেখে ফেলি গভীর জঙ্গলে যুযুধান সাপ আর ময়ূর; সেই সাপ ডিঙিয়ে আমি ময়ূরের কাছাকাছি যেতে পারছি না কিছুতেই। ময়ূর আমার ঈপ্সিত। পালকও আমার ঈপ্সিত। অথচ ওই সাপ! আঁতকে উঠে ঘুম ভেঙে যায়। এতকিছুর পর আমি সত্যিই কথা বলতে পারিনা আর।
আমার হয়ে আজকাল ভরপুর বেঁচে আছে অন্য আর এক জন।
লোকটা খেটেখুটে অন্ধত্ব উপার্জন করেছে ভিখারি হবে বলে।
সে পার্কে এসে হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান গায়।
দেখা পেলে তাকে দুটো পয়সা দিও তুমি। আ
মি ওর খুচরোর ভেতর ঠুনকো করুণা হয়ে
বেঁচে থাকি রোজ
বিজয়া দশমী, ১৪৩২
সবুজাভ শাড়ি ঈষৎ-নম্র রঙে ঘিরেছে কমনীয় দেহলতা; ভঙ্গিমাটি মরালশ্রেণির
সাদা শেমিজে আধেক-প্রকাশ সুডৌল গৌর-কোমল বাহুদুটি;
তবু যা পড়েনি চাপা ইতস্তত গৌর-আক্ষেপ—গৌর-আক্ষেপ তার মণিবন্ধদুটি
পক্ববিম্ব ওষ্ঠাধরে মনোলোভা ভরাট মুখখানি যেন মোমের শিখা: শান্ত দহন
ঠিক মধ্যিখানে, তার ললাটরেখা-’পরে
একবিন্দু কৃষ্ণ
তথা কৃষ্ণময় টিপ
এমন সুন্দর মেয়ে আমাদের ঈপ্সিত
এমন কালো-টিপ-পরা মেয়ে
আমাদের ঈপ্সিত সুচারু দুঃখের মতো
পাঠক
প্লাটফর্মে বসে একমনে ছবি আঁকছে একটি ছেলে, মনে হয় আর্ট-কলেজের। ছবির সাবজেক্ট ওর সামনেই কিছুটা দূরে শুয়ে-থাকা একটা কুকুর; কুকুরটার গা-ভর্তি দগদগে ঘা। একটু একটু করে স্পষ্ট হয়ে উঠছে ছবি। পাশে বসে আর-একটা লোক উদগ্রীব হয়ে চকচকে চোখে ছবি-আঁকাটা দেখছে অনেকক্ষণ থেকে। রঙে রঙ মিলিয়ে একসময় আর্ট-পেপারে জ্যান্ত হয়ে উঠল ঘেয়ো কুকুরটা। পাশে-বসা লোকটা যেন কিছুটা আনমনেই বলে উঠল, ‘বাহ্ চমৎকার!’
দাগ
হাঁস চলেছে পুকুরে
মাঝেমাঝে ডুব দিয়ে তুলে আনছে একটা-দু’টো শামুক-গুগুলি
তারপর আবার ভেসে চলেছে সামনে
যত এগিয়ে যাচ্ছে পিছুপিছু মিলিয়ে যাচ্ছে দাগ
এইসব দাগ থাকে না
হাঁসও থাকে না একদিন
শুধু তার চলে-যাওয়া পথ মনে রেখে
জলের বুকে
মাঝেমধ্যে একটা-দুটো শালুক ফুটে ওঠে

লেখক
সত্যসাধন মণ্ডল
বিশ্বভারতীর প্রাক্তনী। লেখার বিষয় মূলত কবিতা। পত্র-পত্রিকা ও ফেসবুকে নিয়মিত লেখালেখি করেন। ইতিপূর্বে উর্ণপত্র থেকে প্রকাশিত হয়েছে ‘ঈশ্বরের জন্য লেখা কবিতা’ নামে একটি কাব্যগ্রন্থ। তাঁর ঘোষণা অনুসারে—মানুষ আর সাপে ভয় পান, প্রাতিষ্ঠানিক ভূত-ভগবানের বিষয়টি বুঝতে পারেন না এবং উপনিষদ মানেন।
সব কাজ দেখুন →সংখ্যা ১-এর অন্যান্য লেখা
সংখ্যা ১সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়
“কম্পিউটার, ই-মেল এবং ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট হ্যাক করা নিয়ে অনেক আলোচনা হয়। কিন্তু আমরা এখন এমন এক যুগে প্রবেশ করেছি যেখানে মানুষকেও হ্যাক করা সম্ভব।” ‘উই আর বিকামিং হ্যাকেবল অ্যানিমেলস’—হাড়হিম করে দেওয়া এক বাস্তবতার কথা আমাদের বলেছেন হারারি।
সংখ্যা ১গল্পস্বল্প
বোতাম
সবকিছু যখন এক ক্লিকে বদলে যায়, তখন কিছু মানুষ নিঃশব্দে পাহারা দেয় তাদের চিরপুরাতন বিশ্বাস। সুতো আর মায়া দিয়ে পার্বতীদি কী বুনে চলেছেন দিনরাত? কাগজের মতো সহজে ছিঁড়ে যাওয়া সম্পর্কের ভিড়ে, বুকের ভেতরে সামান্য কাপড় বাঁচিয়ে রাখার এক মায়াবী আখ্যান ‘বোতাম’।
সংখ্যা ১পুরাতনী
ওড়িশা প্রজাতন্ত্র—বিংশ শতাব্দীর ইতিবৃত্তের এক বিস্মৃত পৃষ্ঠা: দ্বিতীয় পর্ব
১৮৪৫ সালে লেখা ১৯২৫ সালের এক কাহিনি। এক বিকল্প ইতিহাস। বিদ্রোহের গল্প। এক ভবিষ্যতের উড়িষ্যার গল্প। যে উড়িষ্যা একদিন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীন প্রজাতন্ত্রে পরিণত হবে। কিন্তু সেই স্বাধীনতার পথ মসৃণ নয়; তার ভিতর লুকিয়ে আছে অরণ্যের গভীরে জমে থাকা ক্ষোভ, হারিয়ে যাওয়া স্বাধীনতার স্মৃতি এবং পাহাড়ি মানুষের অদম্য আত্মমর্যাদা। শশীচন্দ্র দত্তের এই কল্প-ভবিষ্যতের কাহিনি যেন উনিশ শতকের ঔপনিবেশিক বাস্তবতার এক প্রতিবিম্ব; স্বাধীনতার স্বপ্ন কীভাবে প্রতিরোধের ভাষা খুঁজে পায়, তার এক রোমাঞ্চকর আখ্যান।
আরও পড়ুন
সংখ্যা ২গল্পস্বল্প
কর্নেলের ঘরে যে নদীটা থাকত
বিষ্ণুপুরের তিনশো বছরের পুরোনো বাড়িতে একাকী কর্নেল শশাঙ্কবাবুর শোবার ঘরের মাঝখান দিয়ে বয়ে যেত এক জীবন্ত নদী। সেই নদীই ছিল তাঁর নিঃসঙ্গ জীবনের আশ্রয়। কিন্তু এক জন্মদিনে নদী তাঁর অতীতকে বুকে নিয়ে মিলিয়ে গেলে স্তব্ধ হয়ে যায় কর্নেলের ঘর। হারানো নদীটকে ফিরে পাওয়ার তীব্র জেদে শুরু হয় খনন।
সংখ্যা ১গল্পস্বল্প
বোতাম
সবকিছু যখন এক ক্লিকে বদলে যায়, তখন কিছু মানুষ নিঃশব্দে পাহারা দেয় তাদের চিরপুরাতন বিশ্বাস। সুতো আর মায়া দিয়ে পার্বতীদি কী বুনে চলেছেন দিনরাত? কাগজের মতো সহজে ছিঁড়ে যাওয়া সম্পর্কের ভিড়ে, বুকের ভেতরে সামান্য কাপড় বাঁচিয়ে রাখার এক মায়াবী আখ্যান ‘বোতাম’।
সংখ্যা ১গল্পস্বল্প
নিশ্চিন্তপুরের রূপকথা
১৯২৩ সালে ইছামতীর তীরের এক প্রত্যন্ত গ্রামে কাঠের বাক্সে বন্দি হয়ে আসে এক মণ ওজনের এক বরফের চাঁই। বাড়ির সর্বেসর্বা কাদম্বিনী দেবীর অমোঘ ইচ্ছায় যে বরফ প্রখর গ্রীষ্মের দাবদাহেও এক ফোঁটাও গলে না। দীর্ঘকাল ধরে উঠোনের তুলসীমঞ্চের পাশে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা সেই বরফ হয়ে ওঠে আস্ত একটা গ্রামের সময়, স্মৃতি ও নিয়তির অলৌকিক ঘড়ি।
