১৯৪৫ সালের এক ৪৮ ঘন্টার জার্নাল: অন্তিম পর্ব
বিশ্বাসঘাতকতার ছায়া, এসপ্ল্যানেডে কামানের গর্জন আর বধ্যমঞ্চে এক অমর বিপ্লবীর শেষ বার্তা! প্রথম লড়াইয়ের প্রাথমিক জয় কি শেষ পর্যন্ত টিকবে? একদিকে ভাইসরয়ের গোপন সামরিক চক্রান্ত ও অতিরিক্ত সেনার আক্রমণ, অন্যদিকে সহযোদ্ধাদের একের পর এক মৃত্যুবরণ— এমনই এক সঙ্কটময় মুহূর্তে গর্জে উঠল কেল্লার কামান। রক্তক্ষয়ী এক অসম যুদ্ধ আর শিরশ্ছেদের মঞ্চে দাঁড়িয়েও এক তরুণের কণ্ঠে স্বাধীনতার জয়গান। পরাধীন ভারতে লেখা ভবিষ্যৎ-বিপ্লবের এক বিস্মৃত আখ্যানের মর্মস্পর্শী অন্তিম পর্ব।
১৯৪৫ সালের এক ৪৮ ঘন্টার জার্নালপর্ব ২/২
সংখ্যা ১অন্তিম পর্ব
আমরা এখন পাঠককে মহিমময় গভর্নর হাউজের চমৎকার কক্ষগুলিতে নিয়ে যাব, যা মহান দয়ালু লর্ড ফেল বুচারের বাসভবন। সর্দার বেয়ারা শোবার ঘরের দরজাটি ঈষৎ ফাঁক করায় দেখা গেল, প্রায় চতুর্দশবর্ষীয়া এক তরুণী তার পোশাক ঠিকঠাক করছে। মাথায় সুন্দর ঘন চুল, চোখদুটি গভীর কালো। পরনে ছিল মিহি সাদা লিনেনের একটি পোশাক, যার হাতা দুটি লম্বা সাদা রঙের। মেয়েটির পোশাকটির ঝুল ছিল হাঁটু অবধি, যা তার পায়ের সুন্দর গঠনটি প্রকাশ করছিল। জুতো জোড়া ছিল নিখুঁত চমৎকার কারুকার্যের। আর তার গলায় জড়ানো একটি রামধনু রঙের চেককাটা সিল্কের রুমাল। এছাড়া কণ্ঠের শোভাবর্ধন করছিল হীরা ও মুক্তো খচিত একটি দেবীমূর্তির লকেট, অমঙ্গল থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য।
তরুণীটি চৌকাঠে পা রাখামাত্রই ভাইসরয় জেগে উঠলেন এবং বিছানা থেকে লাফিয়ে নেমে বেয়ারাকে জিজ্ঞেস করলেন ‘বিবি সাহেবা’ জেগেছেন কিনা। উত্তরে ‘না’ শুনে তিনি তরুণীটিকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে পালকিতে বসিয়ে হৃষ্টমনে বিদায় জানালেন। তারপর সকালের প্রাতঃকৃত্য শেষ করে দৈনিক সংবাদপত্র হাতে কাউন্সিল হলে প্রবেশ করলেন। হলটি চমৎকারভাবে সাজানো—ঝাড়বাতি, আয়না, ছবি, পর্দা এবং গালিচা মিলে এক জাঁকজমকপূর্ণ পরিবেশ। ঘরের মাঝখানে একটি ছোট টেবিল, তার ওপরে চিঠির স্তূপ, লেখার কাগজ এবং লিখন সামগ্রী রাখা। দু-এক মিনিট সংবাদপত্রে চোখ বুলিয়ে সেটি একপাশে সরিয়ে রেখে তিনি উচ্চস্বরে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘বাইরে কে অপেক্ষা করছ?’ টুপি বগলে ও কোমরে তরবারি ঝুলিয়ে একজন তরুণ সৈনিক ঘরে প্রবেশ করে মাথা নিচু করে সম্মান জানালেন এবং মহামান্য লর্ডের কাছে এগিয়ে গেলেন।
—‘ওহে! কী যেন নাম তার, সে কি এখানে এসেছে?’
—‘হ্যাঁ প্রভু, সেনাপতি ভ্যালাঙ্কোর্ট বাইরে অপেক্ষা করছেন।’
—‘তাকে এখানে আসতে বলো।’
সৈনিকটি বেরিয়ে গেল। দু-এক মিনিটের মধ্যেই সেনাপতি কক্ষে প্রবেশ করলেন। তাঁর মুখের পাঁচ-ছয়টি জায়গায় ব্যান্ডেজ লাগানো, বাঁ হাতটি একটি স্লিং-এ বাঁধা।
—‘বেশ মহাশয়, আশা করি গতকালের অভিযানটি গৌরবজনকভাবে শেষ হয়েছে?’
সেনাপতি মাথা নিচু করলেন। লজ্জায় ক্ষোভে তাঁর মুখ রক্তবর্ণ হয়ে উঠল।
—‘আহা, তাই নাকি? রাজভক্ত সেনারা একদল সামান্য বাঙালির সামনে পিছু হটেছে? মনে হয়, আমাদের আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। ভালো কথা, কতজন আহত ও নিহত হয়েছে?’
—‘৫০ জন, প্রভু।’
—‘হায় ভগবান! এ তো ভয়াবহ অবস্থা! ওই দাঙ্গাবাজ জনতা কীভাবে এতজনকে মৃত্যুর দেবতা প্লুটোর অন্ধকার রাজ্যে পাঠাতে পারল?’
—‘ওখানে সব ধরনের অস্ত্রে সজ্জিত দু-তিনশো লোকের একটি দল ওঁৎ পেতে বসেছিল। আমরা যখন বেয়নেট নিয়ে ওই বিদ্রোহী জনতাকে আক্রমণ করি, তখন লুকিয়ে থাকা লোকগুলি হঠাৎ ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং...’
—‘তোমাদের লেজ গুটিয়ে পালাতে বাধ্য করে, তাই তো?’
সেনাপ্রধান আবারও লজ্জায় লাল হয়ে মাথা নত করলেন।
—‘ঠিক আছে, আমি বিষয়টা দেখব। তুমি এখন যেতে পারো। তবে ডাকলে যেন শুনতে পাও, এমন দূরত্বে থাকবে।’
মাথা নিচু করে সম্মান জানিয়ে তরুণটি চলে গেলেন। গভীর চিন্তায় ঘরের মধ্যে দু-তিনবার পায়চারি করার পর, লর্ড তাঁর চেয়ারে এসে বসে নিচের চিঠিটি লিখলেন।
কর্নেল জন ব্লাড থার্স্টি (রক্তপিপাসু)-র সমীপে,
বাংলার ফোর্ট উইলিয়ামের
টাউন ও ফোর্ট মেজর,
প্রিয় কর্নেল,
বেশ কিছু বিশ্বস্ত ব্যক্তির কাছ থেকে পাওয়া তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে যে, স্থানীয় অধিবাসীদের মধ্যে সরকারের প্রতি তীব্র অসন্তোষ বর্তমান। তাই কোনো আকস্মিক আক্রমণের ক্ষেত্রে ফোর্টের সুরক্ষার জন্য যা যা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া দরকার, তা নেওয়ার জন্য আপনাকে আমি কর্তৃত্ব প্রদান করছি। সেক্রেটারি এবং বোর্ডের মাধ্যমে চিঠি পাঠালে জানাজানি হতে পারে, তাই আমাকে এই গোপন পদ্ধতি অবলম্বন করতে হল।
আমি, প্রিয় কর্নেল,
আপনার আন্তরিক
‘বুচার’ (কসাই)
গভর্নমেন্ট হাউজ, এপ্রিল, ১৯৪৫
এই চিঠিটি পাঠানোর পর তিনি দু-একবার পায়চারি করলেন, তারপর নিচের অনুচ্ছেদটি লিখে সংবাদপত্রকে প্রেরণ করলেন।
দ্য ক্যালকাটা ক্যুরিয়ার একস্ট্রাঅর্ডিনারি,
এপ্রিল ১৯৪৫,
আমরা একজন সামরিক ব্যক্তির নিকট জানতে পেরেছি যে, গত সন্ধ্যায় কলিকাতার কাছাকাছি একটি অঞ্চলে ২০০০ জনতার অশান্তি দমন করতে সরকারের পক্ষ থেকে দুজন অশ্বারোহী এবং ১৬ জন পদাতিক সৈন্যের একটি দলকে পাঠানো হয়েছিল। ম্যাজিস্ট্রেট জনগণকে ঘরে ফিরে যাওয়ার জন্য বোঝাতে বৃথাই আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন, তারা নিজেদের অবস্থানে অনড় ছিল। কম্যান্ডে থাকা লেফটেনান্টের আদেশ অনুযায়ী সামরিক বাহিনী একটি ফাঁকা গুলি ছোঁড়ে, যা বিশাল জনতাকে এতটাই আতঙ্কিত করে তোলে যে তারা দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পালিয়ে যায়। ভিড়ের চাপে কিছু মানুষ মারা যায় এবং কিছু মানুষ নদী পার হতে গিয়ে ডুবে যায়। যাইহোক, গতকালের ঘটনাটি কোনো রক্তপাত ছাড়াই শান্তিভঙ্গকারীদের জন্য একটি ভয়ঙ্কর দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
যখন ভুবনমোহন সেই আকস্মিক ভয়াবহ সংঘর্ষের শেষে বাড়ি ফিরলেন, তখন তাঁর মনে নানা চিন্তার উদয় হল। তাঁর অশান্ত শয্যা থেকে ঘুম উধাও হয়ে গেল এবং তিনি গভীর ভাবনায় মগ্ন হয়ে স্থিরভাবে শুয়ে রইলেন। অবশেষে ধড়ফড় করে উঠে চিৎকার করে বলে উঠলেন, ‘এই সমস্ত অলীক ভয় ও অমঙ্গলজনক আশঙ্কা আমাকে দূর করতে হবে।’ তিনি কয়েকজন প্রধান বিপ্লবীকে ডেকে পাঠালেন এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁরা এসে উপস্থিত হলেন। এরপর পরিকল্পিত দুর্গ-আক্রমণের প্রয়োজনীয় কৌশল এবং তার সম্ভাব্য ফলাফল নিয়ে তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করলেন। তিনি বললেন, “আমরা যদি এই অনুকূল মুহূর্তের সুযোগ এখনই না নিই, তবে কি আগামীকালই ভুবনমোহন, পার্বতীচরণ ও গঙ্গানারায়ণের নামে তল্লাশি পরোয়ানা জারি হবে না, অথবা তাদের বিদ্রোহী মাথার উপর পুরস্কার ঘোষণা করা হবে না? আজ রাতেই কলিকাতার আশেপাশের সমস্ত পুলিশ ফাঁড়িতে খবর পৌঁছে যাবে আর আগামীকালের মধ্যেই যুদ্ধসজ্জায় সজ্জিত হাজার হাজার অশ্বারোহী সৈন্য ও শত শত ২৪-পাউন্ডার কামান, যা সূর্যের আলোয় চকচক করবে, তা এসপ্ল্যানেড, এমনকি কলিকাতার সমস্ত রাস্তার দখল নিয়ে নেবে। কিন্তু তাহলে এর প্রতিকারই বা কী? আমাদের প্রত্যাশিত সাহায্য এখনও এসে পৌঁছয়নি এবং আমাদের সৈন্যদলের সেরা অংশটি আজ সন্ধ্যার রক্তক্ষয়ী জেদি লড়াইয়ে এতটাই ক্লান্ত হয়ে পড়েছে যে, আজ রাতেই অতর্কিতে দুর্গ আক্রমণ করার বা গভর্নমেন্ট হাউজ উড়িয়ে দেওয়ার ঝুঁকি নেওয়া তাদের পক্ষে অসম্ভব।”
রাত দু’টো পর্যন্ত এই আলোচনা চললো। নিজেদের গুরুত্ব সম্বন্ধে নিশ্চিত হয়ে, একইসাথে এই দিনের ক্ষুদ্র বিজয়টিতে উত্তেজিত হয়ে তাঁরা পরদিন সন্ধ্যার সময় দুর্গ আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নিলেন। দলের সদস্যরা পূর্ণ প্রত্যাশা নিয়ে বিদায় নিলেন যে, ভোর হওয়ার আগেই তাঁদের কাছে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সৈন্য ও অর্থ এসে পৌঁছবে এবং আগের দিনের মতো আগামীকালের সূর্যও তাঁদের জন্য মঙ্গলময় হবে।
ভোরের আলো জাগিয়ে তুললো ভুবনমোহনকে। নীল আকাশে সকালের আলো সবেমাত্র ছড়িয়ে পড়েছে। এমন সময় দরজায় একটি মৃদু টোকা বার্তা দিল যে, কোন বন্ধুর আগমন ঘটেছে। দরজাটি ধীরে ধীরে খুলে গেলে এক ব্যক্তি আমাদের নায়কের হাতে একটি চিঠি তুলে দিল। তিনি মন দিয়ে একাধিকবার সেটি পড়লেন, এবং আগন্তুকের উপস্থিতি সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয়ে বলে উঠলেন, “যখন মন আর মুখ এক নয়, তখন কেন 'প্রিয় ভুবন' এবং ‘তোমার স্নেহভাজন’ লেখা? আমাকে সরাসরি কেন বললে না যে তুমি তোমার পরিবার, তোমার মাথা আর সবকিছুর ওপরে তোমার টাকার থলিটি নিয়ে আশঙ্কিত ছিলে? আমি কত বড় নির্বোধ ছিলাম যে তোমার কপচানো ওই বড় বড় বুলির উপর বিশ্বাস করেছিলাম। বলেছিলে— ‘আমাদের উদ্দেশ্যকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে তোমার সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকবে, তোমার ভিখারি হতেও কোন আপত্তি নেই বা আরও খারাপ কিছু, এমনকি তোমার মাথা কাটা যাবার সম্ভাবনা থাকলেও সে বিষয়ে তুমি উদাসীন।’ আহা! আমি এখন সবকিছু বুঝতে পারছি। যেহেতু এখন বিষয়টা দিন দিন আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে, তাই তুমি চাইছো...”—হঠাৎ তিনি খেয়াল করলেন যে, পত্রবাহক কর্মচারীটি অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে তাঁর এই অসচেতন মন্তব্যগুলি শুনছে। তিনি সরাসরি তার মুখের দিকে তীব্র তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন, তারপর তাকে অবিলম্বে চলে যাওয়ার আদেশ দিলেন। নিজের গোপন কক্ষে ফিরে গিয়ে গভীর আবেগের সাথে চিঠিটি আবারও পড়ে নিজের মনেই বিড়বিড় করে বললেন—“আমি বেশ বুঝতে পারছি, এই কাপুরুষদের ছাড়াই আমাকে কর্মসম্পাদন করতে হবে, আর এক মুহূর্তও দেরি করা চলবে না।” সারাদিন ধরে তিনি তাঁর সমস্ত বিশ্বস্ত সহযোদ্ধাদের চিঠি লিখতে ব্যস্ত থাকলেন, যে চিঠিতে তিনি এই বিষয়টির দ্রুত ও যথাযথ সমাপ্তির প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে তাঁদের জানাচ্ছিলেন। অবশেষে রাত নেমে এল, বিদ্রোহীদের জনসমষ্টিকে বেশ বিশাল মনে হল। সম্পূর্ণ চিৎপুর রোড এবং এসপ্ল্যানেডের অংশবিশেষ ঠাসাঠাসি জনসমাগমে পূর্ণ হয়েছিল। পাগড়ি পরা মাথা, বল্লম, বন্দুক ও কুঠারযুক্ত বল্লম ছাড়া কিছুই দেখা যাচ্ছিল না—যা চাঁদের ফ্যাকাসে কিরণকে উজ্জ্বল চকচকে আলোর রশ্মিতে প্রতিফলিত করছিল।
কেল্লার প্রাচীরে গোলন্দাজ সৈন্যরা যখন বিদ্রোহী বাহিনীকে একটি ‘উষ্ণ’ অভ্যর্থনার স্বাদ দিতে কামান প্রস্তুত করছিল, ঠিক তখনই একজন বিদ্রোহী অশ্বারোহী একটি বিশাল শ্বেতপতাকা প্রদর্শন করলেন। সেই বলিষ্ঠ তরুণ অশ্বারোহী, গঙ্গানারায়ণ, কেল্লার দিকে তাঁর ঘোড়া ছুটিয়ে দিলেন। সামরিক বাদ্যের তালে তালে নাচতে নাচতে ঘোড়াটি দ্রুত কেল্লা থেকে গুলি-ছোঁড়া দূরত্বে পৌঁছে গেল। গঙ্গানারায়ণকে কাছে আসতে দেখে কেল্লার ঝুলন্ত সেতুটি নামিয়ে দেওয়া হল এবং অফিসারের পোশাকে সজ্জিত কয়েকজন এগিয়ে এসে তাঁকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরলেন। বিন্দুমাত্র ভীত না হয়ে সেই তরুণ দৃঢ় ও উচ্চকণ্ঠে তাদের জানালেন যে, তিনি এদেশের সর্বোচ্চ শক্তি—‘জাতীয় কনভেনশন’-এর নেতৃবৃন্দের দ্বারা আদেশপ্রাপ্ত হয়েছেন।
তিনি কনভেনশনের নামে তাদের কেল্লা সমর্পণ করতে, আত্মত্যাগ করতে এবং তাদের অধীনস্থ সমস্ত দেশীয় সৈন্যদের বরখাস্ত করার আহ্বান জানান। বিনিময়ে তাদের জীবনরক্ষা এবং পরিবার ও সম্পত্তি নিয়ে নিরাপদে চলে যাওয়ার ন্যায্য সুযোগ দেওয়া হবে। তিনি আরো বলেন, “যদি তোমরা এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করো, তবে এর পরিণতি খুবই বিধ্বংসী হবে। আগুন ও তলোয়ার শীঘ্রই তোমাদের ধ্বংস করবে।” এই কথাটি উচ্চারিত হতে না হতেই, যেন কোন্ অলক্ষ্য ইশারায়, তিন-চারজন অফিসার একসঙ্গে শক্ত করে তাঁর হাত চেপে ধরলেন এবং দুজন তাঁর ঘোড়ার লাগাম ধরে জোর করে তাঁকে কেল্লার ভিতর টেনে নিয়ে গেলেন। এই অদ্ভুত পরিস্থিতি দেখে বিদ্রোহী সেনাবাহিনী অধীর উৎকণ্ঠায় এই অসাধারণ আচরণের পরিণতির জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। কয়েক মিনিট পর, যেন সব প্রস্তুতির শেষে, সেই হতভাগ্য লোকটিকে দুর্গের প্রাচীরের ওপর ফাঁসিকাঠে পেন্ডুলামের মত দুলতে দেখা গেল। তাঁর জমকালো পোশাক কেড়ে নেওয়া হয়েছিল এবং মাথায় পরানো হয়েছিল একটি গাধার টুপি, তাঁর বিদ্রোহী দলকে ব্যঙ্গ করার জন্য।
এই ঘটনাই বিদ্রোহীদের আক্রমণ শুরুর সংকেত রূপে দেখা দিল। শত শত অশ্বারোহী সৈন্য তীব্র বেগে ঘোড়া ছোটাল, তাদের পিছনেই ছিল পদাতিক বাহিনীর একটি শক্তিশালী ও সুশৃঙ্খল দল, যারা চেয়েছিল তাদের এই তরুণ অফিসারের নৃশংস হত্যার প্রতিশোধ নিতে। পুরো সেনাবাহিনীই বিশৃঙ্খল হয়ে পড়তে পারত, কিন্তু অভিজ্ঞ অফিসারদের সময়োপযোগী হস্তক্ষেপে তা রক্ষা পায়। তাঁরা সৈন্যদলের এক সারি থেকে অন্য সারিতে ছুটে গিয়ে সৈন্যদের নিজ নিজ স্থানে অবিচল থাকতে অনুরোধ, আদেশ ও পরিচালনা করছিলেন। সৈন্যরা যখন কেল্লার প্রাচীর রক্ষাকারী রক্ষীদের লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়ছিল, তখন কেল্লা থেকে তাদের উপর ধেয়ে আসে কামানের গোলাবৃষ্টি। ফলে অন্তত ৪০টি ঘোড়া প্রভুহীন হয়ে পড়ে। তা সত্ত্বেও সৈন্যরা দৃঢ় মনোবল নিয়ে দুর্গের দেয়াল বেয়ে ওপরে উঠতে থাকে এবং তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসা একদল দক্ষ সশস্ত্র যোদ্ধার জোরালো সাহায্যে তারা আরও একটি মারাত্মক বিধ্বংসী আক্রমণ দৃঢ়ভাবে মোকাবিলা করার চেষ্টা করে। কিন্তু একের পর এক এই মারাত্মক আক্রমণ থেকে নিজেদের বাঁচানোর কোনো উপায় বা নিজেদের বন্দুকের সাহায্যে তার প্রত্যুত্তর দেওয়ার কোন সুযোগ বিদ্রোহীদের ছিল না। কারণ রাজকীয় সৈন্যবাহিনী তখন ব্যারিকেড ও অন্যান্য প্রতিরক্ষার আড়ালে সুরক্ষিত ছিল। ফলে বিদ্রোহীরা এক চরম ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়।
তারা আরও আতঙ্কিত হয়ে পড়ে, যখন দেখতে পায় যে বালিগঞ্জে মোতায়েন থাকা ভাইসরয়ের দেহরক্ষী বাহিনীর প্রায় ৬০০ অশ্বারোহী সেনা কেল্লাকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে আসছে। অশ্বারোহী দল হিংস্র ভাবে আক্রমণ করে এবং গভর্নমেন্ট হাউজ থেকে আরও একবার ভয়াবহ গুলিবর্ষণ শুরু হয় পদাতিক সৈন্যদের ওপর। ইতিমধ্যে ভুবনমোহন এই অবিবেচক যুদ্ধের অনিবার্য ভয়ানক পরিণতি বুঝতে পেরে অত্যন্ত হতাশ হয়েও মরিয়া লড়াই চালিয়ে যান। তাঁর বেশিরভাগ অনুসারীই নিহত হন। শুধু তাই নয়, এক শান্ত ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ সৈন্যদল কারবাইন বন্দুকের গুলিবর্ষণে পথ করে না দিলে ভুবনমোহনের কপালেও হয়তো একই পরিণতি জুটত।
এই কঠিন পরিস্থিতি থেকে কোনোমতে নিজেকে মুক্ত করে তিনি চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নিজের সৈন্যদের আবার একত্রিত করতে শুরু করেন। এমন সময় শত্রুপক্ষের এক অফিসার দ্রুত ঘোড়া ছুটিয়ে তাঁর মুখোমুখি হন। এই অফিসার পূর্বোক্ত লেফটেন্যান্ট মার্টিনের বন্ধু বলে, প্রথমেই তিনি অত্যন্ত ক্রোধের সঙ্গে ভুবনমোহনকে আক্রমণ করেন। কিন্তু ভুবনমোহন অত্যন্ত চটপটে এবং তীক্ষ্ণ দৃষ্টির অধিকারী হওয়ায় একপাশে লাফিয়ে সরে গিয়ে একটি আঘাত এড়ান, যা গায়ে লাগলে নিশ্চিতভাবেই তাঁর মৃত্যু হতো। পরস্পরকে অসংখ্য চতুর আঘাত ও মরিয়া কোপ মেরে তাঁরা একে অপরের দিকে ছুটে গেলেন এবং একে অন্যের জামাকাপড় আঁকড়ে ধরে দুজন মরিয়া গ্ল্যাডিয়েটরের মতো হিংস্রভাবে লড়তে লাগলেন। বেশ কিছু সময় ধরে এই লড়াই চলল, যার মধ্যে তাঁদের সেই মরণকামড় একটুও শিথিল হয়নি। অবশেষে যেন কোনো অপ্রাকৃতিক শক্তির প্রভাবে একই সময়ে দুজনেই দুজনের বাঁধন আলগা করলেন। তারপর রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে একে অপরকে অস্ত্র দিয়ে এক ভয়ানক কোপ মারলেন। অফিসারের তলোয়ারটি ভুবনমোহনের পাঁজর ঘেঁষে চলে গেল, অপরদিকে আমাদের সেই নির্ভীক বীরের তলোয়ার প্রতিপক্ষের হৃদপিণ্ড বিদীর্ণ করল। বিশালদেহী ইংরেজটি যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে মাটিতে উপুড় হয়ে পড়ে গেলেন, নিশ্চিতভাবে বোঝা গেল তাঁর তাৎক্ষণিক মৃত্যু ঘটেছে। এমন একটি দুর্ধর্ষ লড়াইয়ের পর মাত্র মিনিটখানেক বিশ্রাম নিয়ে, ভুবনমোহন ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা তাঁর সৈন্যদের নিজের চারপাশে জড়ো করতে লাগলেন এবং যে অফিসাররা তাঁকে ঘিরে একটি বলয় তৈরি করেছিল, তাদের সাথে পরামর্শ করার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। এই অবস্থায় হঠাৎ অপ্রত্যাশিতভাবে দুর্গদ্বারের ঝুলন্ত সেতুগুলি নামিয়ে দেওয়া হল এবং দুর্গের সৈন্যেরা ঢেউয়ের মতো বাইরে এসে এক আকস্মিক আক্রমণ করল। তীব্র লড়াই শুরু হল, যেখানে সেই দেশপ্রেমিক এবং তাঁর সঙ্গীসাথীরা দৃঢ় সাহসের পরিচয় দিলেন।
দৃশ্যটি ক্রমশ ভয়াবহ হয়ে উঠল। একদিক থেকে দেশপ্রেমিকদের ওপর বেয়নেট চার্জ করা হচ্ছিল, অন্যদিক থেকে ভাইসরয়ের বডিগার্ডরা তাদের আক্রমণ করছিল। আর তৃতীয় একদিক থেকে কামানের বিধ্বংসী গোলা মারাত্মক ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছিল। তরুণ বীর যুদ্ধের সামনের সারিতে থেকে তাঁর দৃঢ় পরিশ্রম ও সাহসী এবং শান্ত আচরণের মাধ্যমে দেশবাসীদের উৎসাহিত করছিলেন, যাঁরা সবদিক থেকে বিপর্যস্ত হয়ে আর যুদ্ধক্ষেত্রে টিকে থাকতে পারছিলেন না। তুলনামূলকভাবে কিছু সাহসী দক্ষ বিদ্রোহী সৈন্য শত্রুসৈন্যের সংখ্যা বা সাফল্যের কথা তোয়াক্কা না করে মরিয়া হয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ল, অন্যদিকে কম সাহসী বা বেশি ক্লান্ত সৈন্যরা এক ক্ষিপ্ত বিজয়ী রাজকীয় সৈন্যদলের অত্যাচারের হাত থেকে বাঁচতে গলিঘুঁজি এবং বাড়ির মধ্যে গিয়ে তাড়াহুড়ো করে লুকিয়ে পড়তে লাগল। প্রতি মুহূর্তে দুর্গ থেকে নতুন নতুন সৈন্যদল এসে যোগ দিচ্ছিল এবং হাজার হাজার সৈন্য বনাম এক মুঠো মানুষের মধ্যে ভয়ঙ্কর লড়াই চলছিল। নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও বিদ্রোহী দেশপ্রেমিকরা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করতে নারাজ ছিলেন। কয়েক হাজারের মধ্যে মাত্র ৫০ জন মানুষ দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াইয়ের ময়দানে অবশিষ্ট ছিলেন। সেইসময় কে বন্ধু আর কে শত্রু চেনার মত পর্যাপ্ত আলো থাকলে, তাঁরাও নিশ্চিতভাবে পিষ্ট হয়ে মারা যেতেন। কিন্তু চাঁদের অন্তর্ধান এবং আগ্নেয়াস্ত্রের ধোঁয়া তাঁদের সুরক্ষায় সাহায্য করেছিল। এই ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতেই ভোরের আলো দেখা গেল, যা ক্রমশ উজ্জ্বল হয়ে ওঠার ফলে ইংরেজদের কাছে শত্রুপক্ষের সৈন্যের স্বল্পতা স্পষ্ট হয়ে উঠল। চারিদিক থেকে প্রচণ্ড গতিতে আক্রমণ শুরু হল এবং দীর্ঘ সময় ধরে লড়াই চালিয়ে যাওয়া সেই একমুঠো মানুষ প্রায় ধ্বংস হয়ে গেল। ২৫ জন তাৎক্ষণিকভাবে নিহত হলেন, ১৫ জন গুরুতর আহত এবং ১০ জন বন্দী হলেন। ঘোড়ার ক্ষুরের আওয়াজ, আহতদের আর্তনাদ, মুমূর্ষুদের গোঙানি এই দৃশ্যকে অত্যন্ত ভয়ঙ্কর করে তুলেছিল। বিশেষভাবে পরীক্ষা করে দেখা গেল যে, দেশপ্রেমিক দলের নেতা মৃত সৈন্যদের মাঝে মাটিতে পড়ে ছিলেন না বরং তিনি অন্য ৯ জন মানুষের সাথে দুর্গের ভিতর বন্দী হয়েছিলেন। খবরটি বিজয়ী সৈন্যবাহিনীর কাছে পৌঁছানো মাত্রই সেখানে বন্য উল্লাস ও হিংস্র আনন্দের এক তীক্ষ্ণ চিৎকার ভেসে উঠলো। সামরিক বাহিনী সারিবদ্ধ হয়ে দুর্গে প্রবেশ করল, ব্যান্ডে বিজয়ের সুর বাজতে লাগল। নিজেদের ঘোড়াগুলোকে তাড়া দিয়ে একলাফে ১২ ফুট পরিখা পার করিয়ে, রক্তরঞ্জিত তরবারি এবং কাদামাখা ইউনিফর্ম পরে অফিসাররা সেই ভয়াবহ আনন্দোল্লাসের চিৎকারে যোগ দিলেন।
“ঋতুর আশারা যথা পৃথিবীকে জানায় বিদায়,
ভারতের শহীদের তরে স্বাধীনতা কাঁদে ‘হায়’।”
ক্যাথিড্রালের ঘন্টায় যখন ছটা বাজলো, চারিদিকে নেমে এল এক অশুভ নীরবতা। শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এসে গভর্নমেন্ট হাউজের সামনের এসপ্ল্যানেডে জড়ো হতে লাগল। ইউরোপীয় দর্শকদের মুখমণ্ডলে বিজয়ের এক পাশবিক উল্লাস প্রকাশ পাচ্ছিল, অন্যদিকে স্থানীয় অধিবাসীদের মুখে ফুটে উঠেছিল চরম হতাশা। সোয়া ছটা নাগাদ ঘোষণা করা হল, বন্দীকে বহনকারী গাড়িটি তার গন্তব্যের কাছাকাছি পৌঁছচ্ছে। যেদিক থেকে গাড়িটি আসছিল, সবার চোখ সেদিকেই আটকে গেল। একদল বাদক ‘ডেড মার্চ’ বাজাতে বাজাতে এগিয়ে আসছিল। তাদের মাপা পদক্ষেপ এবং গম্ভীর ব্যক্তিত্ব সাধারণের মনের বিষাদকে আরো বাড়িয়ে দিচ্ছিল। তাদের পেছনে ছিল হ্যালবার্ট হাতে শ’খানেক মানুষের একটি ছোট বর্গাকার দল, যার ঠিক পেছনেই আসছিল বহুল প্রতীক্ষিত সেই গাড়িটি। তাকে ঘিরে রেখেছিল অশ্বারোহী রক্ষীবাহিনীর দুটো বৃত্তাকার দল। তাদের শিরস্ত্রাণের দুলতে থাকা পালক, চকচকে বেয়নেট এবং রক্তবর্ণ কোট এক ভয়ঙ্কর দৃশ্যের অবতারণা করছিল। সবার পিছনে ছিল পদাতিক বাহিনীর ১৩তম রেজিমেন্ট এবং প্রায় ২০০ জন সুঠাম দেহের অশ্বারোহী সেনা। ধীর ও গম্ভীর পদক্ষেপে তারা এসপ্ল্যানেড রো-র বিপরীত দিকের বড় খিলানযুক্ত পথ দিয়ে গভর্নমেন্ট হাউজে প্রবেশ করল। সেখানে এই শোভাযাত্রাটি থামলো এবং সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে রইল। পদাতিক বাহিনীটি পূর্ব থেকে পশ্চিমে দুটি বিপরীত সারিতে সজ্জিত হল, এবং অশ্বারোহী বাহিনীটি প্রাসাদের সমান্তরালে দাঁড়ালো যাতে চারপাশের দর্শকদের দৃষ্টির সামনে কোন বাধা না আসে। এই প্রাসাদ ও ফাঁসির মঞ্চের মাঝখানে দু-একজন প্রহরী ছাড়া আর কিছুই ছিল না, যারা অত্যন্ত উৎকণ্ঠার সাথে পুরো দৃশ্যটি দেখছিল। আমাদের মহান শাসক ‘কসাই’-প্রভুর বন্ধু ভদ্রলোকেরা যখন এসে পৌঁছলেন, তখন তাঁদের ঘোড়াগুলোকে আস্তাবলে নিয়ে যাওয়া হল। সেখানে সহিসরা ঘোড়াদের গা থেকে জমকালো সাজসজ্জা ও অলঙ্কার খোলার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। মালিকের রুচি, খামখেয়াল বা সামর্থ্য অনুযায়ী ঘোড়ার সেই সাজ ছিল ভিন্ন ভিন্ন রকম।
অতিথিদের বড় হলঘরে নিয়ে যাওয়া হল, সেখানে একটি বড় টেবিল এশীয় অঞ্চলের বিলাসবহুল খাবারদাবারের ভারে একেবারে নুয়ে পড়ছিল। টেবিলের মাথায় বসেছিলেন ‘দয়ালু’ ভাইসরয়, তিনি তাঁর বন্ধুদের স্বাগত জানালেন এবং অত্যন্ত নম্রতার সাথে তাঁর আতিথেয়তা গ্রহণ করার আমন্ত্রণ জানালেন। তাঁদের ক্ষুধার সামনে টেবিলের খাবার দ্রুত নিঃশেষ হয়ে গেল। তারপর ভারতের সবচেয়ে দয়ালু শাসক তাঁর সমস্ত বন্ধু ও অনুসারীদের নিয়ে জানলার সামনে সারিবদ্ধভাবে বসলেন, যাতে আসন্ন গৌরবময় দৃশ্যটি দেখে তাঁরা চোখ জুড়াতে পারেন। বন্দীকে প্রস্তুত করার জন্য বন্দুকের গুলির মাধ্যমে একটি সংকেত দেওয়া মাত্র এক সার্জেন্ট তিন সারি সৈন্য পরিবেষ্টিত বিশাল গাড়িটির দরজা ধীরে ধীরে খুলে দিলেন। বন্দীকে বাইরে নিয়ে এসে জনসাধারণের দৃষ্টির সামনে হাজির করা হল। যুদ্ধের সময় নিজের সৈন্যদের অগ্রভাগে যে সাহসী মনোভাব তাঁকে বিশিষ্ট করে তুলেছিল, তা তখনও তাঁর চোখে-মুখে জ্বলজ্বল করছিল। তাঁর চুল ছিল উস্কোখুস্কো, পোশাক এলোমেলো এবং হাত-পা কঠিন শৃঙ্খলে বাঁধা—একমাত্র তাঁর কঠোর সাহসী ভাবভঙ্গি ছাড়া বাকি সব কিছুই তাঁর করুণ নিয়তিকে স্পষ্ট করে তুলছিল, যা দেখে দর্শকদের মনে ত্রাসসঞ্চার হচ্ছিল।
এবার সম্মানজনক দূরত্বে দাঁড়িয়ে থাকা একজন কর্মকারকে তার দায়িত্ব পালনের জন্য ইশারা করা হল। শিকলের ‘শীতল বন্ধন’ কেটে ফেলে ভুবনমোহনকে বধ্যভূমির দিকে নিয়ে যাওয়া হল। মঞ্চের একপ্রান্তে এক দীর্ঘ বলিষ্ঠ দেহের মানুষ হাতে একটি ভারী কুঠার নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। বন্দী দৃঢ় পদক্ষেপে মঞ্চে উঠে এলেন এবং পূর্ণ সংযমের সাথে সম্পূর্ণ দৃশ্যটি অবলোকন করলেন। এক মুহূর্তের জন্য তিনি নতজানু হয়ে বসলেন, চোখের ওপর হাত রাখলেন, আকাশের দিকে তাকিয়ে অস্ফুটে কিছু উচ্চারণ করলেন—ক্ষণিকের জন্য তাঁর মুখমণ্ডলে একটি রক্তিম আভা ফুটে উঠল। তারপরই তিনি তাঁর স্বাভাবিক ক্ষিপ্রভাবে উঠে দাঁড়ালেন। জনসাধারণের উদ্দেশে কিছু বলার জন্য বীরত্বের সাথে মঞ্চের সামনের দিকে এগিয়ে গেলেন এবং তাঁর মুখ থেকে শব্দগুলি যেন বিস্ফোরিত হল—“আমার বন্ধু ও দেশবাসীরা, এই সান্ত্বনা আমার আছে যে আমি আমার মাতৃভূমিতেই মৃত্যুবরণ করছি। যদিও নিয়তির নির্দেশে এই মঞ্চে এখনই আমার জীবনাবসান হবে, তবুও আমার জীবনের শেষ মুহূর্তগুলি আমার বন্ধুদের উপস্থিতিতে ধন্য। আমি আমার দেশকে রক্ষার জন্য শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত উৎসর্গ করেছি। যদিও আমার দুর্বল জীবনশিখা তার এই ভঙ্গুর দেহ ছেড়ে যেতে উদ্যত, কিন্তু আমি আশা করি, যে পথ আপনারা এত গৌরবময়ভাবে চলতে শুরু করেছেন, তা জারি রাখবেন।”
তিনি যখন প্রবল আবেগে এই কথাগুলি বলে যাচ্ছিলেন, তখন এই তরুণ দেশপ্রেমিকের শক্তি দেখে ভয়ে ও বিস্ময়ে বিচলিত হয়ে ভাইসরয় অবিলম্বে দৃশ্যটি শেষ করার জন্য একজন অফিসারকে পাঠালেন। বন্দীর হাত দুটিকে শক্তভাবে চেপে ধরে মাথাটি দুটি কাঠের স্তম্ভের মাঝে বলপূর্বক ঢুকিয়ে দেওয়া হল। তারপর কুঠারের একটিমাত্র কোপেই তাঁর শরীর থেকে মাথাটি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল।
সংখ্যা ১-এর অন্যান্য লেখা
সংখ্যা ১সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়
“কম্পিউটার, ই-মেল এবং ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট হ্যাক করা নিয়ে অনেক আলোচনা হয়। কিন্তু আমরা এখন এমন এক যুগে প্রবেশ করেছি যেখানে মানুষকেও হ্যাক করা সম্ভব।” ‘উই আর বিকামিং হ্যাকেবল অ্যানিমেলস’—হাড়হিম করে দেওয়া এক বাস্তবতার কথা আমাদের বলেছেন হারারি।
সংখ্যা ১গল্পস্বল্প
বোতাম
সবকিছু যখন এক ক্লিকে বদলে যায়, তখন কিছু মানুষ নিঃশব্দে পাহারা দেয় তাদের চিরপুরাতন বিশ্বাস। সুতো আর মায়া দিয়ে পার্বতীদি কী বুনে চলেছেন দিনরাত? কাগজের মতো সহজে ছিঁড়ে যাওয়া সম্পর্কের ভিড়ে, বুকের ভেতরে সামান্য কাপড় বাঁচিয়ে রাখার এক মায়াবী আখ্যান ‘বোতাম’।
সংখ্যা ১পুরাতনী
ওড়িশা প্রজাতন্ত্র—বিংশ শতাব্দীর ইতিবৃত্তের এক বিস্মৃত পৃষ্ঠা: দ্বিতীয় পর্ব
১৮৪৫ সালে লেখা ১৯২৫ সালের এক কাহিনি। এক বিকল্প ইতিহাস। বিদ্রোহের গল্প। এক ভবিষ্যতের উড়িষ্যার গল্প। যে উড়িষ্যা একদিন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীন প্রজাতন্ত্রে পরিণত হবে। কিন্তু সেই স্বাধীনতার পথ মসৃণ নয়; তার ভিতর লুকিয়ে আছে অরণ্যের গভীরে জমে থাকা ক্ষোভ, হারিয়ে যাওয়া স্বাধীনতার স্মৃতি এবং পাহাড়ি মানুষের অদম্য আত্মমর্যাদা। শশীচন্দ্র দত্তের এই কল্প-ভবিষ্যতের কাহিনি যেন উনিশ শতকের ঔপনিবেশিক বাস্তবতার এক প্রতিবিম্ব; স্বাধীনতার স্বপ্ন কীভাবে প্রতিরোধের ভাষা খুঁজে পায়, তার এক রোমাঞ্চকর আখ্যান।
১৯৪৫ সালের এক ৪৮ ঘন্টার জার্নাল ধারাবাহিকের অন্যান্য পর্ব
সংখ্যা ১পুরাতনী
১৯৪৫ সালের এক ৪৮ ঘন্টার জার্নাল: প্রথম পর্ব
১৮৩৫ সালে বসে এক অষ্টাদশবর্ষীয় তরুণের কল্পনায় দেখা ১৯৪৫-এর ভারত! ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সূচনাপর্বের বহু আগেই কল্পবিজ্ঞানের ধাঁচে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে এক দুঃসাহসিক বিদ্রোহের স্বপ্ন দেখেছিলেন হিন্দু কলেজের কৃতী ছাত্র কৈলাস চন্দ্র দত্ত। ঔপনিবেশিক শৃঙ্খল চূর্ণ করবার সশস্ত্র সংকল্পে গর্জে উঠেছিল গল্পের নায়ক ভুবনমোহনের কণ্ঠ। রক্তক্ষয়ী সংঘাত আর এক অসম যুদ্ধের সূচনা—কী ঘটেছিল সেই ঐতিহাসিক সন্ধ্যায়? পরাধীন ভারতের প্রথম বিদ্রোহী কল্পকাহিনীর শ্বাসরুদ্ধকর সূচনা পড়ুন প্রথম পর্বে।
আরও পড়ুন
সংখ্যা ১পুরাতনী
১৯৪৫ সালের এক ৪৮ ঘন্টার জার্নাল: প্রথম পর্ব
১৮৩৫ সালে বসে এক অষ্টাদশবর্ষীয় তরুণের কল্পনায় দেখা ১৯৪৫-এর ভারত! ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সূচনাপর্বের বহু আগেই কল্পবিজ্ঞানের ধাঁচে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে এক দুঃসাহসিক বিদ্রোহের স্বপ্ন দেখেছিলেন হিন্দু কলেজের কৃতী ছাত্র কৈলাস চন্দ্র দত্ত। ঔপনিবেশিক শৃঙ্খল চূর্ণ করবার সশস্ত্র সংকল্পে গর্জে উঠেছিল গল্পের নায়ক ভুবনমোহনের কণ্ঠ। রক্তক্ষয়ী সংঘাত আর এক অসম যুদ্ধের সূচনা—কী ঘটেছিল সেই ঐতিহাসিক সন্ধ্যায়? পরাধীন ভারতের প্রথম বিদ্রোহী কল্পকাহিনীর শ্বাসরুদ্ধকর সূচনা পড়ুন প্রথম পর্বে।
সংখ্যা ১পুরাতনী
ওড়িশা প্রজাতন্ত্র—বিংশ শতাব্দীর ইতিবৃত্তের এক বিস্মৃত পৃষ্ঠা: দ্বিতীয় পর্ব
১৮৪৫ সালে লেখা ১৯২৫ সালের এক কাহিনি। এক বিকল্প ইতিহাস। বিদ্রোহের গল্প। এক ভবিষ্যতের উড়িষ্যার গল্প। যে উড়িষ্যা একদিন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীন প্রজাতন্ত্রে পরিণত হবে। কিন্তু সেই স্বাধীনতার পথ মসৃণ নয়; তার ভিতর লুকিয়ে আছে অরণ্যের গভীরে জমে থাকা ক্ষোভ, হারিয়ে যাওয়া স্বাধীনতার স্মৃতি এবং পাহাড়ি মানুষের অদম্য আত্মমর্যাদা। শশীচন্দ্র দত্তের এই কল্প-ভবিষ্যতের কাহিনি যেন উনিশ শতকের ঔপনিবেশিক বাস্তবতার এক প্রতিবিম্ব; স্বাধীনতার স্বপ্ন কীভাবে প্রতিরোধের ভাষা খুঁজে পায়, তার এক রোমাঞ্চকর আখ্যান।
সংখ্যা ১পুরাতনী
ওড়িশা প্রজাতন্ত্র—বিংশ শতাব্দীর ইতিবৃত্তের এক বিস্মৃত পৃষ্ঠা: প্রথম পর্ব
১৮৪৫ সালে লেখা ১৯২৫ সালের এক কাহিনি। এক বিকল্প ইতিহাস। বিদ্রোহের গল্প। এক ভবিষ্যতের উড়িষ্যার গল্প। যে উড়িষ্যা একদিন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীন প্রজাতন্ত্রে পরিণত হবে। কিন্তু সেই স্বাধীনতার পথ মসৃণ নয়; তার ভিতর লুকিয়ে আছে অরণ্যের গভীরে জমে থাকা ক্ষোভ, হারিয়ে যাওয়া স্বাধীনতার স্মৃতি এবং পাহাড়ি মানুষের অদম্য আত্মমর্যাদা। শশীচন্দ্র দত্তের এই কল্প-ভবিষ্যতের কাহিনি যেন উনিশ শতকের ঔপনিবেশিক বাস্তবতার এক প্রতিবিম্ব; স্বাধীনতার স্বপ্ন কীভাবে প্রতিরোধের ভাষা খুঁজে পায়, তার এক রোমাঞ্চকর আখ্যান।

