মার্কসের তত্ত্ব: প্রথম পর্ব
কৃত্রিম মেধা ও আধুনিক ফিনান্স পুঁজির যুগে উনিশ শতকের মার্কসীয় দর্শন কতটা প্রাসঙ্গিক—এই ধারাবাহিক প্রবন্ধমালা তারই নির্মোহ অনুসন্ধান। গোঁড়ামি ও পুনরাবৃত্তি এড়িয়ে এই লেখা মার্কসের মূল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক তত্ত্বের গভীর পাঠের পাশাপাশি শ্রমতত্ত্বের আধুনিক সীমাবদ্ধতা, রাষ্ট্রচিন্তার পুনর্বিচার এবং পরিবেশ ও লিঙ্গবৈষম্যের মতো সমকালীন সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মার্কসবাদের সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতাকে বস্তুনিষ্ঠভাবে খতিয়ে দেখার একটি প্রয়াস।

সংখ্যা ১সূচিপত্র
সূচনা
প্রারম্ভিক কথন
গোড়াতেই পাঠককে সতর্ক করা দরকার যে ‘মার্কসের তত্ত্ব’ বলে আমি ধারাবাহিকভাবে যা উপস্থাপন করব তা আমার পাঠ। যদিও কোনো পাঠ, কোনো রচনা কখনই একান্ত নিজস্ব হতে পারে না। তার মধ্যে পূর্ব ভাবনার নানা বিস্তার থেকে যায়। এই শিক্ষা আমরা উত্তর-আধুনিকদের কাছ থেকে পেয়েছি।
সমস্ত চিন্তকদের মত মার্কস তাঁর যুগের সংস্কৃতি ও ইতিহাসজাত। তিনি একাধারে ছিলেন কমিউনিস্ট করেস্পন্ডেন্স কমিটি ও কমিউনিস্ট লিগের প্রতিষ্ঠাতা ও নেতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক অর্থে আইনজ্ঞ ও দার্শনিক। সর্বোপরি তিনি অর্থনীতির প্রতিষ্ঠিত ধারাগুলির তীক্ষ্ণ পাঠক-সমালোচক ছিলেন। ফলে তাঁর ভাবনা-চিন্তায় শ্রমজীবী আন্দোলনের অভিজ্ঞতার যেমন চিহ্ন রয়েছে তেমনই আবার দর্শন ও রাজনৈতিক অর্থনীতির (পলিটিকাল ইকনমি) তৎকালীন ধারাগুলির প্রভাবও রয়েছে। অনেক সময় আমরা ব্যক্তি মার্কসের একটা দিকের প্রতি দৃষ্টি-আকর্ষণ করতে গিয়ে অন্য দিকটিকে অবহেলা করি।
প্রত্যেক দার্শনিক যাঁরা ভবিষ্যৎ কল্পনা গড়ার চেষ্টা করেছেন তাঁদের সূচনাবিন্দু অবশ্যই সমকালীন সমাজ। ফলে পরিবর্তনের প্রকল্প, বিশ্লেষণের বর্গবিন্যাস ধ্রুব সত্য বলে ধরে নিলে, তাঁর আদর্শে যারা অনুপ্রাণিত তাদের চিন্তা-চেতনা একসময় অচল গোঁড়ামিতে পরিণত হয়। তাই আমার মার্কস পাঠের শেষভাগে খানিক আলোচনা করব বর্তমান দুনিয়ায় এর প্রায়োগিক সমস্যা নিয়ে। এর অর্থ এই নয় যে মার্কসের সামগ্রিক চিন্তা বাতিল হয়ে গেছে। মানব সমাজের সার্বিক মুক্তির অর্থ সম্বন্ধে মার্কসের ব্যাখ্যা এখনও স্মরণযোগ্য; তার দর্শন এখনও যথেষ্ট প্রযোজ্য। সমস্যা মূলত তার রাজনৈতিক অর্থনীতি নিয়ে। বিশেষ ভাবে তাঁর শ্রমতত্ত্ব—কৃত্রিম মেধা, লজিস্টিক, শ্রম এবং ফাইনান্স পুঁজির সার্বিক গুরুত্ব বৃদ্ধির যুগে—কতটা কাজের সে ব্যাপারে সন্দেহের যথেষ্ট অবকাশ আছে। এর সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকশ্রেণির ভ্যানগার্ড পার্টি হিসাবে কমিউনিস্ট পার্টির ধারণা নতুনভাবে মূল্যায়ন করার প্রয়োজনীয়তা। শ্রমিক শোষণ ও তার থেকে মুক্তি সম্বন্ধে তার যথেষ্ট সুচিন্তিত বিশ্লেষণ থাকলেও, অন্যান্য নিপীড়ন ও সামাজিক সঙ্কট যেমন—নারী নিপীড়ন, পরিবেশ সঙ্কট এ-সব নিয়ে তিনি বিশেষ কিছুই লিখে যান নি। এ ছাড়া, বর্তমান সময়ে, পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মধ্যে কোন দাবী এবং কাদের দাবী অগ্রাধিকার পাবে তাও চিন্তার বিষয়।
তবে কোনো ভাবধারাকে সমালোচনা ও অতিক্রমণের জন্য সেই ভাবধারা কী তা আগে বোঝা দরকার। তাই আমরা প্রথমে চেষ্টা করব মার্কসের চিন্তা বা দর্শন বোঝার। এই আলোচনার গোড়ায় আমরা চিত্রিত করব মার্কসের সমকালীন পাশ্চাত্য-দুনিয়ার মূল পরিবর্তনের ধারাগুলিকে। পরিবর্তনের প্রক্রিয়া সাংস্কৃতিক জগতে যে মন্থন আনে মার্কসের চিন্তা তার থেকেই উদ্ভূত। তাই পরিবর্তনের সূত্র ধরে আমরা, সে সময় যে অন্যান্য সমাজবাদী চিন্তনের ধারা প্রচার হয়েছিল, তাদের উল্লেখও করব।
খানিক ইতিহাস
গ্রাম থেকে শহর
ষোড়শ সপ্তদশ শতাব্দী জুড়ে পাশ্চাত্যে, বিশেষ করে বিলেতে, কৃষিক্ষেত্রে উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতা উল্লেখযোগ্য ভাবে বৃদ্ধি পায়। এর পেছনে নানা কারণ ছিল। বিভিন্ন জোতের মধ্যে ফসল ঘূর্ণনের (ক্রপ রোটেশন) ফলে জমির উর্বরতা, একই জোতে অপরিবর্তিতভাবে একই ফসল চাষ করলে জমির উর্বরতা যতটা কমে তার থেকে কম হ্রাস পায়। ঋতুভিত্তিক ফসলক্রমে পরিবর্তন এবং নতুন নতুন যন্ত্রের প্রয়োগ কৃষির উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। এরই অনুষঙ্গে গ্রামসমাজ ত্যাগ করে কৃষকদের শহরে যাত্রা। কৃষির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির ফলে কৃষিকাজে নিযুক্তি কমে, তাই কৃষকদের শহরে অভিবাসন ছিল একরকম অনিবার্য।
খানিক বাধ্য হয়ে আর খানিক শহরের হাতছানিতে লুব্ধ হয়ে কৃষকেরা গ্রামসমাজ ত্যাগ করতে থাকে। বাধ্য হওয়ার প্রধান কারণ—যে গ্রামীণ সম্পদে কৃষক সাধারণের যৌথ অধিকার ছিল সেগুলিকে সামন্তপ্রভুর ব্যক্তিগত জোত হিসাবে ঘেরার অভিযান (এনক্লোসার মুভমেন্ট)। দ্বাদশ শতাব্দীতে এই অভিযানের সূচনা। ১৪৫০ থেকে ১৬৪০, এই পর্যায়ে যৌথ সম্পদ ঘেরার অভিযান খুব দ্রুত সম্পন্ন হয়, আবার তা ঘটে ১৭৫০ থেকে ১৮৬০-এর পর্যায়ে। চারণ-ভূমি, জঙ্গল ও পুকুর, নদীর মত জলসম্পদ এই অভিযানের মাধ্যমে, আইন করে এবং বেআইনি পথে, জমিদার বা সামন্তশ্রেণি কব্জা করে। এর ফলে, চারণ-ভূমির অভাবে, কৃষকদের পক্ষে চাষের জন্য ঘোড়া লালন করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। (আমাদের দেশে যেমন কৃষি যান্ত্রিকীকরণের আগে চাষের জন্য হাল-বলদ ব্যবহার করা হত, ইয়োরোপে তার বদলে ঘোড়া ব্যবহার করা হত।) এছাড়া কৃষকদের নিজস্ব জোতগুলি, সাধারণভাবে এত স্বল্প পরিসরের ছিল যে, তার ওপর নির্ভর করে পরিবারের সম্পূর্ণ চাহিদা পূরণ সম্ভব ছিল না। তাই তারা জলসম্পদ ও বনজসম্পদের ওপর অনেকটাই নির্ভর করত—ফলমূল, হরিণের মাংস, মাছ, ইত্যাদি। এই সম্পদের ওপর তাদের অধিকার ছিনিয়ে নেওয়ার ফলে, গ্রামে থাকা তাদের পক্ষে দুষ্কর হয়ে ওঠে। সামাজিক ডাকাত (সোশাল ব্যান্ডিট) রবিন হুডের গল্পের সঙ্গে আমরা অনেকেই পরিচিত। রবিন হুডের দুঃসাহসী ডাকাতের দল শেরউড জঙ্গলে ধনী যাত্রীদের লুঠ করে গরিবদের মধ্যে সম্পদ বিতরণ করত। ঐ জঙ্গল যে সামন্ত কব্জা করেছিল তার রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তারা বনসম্পদ আহরণ করে দিব্বি ছিল। বলা যেতে পারে যে, এই গল্পে এনক্লোসার মুভমেন্ট-এর বিরুদ্ধে একধরণের সামাজিক প্রতিবাদের ছবি ফুটে উঠেছিল। কৃষকরা গ্রাম ছাড়তে বাধ্য হয় আরও নানা কারণে। আমরা আগেই উল্লেখ করেছি এই পর্যায়ে কৃষি উৎপাদনশীলতা বাড়তে থাকে। ফলে, অনেক চাষি কাজ হারায়। শস্য উৎপাদনের বদলে ধনী কৃষকরা উল উৎপাদনের জন্য ভেড়া লালন শুরু করে। ভেড়া লালনে অনেক কম শ্রম লাগে, ফলে এই সব অঞ্চলে চাষিরা জীবিকা হারায়।
শহুরে জীবন কৃষকদের আকর্ষণও করে। গ্রামের সামন্ততান্ত্রিক অনুশাসনের তুলনায় শহরের সমাজ ছিল অনেক মুক্ত। শহর-জীবন পরিচালনের জন্য বণিকদের বিভিন্ন সংগঠন (গিল্ড)-এর থেকে শহরের পরিচালনমণ্ডলী বা পৌরসভা নির্বাচন করা হত। ফলে, শহরে একধরণের সীমিত গণতন্ত্রের উপস্থিতিও ছিল।
স্বাধীন কারিগর থেকে পরাধীনতা
সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যে শিল্পসংগঠনগুলি ছিল মূলত গ্রামে অবস্থিত কুটীর শিল্প। কারিগররা গ্রামে-গঞ্জে আর গ্রামীণ মেলায় তাদের তৈরি জিনিস ফেরি করত। সামন্ততান্ত্রিক শাসনক্ষমতা বিকেন্দ্রিত বা অঞ্চল-ভিত্তিক ছিল। ফলে, ক্ষুদ্র উৎপাদন সংগঠন, যা বাজার অঞ্চলের মধ্যেই সীমিত, এই শাসন ব্যবস্থার সঙ্গে মানানসই ছিল—ভিন দেশের খবর সামন্ততান্ত্রিক সামাজিক বাঁধুনি শিথিল করতে পারত। ক্রমে গ্রাম ত্যাগ করে কারিগরেরা শহরে বসবাস শুরু করে। এর ফলে কারিগরেরা বাজারের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ-বিচ্ছিন্ন হয়। বণিকরা এখন কারিগর আর ক্রেতার মধ্যে মধ্যস্থতা করতে শুরু করে। কারিগরদের তুলনায় বণিক সম্প্রদায়, গিল্ড বা তাদের সমবায়ের মাধ্যমে অনেক বেশী সংগঠিত ছিল। উপর্যুপরি, পৌরসভার প্রশাসনিক ক্ষমতাও এদের হাতে ছিল। তাই, দরাদরিতে বণিকরা বেশি সুবিধা করতে পারত। ক্রমশ, কারিগরদের আর্থিক অবস্থার অবনতি আর বণিকদের অবস্থার উন্নতি হতে থাকে। একসময়, কারিগররা উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল কেনার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। বাধ্য হয়ে এরা বণিকদের ওপর নির্ভর করে ধারে কাঁচামাল সরবরাহের জন্য। শুরু হয় দাদন প্রথা। কারিগরেরা বণিকদের নির্দেশমতো উৎপন্ন দ্রব্য সরবরাহ করতে আরম্ভ করে, তাদেরই অগ্রিম দেওয়া কাঁচামাল ব্যবহার করে। কারিগররা স্বাধীন ভাবে উৎপাদনের ক্ষমতা হারায়।
পরাধীন কারিগর থেকে শ্রমিক
ক্রমে কারিগরদের আর্থিক দুর্গতি এমন পর্যায়ে পৌছায় যে তারা বাধ্য হয় বণিকদের কাছে তাদের যন্ত্রপাতি বিক্রি করে দিতে। বণিকরা কারিগরদের বেশ কিছু যন্ত্র—যেমন তাঁত—একত্রিত করে একই ছাদের তলায়। এই আদিম কারখানাকে বলা হত ম্যানুফ্যাক্টারি। ম্যানুফ্যাক্টরিতে যন্ত্র চালাত পুরনো কারিগর শ্রেণি, যারা এখন মজুরির বিনিময় তাদের কর্মক্ষমতা বিক্রি করে অর্থ-উপার্জন করতে বাধ্য হল। অর্থাৎ কারিগর শ্রেণি রূপান্তরিত হল শ্রমিক শ্রেণিতে। এই পরিবর্তনকে মার্কস চিহ্নিত করছেন ক্যাপিটালের অধীনে আইনি নিয়ন্ত্রণ হিসাবে। আইনগতভাবে শ্রমিকের উৎপাদন সংক্রান্ত কোন সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আর থাকল না। এই প্রক্রিয়া, যাকে পুঁজির আদিম পুঞ্জীভবন (প্রিমিটিভ ক্যাপিটাল আক্যুমুলেশন) বলা হয়, মার্কস বিশদে আলোচনা করেছেন ক্যাপিটাল গ্রন্থের প্রথম খণ্ডের অষ্টম ভাগে।
উৎপাদন ব্যবস্থায় পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক ক্ষমতাও হাত বদলায়। সামন্ত খাজনাভোগীদের থেকে রাজনৈতিক ক্ষমতা চলে যায় বণিক শ্রেণির হাতে। এই প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয় ১৫০০ থেকে ১৬৫০ খ্রিষ্টাব্দ এই পর্যায়ে অবিচ্ছিন্ন মূল্যস্ফীতির ফলে। কারণ মূল্যস্ফীতিতে স্থির অর্থমূল্যের খাজনার প্রকৃত মূল্য ক্রমেই কমতে থাকে।
ম্যানুফ্যাক্টরি থেকে পুরোদস্তুর কারখানা উৎপাদনের সূচনা
আদিম পুঞ্জীভবনের আলোচনাতেই মার্কস বর্ণনা করছেন আইনি নিয়ন্ত্রণ থেকে কীভাবে পুঁজিপতিদের হাতে উৎপাদনের বাস্তবিক নিয়ন্ত্রণ-ক্ষমতা হস্তান্তর হল। প্রাথমিক অবস্থায় কারিগরেরা তাদের যন্ত্রপাতির ওপর মালিকানা হারিয়েছিল কিন্তু উৎপাদনের পরিকল্পনা, যন্ত্রের রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রের উন্নতি-পরিকল্পনা—এসবের ওপর তাদের বাস্তবিক নিয়ন্ত্রণ ছিল। এর মূল কারণ ছিল উৎপাদনের যন্ত্র ও কারিগরি বিদ্যা এদের মেধার দখলে ছিল। কারিগরেরা যন্ত্রের ওপর মালিকানা হারানো সত্ত্বেও যন্ত্রপাতি বা উৎপাদন পদ্ধতি অপরিবর্তিত থাকে। মুনাফা এবং (সেজন্য) উৎপাদন বাড়াবার তাগিদে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় কিছু পরিবর্তন করা হয় যার ফলে উৎপাদনের ওপর বাস্তবিক নিয়ন্ত্রণ শ্রমিকদের থেকে পুঁজিপতিদের প্রতিনিধি বা এক নতুন শ্রেণির কর্মী—ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারদের হাতে চলে যায়।
এই পরিবর্তনগুলির মধ্যে প্রথম যে পরিবর্তন অ্যাডাম স্মিথের মত ধ্রুপদী (ক্লাসিকাল) অর্থনীতিবিদদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তা হল শিল্পগত শ্রমবিভাজন। এই প্রক্রিয়াতে একটা পণ্য উৎপাদনের গোটা প্রক্রিয়াটিকে ছোট ছোট ভাগে বিভক্ত করে প্রতিটি ভাগ নির্দিষ্ট শ্রমিক বা শ্রমিক দলের হাতে ন্যস্ত করা হয়। স্মিথ দেখিয়েছিলেন আলপিন উৎপাদনের প্রক্রিয়াকে ১৯ ভাগে বিভক্ত করা হয়েছিল। এই বিভাজনের মধ্যে দিয়ে একদিকে উৎপাদন ব্যয় কমে অন্যদিকে উৎপাদন প্রক্রিয়ার ওপর শ্রমিক তার বাস্তবিক নিয়ন্ত্রণ হারায়।
ব্যয় কমে একাধিক কারণে। প্রথমত, এই পরিবর্তনের ফলে উৎপাদনের কাজ আরও দ্রুত সম্পন্ন হয়। প্রতিটি শ্রমিক আর আগের মত উৎপাদন সংক্রান্ত বিভিন্ন কাজ করে না; তারা যান্ত্রিকভাবে একই কাজ বারবার করার ফলে কাজটা যান্ত্রিক অভ্যাসে পরিণত হয়। এছাড়া, একটা কাজ সেরে অন্য কাজ হাতে নেওয়ার সময় বাঁচে। দ্বিতীয়ত, গড় মজুরি কম দিতে হয়। উৎপাদন প্রক্রিয়ার বিভাজনের ফলে, কিছু কিছু ভাগ সম্পন্ন করার জন্য অদক্ষ শ্রমিকই যথেষ্ট। আলপিন উৎপাদনের ক্ষেত্রে যেমন পিনের মাথা পালিশ করাটা সবচেয়ে দক্ষ কাজ। শিল্পগত শ্রমবিভাজনের আগে, প্রতিটি শ্রমিককেই এই দক্ষতার অধিকারী হতে হত। কিন্তু, এর পরে ১৯ জন শ্রমিক প্রতি মাত্র একজন এই দক্ষতা-সম্পন্ন হলেই যথেষ্ট ছিল। দক্ষতা অনুযায়ী মজুরি নির্ধারণের ফলে, শিল্পগত শ্রমবিভাজনের দরুন, গড় মজুরী কম দিতে হয়। এ ছাড়া, অদক্ষ শ্রমিক নিযুক্তির দরুন এখন অনভিজ্ঞ নারী ও শিশু শ্রমিকের নিয়োগের সম্ভাবনা খুলে গেল। নারী ও শিশু শ্রমিকদের জন্য তুলনামূলকভাবে আরও কম পারিশ্রমিক তখন সামাজিকভাবে স্বীকৃত ছিল কারণ এদের মজুরি পারিবারিক আয়ে সংযোজন মাত্র বলে গণ্য করা হত, মূল আয় বলে নয়। এসমস্ত কারণে, শিল্পগত শ্রমবিভাজনের বিস্তারের ফলে পুঁজিপতিরা মজুরি-ব্যয় কমাতে সফল হয়।
পুঁজিপতিদের দিক দিয়ে শ্রমবিভাজন প্রবর্তন করার তাগিদের আর একটা কারণ ছিল। এর মধ্য দিয়ে উৎপাদন প্রক্রিয়ার ওপর শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণ কমানো সম্ভব হয়। এই বিভাজনের আগে পর্যন্ত, প্রত্যেক শ্রমিক সামগ্রিক উৎপাদন প্রক্রিয়া সম্বন্ধে অবগত ছিল। পরিবর্তনের ফলে প্রত্যেক শ্রমিকের জ্ঞান উৎপাদন প্রক্রিয়ার নির্দিষ্ট ও ক্ষুদ্র অংশে সীমিত হয়। বিভাজন প্রবর্তনের পর, শ্রমিকরা কাজের পরিকল্পনা, যন্ত্রাদির মেরামত, উন্নতি পরিকল্পনা ইত্যাদি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়। এই সমস্ত কাজ ন্যস্ত হয় এক বিশেষ উচ্চশ্রেণির উৎপাদক বা পুঁজিপতির প্রতিনিধি—ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারদের ওপর।
নতুন নতুন যন্ত্র ব্যবহার এই পরিবর্তন ত্বরান্বিত করে। উৎপাদন প্রক্রিয়ার সূক্ষ্ম বিভাজন, আরও যান্ত্রিকীকরণ, উন্নত কৃত্রিম শক্তি দিয়ে যন্ত্র চালনার কৌশল—এই সমস্ত প্রক্রিয়াগুলিকে একত্রে চিহ্নিত করা হয় শিল্প-বিপ্লব (ইন্ডাসট্রিয়াল রেভল্যুশন) নামে। এর প্রভাব প্রথমে পড়ে কাপড়-শিল্পের ওপর। এই শিল্পের সম্প্রসারণে ঔপনিবেশিক শোষণও যথেষ্ট সহায়তা করে। প্রয়োজনীয় কাঁচামাল যোগায় দক্ষিণ আমেরিকার উপনিবেশগুলি। তুলো চাষ করত আফ্রিকা থেকে ব্রিটিশ লুটেরাদের তুলে আনা দাস-শ্রমিক; বাজার যোগাত ভারতীয় উপনিবেশ, তার নিজস্ব কাপড়-শিল্প ধ্বংসের বিনিময়ে। অবশ্য, নগরায়ণের ফলে, ছোট হলেও একটা স্থায়ী চাহিদার উৎস ছিল ইওরোপের অভ্যন্তরীণ শহরাঞ্চল।
সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিবর্তন
নগরায়নের ফলে সামন্ততান্ত্রিক বশ্যতা এবং ঐ যুগের আর্থ-সামাজিক স্তরবিন্যাস অবলুপ্ত হয়। ব্যক্তিস্বাধীনতা, ব্যক্তিতন্ত্র, লিবারালিজম, অর্থাৎ উদারনীতিবাদের জন্ম এই সময়। ছোট পুঁজিপতি, দোকানদার, সঙ্গে নব আইনজীবী সম্প্রদায় মিলিত হয়ে এক উদীয়মান মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্ম দেয় যারা ছিল নতুন বুর্জোয়া সমাজ ও সংস্কৃতির প্রধান ধারক। সাংস্কৃতিক, বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক জগতে যে বিরাট মন্থন চলছিল তা এই পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণে কিছু মনীষীদের অবদান দেখলেই স্পষ্ট হয়।
বেন্থাম (১৭৪৮–১৮৩২): ইউটিলিটারিয়ান ধারার প্রবক্তা হিসাবে পরিচিত। বেন্থামের মতে মানুষ আত্মকেন্দ্রিক; যে কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে ব্যক্তি কী করবে তা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে তার সিদ্ধান্তের ফলে; তার আন্দাজ মত, কতটা তাকে কষ্টভোগ করতে হতে পারে আর কতটা তৃপ্তি সে পাবে—তার ওপর। সে ঠাণ্ডা মাথায় হিসেব করে কোন তৃপ্তি সে খুঁজবে আর কোন কষ্ট সে এড়িয়ে যাবে। তাঁর মতে মানুষ স্বাভাবিক ভাবে নিথর (ইনার্ট) বা কর্মবিমুখ। অর্থাৎ, তৃপ্তি বা যন্ত্রণার সম্ভাবনা না দেখলে সে কিছুই করে না, নিথর থাকে। বেন্থামের দর্শন অনুযায়ী ধর্ম বা নৈতিকতা সমাজের ভিত্তি নয়। স্বাধীন, বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিদের একক ব্যক্তিস্বিদ্ধান্তই সামগ্রিক সমাজের যুক্তিপথ নির্ধারণ করে।
দেকার্ত (১৫৯৬–১৬৫০): সংশয়বাদের প্রবক্তা বলে পরিচিত। দেকার্ত বিশ্বাস করতেন যে, দর্শনের কেন্দ্রে রয়েছে যুক্তি। কোনো কিছুই নিঃসংশয় বিশ্বাসে গ্রহণ করা উচিত নয়। সব কিছুই প্রশ্ন করা উচিত।
নিউটন (১৬৪৩–১৭২৭): প্রকৃতির একটি সাধারণ নিয়ম প্রস্তাব করেন, যা বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ড সম্বন্ধে মানুষের ধারণা বদলে দেয়। বল-এর ধারণা আবিষ্কার করেন এবং বল ও বস্তুর মধ্যে সংযোগকারী নিয়মগুলি, যা প্রয়োগ করে ব্রহ্মাণ্ডে গ্রহ-নক্ষত্রের পথ নির্ণয় পর্যন্ত সম্ভব হয়। একরকমভাবেও বলা যায় যে, নিউটন ভগবানের যায়গায় ‘বল’-এর ধারনা প্রতিষ্ঠিত করেন।
চিন্তাচেতনার জগতে এঁরা এবং আরও অনেক মনীষীদের আবির্ভাব যুগের অস্থিরতারই ইঙ্গিত করে। তবে, মার্কসের চিন্তাভাবনার ওপর এদের মধ্য সবচেয়ে বেশী প্রভাব বিস্তার করেছিল ডারউইনের তত্ত্ব।
চার্লস ডারউইন (১৮০৮–১৮৮২): সমস্ত জীব প্রজাতির আবির্ভাব এবং বিবর্তন সম্বন্ধে ডারউইন একটি তত্ত্ব আবিষ্কার করেন যা প্রকাশিত হয়েছিল ‘অন দি অরিজিন ওফ স্পিসিস’ গ্রন্থে। তাঁর মূল প্রস্তাব ছিল—নতুন নতুন প্রজাতির জীব অহরহ জন্মাচ্ছে; এদের মধ্যে সবচেয়ে সক্ষম প্রজাতিগুলিই বিভিন্ন প্রজাতির অন্তর্গত আপশহীন লড়াইতে টিকে থাকে। প্রকাশের অল্প দিনের মধ্যে বইটি পাঠ করে মার্কস এঙ্গেলস্কে লেখেন যে, প্রকৃতির ইতিহাসে তাঁদের দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের তত্ত্বের সমর্থন পাওয়া গেল।
ধ্রুপদী অর্থনীতির (ক্লাসিকাল) আবির্ভাব
অষ্টাদশ শতাব্দী ছিল নানা যুগান্তকারী পরিবর্তনের সাক্ষী। শিল্প বিপ্লব, মধ্যবর্তী শ্রেণির আবির্ভাব; ব্যক্তিতন্ত্র, স্বাধীনতার বোধ ও বিজ্ঞান-মনস্কতার জন্ম এই শতকেই। বিরাট সামাজিক মন্থন ও ধনবান এবং মধ্যবর্তী শ্রেণির মধ্যে সম্পদের প্রাচুর্য ও তা ভোগের ফলে এক শ্রেণির মানুষের বিশ্বাস জন্মেছিল যে, অর্থনৈতিক অগ্রগতির জোয়ার চিরস্থায়ী হবে। এই আশার একটি তাত্ত্বিক প্রকাশ ঘটল ধ্রুপদী অর্থনীতির আবির্ভাবে। এই ধারার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক ছিলেন অ্যাডাম স্মিথ। সবচেয়ে প্রচলিত ব্যাখ্যা অনুসারে স্মিথ উদারনীতিবাদের একটি মৌলিক স্ববিরোধের সমাধান প্রস্তাব করেছিলেন। উদারনীতিবাদ ব্যক্তিস্বাধীনতার সমর্থক। কিন্তু, তা এও বিশ্বাস করে যে প্রতিটি ব্যক্তি আত্মকেন্দ্রিক, অর্থাৎ নিজের সুখ ছাড়া কিছুই বোঝে না। বল্গাবিহীন ব্যক্তিস্বাধীনতা সমাজে অরাজকতা সৃষ্টি করবে, এই-ই স্বাভাবিক। সুতরাং লক, হবস্-দের মতো উদারনীতিবাদের তাত্ত্বিকদের মতে, এই সঙ্কটের বাস্তবিক সমাধান হল, এই অরাজকতা থেকে মুক্তির জন্য ব্যক্তিকে স্বাধীন প্রয়াস করতে হবে। তারা সহমত হয়ে রাষ্ট্রব্যবস্থা নির্মাণ করবে, যার প্রধান কাজ হবে সমাজে আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখা। এর জন্য তারা তাদের স্বাধীনতা রাষ্ট্রের হাতে সঁপে দেয়, যে আবার আইনগতভাবে নির্দিষ্ট ব্যক্তি-স্বাধীনতা প্রত্যেকটি নাগরিককে প্রদান করে। ফাঁকটা ভরাট হল, কিন্তু খুব বিশ্বাসযোগ্যভাবে নয়। স্বাধীন ব্যক্তি কেন স্বেচ্ছায় তার স্বাধীনতা খর্ব করবে?
স্মিথ এই ধাঁধা বা স্ববিরোধের অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য একটি সমাধান দিয়েছেন বলে অনেক ভাষ্যকারের ধারণা। স্মিথ দেখালেন যে, আত্মকেন্দ্রিক ব্যক্তিদের বাজারে লেনদেনের পূর্ণ স্বাধীনতা দিলে ‘বাজারের অদৃশ্য হাত’ ভারসাম্য বজায় রেখে দাম নির্দিষ্ট করে এবং ঐ দামে লেনদেনের ক্ষেত্রে সমষ্টিগতভাবে সমাজ সর্বোচ্চ-সম্ভব উপযোগিতা অর্জন করে। এর ফলে ব্যক্তিস্বাধীনতাও ক্ষুণ্ণ হল না আর অরাজকতাও এড়ানো গেল, সর্বোপরি ব্যবস্থাটা উপযোগিতা বাড়ায় বলে কাম্যও বটে।
বস্তুত স্মিথের এই পাঠ একপেশে। স্মিথের একটা বক্তব্য ছিল যে, মানুষের প্রকৃতিই এমন যে তাকে নিয়ে অন্যে কি ভাবল, সে ব্যাপারে সে চিন্তিত। বিষয়টা এরকমভাবে স্মিথ পেশ করেছেন: প্রত্যেকটি মানুষ একজন নিরপেক্ষ পরিদর্শকের (ইম্পারশিয়াল অবসারভার) উপস্থিতি কল্পনা করে নেয়, যে তার কাজকর্ম পর্যালোচনা করে চলেছেন। সহজ করে ভাবলে বলা যায় যে, আমার কাজের ওপর অনেকের নজর আছে যেমন আমার নজর আছে অন্যের কাজের প্রতি। অনেকে মূল্যায়ন করছে বলে গড়ে মূল্যায়ন নিরপেক্ষ ধরে নেওয়া যায়। আমরা সবাই চাই এই নিরপেক্ষ পরিদর্শকের হাতে ভাল নম্বর পেতে। অথবা বলা যায় আমরা সমাজের গড় নজরে ভালো হতে চাই। এই ইচ্ছের মধ্যেই রয়েছে সমাজে মিলমিশের চাবিকাঠি; সমাজ কেন অরাজকতার শিকার নয়, তার উত্তর। স্মিথের মতে এর জন্য কোন রাষ্ট্রের লৌহশাসন লাগে না।
ফুকোর মত আধুনিক ভাষ্যকাররা অবশ্য ভিন্নমত পোষণ করেন। তাঁদের মতে, স্মিথ উদারনীতিবাদের ধাঁধার সমাধান করেন নি; তিনি শুধু ব্যক্তিস্বাধীনতা আর সরকারি নজরদারির ক্ষেত্র থেকে স্ববিরোধটি স্থানান্তরিত করেছেন শাসন আর অবারিত বাজারের মধ্যে সংঘাতের ক্ষেত্রে। তিনি অর্থনৈতিক চেতনাকে বিষয়ী চেতনার মূল বস্তুতে উন্নীত করেছেন। এর ফলে উদারনীতিবাদের মূল স্ববিরোধ নানাভাবে প্রকাশ পেয়েছে অর্থনীতির ক্ষেত্রে: ব্যক্তিগত ক্ষেত্র/পণ্য আর সর্বজনীন ক্ষেত্র/পণ্যের মধ্যে অমীমাংসিত বিরোধ; ব্যক্তি মালিকানা আর যৌথ মালিকানার মধ্যে সংঘাত ইত্যাদি। এই বিরোধগুলি প্রকাশ পায় আধুনিক কালে নানা ধরনের সামাজিক প্রতিবাদ/প্রতিরোধে। যেমন, ক্ষেত্র দখলের আন্দোলন, সবুজ (গ্রীন) আন্দোলন ইত্যাদি।
মূল্য এবং বণ্টন
আমাদের আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে স্মিথের মূল্য-তত্ত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ মার্কসের পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থার আলোচনার সূচনা স্মিথের মূল্য ও বণ্টন-তত্ত্বের সমালোচনা থেকে। মার্কসের নিজস্ব মতানুসারে, মূল্য ও বণ্টনের মধ্যে সম্পর্ক আছে এই ধারণা আমরা প্রথম পাই স্মিথের তত্ত্বে। ‘প্রাচীন এবং অসংস্কৃত (আর্লি অ্যান্ড রূড সোসাইটি) সমাজে, যেখানে পুঁজির পুঞ্জীভবন এবং জমি থেকে কৃষকের বিচ্ছেদ ঘটে নি’ (বই ১, অধ্যায় ৬) সেই অবস্থায় পণ্যের মূল্য বা দাম উৎপাদনে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ ভাবে যে শ্রম ব্যবহার হয়েছে তা দিয়ে নির্ণয় হত। আর এই মূল্য সম্পূর্ণভাবে যারা পরিশ্রম করত তারাই ভোগ করত।
স্মিথের তত্ত্ব যদি পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থায় প্রয়োগ করা হয়, তাহলে বাজারে পণ্য বিক্রি করে যে অর্থ উপার্জন হল তা পণ্যে সম্পূর্ণ নিহিত শ্রমের সমান। তাই পণ্য বিক্রি করে যা আয় হল তা সম্পূর্ণভাবে মজুরি দিতে ব্যয় হয়ে যেত। সেক্ষেত্রে বণ্টনের আর দুই ভাগ মেটানো সম্ভব হত না—মুনাফা এবং ভাড়া। ফলে পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় স্মিথকে তার তত্ত্ব পরিমার্জন করতে হয়। স্মিথ বললেন যে পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় দাম নিহিত শ্রমের থেকে বেশী; পণ্য দিয়ে যে পরিমাণ শ্রম কেনা যায় (লেবার কমান্ডেড), পণ্যের দাম তার সমান হয়।
মার্কসের মতে স্মিথের ভুল
মার্কসের মতে, স্মিথের তথাকথিত আদিম অবস্থা থেকে পুঁজিবাদী অবস্থায় উত্তরণের ফলে মূল্য-তত্ত্বের পরিমার্জনের কারণ তার একটি মৌলিক ভ্রান্তি: তিনি ধরে নিয়েছিলেন যে, পণ্যে নিহিত সম্পূর্ণ শ্রম মজুরি হিসেবে শ্রমিককে প্রদান করা হয়। “তারা [ক্লাসিকালরা] কখনই আবিষ্কার করে নি যে তাদের বিশ্লেষণের ধারা শুধুমাত্র শ্রমের বাজার-দর থেকে তার আপাত মূল্যে পৌঁছে দেয় নি, বরঞ্চ শ্রমের মূল্যকেই বিশ্লেষণ করেছে শ্রম-শক্তির মূল্যে”। (ক্যাপিটাল ১, অধ্যায় ১৯, পৃ. ৩৭৪)
বিষয়টা একটু বিশদে দেখা যাক। স্মিথের মতে, যে কোনো পণ্যের মূল্য আসলে তাতে নিহিত শ্রমের মূল্য। তাই কারখানায় যদি কোনো শ্রমিক ১০ ঘণ্টা কাজ করে, তাহপলে তার এই পরিশ্রমের দাম বা মূল্য ১০ কারণ ১০ ঘণ্টা শ্রমে তো ১০ ঘণ্টা শ্রমই নিহিত। সুতরাং ১০ ঘন্টা শ্রমে নির্মিত পণ্যের দাম ও মজুরিও ১০ হওয়া উচিত। তা হলে মুনাফা আর ভাড়া দেওয়া তো সম্ভব নয়। তাই নিহিত শ্রম-তত্ত্ব বর্জন করে স্মিথ বললেন যে, পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় জিনিসের দাম ঠিক হয় তাতে নিহিত শ্রম দিয়ে নয়, তার এক একক বাজারে কতটা শ্রম কিনতে পারে তা দিয়ে। বস্তুত, এই তত্ত্ব দামকে আর বিশ্লেষণ করল না, শ্রম হয়ে গেল দাম পরিমাপের একটা মাপকাঠি, যেমন টাকা।
মার্কস বললেন—শ্রমিক পুঁজিপতিকে শ্রম নয়, শ্রম-শক্তি বিক্রি করে। আর পাঁচটা পণ্যের মত, শ্রম-শক্তির মূল্যও আসলে তাতে নিহিত শ্রমই। শ্রম-শক্তিতে নিহিত শ্রম কী? ওই পরিমাণ শ্রম-শক্তি উৎপাদনে যতটা শ্রম ব্যয় হয় সেটাই তার মূল্য। শ্রমিক দিনে ১০ ঘণ্টা কাজ করে। তাই ১০ ঘণ্টা শ্রম-শক্তি বিক্রি করতে তাকে একদিন সপরিবার বাঁচতে হবে। এর জন্য তার নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস বাজারে কিনতে হয়। এই সব ন্যূনতম প্রয়োজনীয় জিনিস উৎপাদনে যতটা শ্রম দরকার সেটাই ঐ ১০ শ্রম-শক্তির মূল্য। এর পরিমাণ যদি, ধরা যাক, ৬ ঘণ্টা হয় তাহলে শ্রমিক পাবে ৬-এর আনুপাতিক মজুরি, বাকি ৪ (= ১০―৬) হল উদ্বৃত্ত মূল্য (সারপ্লাস ভ্যালু)। এই উদ্বৃত্ত মূল্য পুঁজিপতি আহরণ করে, একটা অংশ ভাড়া, সুদ ইত্যাদি দিতে ব্যবহার করে। আমরা পরে দেখব যে, উদ্বৃত্ত মূল্য মার্কসের পুঁজিবাদের বিশ্লেষণের এবং তথাকথিত বুর্জোয়া অর্থনীতির সমালোচনার মূল স্তম্ভ। আপাতত আমরা একটু তৎকালীন ইতিহাস ফিরে দেখবো। বোঝার চেষ্টা করব জনগণের ব্যাপক অংশের ওপর শিল্প বিপ্লবের প্রভাব কী ও কেমন ছিল।
শিল্প বিপ্লবের কুফল
বিলেতের মোট জনসংখ্যার একটি ছোট অংশ শিল্পবিপ্লবের ফলে উপকৃত হয়; ব্যাপক অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ছিল শ্রমিক শ্রেণি, নিঃসম্বল এবং ভবঘুরেরা। এর প্রধান কারণ ছিল অর্থনৈতিক বিপর্যয়। ১৭৫০-এ মজুরি দেওয়া হত, তখনকার বিচারে ন্যূনতম হারে। এরপর প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে প্রকৃত মজুরি কমতে থাকে। পরবর্তী বিশ বছরের গতিবিধি সম্বন্ধে ঐতিহাসিকরা ঐক্যমত নন। এর সঙ্গে যুক্ত হয় দৈনিক কাজের সময়ের তাৎপর্যপূর্ণ বৃদ্ধি।
অর্থনৈতিক দুরবস্থা ছাড়াও শ্রমিকরা নানা রকম সামাজিক ও মানসিক সমস্যায় পড়ে। শ্রমিকরা তাদের কাজের থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন বোধ করতে শুরু করে। আমরা আগেই উল্লেখ করেছি যে কারখানায় শিল্পগত শ্রমবিভাজন প্রবর্তন করার ফলে প্রতিটি শ্রমিক উৎপাদন প্রক্রিয়ার একটি সীমিত, ক্ষুদ্র অংশ সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল থাকে। তাই শ্রমিকের পক্ষে তার কাজ পরিকল্পনা করার অবকাশ থাকে না। মার্কস ও এঙ্গেলসের মতে পশু-শ্রম থেকে মানুষের শ্রমের পার্থক্য এই যে মানুষ তার কাজ দু’বার করে—একবার মস্তিষ্কে (পরিকল্পনা) আর দ্বিতীয়বার বাস্তবে (পরিকল্পনার বাস্তবায়ন)। তাই কারখানার শ্রমিকের কাজের ধরন পশু-শ্রমের মত। এর থেকেই একধরণের বিচ্ছিন্নতাবোধের জন্ম হয়। এ ছাড়া ছিল গ্রামীণ সমাজের নিরাপত্তা হারাবার কষ্ট। পারিবারিক সময় কাটাবার অবকাশও কমে যায়—অনেক সময়ই স্বামী, স্ত্রী, বাচ্চারা ভিন্ন ভিন্ন কারখানায় কাজ পেত।
গরিবদের অবস্থার অবনতিতে রাষ্ট্র সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। কম্বিনেশন (সম্মিলন) আইনের মাধ্যমে রাষ্ট্র শ্রমিক সঙ্ঘ বেআইনি ঘোষণা করে। পাশাপাশি প্যূর (দরিদ্র সংক্রান্ত) আইনের মাধ্যমে পুঁজিপতিদের নানাভাবে সস্তা শ্রমিক সরবরাহের ব্যবস্থা করেছিল রাষ্ট্র। ভিক্ষাজীবী ও ভবঘুরেদের বেআইনি ঘোষণা করা হয়; নির্দিষ্ট ওয়ার্ক হাউসে (শ্রম-গৃহ) এদের আশ্রয় দেওয়ার দায়িত্ব ন্যস্ত হয় প্যারিশের (এক একটি চার্চের অধীনস্থ অঞ্চল) ওপর। শ্রম-গৃহগুলি কারখানার মালিকদের কাছে নিলামে ইজারা দেওয়া হত। বাসিন্দারা বাধ্য হত মালিকের মর্জিমতো সময় কাজ করতে। এর বিনিময়ে শ্রম-গৃহগুলিতে মিলত যৎসামান্য, অপুষ্টিকর খাদ্য। অনেক বাসিন্দা, বিশেষত শিশুদের, অপুষ্টির কারণে মৃত্যুও ঘটত। এই শ্রম-গৃহগুলির ওপর সরকারের কোনওরকম নিয়ন্ত্রণ ছিল না।
সমাজবাদী চিন্তার উদ্ভব
শিল্প-বিপ্লবের কারণে আর গরিবদের আর্থিক অবনতির ফলে নানা প্রতিবাদ-প্রতিরোধ-আন্দোলন শুরু হয়। এই আন্দোলনগুলির থেকেই বিভিন্ন ধরণের সমাজবাদী বা সাম্যবাদী চিন্তার সূচনা। লেভেলার আর ডিগার নামক দুটি গোষ্ঠীর জন্ম শিল্প বিপ্লবের আগেই। এরা অব্যবহৃত সরকারি জমি দখল করে কমিউন বা গোষ্ঠীগত ভাবে চাষ করত। শিল্পবিপ্লবের সঙ্গেই লুডাইট বা যন্ত্র ভাঙার আন্দোলনের সূচনা। এদের বিশ্বাসে এই সব আবিষ্কারই শ্রমজীবী মানুষদের দুর্গতির কারণ।
পরবর্তীকালে, মার্কসের আগে তিনজন সমাজবাদীর চিন্তা শ্রমজীবীদের কিছু অংশকে প্রভাবিত করেছিল। এরা হলেন ওয়েন, বেবুফ ও ফুরিয়ের। ওয়েনের মতে যন্ত্রের কাছে মানুষের নতি স্বীকারই শ্রমজীবীদের দুর্দশার কারণ। তিনি চেষ্টা করেন জীবনের সমস্ত দিক বেষ্টন করে এক একটা আঞ্চলিক গোষ্ঠী গড়ে তুলতে—উৎপাদন, বণ্টন, পারিবারিক বসবাস, সন্তানদের লালন পালন ইত্যাদি। বেবুফ অনেক বেশী আগ্রাসী ধরণের সমাজবাদ প্রচার করতেন। তাঁর মতে ‘প্রকৃতি প্রত্যেক মানুষকে সমস্ত সম্পদ ভোগ করার সমান অধিকার দিয়েছে’। তিনি বিশ্বাস করতেন একমাত্র সশস্ত্র বিদ্রোহই এই অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারে। ফুরিয়ের আর ওয়েনের ভাবনা-চিন্তায় কিছু মৌলিক মিল ছিল, বিশেষ করে তাদের গোষ্ঠী ধারণায়। পার্থক্য ছিল এই যে, ওয়েন বিশ্বাস করতেন গোষ্ঠীতন্ত্র একটি যৌক্তিক প্রস্তাব কারণ এই গোষ্ঠীবদ্ধতা মানুষের চেতনার অঙ্গ। বিপরীতে, ওয়েন বিশ্বাস করতেন যে মানুষে মানুষে প্রকৃতিগত প্রভেদ আছে এবং গোষ্ঠীতন্ত্রের অন্তিম পর্যায়ে (জটিল জনগোষ্ঠী কমপ্লেক্স এসোসিয়েশন) যে-যার নিজের মতো থাকার সমান অধিকার সকলেরই পাওয়া উচিত।
মার্কসের মতবাদে একটা অভিনবত্ব ছিল। তাঁর মতে বৈষম্যের কারণ উৎপাদন ব্যবস্থার মধ্যে সংগঠিত শোষণ। শোষণ সম্ভব হয় কারণ শ্রমিক শ্রেণি উৎপাদনের উপকরণের মালিকানা থেকে বঞ্চিত। মার্কস তাঁর শোষণ তত্ত্বের থেকে শুরু করে পুঁজিবাদের একটি সম্পূর্ণ বিবরণ নির্মাণ করেন। এর থেকেই উদ্ভূত শ্রমিক শ্রেণির মুক্তির পথ—উৎপাদনের উপাদানের ওপর তাদের মালিকানা পুনঃপ্রতিষ্ঠা। বেবুফের মতই মার্কস বিশ্বাস করতেন যে এই মালিকানা পুনরুদ্ধারের পথ সশস্ত্র সংগ্রাম কারণ শোষকরা তাদের অধিকার স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ছেড়ে দেবে না।
উৎসপঞ্জি
- Michel Foucault, ‘The Birth of Biopolitics: Lectures at the Collège de France, 1978–1979’, Michel Senellart (editor), Graham Burchell (translator), Basingstoke: Palgrave Macmillan, 2008.
- Eric Hobsbawm, ‘Industry and Empire: From 1750 to the Present Day’, Harmondsworth, Middlesex: Penguin Books, 1968.
- E. K. Hunt & Howard J. Sherman, ‘Economics: An Introduction to Traditional and Radical Views’, New York: Harper & Row, 1975, 2nd ed.
- Karl Marx, ‘Capital: A Critique of Political Economy’, Vol. 1, Samuel Moore & Edward Aveling (translators), Frederick Engels (editor), Moscow: Progress Publishers, Marxists Internet Archive, [https://www.marxists.org/archive/marx/works/download/pdf/Capital-Volume-I.pdf].
- Maurice Dobb, ‘Studies in the Development of Capitalism’, London: Routledge & Kegan Paul, 1950, First published 1946.
- Eric Roll, ‘A History of Economic Thought’, London: Faber and Faber, 1973, 4th ed.
- Ernesto Screpanti & Stefano Zamagni, ‘An Outline of the History of Economic Thought’, David Field & Lynn Cohen (translators), Oxford: Oxford University Press, 2005, 2nd ed.
- Adam Smith, ‘An Inquiry into the Nature and Causes of the Wealth of Nations’, Chicago: University of Chicago Press, 2012.
- Paul M. Sweezy et al., ‘The Transition from Feudalism to Capitalism: A Symposium’, New York: Science & Society, 1963, First published 1954.

লেখক
প্রণবকান্তি বসু
সত্তরের দশকে প্রেসিডেন্সি কলেজ এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতির পাঠ। সেই সময় থেকেই, বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত, যুক্ত ছিলেন ‘অন্য অর্থ’ পত্রিকা গোষ্ঠীর সঙ্গে। দীর্ঘকাল পড়িয়েছেন আশুতোষ কলেজ এবং বিশ্বভারতীতে। মার্কসবাদের নিবিড় পাঠক প্রণবকান্তি বসু বাংলা, ইংরেজি দুই ভাষাতেই বহু সাময়িক পত্রে প্রবন্ধ লিখে আসছেন দীর্ঘদিন ধরে। তাঁর লেখা একাধিক গ্রন্থের মধ্যে আছে ‘সামন্ততন্ত্র: উত্তর আধুনিকতার চোখে’, ‘Globalisation—An Anti Text: A Local View’ প্রভৃতি।
সব কাজ দেখুন →সংখ্যা ১-এর অন্যান্য লেখা
সংখ্যা ১সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়
“কম্পিউটার, ই-মেল এবং ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট হ্যাক করা নিয়ে অনেক আলোচনা হয়। কিন্তু আমরা এখন এমন এক যুগে প্রবেশ করেছি যেখানে মানুষকেও হ্যাক করা সম্ভব।” ‘উই আর বিকামিং হ্যাকেবল অ্যানিমেলস’—হাড়হিম করে দেওয়া এক বাস্তবতার কথা আমাদের বলেছেন হারারি।
সংখ্যা ১গল্পস্বল্প
বোতাম
সবকিছু যখন এক ক্লিকে বদলে যায়, তখন কিছু মানুষ নিঃশব্দে পাহারা দেয় তাদের চিরপুরাতন বিশ্বাস। সুতো আর মায়া দিয়ে পার্বতীদি কী বুনে চলেছেন দিনরাত? কাগজের মতো সহজে ছিঁড়ে যাওয়া সম্পর্কের ভিড়ে, বুকের ভেতরে সামান্য কাপড় বাঁচিয়ে রাখার এক মায়াবী আখ্যান ‘বোতাম’।
সংখ্যা ১পুরাতনী
ওড়িশা প্রজাতন্ত্র—বিংশ শতাব্দীর ইতিবৃত্তের এক বিস্মৃত পৃষ্ঠা: দ্বিতীয় পর্ব
১৮৪৫ সালে লেখা ১৯২৫ সালের এক কাহিনি। এক বিকল্প ইতিহাস। বিদ্রোহের গল্প। এক ভবিষ্যতের উড়িষ্যার গল্প। যে উড়িষ্যা একদিন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীন প্রজাতন্ত্রে পরিণত হবে। কিন্তু সেই স্বাধীনতার পথ মসৃণ নয়; তার ভিতর লুকিয়ে আছে অরণ্যের গভীরে জমে থাকা ক্ষোভ, হারিয়ে যাওয়া স্বাধীনতার স্মৃতি এবং পাহাড়ি মানুষের অদম্য আত্মমর্যাদা। শশীচন্দ্র দত্তের এই কল্প-ভবিষ্যতের কাহিনি যেন উনিশ শতকের ঔপনিবেশিক বাস্তবতার এক প্রতিবিম্ব; স্বাধীনতার স্বপ্ন কীভাবে প্রতিরোধের ভাষা খুঁজে পায়, তার এক রোমাঞ্চকর আখ্যান।

