কর্নেলের ঘরে যে নদীটা থাকত
বিষ্ণুপুরের তিনশো বছরের পুরোনো বাড়িতে একাকী কর্নেল শশাঙ্কবাবুর শোবার ঘরের মাঝখান দিয়ে বয়ে যেত এক জীবন্ত নদী। সেই নদীই ছিল তাঁর নিঃসঙ্গ জীবনের আশ্রয়। কিন্তু এক জন্মদিনে নদী তাঁর অতীতকে বুকে নিয়ে মিলিয়ে গেলে স্তব্ধ হয়ে যায় কর্নেলের ঘর। হারানো নদীটকে ফিরে পাওয়ার তীব্র জেদে শুরু হয় খনন।

সংখ্যা ২রিটায়ার্ড কর্নেল শশাঙ্কবাবু বিষ্ণুপুরের একটা পুরোনো কাছারি বাড়িতে থাকতেন। বাড়িটা তিনশো বছরের পুরোনো। তাঁর স্ত্রী মারা গেছেন অনেক দিন, ছেলে থাকে আমেরিকায়। তাই তিনি একাই থাকতেন।
বাড়ির সবচেয়ে অদ্ভুত জিনিসটা ছিল কর্নেলের শোবার ঘরে। ঘরের ঠিক মাঝখানে একটা নদী বইত।
নদীটা খুব ছোট না, খুব বড়োও না। প্রায় দশ-বারো হাত মতো চওড়া। পশ্চিমের দেওয়াল ফুঁড়ে ঢুকে, পুবের দেওয়াল ফুঁড়ে বেরিয়ে যেত। জল পরিষ্কার, স্রোত আছে, ছোট ছোট মাছও আছে। রাতে নদী থেকে জোনাকি উঠত।
কর্নেল যখন বাড়িটা কিনেছিলেন, দলিল লেখার সময় উকিল বলেছিল, ‘ঘরের মধ্যে একটা নদী আছে, ওটা আপনাকে মেনে নিতে হবে।’ কর্নেল মেনে নিয়েছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন, এ আর এমন কি, বিষ্ণুপুরে কত বাড়িতেই তো ঘরের ভেতর দিয়ে সাপ যায়, এখানে না হয় একটা নদী থাকল।
তিনি নদীটার ওপর একটা ছোট কাঠের সাঁকো বানিয়েছিলেন। রাতে শুতে যাওয়ার জন্য সাঁকো পেরোতে হতো।
কর্নেলের জীবন নদীটাকে ঘিরেই চলত। তিনি সকালে নদীর পাড়ে বসে দাঁত মাজতেন। দুপুরে নদীতে স্নান সেরে খাটের ওপর বসে পা ডুবিয়ে রাখতেন জলে। মাছগুলো তাঁর পায়ের কাছে এসে ঘুরে যেত। রাতে নদীর শব্দে তাঁর ঘুম আসত।
একদিন একটা চোর এল। চোরটা সাঁকো পেরিয়ে আলমারি খুলতেই নদীটা ফুলে উঠল। জল বেড়ে চোরের হাঁটু পর্যন্ত ডুবে গেল। ঘরের ভেতরে হঠাৎ স্রোতের শব্দ বাড়ল। চোরটা ভয় পেয়ে পালিয়ে গেল, কিন্তু তার একটা চটি নদীতে পড়ে রইল। সেই চটি আজও নদীতে ভাসে, কখনো ডোবে না। একবার ঘুরে আসে, আবার ফিরে আসে। কর্নেল ওটাকে তাঁর ঘরের বাতিঘর বলে ডাকতেন। কোনটা পূর্ব, কোনটা পশ্চিম, তিনি ওই চটি দেখে বুঝতেন।
কর্নেলের ছেলে বিদেশ থেকে চিঠি লিখল, ‘বাবা, তুমি বাড়িটা বিক্রি করে আমার কাছে চলে এসো।’ কর্নেল উত্তরে লিখলেন, ‘নদীটাকে নিয়ে যাওয়া যাবে না, তাই আমিও যেতে পারব না।’
ছেলে বিশ্বাস করল না। সে ভাবল, বাবার মাথা খারাপ হয়েছে।
আসল ঘটনা ঘটল কর্নেলের আশি বছরের জন্মদিনে। সেদিন সকাল থেকে নদীর জল ঘোলা। মাছগুলো আর দেখা যাচ্ছে না। কর্নেল নদীতে হাত ডুবিয়ে দেখলেন, জল গরম।
দুপুরে, নদীর ওপার থেকে, মানে পুবের দেওয়ালের ভেতর থেকে, একটা নৌকা এলো। নৌকায় বসে আছেন কর্নেলের স্ত্রী, যিনি পনেরো বছর আগে মারা গেছেন। তাঁর কোলে কর্নেলের মা, যিনি কর্নেলের জন্মের সময় মারা গিয়েছিলেন।
স্ত্রী বললেন, ‘অনেকদিন তোমার ঘরে আছি, তুমি খেয়াল করোনি? এই নদীটা আসলে আমরাই।’
কর্নেল বললেন, ‘তা তোমরা এখন যাচ্ছ কোথায়?’
স্ত্রী বললেন, ‘নদীটার উৎসে। তোমার ঘরে থাকতে থাকতে নদীটা ক্লান্ত হয়ে গেছে।’
কর্নেল বললেন, ‘তাহলে আমার ঘুম?’
স্ত্রী হাসলেন। বললেন, ‘এবার তুমি নদীর শব্দ ছাড়াই ঘুমোতে শিখবে।’
নৌকাটা পশ্চিমের দেওয়াল ফুঁড়ে বেরিয়ে গেল। তার পেছন পেছন সমস্ত জল, সমস্ত মাছ, এমনকি চোরের সেই চটিটাও চলে গেল। ঘরের মাঝখানে পড়ে রইল শুধু একটা শুকনো খাত। খাতের গায়ে শ্যাওলা, কাদা, আর ভেজা বালির দাগ।
সেদিন রাতে কর্নেল ঘুমোতে পারলেন না। নদীর শব্দ নেই। এত নিস্তব্ধতা তিনি জীবনে শোনেননি।
পরদিন সকালে তিনি একটা কোদাল নিয়ে ঘরের মাঝখানের শুকনো খাতটা খুঁড়তে শুরু করলেন। প্রতিবেশীরা ভাবল, বুড়ো পাগল হয়েছে।
তিনি তিন দিন তিন রাত খুঁড়লেন। চতুর্থ দিনে, খাতের ভেতর থেকে জল বেরোল। নোনা জল।
কর্নেল বুঝলেন, তিনি সমুদ্র পর্যন্ত খুঁড়ে ফেলেছেন। আর সেই জলের ওপর ভাসতে ভাসতে আবার ফিরে এলো চোরের সেই চটিটা।
এখন কর্নেলের ঘরের মাঝখানে আর নদী নেই, একটা সমুদ্র আছে। ছোট্ট, ঘরের মাপের সমুদ্র। সেখানে জোয়ার ভাটা হয়। রাতে যখন জোয়ার আসে, তখন কর্নেলের খাটটা একটু ভেসে ওঠে। তিনি ভেসে ভেসে ঘুমোন।
তাঁর ছেলে আমেরিকা থেকে ফিরে এসে দেখল, বাবা ঘরের ভেতর একটা সমুদ্রের ওপর ভাসছেন, হাতে একটা চোরের চটি। ছেলে আর কিছু বলল না। সে জুতো খুলে সমুদ্রে পা ডুবিয়ে বসল।

লেখক
সত্যসাধন মণ্ডল
বিশ্বভারতীর প্রাক্তনী। লেখার বিষয় মূলত কবিতা। পত্র-পত্রিকা ও ফেসবুকে নিয়মিত লেখালেখি করেন। ইতিপূর্বে উর্ণপত্র থেকে প্রকাশিত হয়েছে ‘ঈশ্বরের জন্য লেখা কবিতা’ নামে একটি কাব্যগ্রন্থ। তাঁর ঘোষণা অনুসারে—মানুষ আর সাপে ভয় পান, প্রাতিষ্ঠানিক ভূত-ভগবানের বিষয়টি বুঝতে পারেন না এবং উপনিষদ মানেন।
সব কাজ দেখুন →সংখ্যা ২-এর অন্যান্য লেখা
সংখ্যা ২কবিতা ও ছড়া
উইকএন্ড ট্যুর
শুক্রবারেই শ্যামলালের প্ল্যান, টুক করে ট্যুর! একদিনের ছুটিতে হাওয়াবদলের সাধ নিয়ে সপরিবারে বেরিয়ে পড়া। তারপর ট্রেনের সিট, হোটেলের বন্দোবস্ত, গাড়ির জোগাড়, গিন্নির ফরমান আর ফর্দ সামলাতে সামলাতে প্রকৃতি দর্শনের সুযোগটুকুও গেল ফসকে। পকেট হল হালকা, অভিজ্ঞতার ঝুলি হল ভারী! সব মিলিয়ে, এইভাবেই শেষ হল শ্যামলালের উইকএন্ড ট্যুর।
সংখ্যা ২বিজ্ঞান
মনোরোগের ধূসরতায়: চতুর্থ পর্ব
যদি মানুষের চেতনাই হয়ে ওঠে যুদ্ধের গোপন মারণাস্ত্র! নাৎসি বিজ্ঞানীদের গোপন পুনর্বাসন, জাপানের নৃশংস জীবাণুযুদ্ধ, আর মানুষের মনকে বশে আনতে সিআইএ-র কুখ্যাত গোপন প্রকল্প ‘MK-Ultra’! এলএসডি-র যথেচ্ছ প্রয়োগ থেকে শুরু করে যুদ্ধের বন্দীদের ওপর মারাত্মক রাসায়নিক পরীক্ষা—রাজনীতি আর ক্ষমতার নোংরা খেলায় কীভাবে সাধারণ মানুষের মনকে কব্জা করা হয়েছিল? কেন বিটনিক-হিপি বিদ্রোহের মতো গণ-আন্দোলনকে নেশার সাগরে ডুবিয়ে দেওয়া হলো? যে কোনো রাজনৈতিক থ্রিলারকে হার মানানো এক অবিশ্বাস্য ইতিহাসের সাক্ষী হতে পড়ুন চতুর্থ পর্ব—‘মগজধোলাই রাজনীতির থ্রিলার’।
সংখ্যা ২বিজ্ঞান
মনোরোগের ধূসরতায়: তৃতীয় পর্ব
সিগমুন্ড ফ্রয়েড কি একজন মহান মনস্তাত্ত্বিক, নাকি এক চতুর গল্পকার? অবচেতন মন, যৌন অবদমন আর মনঃসমীক্ষণ—যাঁর তত্ত্বে একসময় বুঁদ হয়েছিল গোটা বিশ্ব, তাঁর গবেষণার পেছনে কতটা বিজ্ঞান আর কতটা সাজানো রূপকথা? কোকেন আসক্তি থেকে শুরু করে নিজের ব্যর্থ চিকিৎসা ও রোগীদের আসল পরিণতি লুকিয়ে রাখার পরও কীভাবে একনায়কের মতো নিজের তত্ত্বকে শতাব্দীর সেরা চিকিৎসা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ফ্রয়েড? মনোবিশ্লেষণের সেই জাদুকরী ছদ্মবেশ নিয়ে তৃতীয় পর্ব—‘ফ্রয়েডের বৈজ্ঞানিক রূপকথা’।
আরও পড়ুন
সংখ্যা ১গল্পস্বল্প
বোতাম
সবকিছু যখন এক ক্লিকে বদলে যায়, তখন কিছু মানুষ নিঃশব্দে পাহারা দেয় তাদের চিরপুরাতন বিশ্বাস। সুতো আর মায়া দিয়ে পার্বতীদি কী বুনে চলেছেন দিনরাত? কাগজের মতো সহজে ছিঁড়ে যাওয়া সম্পর্কের ভিড়ে, বুকের ভেতরে সামান্য কাপড় বাঁচিয়ে রাখার এক মায়াবী আখ্যান ‘বোতাম’।
সংখ্যা ১গল্পস্বল্প
নিশ্চিন্তপুরের রূপকথা
১৯২৩ সালে ইছামতীর তীরের এক প্রত্যন্ত গ্রামে কাঠের বাক্সে বন্দি হয়ে আসে এক মণ ওজনের এক বরফের চাঁই। বাড়ির সর্বেসর্বা কাদম্বিনী দেবীর অমোঘ ইচ্ছায় যে বরফ প্রখর গ্রীষ্মের দাবদাহেও এক ফোঁটাও গলে না। দীর্ঘকাল ধরে উঠোনের তুলসীমঞ্চের পাশে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা সেই বরফ হয়ে ওঠে আস্ত একটা গ্রামের সময়, স্মৃতি ও নিয়তির অলৌকিক ঘড়ি।
সংখ্যা ১কবিতা ও ছড়া
আত্মকথা ও অন্যান্য কবিতা
হারিয়ে যাওয়া, থেকে যাওয়া এবং তাদের মাঝখানে জন্ম নেওয়া স্মৃতির এক অদৃশ্য ভূগোল কখনও শব্দে, কখনও স্বপ্নে, কখনও রাগে, কখনও দাগে—কবি খুঁজে ফেরেন। এখানে সৌন্দর্যের পাশে নিঃশব্দে বসে থাকে বিষণ্ণতা, আকাঙ্ক্ষার পাশে অনিবার্য দূরত্ব, আর শৈল্পিক সৌন্দর্যের আড়ালে উঁকি দেয় জীবনের ক্ষত। সে চলে যায় রেখে যায় ক্ষীণ অথচ গভীর কোনো চিহ্ন। হাঁসের চলে যাওয়া পথের মতো—দাগ মুছে যায়, অথচ কোনো একদিন সেই জলের বুকেই শালুক ফুটে ওঠে।

