একটি প্রাচীন লোকবিশ্বাস ও গ্রাফ তত্ত্বের জন্ম
গণিত মানেই কি শুধু কঠিন সূত্র আর হিসাব? একেবারেই নয়। ধাঁধা, সেতু, মানচিত্র আর রঙের মতো পরিচিত বিষয় থেকেই কীভাবে জন্ম নিয়েছে গণিতের গুরুত্বপূর্ণ শাখা গ্রাফ থিওরি ও কম্বিনেটরিক্স—এই লেখায় রয়েছে সেই রোমাঞ্চকর ইতিহাস। অয়লারের কোনিগসবার্গের সেতু সমস্যা থেকে চার-রঙের অনুমান—সহজ ভাষায় গণিতের চমকপ্রদ জগতের এক আকর্ষণীয় সফর।

সংখ্যা ১Combinatorics বা বিন্যাস-সমাবেশ তত্ত্ব হল গণিতের এমন একটি শাখা যা সসীম বা বিচ্ছিন্ন পদ্ধতির (discrete systems) উপাদানগুলির নির্বাচন, বিন্যাস এবং ক্রিয়াকলাপ নিয়ে অধ্যয়ন করে, যার মধ্যে কম্বিনেটরিয়াল জ্যামিতিও অন্তর্ভুক্ত। গণনা, অস্তিত্ব, নির্মাণ এবং অপ্টিমাইজেশন সবই কম্বিনেটোরিক্সের বিভিন্ন দিক। গণিতের এই বিশেষ শাখাটি একই সাথে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ও কালে একটু একটু করে বিস্তার লাভ করেছিল। এর বিকাশের পিছনে সবচেয়ে বেশি যে সব ক্ষেত্র থেকে প্রেরণা এসেছিল তার মধ্যে বিভিন্ন গাণিতিক ধাঁধা, লোকবিশ্বাস ও ভাষাতাত্ত্বিক বিষয়গুলি অঙ্গীভূত ছিল।
খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকের ভারতীয় ঋষি পিঙ্গল ছিলেন সংখ্যাতাত্ত্বিক এবং বিশিষ্ট বৈয়াকরণ। ইনি সংস্কৃত কবিতার অক্ষর-বিন্যাস বা ছন্দ-কাঠামো বিশ্লেষণের জন্য পুনরাবৃত্তিমূলক নিয়ম (recursive rules) ও বিন্যাস-সমাবেশ তত্ত্ব ব্যবহার করেছিলেন।১ পরবর্তীকালে দ্বাদশ শতাব্দীতে ভাস্করের মতো গণিতবিদরা দ্বিপদী সহগ (binomial coefficients) সংক্রান্ত ধারণার আরও বিস্তার ঘটান।
ম্যাজিক স্কোয়ার এবং দ্বিপদী সহগ হল প্রাথমিক কম্বিনেটরিয়াল সমস্যার উদাহরণ যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গণিতবিদদের আগ্রহী করে তুলেছে। ম্যাজিক স্কোয়ার হল সংখ্যার একটি বর্গাকার ছক, যেখানে সংখ্যাগুলোকে এমনভাবে সাজানো হয় যাতে প্রতিটি সারি (row), স্তম্ভ (column) এবং প্রধান কর্ণগুলোয় (diagonals) থাকা সংখ্যাগুলির যোগফল সর্বদা সমান হয়। এই ধ্রুবক যোগফলটিকে বলা হয় ম্যাজিক কনস্ট্যান্ট। নিচের একটি উদাহরণ থেকে বিষয়টি পরিষ্কার হবে।
| ৮ | ১ | ৬ | =১৫ |
| ৩ | ৫ | ৭ | =১৫ |
| ৪ | ৯ | ২ | =১৫ |
| =১৫ | =১৫ | =১৫ | =১৫ কর্ণ বরাবর যোগফল |
সপ্তদশ শতাব্দীতে, ব্লেইজ প্যাসকেল এবং পিয়ের ডি ফার্মা গুরুত্বপূর্ণ কিছু আবিষ্কার করেছিলেন যা সম্ভাবনা তত্ত্বের বিকাশে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়েছিল। গটফ্রিড উইলহেলম লাইবনিজ এবং লিওনহার্ড অয়লারের মতো গণিতবিদদের কল্যাণে কম্বিনেটরিক্স গণিতের একটি স্বতন্ত্র শাখায় পরিণত হয়েছে। বিংশ শতাব্দীতে কম্পিউটার প্রযুক্তি, গ্রাফ থিওরি এবং পরিসংখ্যানিক বলবিদ্যার বিকাশ এই ক্ষেত্রটিকে আরও এগিয়ে নিয়ে গেছে। কম্বিনেটরিয়াল পদ্ধতিগুলি বীজগণিত, সম্ভাবনা তত্ত্ব, সংখ্যা তত্ত্ব এবং গাণিতিক যুক্তিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে। তবে লিওনহার্ড অয়লারের লেখ তত্ত্ব আবিষ্কার বহুদিনের এক লোকবিশ্বাস কে ভেঙে দিয়েছিল। বহু দিন ধরে অমীমাংসিত থাকা Königsberg bridge problem-টি সমাধানের মাধ্যমে অয়লার আধুনিক গণিতের দুটি অন্যতম শাখা গ্রাফ থিওরি ও টপলজির জন্ম দিয়েছিলেন।২৩

অষ্টাদশ শতাব্দীতে সুইস বিজ্ঞানী লিওনার্ড অয়লার গণিতের জগতে একজন সুপরিচিত গণিতজ্ঞ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। গ্রাফ থিওরির (লেখ তত্ত্ব) উৎপত্তির ইতিহাস বুঝতে গেলে ১৭৩৫ সালে ফিরে যেতে হবে। সেই সময়ে, বাল্টিক সাগরের তীরে অবস্থিত কোনিগসবার্গ (বর্তমানে কালিনিনগ্রাদ) শহরটি রাশিয়ার অন্যতম একটি শহর ছিল। প্রাচীন প্রুশিয়া প্রদেশের অন্তর্গত এই শহরটির মধ্য দিয়ে প্রেগেল নদী প্রবাহিত হয়েছে। নদীটির ভিতরে দুটি নদী দ্বীপ রয়েছে তাই নদীর দুই পাড় ও এই দুটি দ্বীপ ধরলে শহরটি চারটি জল দ্বারা বিচ্ছিন্ন অংশে বিভক্ত ছিল। এই চারটি অংশ সাতটি সেতুর মাধ্যমে সংযুক্ত ছিল (চিত্র ১ দ্রষ্টব্য)। এই সেতুগুলোর ওপর দিয়ে চলাচলের সময় শহরের মানুষের মনে একটি প্রশ্ন জেগেছিল—এমন কোনো উপায়ে কি সেতুগুলো অতিক্রম করা সম্ভব যাতে সবগুলি ভূখণ্ডে যাওয়ার কাজটি প্রতিটি সেতু ঠিক একবারই পার হয়ে সম্পন্ন করা যায়? শহরের কিছু মানুষজন সারাদিন ধরে ‘ট্রায়াল অ্যান্ড এরর’ বা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে কাজটি করার চেষ্টা করতেন, কিন্তু তারা কখনোই এতে সফল হননি। এই অসাফল্য থেকে এক শ্রেণীর মানুষের মনে অদম্য জেদ তৈরী হয়েছিল যে এভাবেই চেষ্টা করতে করতে এক সময় উপায় নিশ্চই একটা ঠিক পাওয়া যাবে।
তবে গণিতবিদ হিসেবে অয়লারের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল ভিন্ন; তিনি বিষয়টিকে গাণিতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, এই বিষয়টি গণিতের একটি নতুন শাখার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। সমস্যাটির সমাধানে অয়লারের প্রাথমিক আলোচনায় লেখ (graph), শীর্ষবিন্দু (vertex) এবং বাহু / ধার সংযোগরেখা (edge)-এর মতো আধুনিক পরিভাষাগুলোর কোনো উল্লেখ ছিল না, যদিও বাস্তবে এই ধারণাগুলোই ব্যবহৃত হয়েছিল। লিওনহার্ড অয়লার এই সমস্যার একটি সমাধান উপস্থাপন করেন এবং সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, এ ধরনের পথচলা বা ভ্রমণ অসম্ভব। বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য ধরা যাক, এমন একটি ভ্রমণ সম্ভব।
সমস্যাটি সহজে সমাধানের সুবিধার্থে, আমরা মূল সমস্যাটি থেকে কেবল প্রাসঙ্গিক তথ্যটুকুই আলাদা করে নেব এবং সমাধানে পৌঁছানর পথটি আরও বিস্তারিতভাবে আলোচনার চেষ্টা করব। মূলত এখানে চারটি ভূখণ্ড রয়েছে এবং সেগুলোকে সংযুক্তকারী বিভিন্ন সেতু আছে। সেতু পার হওয়ার সময় ছাড়া অন্য সময়ে আপনি কোন দোকানে গেলেন বা কী দেখলেন তা আমাদের বিবেচ্য বিষয় নয়; আমাদের কাছে এই চারটি ভূখণ্ডের প্রতিটিই কেবল এমন একটি স্থান, যেখান থেকে অন্য কোনো কোনো ভূখণ্ডে যাওয়ার সেতু রয়েছে। আসুন, প্রতিটি ভূখণ্ডের জন্য একটি করে বিন্দু (dot) আঁকি (চিত্র ২)। আমাদের কাছে কোনো একটি ভূখণ্ডে যাওয়া আর সেই ভূখণ্ড-সংশ্লিষ্ট বিন্দুটিতে যাওয়া—একই কথা।

এবার বিন্দুগুলোর মধ্যে সংযোগ স্থাপন করা যাক—প্রতিটি সেতুর জন্য একটি করে সংযোগ (চিত্র ৩)

আমরা এখন অয়লারের মত করে বিষয়টি বোঝার জন্য ভৌগোলিক বিষয় যথা নদী-ভূভাগ-সেতু গুলি ছবি থেকে বাদ দিয়ে পাই,

এবার বিন্দু ও সংযোগ রেখাগুলো আরও পরিপাটিভাবে আঁকলে চিত্রটা এরকম সহজ দাঁড়ায়।

আমাদের মূল বিবেচ্য বিষয় হল সেতুগুলোর মাধ্যমে বিভিন্ন ভূখণ্ডের মধ্যকার সংযোগ স্থাপন করা—ঠিক কতটা পথ বা কোন দিকে হাঁটতে হবে, তা নয়। এখন সমস্যাটি হল প্রতিটি সেতু কেবল একবার ব্যবহার করে এক বিন্দু থেকে অন্য বিন্দুতে যাওয়া। ধরা যাক, আমরা একেবারে ডানদিকের বিন্দুটি থেকে যাত্রা শুরু করলাম। সেখান থেকে বের হওয়ার সময় আমরা তিনটি সেতুর মধ্যে একটি ব্যবহার করি; ফলে ডানদিকের ওই বিন্দুর সাথে আরও দুটি সেতু যুক্ত থেকে যায়, যা আমাদের শেষ পর্যন্ত ব্যবহার করতেই হবে। অন্য একটি সেতু ব্যবহার করার একমাত্র উপায় হল আবার ওই বিন্দুতে ফিরে আসা। আমরা যখন ফিরে আসি, তখন আরেকটি সেতু ব্যবহার করি এবং একটি সেতু অবশিষ্ট থাকে ব্যবহার করার জন্য। বেশ, তাহলে আমাদের আবার সেই বিন্দুটি ছেড়ে যেতে হবে, এবং এর সাথে সংযুক্ত তিনটি সেতুর মধ্যে শেষটি ব্যবহার করতে হবে। কিন্তু তাহলে তো ফিরে আসার জন্য কোনো সেতু থাকবে না, এবং আমাদের একটি চক্রাকার ভ্রমণ করার কথা।
ঠিক আছে। হয়তো আমাদের যাত্রাটি একেবারে ডানদিকের বিন্দু থেকে শুরু করা উচিত নয়। আমরা অন্য কোথাও থেকে শুরু করব। তবুও, এর সাথে সংযুক্ত সেতুগুলো ব্যবহার করার জন্য আমাদের কোনো এক সময়ে একেবারে ডানদিকের বিন্দুটিতে যেতেই হবে। আমাদের প্রথমবার যাওয়ার সময়, আমরা আসার জন্য একটি সেতু ব্যবহার করি। তারপর আমাদের আরেকটি ব্যবহার করতেই হবে, এবং তাই আমরা চলে যাই। কিন্তু ডানদিকের বিন্দুটির সাথে এখনও একটি সেতু সংযুক্ত আছে যা ব্যবহার করা হয়নি। তাই আমাদের আবার ফিরে আসতে হবে, কিন্তু তখন তো আমরা আর যেতে পারব না! এটা হতাশাবাঞ্জক, কারণ এখন আমাদের যাত্রাটি একটি চক্রাকার ভ্রমণ হয়ে গেছে যা একেবারে ডানদিকের বিন্দু থেকে শুরু হয়নি।
প্রকৃতপক্ষে, এটা দেখানো কঠিন নয় যে প্রতিটি বিন্দুতে (ভূখণ্ড), সেটি শুরু এবং শেষের বিন্দু হোক বা না হোক, তার সাথে অবশ্যই জোড় সংখ্যক সেতু সংযুক্ত থাকতে হবে, অন্যথায় আপনি সমস্যায় পড়বেন। আপনি যখন কোনো জায়গায় আসেন এবং তারপর আবার চলে যান, তখন আপনি জোড় সংখ্যক সেতু ব্যবহার করেন।
শুরুর বিন্দু ছাড়া অন্য বিন্দুগুলোর ক্ষেত্রে, আসার পর আপনাকে অবশ্যই চলে যেতে হবে, তাই প্রতিবার যাতায়াতের সময় আপনি একজোড়া সেতু ব্যবহার করেন। সুতরাং প্রতিটি ভূখণ্ডের সাথে অবশ্যই জোড় সংখ্যক সেতু থাকতে হবে। আপনার শুরুর বিন্দু/ গন্তব্য বিন্দুর জন্য, আপনি প্রতিবার যাতায়াতের সময় একজোড়া সেতু ব্যবহার করেন, কিন্তু শুরুতে চলে যাওয়ার জন্য একটি সেতু এবং একেবারে শেষে ফিরে আসার জন্য একটি সেতুও ব্যবহার করেন। সুতরাং সেখানেও জোড় সংখ্যক সেতু থাকা উচিত। কোনিগসবার্গে, প্রতিটি ভূমির সাথে বিজোড় সংখ্যক সেতু সংযুক্ত আছে, তাই ওখানে বাস্তব সম্মত কোনো পথ কোনো দিনই পাওয়া যাবে না যাতে করে সাতটি সেতু ঠিক একবার ব্যবহার করে পূর্বে উল্লেখিত চারটি ভূখণ্ড A, B, C এবং D যাওয়া সম্ভব হবে।
গাণিতিক ভাবে অয়লার এইভাবে বিষয়টি উপস্থাপন করেছিলেন। বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য ধরা যাক, এমন একটি ভ্রমণ সম্ভব। যাত্রাপথে কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে (শুরু বা শেষের ভূখণ্ড ছাড়া) একবার পৌঁছানোর অর্থ হল দুটি ভিন্ন সেতুর হিসাব করা: একটি দিয়ে ভূখণ্ডটিতে প্রবেশ করা এবং অন্যটি দিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে আসা। সুতরাং, কোনো ভূখণ্ডে যতবার আসা-যাওয়া করা হবে, তার দ্বিগুণ সংখ্যক সেতুর প্রান্তবিন্দু হিসেবে সেটিকে কাজ করতে হবে। তাই, প্রতিটি ভূখণ্ড—শুরু ও শেষের ভূখণ্ড দুটি অভিন্ন না হলে সেগুলোর সম্ভাব্য ব্যতিক্রম বাদে—অবশ্যই বাকি ভূখণ্ড গুলি জোড় সংখ্যক সেতুর প্রান্তবিন্দু হবে। কিন্তু কোনিগসবার্গের ভূখণ্ডগুলোর ক্ষেত্রে দেখা যায়, ‘A’ ভূখণ্ডটি পাঁচটি সেতুর প্রান্তবিন্দু এবং ‘B’, ‘C’ ও ‘D’ ভূখণ্ডগুলো তিনটি করে সেতুর প্রান্তবিন্দু। ফলে, খুব স্বাভাবিক ভাবে এ ধরনের কাঙ্ক্ষিত একটি ভ্রমণপথ কনিগসবার্গে পাওয়া কার্যত অসম্ভব (দ্র. টীকা ২)।
তাহলে প্রশ্ন উঠবে কি থাকলে আমরা এই সমস্যায় পড়তাম না? এজন্য অবশ্যই প্রতিটি ভূখণ্ডের সাথে জোড় সংখ্যক সেতু সংযুক্ত থাকলে আমরা সহজেই একটি কাঙ্ক্ষিত পথ পেয়ে যাব কিন্তু সেক্ষেত্রে পূর্বোক্ত সেতুগুলির সাথে আরো দুটি নতুন সেতু সংযুক্ত করতে হবে (চিত্র ৬)।

নতুন সেতুগুলি এখানে লাল রেখা দ্বারা চিহ্নিত হয়েছে। এক্ষেত্রে অনেকগুলি অয়লারিয়ান পথ পাওয়া সম্ভব যার মধ্যে একটি হল: B>A>D>A>D>B>C>A>C>B। আমাদের দেশে নতুন জামাইকে ধাঁধা বা মজার অঙ্ক দিয়ে শালা—শালিদের ঠকানো বা বুদ্ধি যাচাই এর প্রথা কিছু কিছু জায়গায় এখনও চালু আছে। ঠিক এই একই ধরণের একটি সমস্যা বহু বছর ধরে জামাই ঠকানো সমস্যা হিসেবে আমাদের দেশে প্রচলিত আছে যা সংক্ষেপে হল: চারটি বিন্দু জুড়ে একটি আয়তক্ষেত্র এবং তার দুটি কর্ণ কি একটানে কাগজ থেকে পেন না সরিয়ে আঁকা সম্ভব? বুদ্ধিমান জামাইরা উত্তরটা না বলবেন আর অন্যরা শালা-শালিদের আনন্দের মাত্রা বাড়িয়ে কাগজ কলম নিয়ে একবার অন্তত চেষ্টা করে অবশ্যম্ভাবী ভাবে বিফল হবেন। এই ধরণের বহু মজাদার গাণিতিক সমস্যার সমাধান করতে আমাদের অয়লারের লেখতত্ত্ব জানতেই হবে।
কোনিগসবার্গের সেতু সমস্যাটিকে একটি ‘গ্রাফ’ হিসেবে কল্পনা করতে গণিতবিদদের প্রায় ১৫০ বছর সময় লেগেছিল; যেখানে ভূখণ্ডগুলোকে ‘নোড’ বা ‘শীর্ষবিন্দু’ (vertices) এবং সেতুগুলোকে ‘আর্ক’ বা ‘ধার’ (edges) হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একটি গ্রাফের কোনো শীর্ষবিন্দুর ‘ডিগ্রি’ বা মাত্রা বলতে বোঝায় ওই বিন্দুর সাথে যুক্ত ধার বা বাহুর সংখ্যা। আধুনিক গ্রাফ তত্ত্বে, ‘অয়লারিয়ান পথ’ (eulerian path) বলতে এমন একটি পথকে বোঝায় যা গ্রাফের প্রতিটি ধার বা বাহু দিয়ে ঠিক একবারই অতিক্রম করে। অর্থাৎ পূর্বোক্ত কনিগসবার্গের ব্রিজ সমস্যার লেখচিত্রে কোনো অয়লারিয়ান পথ কখনই পাওয়া যাবে না।
সেতু সমস্যা সমাধানে অয়লারের যুক্তির ওপর ভিত্তি করেই গ্রাফ থিওরির নতুন নতুন সংজ্ঞা তৈরি হয়েছিল। অয়লারের প্রাথমিক কাজের পর প্রায় এক শতাব্দীকাল গ্রাফ থিওরির ক্ষেত্রে বিশেষ কোনো অগ্রগতি হয়নি; তবে ঊনবিংশ শতাব্দীতে ধীরে ধীরে বিষয়টি আরও অনেক গণিতবিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ‘গ্রাফ’ (graph) শব্দটি ১৮৭৮ সালে ব্রিটিশ গণিতবিদ জেমস সিলভেস্টার প্রথম ব্যবহার করেন। ঊনবিংশ শতাব্দীতে বিখ্যাত ব্রিটিশ গণিতবিদ আর্থার কেলি গ্রাফ তত্ত্বের ক্ষেত্রে গবেষণা পরিচালনা করেন, যা আজও এই তত্ত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল হিসেবে স্বীকৃত। কেলির কাজ মূলত গ্রাফ গণনা তত্ত্বের (graph counting theory) ভিত্তি স্থাপন করেছিল; তিনি নির্দিষ্ট সংখ্যক শীর্ষবিন্দু (vertices) বিশিষ্ট ‘ট্রি’ বা বৃক্ষ-কাঠামোর সংখ্যা নির্ণয়ের একটি পূর্ণাঙ্গ সূত্র প্রদান করেন, যা 'কেলির সূত্র' নামে পরিচিত। বিংশ শতাব্দীতে গ্রাফ তত্ত্ব গণিতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শাখা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে এবং অন্যান্য বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এর ব্যাপক প্রয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হয়।
গ্রাফ থিওরির ইতিহাসে নানাবিধ ও আকর্ষণীয় সব সমস্যার উদ্ভব হয়েছে। স্প্যানিং ট্রি (spanning trees) গণনা, চার-রঙের অনুমান (four-color conjecture), কুরাটোভস্কির উপপাদ্য (Kuratowski’s Theorem), ট্রাভেলিং সেলসম্যান সমস্যা (traveling salesman problem) এবং তুরানের উপপাদ্য (Turán’s Theorem) হল এসব বিষয়ের কয়েকটি উদাহরণ। এই নিবন্ধে আমরা উল্লিখিত চার-রঙের অনুমান (four-color conjecture) বিখ্যাত সমস্যা নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করার চেষ্টা করব কারণ অন্য সমস্যাগুলির সমাধান আলোচনা করতে গেলে যে পরিমাণ নতুন গাণিতিক পরিভাষা ও চিহ্ন ব্যবহার করতে হবে তা সাধারণ পাঠককে ক্লান্ত করতে পারে।
চার-রঙের অনুমান (Four-color conjecture)
প্রতিটি সমতলীয় গ্রাফকে ন্যূনতম চারটি রঙ দিয়ে রঞ্জিত করা সম্ভব। ঊনবিংশ শতাব্দীতে গ্রাফ থিওরির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হল চার-রঙের অনুমান। এই বিষয়টি একটি পৃষ্ঠায় বিভিন্ন বিন্দু বা অঞ্চলের রঙ করার বিষয় নিয়ে আলোচনা করে। ধরা যাক, আমাদের কাছে একটি ভৌগোলিক মানচিত্র আছে যাতে বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চল রয়েছে। যদি আমরা প্রতিটি দেশকে একটি বিন্দু (শীর্ষবিন্দু বা vertex) হিসেবে বিবেচনা করি এবং যেসব দেশের সীমানা বা সীমান্ত (edge) সাধারণ বা যৌথ, তাদের মধ্যে বাহু দিয়ে সংযোগ স্থাপন করি, তবে আমরা একটি ‘গ্রাফ’ পাব। শর্তটি হল, কোনো দুটি সংলগ্ন অঞ্চলের সীমানা বা সীমান্ত যেন একই রঙের না হয়; এমতাবস্থায় একটি মানচিত্র রঙ করার জন্য কি চারটি রঙই যথেষ্ট? ১৮৫২ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার গণিতবিদ ফ্রান্সিস গুথ্রি (Francis Guthrie) প্রথম এই অনুমানটি প্রস্তাব করেন এবং পরবর্তীতে অনেক গণিতবিদ এটি নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা করেন। ফ্রান্সিসই প্রথম উপলব্ধি করেছিলেন যে, মাত্র চারটি রঙ ব্যবহার করেই একটি মানচিত্র রঙ করা সম্ভব। অবশ্য তিনি এর গাণিতিক প্রমাণ জানতেন না; তাই তিনি তাঁর ভাইয়ের মাধ্যমে ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনে তাঁর অধ্যাপক ডি মরগানের (De Morgan) কাছে এর সমাধানের বিষয়ে জানতে চান। ডি মরগান বিষয়টি নিয়ে স্যার উইলিয়াম রোয়ান হ্যামিল্টনের সাথে আলোচনা করেন, যিনি তাৎক্ষণিক জবাবে জানান যে, নিকট ভবিষ্যতে এ নিয়ে ভাবার মতো সময় তাঁর নেই। ধীরে ধীরে ডি মরগানের প্রচেষ্টায় অনেক গণিতবিদ এই বিষয়টি নিয়ে গবেষণা ও অনুসন্ধান শুরু করেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম বিখ্যাত ছিলেন কেলি। এমনকি ১৮৭৯ সালে তিনি মানচিত্র রঙ করার বিষয়ে একটি গবেষণাপত্রও লিখেছিলেন।

১৮৭৯ সালে কেলির এক ছাত্র দাবি করেন যে তিনি এই অনুমানের একটি প্রমাণ খুঁজে পেয়েছেন, যা কেলির সহযোগিতায় প্রকাশিত হয়েছিল। তবে ১৮৯০ সালে জন হেউড প্রমাণ করেন যে ওই দাবিটি ভুল ছিল। হেউড দেখান যে, ওই প্রমাণটি ৫টি রঙের ক্ষেত্রে সঠিক হলেও ৪টি রঙের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। চার-রঙের অনুমানটি প্রমাণ করার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকে এবং ১৯৭৬ সালে অবশেষে এর প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়। বিজ্ঞানের অগ্রগতি এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণায় কম্পিউটারের ব্যবহারের ফলে কেনেথ অ্যাপেল ও উলফগ্যাং হ্যাকেন এই প্রমাণটি উপস্থাপন করেন। গাণিতিক প্রমাণে কম্পিউটারের ব্যবহারের ক্ষেত্রে এটিই ছিল মূলত সূচনালগ্ন, যদিও এখন পর্যন্ত এই সমস্যাটির কোনো বিশুদ্ধ গাণিতিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে ২০০৯ সালে লিমিন জিয়াং-এর করা প্রমাণ অবশ্যই উল্লেখযোগ্য প্রমাণ হিসেবে গণ্য হয়েছে।৪ তবে গণিতের এই শাখায় শেষ কথা বলে কিছু নেই। এই নিবন্ধ লেখার সময়ে পাওয়া নতুন একটি প্রমাণের খবর তাত্ত্বিক কম্পিউটার বিজ্ঞানীদের চমকে দিয়েছে তবে তার গ্রহণযোগ্যতা কতটা তা জানার জন্য আগামী নভেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।৫
টীকা
- ১.Jayant Shah, ‘A History of Piṅgala’s Combinatorics’, Boston, Mass: Northeastern University, 2021.
- ২.Martin Charles Golumbic, ‘Algorithmic Graph Theory and Perfect Graphs’, New York: Academic Press, 1980.
- ৩.N. Deo, ‘Graph Theory with Applications to Engineering & Computer Science’, Mineola, New York: Dover Publications, Inc., 1998.
- ৪.Limin Xiang, ‘A Formal Proof of the Four-Color Theorem’, Kyushu Sangyo University, 2009.
- ৫.Gregory Barber, ‘The Four-Color Theorem Gets a Rare New Proof’, Quanta Magazine, 10 September 2026.

লেখক
মৃণ্ময় হোতা
জন্ম ১৯৬৬ সালে ঝাড়গ্রামের চন্দ্রী গ্রামে। স্কুলের গণ্ডী ছাড়িয়ে মেদিনীপুরে পড়তে যাওয়া। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত নিয়ে পড়া সাঙ্গ করে আবহাওয়া বিজ্ঞানে এম টেকে ভর্তি হন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সে পড়া অসমাপ্ত রেখেই শিক্ষকতার চাকরি নিয়ে ঝাড়গ্রামে ফিরে আসা ১৯৯৩ সালে। চাকরিরত অবস্থায় ২০০৫ সালে পিএইচ.ডি করেন তাত্ত্বিক কম্পিউটার-বিজ্ঞানে। প্রধান শিক্ষক হন ২০০৩ সালে। ৩০ এপ্রিল ২০২৬ সালে দহিজুড়ি মহাত্মা বিদ্যাপীঠ থেকে অবসর নিয়েছেন। পেশার সঙ্গে গণিত জড়িয়ে থাকলেও ছেলেবেলা থেকেই সাহিত্য-দর্শন-ইতিহাস-অর্থনীতি-শিল্পকলার মত নানান বিষয়ের প্রতি ছিল প্রবল টান। গনিত ছাড়াও মহাকাশ, পরিবেশ, সাহিত্য ও ঝাড়গ্রামের ইতিহাস সহ বিবিধ বিষয়ে তাঁর শতাধিক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। নেশা বই পড়া, ছোটদের বিজ্ঞান সচেতন করা আর সুযোগ পেলেই ভ্রমণে বেরিয়ে পড়া।
সব কাজ দেখুন →সংখ্যা ১-এর অন্যান্য লেখা
সংখ্যা ১সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়
“কম্পিউটার, ই-মেল এবং ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট হ্যাক করা নিয়ে অনেক আলোচনা হয়। কিন্তু আমরা এখন এমন এক যুগে প্রবেশ করেছি যেখানে মানুষকেও হ্যাক করা সম্ভব।” ‘উই আর বিকামিং হ্যাকেবল অ্যানিমেলস’—হাড়হিম করে দেওয়া এক বাস্তবতার কথা আমাদের বলেছেন হারারি।
সংখ্যা ১গল্পস্বল্প
বোতাম
সবকিছু যখন এক ক্লিকে বদলে যায়, তখন কিছু মানুষ নিঃশব্দে পাহারা দেয় তাদের চিরপুরাতন বিশ্বাস। সুতো আর মায়া দিয়ে পার্বতীদি কী বুনে চলেছেন দিনরাত? কাগজের মতো সহজে ছিঁড়ে যাওয়া সম্পর্কের ভিড়ে, বুকের ভেতরে সামান্য কাপড় বাঁচিয়ে রাখার এক মায়াবী আখ্যান ‘বোতাম’।
সংখ্যা ১পুরাতনী
ওড়িশা প্রজাতন্ত্র—বিংশ শতাব্দীর ইতিবৃত্তের এক বিস্মৃত পৃষ্ঠা: দ্বিতীয় পর্ব
১৮৪৫ সালে লেখা ১৯২৫ সালের এক কাহিনি। এক বিকল্প ইতিহাস। বিদ্রোহের গল্প। এক ভবিষ্যতের উড়িষ্যার গল্প। যে উড়িষ্যা একদিন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীন প্রজাতন্ত্রে পরিণত হবে। কিন্তু সেই স্বাধীনতার পথ মসৃণ নয়; তার ভিতর লুকিয়ে আছে অরণ্যের গভীরে জমে থাকা ক্ষোভ, হারিয়ে যাওয়া স্বাধীনতার স্মৃতি এবং পাহাড়ি মানুষের অদম্য আত্মমর্যাদা। শশীচন্দ্র দত্তের এই কল্প-ভবিষ্যতের কাহিনি যেন উনিশ শতকের ঔপনিবেশিক বাস্তবতার এক প্রতিবিম্ব; স্বাধীনতার স্বপ্ন কীভাবে প্রতিরোধের ভাষা খুঁজে পায়, তার এক রোমাঞ্চকর আখ্যান।
আরও পড়ুন
সংখ্যা ২বিজ্ঞান
মনোরোগের ধূসরতায়: চতুর্থ পর্ব
যদি মানুষের চেতনাই হয়ে ওঠে যুদ্ধের গোপন মারণাস্ত্র! নাৎসি বিজ্ঞানীদের গোপন পুনর্বাসন, জাপানের নৃশংস জীবাণুযুদ্ধ, আর মানুষের মনকে বশে আনতে সিআইএ-র কুখ্যাত গোপন প্রকল্প ‘MK-Ultra’! এলএসডি-র যথেচ্ছ প্রয়োগ থেকে শুরু করে যুদ্ধের বন্দীদের ওপর মারাত্মক রাসায়নিক পরীক্ষা—রাজনীতি আর ক্ষমতার নোংরা খেলায় কীভাবে সাধারণ মানুষের মনকে কব্জা করা হয়েছিল? কেন বিটনিক-হিপি বিদ্রোহের মতো গণ-আন্দোলনকে নেশার সাগরে ডুবিয়ে দেওয়া হলো? যে কোনো রাজনৈতিক থ্রিলারকে হার মানানো এক অবিশ্বাস্য ইতিহাসের সাক্ষী হতে পড়ুন চতুর্থ পর্ব—‘মগজধোলাই রাজনীতির থ্রিলার’।
সংখ্যা ২বিজ্ঞান
মনোরোগের ধূসরতায়: তৃতীয় পর্ব
সিগমুন্ড ফ্রয়েড কি একজন মহান মনস্তাত্ত্বিক, নাকি এক চতুর গল্পকার? অবচেতন মন, যৌন অবদমন আর মনঃসমীক্ষণ—যাঁর তত্ত্বে একসময় বুঁদ হয়েছিল গোটা বিশ্ব, তাঁর গবেষণার পেছনে কতটা বিজ্ঞান আর কতটা সাজানো রূপকথা? কোকেন আসক্তি থেকে শুরু করে নিজের ব্যর্থ চিকিৎসা ও রোগীদের আসল পরিণতি লুকিয়ে রাখার পরও কীভাবে একনায়কের মতো নিজের তত্ত্বকে শতাব্দীর সেরা চিকিৎসা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ফ্রয়েড? মনোবিশ্লেষণের সেই জাদুকরী ছদ্মবেশ নিয়ে তৃতীয় পর্ব—‘ফ্রয়েডের বৈজ্ঞানিক রূপকথা’।
সংখ্যা ১বিজ্ঞান
মনোরোগের ধূসরতায়: দ্বিতীয় পর্ব
রোগ নিরাময়, নাকি আধুনিক বিজ্ঞানের পোশাকে আদিম বর্বরতা? কখনো পেটের নাড়িভুঁড়ি কেটে বাদ দেওয়া, কখনো মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল লোব খুবলে নিয়ে রোগীকে জড়ভরত বানিয়ে দেওয়া, আবার কখনো ম্যালেরিয়ার জীবাণু বা ইনসুলিনের মারণ কোমা দিয়ে তথাকথিত ‘চিকিৎসা’! এমনকি এই মারাত্মক লোবোটমির জন্য জুটেছিল নোবেল পুরস্কারও। চিকিৎসকদের অন্ধ অহংকার আর অসহায় পরিবারের আর্তি কীভাবে মানসিক রোগীদের ঠেলে দিয়েছিল এক জীবন্ত নরকে? মনোরোগ চিকিৎসার আদিপর্বের চাঞ্চল্যকর ইতিহাস জানুন দ্বিতীয় পর্বে—‘মনোচিকিৎসার আদিপর্ব: বিজ্ঞানের আড়ালে’।


