নোবেল ও বাঙালি

যে বাঙালি রবীন্দ্রনাথের বর্তমানে ‘চুরি’ যাওয়া নোবেলের গর্বে সারা দেশে বুক ফুলাইয়া ঘুরিয়া বেড়ায় একদা রবীন্দ্রনাথ এককথায় তাহাদের নাকচ করিয়া দিয়াছিলেন। কীরকম? ১৯১৩ সালের ২৩ নভেম্বর। রবীন্দ্রনাথ নোবেল লরিয়ট হইয়াছেন। বাঙালি বুদ্ধিজীবীগণ রওনা দিলেন শান্তিনিকেতন অভিমুখে; এতদিন যাহারা রবীন্দ্রসাহিত্য লইয়া খেউড় করিতেছিলেন তাহারাও বাদ যান নাই। সভায় ইহাদের দেখিয়া ক্রুদ্ধ কবি কহিয়াছিলেন—“দেশের লোকের হাত থেকে যে অপযশ ও অপমান আমার ভাগ্যে পৌঁছেছে তার পরিমাণ নিতান্ত অল্প হয়নি এবং এতকাল আমি তা নিঃশব্দে বহন করে এসেছি।... যাই হোক্, যে কারণেই হোক্, আজ ইওরোপ আমাকে সম্মানের বরমাল্য দান করেছেন। তার যদি কোনো মূল্য থাকে তবে সেখানকার গুণিজনের রসবোধের মধ্যেই আছে, আমাদের দেশের সঙ্গে তার কোনো আন্তরিক সম্বন্ধ নেই। নোবেল প্রাইজের দ্বারা কোনো রচনার গুণ বা রস বৃদ্ধি করিতে পারে না।”

তন্ময় সিংহ মহাপাত্রের প্রতিকৃতি
৪ মিনিট পড়া
শেয়ার করুন
নোবেল ও বাঙালি প্রচ্ছদসংখ্যা ১
লেখার আকার
লেখার অবস্থান

কারসন ২০২৬ সালের নোবেল পুরস্কার লাভ করিয়াছেন। প্রতি বছরই সাহিত্যে একজন করিয়া নোবেল পুরস্কার পাইয়া থাকেন। সুতরাং অ্যান বা অন্য কেউ-না-কেউ এই পুরস্কার পাইতেনই; বিশ্বযুদ্ধের মতো কিছু না বাধিলে, ২০২৭ সালেও কেউ-না-কেউ নোবেল পাইবেন, ২৮-এও পাইবেন, ২৯-এও পাইবেন। কথা তাহা নহে। প্রতি বৎসর যিনিই নোবেল পান না কেন, দেখা যাইতেছে, সেই সদ্যোজাত নোবেল লরিয়টকে লইয়া ‘সহৃদয়’ বাঙালি পাঠকের আনন্দের সীমা নাই। ফেসবুকে-ওয়েবজিনে তাঁহাকে লইয়া ‘মগ্নগদ্যে’র ছড়াছড়ি। কর্মহীন অবসরে আপনি ফেসবুকের এ-দেয়াল ও-দেয়াল, ইতি-উতি ভ্রমণ করিতেছেন। সর্বত্র কারসন। তাঁহার ব্যক্তিজীবনের কয়েক টুকরা, মহত্ত্বের মিথ ইত্যাদি। ইহা সাধারণ। কেহ কেহ কারসন-সাহিত্য সমালোচনায় নিরত। অহো! বাঙালির মতন সাহিত্যবোদ্ধা জাতি কয়টা আছে এ জগতে? ‘কাব্য ও গদ্যের কঠিন বিভাজনের রেখা ভাঙিয়া দিয়াছেন তিনি’, ‘প্রথাগত পথে হাঁটেন নাই’, ‘উদ্ভাবনী প্রকাশভঙ্গি, অনবদ্য শৈলী’ এইসব শুনিয়া আপনার ইনফিরিয়রিটি কমপ্লেক্স অনিবার্য। মনে মনে ভাবিবেন, সত্যি জীবনে কিছুই পড়া হইল না। অবশ্য দুষ্ট কাহারও কাহারও মনে এই প্রশ্ন জাগিতে পারে, আচ্ছা যাহারা লিখিতেছে তাহারা নোবেল পুরস্কার ঘোষিত হইবার পূর্বে কারসনের এত লেখা পড়িয়াছিল? কিন্তু কেহই বলিবার সাহস করিবে না, বরং চ্যাটজিপিটি কি জেমিনি হইতে টুকিয়া একটা কমেন্ট করিয়া আসিবে। এইরূপে ২০২৭ আসিবে, আরো একজন নোবেল লরিয়ট ভূমিষ্ঠ হইবেন, কারসন বাঙালির যৌথ জাতিস্মৃতি হইতে হারাইয়া যাইবেন। যে আজ ফেসবুকে কারসনের সাহিত্য আলোচনায় পঞ্চমুখ তাহাকে পাঁচ বছর পর যদি জিজ্ঞাসা করেন যে—২০২৬ সালে কে নোবেল পাইয়াছিল, সে বলিতে পারিবে না। অবশ্য মুখোমুখি বসিয়া ইন্টারোগেট করিতে হইবে, ফেসবুকে বিশেষ সুবিধা হইবে না।

নোবেল কি সাহিত্যের উৎকর্ষ বিচারের উপযুক্ত মানদণ্ড? তলস্তয়, জয়েস, বোর্হেস, ইবসেন, প্রুস্ত, চেকভ—নোবেল পান নাই; তারাশঙ্কর, মানিক, বিভূতিভূষণ, প্রেমচন্দ, মান্টো, আর কে নারায়ণ, লু শ্যুনও নোবেল পান নাই। বস্তুত হিসাব করিলে দেখা যাইবে সাহিত্যের নোবেল পুরস্কারের আশি শতাংশই আছে ইওরোপের দখলে। তাহাতে দুঃখ পাইবার কিছু নাই। উহারা গাছ লাগাইয়াছে, উহারাই ফল খাইবে। গোঁসা করিলে আঁটিই সার!

বাঙালি অবশ্য আঁটি লইয়াই খুশি। সে আনন্দে উদ্বাহু নৃত্য করিতেছে। কারণ কী? কারসনের বাবা, মা, ঠাকুরদা, তুতো বোন কেহ কি বাঙালি? ভারতীয় বংশোদ্ভূত? উঁহু। সে গুড়ে বালি। এক এবং একমাত্র রবীন্দ্রনাথই সম্বল। এক শতাব্দী কাটিয়া গেছে কিছু হয় নাই, আশা করা যায় আগামীও এইরূপেই কাটিবে।

কিন্তু যে বাঙালি রবীন্দ্রনাথের বর্তমানে ‘চুরি’ যাওয়া নোবেলের গর্বে সারা দেশে বুক ফুলাইয়া ঘুরিয়া বেড়ায় একদা রবীন্দ্রনাথ এককথায় তাহাদের নাকচ করিয়া দিয়াছিলেন। কীরকম? ১৯১৩ সালের ২৩ নভেম্বর। রবীন্দ্রনাথ নোবেল লরিয়ট হইয়াছেন। বাঙালি বুদ্ধিজীবীগণ রওনা দিলেন শান্তিনিকেতন অভিমুখে; এতদিন যাহারা রবীন্দ্রসাহিত্য লইয়া খেউড় করিতেছিলেন তাহারাও বাদ যান নাই। সভায় ইহাদের দেখিয়া ক্রুদ্ধ কবি কহিয়াছিলেন—“দেশের লোকের হাত থেকে যে অপযশ ও অপমান আমার ভাগ্যে পৌঁছেছে তার পরিমাণ নিতান্ত অল্প হয়নি এবং এতকাল আমি তা নিঃশব্দে বহন করে এসেছি।... যাই হোক্, যে কারণেই হোক্, আজ ইওরোপ আমাকে সম্মানের বরমাল্য দান করেছেন। তার যদি কোনো মূল্য থাকে তবে সেখানকার গুণিজনের রসবোধের মধ্যেই আছে, আমাদের দেশের সঙ্গে তার কোনো আন্তরিক সম্বন্ধ নেই। নোবেল প্রাইজের দ্বারা কোনো রচনার গুণ বা রস বৃদ্ধি করিতে পারে না।”

বাঙালির অসুখ সেই কোন কালে রবীন্দ্রনাথ ধরিয়া ফেলিয়াছিলেন। যাহাকে কাল গালি দিতেছিলাম, আজ যেই না সে মসনদে বসিল অমনি পায়ে সুড়সড়ি দিতে আরম্ভ করিলাম। শুধু রেজাল্ট প্রকাশ হইবার অপেক্ষা। সুতরাং ‘বাজে কথা’কে কাজের কথা ও কাজের কথাকে বাজে কথায় রূপান্তরিত করিতে বাঙালি সিদ্ধহস্ত। রস-টস লইয়া ভাবিবার সময় তাহার নাই। শ্রাদ্ধেও সে ডিজে বাজাইয়া ‘তোমার হল শুরু আমার হল সারা’ গায়, ফ্রেশার্স ওয়েলকামেও। আর বাঙালির কোনো অবসরকালীন সম্বর্ধনাসভায় এই গান গাওয়া হয় নাই, ইহা অসম্ভব।

সুতরাং এক শতাব্দী ধরিয়া আমাদের একমাত্র নোবেল লরিয়টকেই আমার সিরিয়াসলি লই নাই, অ্যান কারসনকে সিরিয়াসলি লইব? ইহাও কি হইতে পারে? কলিকাতায় প্রথম বাংলা নাট্যমঞ্চ প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলেন যিনি সেই গেরাসিম স্তেপানোভিচ লেবেদেফ ঠিকই বুঝিয়াছিলেন, বাঙালি রঙ্গপ্রিয় জাত, ভাঁড়ামিই তাহার শোভা। সুতরাং এই বৎসর কারসন, পর-বৎসর আর কেউ—আমোদগেঁড়ে বাঙালির কাউকে একটা চাই।

তা যদি না হইত তাহা হইলে গত শতাব্দী জুড়িয়া অন্তত তারাশঙ্কর, মানিক, বিভূতিভূষণ, সুবোধ, শক্তি, জগদীশ, জ্যোতিরিন্দ্র, প্রেমেন্দ্র, ভাস্কর, আখতারুজ্জামান, সমরেশের মতো কবি-লেখকের রচনার বহুল অনুবাদ, প্রচার ও প্রসারের চেষ্টা করিত সে। তাহা সে করে নাই। বাঙালির যত্ন নাই, উদ্যোগ নাই, ইচ্ছা নাই। আত্মসম্মানও নাই। থাকিলে অন্তত নিজের ভাষার ধ্রুপদী সাহিত্য সে মনোযোগ দিয়া পড়িত, নিয়মিত তাহার চর্চা করিত, সাহিত্যসমালোচনায় বিশেষজ্ঞতার ক্ষেত্র গড়িয়া উঠিত। শুধু জন্মের রজত-সুবর্ণ-হীরক-প্লাটিনাম, শতবর্ষ আর সার্ধশতবর্ষেই লেখক-কবিদের কথা মনে পড়িত না। গুল্মে আর আগাছায় ভরিয়া উঠিত না তাহার ‘সেন্টার অফ এক্সিলেন্স’।

শেয়ার করুন
তন্ময় সিংহ মহাপাত্রের প্রতিকৃতি

লেখক

তন্ময় সিংহ মহাপাত্র

তন্ময় সিংহ মহাপাত্র বিশ্বভারতী-র প্রাক্তন ছাত্র এবং দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভারতীয় ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের প্রাক্তন গবেষক। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য পড়িয়ে জীবিকানির্বাহ করেন। প্যারালালের সঙ্গে যুক্ত।

সব কাজ দেখুন →

সংখ্যা ১-এর অন্যান্য লেখা

সম্পাদকীয় প্রচ্ছদসংখ্যা ১

সম্পাদকীয়

সম্পাদকীয়

“কম্পিউটার, ই-মেল এবং ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট হ্যাক করা নিয়ে অনেক আলোচনা হয়। কিন্তু আমরা এখন এমন এক যুগে প্রবেশ করেছি যেখানে মানুষকেও হ্যাক করা সম্ভব।” ‘উই আর বিকামিং হ্যাকেবল অ্যানিমেলস’—হাড়হিম করে দেওয়া এক বাস্তবতার কথা আমাদের বলেছেন হারারি।

সমান্তর সম্পাদক৪ মিনিট
কাগজের মতো সহজে ছিঁড়ে যাওয়া সম্পর্কের ভিড়ে, বুকের ভেতরে সামান্য কাপড় বাঁচিয়ে রাখার এক মায়াবী আখ্যান ‘বোতাম’।সংখ্যা ১

গল্পস্বল্প

বোতাম

সবকিছু যখন এক ক্লিকে বদলে যায়, তখন কিছু মানুষ নিঃশব্দে পাহারা দেয় তাদের চিরপুরাতন বিশ্বাস। সুতো আর মায়া দিয়ে পার্বতীদি কী বুনে চলেছেন দিনরাত? কাগজের মতো সহজে ছিঁড়ে যাওয়া সম্পর্কের ভিড়ে, বুকের ভেতরে সামান্য কাপড় বাঁচিয়ে রাখার এক মায়াবী আখ্যান ‘বোতাম’।

সত্যসাধন মণ্ডল২ মিনিট
১৮৪৫ সালে লিখিত বিকল্প ইতিহাস। এক ভবিষ্যতের উড়িষ্যা, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীন প্রজাতন্ত্রে পরিণত হবে।সংখ্যা ১

পুরাতনী

ওড়িশা প্রজাতন্ত্র—বিংশ শতাব্দীর ইতিবৃত্তের এক বিস্মৃত পৃষ্ঠা: দ্বিতীয় পর্ব

১৮৪৫ সালে লেখা ১৯২৫ সালের এক কাহিনি। এক বিকল্প ইতিহাস। বিদ্রোহের গল্প। এক ভবিষ্যতের উড়িষ্যার গল্প। যে উড়িষ্যা একদিন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীন প্রজাতন্ত্রে পরিণত হবে। কিন্তু সেই স্বাধীনতার পথ মসৃণ নয়; তার ভিতর লুকিয়ে আছে অরণ্যের গভীরে জমে থাকা ক্ষোভ, হারিয়ে যাওয়া স্বাধীনতার স্মৃতি এবং পাহাড়ি মানুষের অদম্য আত্মমর্যাদা। শশীচন্দ্র দত্তের এই কল্প-ভবিষ্যতের কাহিনি যেন উনিশ শতকের ঔপনিবেশিক বাস্তবতার এক প্রতিবিম্ব; স্বাধীনতার স্বপ্ন কীভাবে প্রতিরোধের ভাষা খুঁজে পায়, তার এক রোমাঞ্চকর আখ্যান।

অনুবাদ: মেঘা সিনহা১২ মিনিট

আরও পড়ুন

একটি সংক্ষিপ্ত পদ্য-ভ্রমণকথা।সংখ্যা ২

কবিতা ও ছড়া

উইকএন্ড ট্যুর

শুক্রবারেই শ্যামলালের প্ল্যান, টুক করে ট্যুর! একদিনের ছুটিতে হাওয়াবদলের সাধ নিয়ে সপরিবারে বেরিয়ে পড়া। তারপর ট্রেনের সিট, হোটেলের বন্দোবস্ত, গাড়ির জোগাড়, গিন্নির ফরমান আর ফর্দ সামলাতে সামলাতে প্রকৃতি দর্শনের সুযোগটুকুও গেল ফসকে। পকেট হল হালকা, অভিজ্ঞতার ঝুলি হল ভারী! সব মিলিয়ে, এইভাবেই শেষ হল শ্যামলালের উইকএন্ড ট্যুর।