জ্ঞানবৃক্ষের ফল, নির্মল নিস্তব্ধতা, ভাঙা মন্দির এবং স্বর্গের ঠিকানা

হেমন্তের মায়াবী রোদে মোড়া কাশ্মীর—যেখানে আপেল বাগানের মিষ্টি সুবাস আর জাফরানের খেত ছুঁয়ে বয়ে যায় হিমেল হাওয়া। ডাল লেকের বুকে শিকারায় ভেসে দূর পাহাড়ের গায়ে রঙের খেলা দেখা, পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথে পাইন-উইলোর ছায়া মাড়িয়ে দুধপাথরি বা সোনমার্গের নির্জন নিসর্গে হারিয়ে যাওয়া—এ যেন এক অলীক স্বপ্নের দেশ। শুধু প্রাকৃতিক শোভা নয়, এই উপত্যকার পরতে পরতে জড়িয়ে আছে শতাব্দী-প্রাচীন ইতিহাস আর স্থানীয় মানুষের হৃদয়স্পর্শী আতিথেয়তা।

অদিতি ব্যানার্জীের প্রতিকৃতি
১১ মিনিট পড়া
শেয়ার করুন
জ্ঞানবৃক্ষের ফল, নির্মল নিস্তব্ধতা, ভাঙা মন্দির এবং স্বর্গের ঠিকানা প্রচ্ছদ
লেখার আকার
লেখার অবস্থান

‘দাদী লিজিয়ে।’

তাকিয়ে দেখি গাড়ির জানলা দিয়ে মায়ের দিকে বাড়ানো হাতে রয়েছে চার-চারটি তাজা রসালো বাইবেলের সেই ‘দ্য ফ্রুট অফ নলেজ অ্যান্ড ডিজায়ার’—জ্ঞানবৃক্ষের সেই ফল। অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহ। গাড়ি দাঁড়িয়ে রয়েছে কাশ্মীর উপত্যকার একটি আপেল-বাগিচার সামনে। আর মাকে সারপ্রাইজ দেওয়ার খুশি মেখে গাড়ির জানলায় আমাদের এই পথের সারথির উজ্জ্বল মুখ। ভাষার ব্যবধান সত্ত্বেও যে অনায়াস আত্মীয়তা পাতিয়েছে এই সফরের শুরু থেকে। উত্তর গোলার্ধের আপেল মরসুমে নুয়ে পড়া ফলন্ত গাছ। সুস্বাস্থ্যের জন্য যাকে ঘিরে প্রবাদ, ‘অ্যান অ্যাপেল আ ডে কীপস দ্য ডকটর অ্যাওয়ে’। টুসটুসে রসালো লাল, সোনালি আপেল-জমিনের ফাঁক দিয়ে উপত্যকার বোনা নরম মিঠে রোদের নকশা। বাগানে গড়াগড়ি যাচ্ছে তাজা আপেল। লিখিত নির্দেশ অনুসারে গাছ থেকে পাড়া বারণ। অত্যুৎসাহী পর্যটকের আপেল সহ সেলফির অত্যাচারে গাছের ক্ষতি হয়। সুতরাং জরিমানার অঙ্ক লেখা। বাগানে ঝরে পড়া ফল আর তার গন্ধভরা বাতাস। এক কামড়েই কনুই পর্যন্ত গড়িয়ে আসা মিষ্টি রসের স্রোত। বাগানের এককোণে জুস বিক্রির ব্যবস্থা। চাইলে বাগানের মধ্যেই হতে পারে আপেল জুসের স্বাদগ্রহণ। পাশেই চলছে ঝাড়াই, বাছাই। রুটি-রুজির ফলবাগানে কর্মিষ্ঠ অভ্যস্ত হাতের দ্রুতিময় চলনে রাশি রাশি ফলের বাক্সবন্দী হয়ে পাড়ি দেওয়ার প্রস্তুতিপর্ব। কাশ্মীর উপত্যকায় মার্চ-এপ্রিলের টিউলিপের মরসুম যেমন মনোমুগ্ধকর, তেমনই অক্টোবরের এই আপেল-মরসুম এবং পাতাঝরা অর্থাৎ ‘ফল সিজন’এর টানেও বহু পর্যটকের আগমন হয়। এই সময়ে ফলভারনত গাছগুলিকে দেখলে উপলব্ধি করা যায় পরিপূর্ণতার সন্ধিক্ষণে উপনীত জীবনের মাধুর্যের স্বরূপ। বসন্তের ফুলখেলা শেষ করে ‘হেমন্তে তার সময় হল এবে, পূর্ণ করে আপনাকে সে দেবে।’ ফসলবিলাসী হাওয়া মেখে গাড়ি এগিয়ে চলে গন্তব্যের দিকে। পথে পড়ে জাফরান তুলে নেওয়ার পরের শূন্য জমি, মাঝে মাঝে তখনও থেকে যাওয়া মভ রঙের জাফরান ফুলের সামান্য অবশেষ। আলতো চোখে দেখা যায় আখরোটের হলুদ বাগিচায় টুকরি ভরে ফল তোলার ব্যস্ততা। গাছগুলো রোদের রঙ মেখে সোনার মত ঝকঝক করতে থাকে। বেলা গড়িয়ে আসে, কে জেগে থাকবে খোঁজ করতে কোজাগরীর চাঁদ উঁকি দেয়। রাত ঘনায়, পারদ নেমে আসে। দুপাশে চন্দ্রালোকিত আপেল বাগানে হিমেল বাতাসের ফিসফিস, পাতায় পাতায় গলিত রুপোর পরত ক্ষণে ক্ষণে বিভ্রম সৃষ্টি করে। কখনও পথের পাশে পাশে বয়ে চলে স্বচ্ছ হিমস্রোতা নদী। নশ্বর জীবনে স্বর্গের ঠিকানা মেলে।

চিত্র ১ ভেড়ার দল
চিত্র ১ ভেড়ার দল
চিত্র ২ ডাল লেক
চিত্র ২ ডাল লেক

কাশ্মীরের পর্যটন মানচিত্রে স্থাননাম অনেক। রাজধানী শ্রীনগর ডাল লেকের জন্য বিশেষভাবে বিখ্যাত। এটি কাশ্মীরের মুকুটমণি। অত্যন্ত সমৃদ্ধ একটি জলজ বাস্তুতন্ত্র। জম্মু-কাশ্মীরের দ্বিতীয় বৃহত্তম স্বাদু জলের হ্রদ। জলদর্পণে আকাশ আর পাহাড় সেখানে নিজের মুখ দেখে। প্রহরে প্রহরে তার বিচিত্র রূপ। হাউসবোটে রাত্রিবাস করে ভোরে লেকের জলে সূর্যোদয় দেখার অভিজ্ঞতা অতুলনীয়। দূর থেকে ভেসে আসা শঙ্করাচার্য মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি এবং আজানের ধ্বনি স্নিগ্ধ সকালকে এক পবিত্র অনুভূতিতে ভরিয়ে দেয়। আর সারাদিনের সূর্যধোয়া রঙের খেলার শেষে সন্ধ্যে নামলে সেই লেকের জলে বোট আর শিকারাগুলির নরম আলো মায়াবাস্তবের প্রহেলিকা রচনা করে। এখানে ভাসমান বাগান এবং লিলি ফুলের খামার চোখ জুড়িয়ে দেয়। হ্রদের তীররেখা বরাবর মুঘল আমলের বিখ্যাত বাগানগুলির মনোরম শোভা দেখতে পাওয়া যায়। জলে তিরতির করে কাঁপে গাছের ছায়া। ওরা পেয়েছে খবর, পাতা খসানোর সময় হয়েছে শুরু। ডাল লেকের বুকে সারাদিন ভেসে বেড়ায় অজস্র রঙিন শিকারা। পর্যটকেরা যেমন শিকারায় ভাসতে ভাসতে ডাল লেকের অপার্থিব সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন, তেমনই এই শিকারাগুলি হয়ে ওঠে ভাসমান এক একটি বিপণি। কোনও শিকারায় ফুলের বাগান, কোনোটিতে স্থানীয় কারিগরদের বানানো গয়না, কোনোটিতে বিখ্যাত কাশ্মীরী পানীয় কাহওয়া (জাফরান এবং বিভিন্ন ভেষজ মিশ্রিত একপ্রকার চা, সামোভার নামক একটি তামা বা পিতলের পাত্র থেকে পরিবেশিত হয়), কোনোটিতে আবার কাশ্মীরী পোশাকে সেজে ছবি তোলার আয়োজন। এখানে ভাসমান বাজারও অন্যতম আকর্ষণের কেন্দ্র। ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই শিকারাগুলি জড়ো হয় নির্দিষ্ট প্রান্তে, দৈনন্দিন সামগ্রী এবং উপচে পড়া ফুলের সম্ভার নিয়ে। পুষ্পিত শিকারায় সুন্দর হাসিমুখের আড়ালে লুকিয়ে থাকে মেহনতি মানুষের প্রতিদিনের জীবনসংগ্রামের ঘ্রাণ, পর্যটন বিলাসের এই স্বর্গরাজ্যে রোজ শিকারা সাজিয়ে নিয়ে আসা যাদের ‘বাই চয়েস’ নয়। সুসজ্জিত বিপণিগুলিতে মেলে কাশ্মীরী হস্তশিল্পসামগ্রীর সমাহার। এখানকার হাতে কাজ করা পশমিনা বা কাশ্মীরী শালের খ্যাতি বিশ্বজোড়া। প্রকৃতির চিনার পাতার নকশা সুতোর নিপুণ বুননে ফুটে ওঠে কারিগরের হাতে, তার পশমি ওম কাশ্মীরের আতিথেয়তার উষ্ণতা নিয়ে জড়িয়ে ধরে। তারই পাশে এর কাঠখোদাই সহ কারুশিল্পেরও কোনো তুলনা নেই। হাউসবোটগুলির কাঠখোদাইয়ের কাজে মিশে থাকে শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার। এই অঞ্চলের উইলো কাঠ থেকে নির্মিত ক্রিকেট ব্যাটে প্র্যাকটিস করেই দেশের অগণিত কিশোর একদিন দেশের হয়ে খেলার স্বপ্ন লালন করে। একে স্বপ্নের জন্মভূমি না বলে উপায় কী!

চিত্র ৩ গুলমার্গ
চিত্র ৩ গুলমার্গ

শ্রীনগর থেকেই পৌঁছই বারমুলা জেলায় অবস্থিত গুলমার্গে। ফার্সিতে ‘গুল’ শব্দের অর্থ ফুল। এটি ফুলের উপত্যকা। এখানে বিশ্বের অন্যতম উচ্চ গন্ডোলা (কেব্‌ল কার রাইড) হয়। ফেজ ওয়ান এবং ফেজ টু এই দুই পর্বে এই রাইডটি করা সম্ভব। এখানে শীতে স্কিয়িং হয় এবং চমৎকার একটি গলফ্‌ কোর্ট আছে। ওপর থেকে পাখির চোখে দেখি বিস্তীর্ণ উপত্যকার নয়নাভিরাম রূপ। শীতকালে বরফের চাদরে মোড়া থাকলেও এই মধ্য অক্টোবরের উপত্যকায় রঙের সমারোহ দেখে মুগ্ধ হতে হয়। গাছের পাতায় পাতায় যে এত রঙ ধরতে পারে, এখানে না এলে বিশ্বাস করা কঠিন। পরের গন্তব্য সোনমার্গ। গণ্ডেরবাল জেলায় অবস্থিত এই সোনমার্গের অর্থ ‘স্বর্ণময় তৃণভূমি’। ঐতিহাসিকভাবেও এর তাৎপর্য আছে। এটি প্রাচীন সিল্ক রুটের একটি প্রবেশপথ ছিল। তিব্বতের সঙ্গে কাশ্মীরের সংযোগ রক্ষায় এর ভূমিকা ছিল। এখান থেকেই আলাদা গাড়ির ব্যবস্থা করে এগিয়ে চলি জোজি লা গিরিপথের দিকে। এটি লাদাখের প্রবেশদ্বার। ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে কৌশলগতভাবেও স্থানটির গুরুত্ব অসীম। অনুপ্রবেশকারী শত্রুসেনার হাত থেকে এই গিরিপথকে রক্ষা করা দেশের বীর সেনানীদের স্মরণে এখানে একটি ওয়ার মেমোরিয়াল আছে। এই দুস্তর পথ পাড়ি দিয়ে এসে অনুভব করি যাঁদের অতন্দ্র প্রহরায় আমরা নিশ্চিন্ত জীবনযাপন করি, তাঁদের প্রতিটা দিনই একটা যুদ্ধ। একদিকে খাড়া পাহাড়, অন্যদিকে অতলান্ত খাদ, মাঝে সরু ফিতের মত পথ। দূরের পাহাড়চূড়ায় ঝকঝক করে বরফের মুকুট। কনকনে হাওয়া দেয়। রুক্ষতার মধ্যেও যে সৌন্দর্য আছে, তা জোজি লা পাসের সেই দুর্গম পথে না গেলে অনুভব করা যায় না।

চিত্র ৪ জোজি লা পাস
চিত্র ৪ জোজি লা পাস
চিত্র ৫ পহেলগাঁও
চিত্র ৫ পহেলগাঁও

শ্রীনগর থেকেই আরেক শৈলশহর পহেলগাঁও। জেলা অনন্তনাগ। ঘন পাইনের সারি, নীলাভ লিডারের উচ্ছ্বল কলধ্বনি। নদীর জলের রঙ প্রকৃতির নিজের প্যালেটে গোলা। বেতাব, আরু ভ্যালি এবং চন্দনওয়াড়ি। শান্ত নৈসর্গিক শোভা। কাশ্মীর বরাবরই তার অনন্ত সৌন্দর্যের জন্য চলচ্চিত্র পরিচালকদের চিত্রগ্রহণের প্রিয় ঠিকানা। আর বলিউড কেমনভাবে আপামর জনমনে রাজ করে তার প্রমাণ, বেতাব উপত্যকার নাম আগে ছিল হাজন। কিন্তু হিন্দি ফিল্ম ‘বেতাব’ এর শুটিং হবার পর থেকে এর নাম হয়ে যায় বেতাব। চন্দনওয়াড়ি তার অপার্থিব সৌন্দর্যের পাশাপাশি ভারতবর্ষের আধ্যাত্মিক ইতিহাসে অত্যন্ত পবিত্র এক তীর্থপথের সূচক হিসেবে স্বনামধন্য। এখান থেকেই বিখ্যাত অমরনাথ যাত্রার সূচনা হয়। প্রতি বছর অমরনাথ যাত্রার সময় তীর্থযাত্রীদের সমাগমে জায়গাটি জমজমাট হয়ে ওঠে। তবে পরিচিত কাশ্মীর ভ্রমণসূচিতে যে উপত্যকাটি এখনও সেভাবে ট্যুর প্যাকেজে অনুপ্রবিষ্ট হয়নি, তার নাম দুধপাথরি। হয়নি বলেই হয়তো তার অনাঘ্রাত অমৃতগন্ধা নয়নাভিরাম শোভা অকারণ উল্লাসের হুল্লোড়ে ক্লেদাক্ত হয়নি। এই দুধপাথরি জম্মু ও কাশ্মীরের বুদ্গাম জেলায় অবস্থিত, প্রকৃতির এক আশ্চর্য বিস্ময়। বসন্তে এই উপত্যকা ফুলে ভরে যায়। শীতল পাহাড়ি হাওয়ায় শরীর মনের সমস্ত ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। দুধপাথরি নামের অর্থ ‘দুধের উপত্যকা’ বা ‘ভ্যালি অফ মিল্ক’। স্থানীয় লোককথা অনুসারে বহুকাল আগে শেখ নূর উদ্দিন নূরানী নামক এক ধর্মপ্রাণ সুফি পীর এই কাশ্মীর উপত্যকায় বাস করতেন। তিনি এই পথে যাওয়ার সময় নমাজের আগে ওজুর জলের প্রয়োজন হলে মাটিতে লাঠি দিয়ে আঘাত করেন। সেই আঘাতে মাটি ফেটে বেরিয়ে আসে দুধের ধারা। কিন্তু তাঁর প্রয়োজন ছিল জলের। তিনি মনে মনে সেকথা ভাবলে সেই দুধের ধারা শীতল স্বচ্ছ জলে পরিণত হয়। সেই থেকেই এই উপত্যকার এহেন নামকরণ। এখানে দিকচক্রবালে আকাশে মিশে গেছে উইলোর বনানীরেখা, সামনে বহুধাবিস্তৃত ঘন সবুজ পার্বত্য তৃণভূমির গালিচা। ঘোড়ায় চড়ে যাওয়া যায় উপত্যকার মাঝে বহমান ঘন নীল শালিগঙ্গা দেখতে। নীরবতার যে নিজস্ব ভাষা আছে, তাকে পড়ার মন থাকলে আসতেই হবে নির্মল নিস্তব্ধতার এই স্বর্গে।

তারপর আমরা খুঁজে নিই কয়েকটি স্বল্পখ্যাত কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ দর্শনীয় স্থান। যেহেতু কাল নিরবধি এবং পৃথিবী বিপুলা, ফলে ইতিহাসের আলোকরেখা সর্বত্র সমভাবে অন্ধকার দূর করতে পারেনি। তাই লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে যাওয়া অতীতকে নতুন করে ফিরে দেখার ইচ্ছেতে এই অর্বাচীন কয়েক কদম এগিয়ে যায়। টাইম-ট্রাভেল করে পৌঁছতে চায় সেইসময়ে, যখন কাশ্মীর হিন্দু রাজাদের শাসনাধীন ছিল। মুসলিম বিজয়ের আগে কাশ্মীর শৈব ধর্মচর্চা এবং হিন্দু ধর্ম-দর্শন চর্চার মূল কেন্দ্র ছিল। সংস্কৃত সাহিত্যতত্ত্বের পীঠস্থান হিসেবেও এর খ্যাতি ছিল। বিভিন্ন রাজার পৃষ্ঠপোষকতায় বিভিন্ন প্রখ্যাত সাহিত্যতাত্ত্বিক তাঁদের অমূল্য গ্রন্থগুলি রচনা করেছিলেন। দ্বাদশ শতকের কাশ্মীরী পণ্ডিত কলহন কাশ্মীরের রাজাদের ধারাবাহিক ইতিহাস রচনার সময় তাঁর ‘রাজতরঙ্গিনী’তে উল্লেখ করেছেন ত্রিভুবনের মধ্যে রত্নপ্রসবিনী পৃথিবী শ্রেষ্ঠ, পৃথিবীর মধ্যে উত্তর দিক শ্রেষ্ঠ, উত্তরাংশের স্থানসমূহের মধ্যে হিমালয় শ্রেষ্ঠ, হিমালয়ের উপরিস্থিত দেশসমূহের মধ্যে কাশ্মীর শ্রেষ্ঠ। আমরা প্রথমেই পৌঁছই কলহন কথিত সেই শ্রেষ্ঠ স্থানের শতাব্দীপ্রাচীন এক উপাসনালয়ের ভগ্নাবশেষে, মন্দিরময় আর্যাবর্তের একটি উল্লেখযোগ্য সূর্যসাধনক্ষেত্র মার্তণ্ড মন্দিরে। ‘মার্তণ্ড’ নামের অর্থই সূর্য। অষ্টম শতাব্দীতে কার্কোট রাজবংশের রাজা ললিতাদিত্য মুক্তাপীড়ের সময়ে এটি নির্মিত হয়েছিল। পরে সিকান্দার শাহ মিরির হাতে এটি ধ্বংস হয়। মিরি সিকান্দার বুতশিকান নামেও পরিচিত ছিলেন। তার অর্থ প্রতিমাধ্বংসকারী। মন্দিরটি ভগ্নস্তূপ হলেও স্থাপত্যশিল্পের এক উৎকৃষ্ট নিদর্শন। সারাদিনব্যাপী সূর্যদেবের বিগ্রহের ওপরে সূর্যালোক যাতে পড়তে পারে, তেমন ব্যবস্থা এখানে ছিল। নিখুঁত খোদাইকর্মের কিছু নমুনা এখনও মন্দির-প্রাঙ্গণে সময়ের বলিরেখা উপেক্ষা করে টিকে গেছে। ভারতীয় পুরাতত্ত্ব বিভাগ বর্তমানে এর তত্ত্বাবধায়ক। এরপর পুলওয়ামার অবন্তীপুরায় ঝিলামের কাছে অবন্তীস্বামী মন্দির। নবম শতাব্দীতে উৎপল রাজবংশের রাজা অবন্তীবর্মন এই মন্দির নির্মাণ করান। রাজা অবন্তীবর্মার নামানুসারেই এই স্থানের নাম ছিল অবন্তীপুর। মন্দিরচত্বর সুবিশাল। সেখানে একাধিক ধ্বংসাবশেষ একাধিক মন্দিরের উপস্থিতির সাক্ষ্যবাহী। সর্ববৃহৎ মন্দিরটিই বিষ্ণু অর্থাৎ অবন্তীস্বামীর। কাছেই আছে অবন্তীশ্বর শিবমন্দির। মোট পাঁচটি মন্দিরের সন্ধান মেলায় স্থানীয়দের কাছে এর নাম ‘পাণ্ডব লরি’ অর্থ পাণ্ডবদের ঘর। গান্ধার শৈলীর প্রভাবযুক্ত মন্দিরের কারুকার্য যেটুকু অবশিষ্ট আছে, দর্শকের সম্ভ্রম উৎপাদন করে। সেকালের প্রযুক্তি উৎকর্ষের প্রমাণ হিসেবেও এগুলির গুরুত্ব অপরিসীম। সমগ্র মন্দির ইন্টারলক সিস্টেম এ তৈরি। পাথরের সঙ্গে পাথর জুড়ে এর নির্মাণ। কোথাও চুন, বালি, সুরকি বা এই জাতীয় অন্যান্য পদার্থের ব্যবহার করা হয়নি। এটিও বর্তমানে ধ্বংসপ্রাপ্ত এবং ভারতীয় পুরাতত্ত্ব বিভাগ দ্বারা সংরক্ষিত। মন্দিরটি বিধর্মী শাসকদের দ্বারা নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এবং সম্ভবত ভূমিকম্পে বেশিরভাগ অংশ মাটির তলায় চলে গিয়েছিল। পরে খননকার্যের ফলে এটির পুনরুদ্ধার সম্ভব হয়। তার নেতৃত্বে ছিলেন ড. দয়ারাম সাহানি।

চিত্র ৬ অবন্তীস্বামী মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ
চিত্র ৬ অবন্তীস্বামী মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ

নতুন জায়গায় যেমন অপরিচিতের সঙ্গে পরিচয় হয়, তেমনই পরিচিতকেও আবিষ্কার করা যায় নতুন করে। আত্ম-আবিষ্কারের এ এক অভিনব পন্থা। অপরিচিত ভূগোল আর অজানা ইতিহাস আত্মস্থ করতে করতে মনে হয় সময় বড় অল্প। সহসা অবসরের দিন ফুরিয়ে আসে। ফেরার আগে দেখি কঠিন শীতের দিনের আগাম প্রস্তুতিতে কাঠ চেরাই, ফল শুকোনো ইত্যাদিতে ব্যস্ত মানুষের দিনলিপি। একদিকে নির্মম অস্ত্রহাতে অবিচল প্রহরা, অন্যদিকে বাড়িয়ে দেওয়া চকলেটের আনন্দে স্কুলফেরত শিশুদের নিষ্পাপ হাসিমুখ। গান্ধর্ব কবিতাগুচ্ছ থেকে শব্দ ধার করলে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয় একদিন এই সুজলা সুফলা দেশে ছিন্নভিন্ন পক্ষাঘাত থেকে চন্দ্রগরিমার দিকে যারা হাত বাড়াবে, তারা সকলেই কেবল মানবধর্মে দীক্ষা নিয়ে ‘একাকার কোনো দীন-ই-ইলাহীর গোলাপবাগানে উৎসের আতর ছুঁয়ে প্রাচী-র প্রান্তর ভরে দেবে’ আর এ জাহান পেয়ে যাবে তার প্রত্যাশিত নূর। আমির খসরু বলেছিলেন পৃথিবীতে যদি কোথাও স্বর্গ থাকে, তবে তা এখানেই। রুদ্ধশ্বাস আতঙ্ক আর সন্ত্রাসের কবলে বারংবার রক্তাক্ত হয়ে ওঠা ভূস্বর্গের আতিথেয়তার উঠোনে দাঁড়িয়ে মনে হয় এই স্বর্গচ্যুতির দায় আসলে কাদের?

চিত্র ৭ আপেলগাছ
চিত্র ৭ আপেলগাছ
চিত্র ৮ আপেলগাছ
চিত্র ৮ আপেলগাছ

প্রকৃতির অকৃপণ দাক্ষিণ্যের সুযোগ বারেবারেই নিয়েছি আমরা, মানব-প্রজাতি। এখানেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। পরিবেশ-বান্ধব পর্যটনের নির্দেশিকা শিকেয় তুলে দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ, নানাবিধ দূষণ আর কার্বন ফুটপ্রিন্টের বাড়াবাড়িতে জেরবার হয়ে যাচ্ছে স্বপ্নিল উপত্যকা। তবু এই আকালেও স্বপ্ন দেখি। প্রকৃতি আর পরিবেশের এই অবহননের অশনিসংকেতের মধ্যেও ভূস্বর্গের স্বপ্নভূমিতে হেমন্ত যেন জলরঙে আঁকা ছবি। আকাশ অপরাজিতা ফুলের পাপড়ি সেঁচা নীল, ধূম্র পাহাড়ের সারি, গগনচুম্বী শৃঙ্গরাজির মাথায় সদ্যঝরা বরফের অভ্ররেখা, পীরপঞ্জলের ওপর সূর্যের জাফরানি আলো, ঢেউখেলানো ঘন পাইন, উইলোর পান্নাসবুজ বনানী আর মায়াবী উপত্যকার সবুজ ভেলভেট চিরে বয়ে চলা উপল-মুখরা স্রোতস্বিনী। পাতাঝরার মরসুমে শেষবেলায় ঝরে পড়বার আগে চিনারের পাতায় পাতায় সোনারঙের বর্ণিল উজ্জ্বলতা, তার নয়নাভিরাম রূপ। পথের বাঁকে বাঁকে বিমুগ্ধ বিস্ময়। ফুলের সমারোহ, আয়নার মত জলাশয়ে প্রতিবিম্বিত আকাশ, ঘোড়া আর পশমি ভেড়ার পাল, তাদের খুরে ওঠা ধুলোর মিহি আবেশ, আপেল বাগানে সুপক্ক আপেলের ঘ্রাণ, কেশর আখরোটগন্ধী বাতাসে মিশে যাওয়া মেপল কাঠের ধোঁয়ার গন্ধ। সব মিলে এক শব্দ, গন্ধ, স্পর্শময় অথচ অপার্থিব অনুভব। মায়াবাস্তবের অলীক পরিসরে কাটানো সেই সময়টুকু যেন বিশুদ্ধ মৃতসঞ্জীবনী। সেই সময়ের গর্ভে দৃশ্যের জন্ম। আর এই একেকটি দৃশ্যের জন্যই মনে হয় জন্মজন্মান্তর অপেক্ষা করা যায়। অকস্মাৎ পূর্ণ হয়ে ওঠে আমাদের এই তুচ্ছ জীবন। অক্ষরমালায় তার বর্ণনা কভু না সম্ভবে। বর্ণনা-অপটু কলমের মুখ থেকে তাই অক্ষরগুলি ঝরে যায় গহীন গিরিবর্তের অন্দরে। শুধু থেকে যায় অ-লৌকিক এক স্মৃতির রেখা। ভূস্বর্গ প্রত্যাগতের মানসপটে সেই স্মৃতি সততই সজীব। কোলাহলমুখর এই শহরে, ক্লান্ত দিনশেষে, পরিচিত জনতার সরণিতে সেই স্মৃতির মাদকে ডুবে যাওয়া অভ্যেস করি। চারপাশ স্তব্ধ হয়ে যায়। আর সেই তারার হীরকখচিত আকাশ, সেই উপত্যকা, বনরাজি, গিরিবর্ত্ম, নদী, বরফ আর সবুজের পাহাড় হাজার হাজার মাইলের ব্যবধান পেরিয়ে নিমেষে চোখের পাতায় এসে দাঁড়ায়।
—
আলোকচিত্র: লেখক

শেয়ার করুন
অদিতি ব্যানার্জীের প্রতিকৃতি

লেখক

অদিতি ব্যানার্জী

হুগলী মহসীন কলেজের অধ্যাপক। প্রথমে প্রেসিডেন্সি কলেজ ও পরে প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা ও গবেষণা। প্রাবন্ধিক। বই পড়তে ও ভ্রমণ করতে ভালোবাসেন।

সব কাজ দেখুন →

আরও পড়ুন

কেওনঝড়ের প্রতিটি জলপ্রপাতের পেছনে রয়েছে প্রকৃতির বিস্ময়, প্রাচীন কিংবদন্তি আর ইতিহাসের কত অজানা কাহিনি!

ভ্রমণকাহিনি

প্রাচীন কিংবদন্তী, জংলা পাহাড় আর শত ঝরনার জল

পান্না-সবুজ অরণ্যের বুক চিরে রুপোলি জলধারার অবিরাম নৃত্য, পাহাড়ের গায়ে মেঘের ওড়াউড়ি, ভেজা পাথরে রামধনুর রঙিন ছোঁয়া—কেওনঝড় যেন প্রকৃতির নিজস্ব ক্যানভাস। সেই সৌন্দর্যের পরতে পরতে মিশে আছে পুরাণের ছায়া, আদিবাসী ঐতিহ্য আর হারিয়ে যেতে বসা এক আদিম পৃথিবীর দীর্ঘশ্বাস।

অদিতি ব্যানার্জী১২ মিনিট