প্রাচীন কিংবদন্তী, জংলা পাহাড় আর শত ঝরনার জল
পান্না-সবুজ অরণ্যের বুক চিরে রুপোলি জলধারার অবিরাম নৃত্য, পাহাড়ের গায়ে মেঘের ওড়াউড়ি, ভেজা পাথরে রামধনুর রঙিন ছোঁয়া—কেওনঝড় যেন প্রকৃতির নিজস্ব ক্যানভাস। সেই সৌন্দর্যের পরতে পরতে মিশে আছে পুরাণের ছায়া, আদিবাসী ঐতিহ্য আর হারিয়ে যেতে বসা এক আদিম পৃথিবীর দীর্ঘশ্বাস।


এখানে পথ সবুজ ছায়াচ্ছন্ন। কালো পিচরাস্তার চারপাশে ভাসে বনজ আর্দ্রতা। বাতাসে ভিজে শ্যাওলার গন্ধ। স্নায়ুতন্ত্রীতে বয়ে চলে বিরতিহীন জলের শব্দ। ভিজে পাথরের দেওয়াল থেকে উঁকি দেয় উজ্জ্বল সবুজ চারা। অবিশ্রান্ত বৃষ্টি শেষে মেঘভাঙা মায়াবী আলোয় অনির্বচনীয় লাগে চারপাশ। গহীন অরণ্যময় পাহাড়ের গা বেয়ে বয়ে চলে অবিরাম জলধারা। বর্ষায় স্ফীত, পুষ্ট সেই জলরাশি অগণন প্রপাতে চূর্ণবিচূর্ণ হতে হতে নিম্নগামী হয়। রুপোর পাতের মতো চকচক করে দূর থেকে। আদিম নীলচে-সবুজ অরণ্যভূমির বুক চিরে বইতে থাকে চঞ্চল স্রোত। যেন স্বপ্নের ভেতর থেকে শোনা যায় জলের কলধ্বনি। ধাপে ধাপে প্রবাহিত জল হারিয়ে যায় দুস্তর অরণ্যে ঢাকা গভীর খাতের ভিতরে। তখন ওপর থেকে তার দেখা মেলে না। কেবল অন্তঃসলিলা ঝোরার শব্দ। আর দৃশ্যমান জলপ্রপাতগুলির গায়ে কুয়াশার আবরণে রামধনু রঙের আঁকিবুঁকি। জলের কলরোলে মিশে যায় পাখির ডাক। নাম না জানা পাখিগুলো ঘাসের ওপরে পোকা খোঁজে। দ্রুতগতিতে ধাবমান নাগরিক জীবনের যান্ত্রিকতায় আড়ষ্ট মন শুশ্রূষা খুঁজে পায় এই প্রকৃতিলগ্ন শান্ত পরিবেশে। সবুজাভ চারদিক সজীব, সতেজ, সপ্রাণ। কি শেড এই সবুজের? কিসের সঙ্গে তুলনা করা চলে? এই কি সেই মকরতমণির রঙ?
এবারের গন্তব্য ওড়িশার কেওনঝড়। বর্ষাধোয়া ঘন জঙ্গল, পাহাড় আর জলপ্রপাত। শহরের কোলাহল থেকে দূরে কদিনের স্বস্তিযাপন। হাওড়া থেকে ট্রেনে বারবিল স্টেশন, সেখান থেকে গাড়ি। থাকার জন্য ওটিডিসি পান্থনিবাস। কেওনঝড়ে পান্না-সবুজ বনের বুক চিরে কালো রাস্তায় চলতে চলতে জঙ্গলের পথে গেলে চড়াই-উতরাই ভেঙে দেখা মেলে অপূর্ব সব জলপ্রপাতের। ভৌগোলিক পরিভাষায় কোনোটি প্লাঞ্জ, কোনোটি ক্যাসকেড, কোনোটি হর্সটেল। পথে পড়ে হাতির করিডোর। বিভিন্ন মরসুমি পাহাড়ি ঝোরায় জলের যোগান থাকায় বর্ষার কয়েকমাস সরোবরের মতো হয়ে থাকে কয়েকটা জায়গা। শুধু অনাবিল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যই নয়, এই অঞ্চলে ছড়িয়ে আছে পুরাণ আর লোককথার নানা কাহিনিসূত্র। পুরাণকথার নায়কেরা মানুষের কৌম স্মৃতিতে আজও বড় জীবন্ত। যেমন কেওনঝড় আর ময়ূরভঞ্জের সীমান্তে বৈতরণী নদীর বুকে সৃষ্ট ভীমকুণ্ড। প্রাকৃতিক জলপ্রপাত। এর নামেই জড়িয়ে আছে পৌরাণিক মহিমা। ঘন জঙ্গলের মধ্যে পাথুরে গিরিখাত বেয়ে জলস্রোত নেমে এসে তৈরি করেছে একটি গভীর জলাশয়। কথিত আছে মধ্যম পাণ্ডব ভীম এই কুণ্ড খনন করেছিলেন। তখন পঞ্চপাণ্ডবের অজ্ঞাতবাসের সময়। তীব্র গরম, নিদারুণ জলকষ্ট। মাতা কুন্তী এবং দ্রৌপদী কাতর হয়ে পড়লে মহাপরাক্রমশালী ভীমসেনের গদার আঘাত এখানকার মাটি ভেদ করে। মাটির তলা থেকে জল বেরিয়ে আসে এবং এই কুণ্ড সৃষ্টি হয়। আবার অনেকের মতে ভীম এই জলাশয়ে স্নান করেছিলেন বলেই জায়গাটির এই নাম। এখানে মহাবলী ভীমের একটি মূর্তি আছে। এই জলপ্রপাতের মাঝে একটি বড় ওয়াচ-টাওয়ার আছে, যেখান থেকে কেওনঝড় এবং ময়ূরভঞ্জ দুটি দিকই দেখতে পাওয়া যায়। স্বল্প প্রবেশমূল্য দিয়ে সেখানে প্রবেশ করলে বহতা জলের ভয়ানক গতির প্যানোরামিক ভিউ পাওয়া যায়। স্তব্ধ হয়ে দেখি প্রবল বর্ষায় চারপাশ বিধৌত করে উন্মত্ত জলস্রোত গেরুয়া বর্ণ ধারণ করে ছুটে আসছে। সামনে যা পাবে, ভাসিয়ে নেবে খড়কুটোর মতো। অগণন শৈলশিরা তার বুকে জেগে আছে। জলের তীব্র গর্জনে কথা হারিয়ে যায়। জানতে পারি প্রতি বছর মকর সংক্রান্তিতে এখানে বড় মেলা বসে। বহু মানুষ এখানে স্নান করতে আসেন। লোকবিশ্বাস, এখানে স্নানের ফলে রোগমুক্তি ঘটে, পাপক্ষয় হয়।

এরপরে একই নদীর ওপর দুটি ভিন্ন জলপ্রপাত। বড়ঘাঘরা আর সানাঘাঘরা। মাচাকান্দনা বা মাছকান্দনা নদীর ওপর অবস্থিত। বড়ঘাঘরার চারপাশে ঘন সবুজ বন। তার মধ্যে প্রায় ২০০ ফুট ওপর থেকে জলধারা প্রবল বেগে নিচে পড়ছে। এটিতে সারাবছরই জল থাকে। তবে এর শ্রেষ্ঠ সৌন্দর্য টের পাওয়া যায় বর্ষাকালেই। সানাঘাগরার মত ধাপে ধাপে না পড়ে একধারায় পড়ছে বলে এখানে জলের আওয়াজ অনেক তীব্র। এই জলস্রোত নিচে একটি প্রাকৃতিক জলাশয় সৃষ্টি করেছে। এখানে একটি ড্যাম তৈরি করা হয়েছে, যেখান থেকে এই শহরের পানীয় জল সরবরাহ করা হয়। যারা আরেকটু রোমাঞ্চ চান, তাদের জন্য জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে ট্রেকিং রুট আছে। প্রায় চার কিমি মতো রাস্তা হেঁটে বড়ঘাঘরা এবং সানাঘাগরা একসঙ্গে দেখে নিতে পারেন। সানাঘাগরা জলপ্রপাত প্রায় ১০০ ফুট উঁচু। ‘সানা’ অর্থ ছোট। ঢেউখেলানো ভূমিরূপের মধ্যে এটি একটি ভি আকৃতির ঢাল। নদীর গতিপথে কোমল শিলা দ্রুত ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে। বর্ষায় প্রবল জলরাশি ওপর থেকে ধাপে ধাপে নিচে লাফিয়ে পড়ছে। শীতল জলের মিহি গুঁড়োতে চারপাশ ধোঁয়াধোঁয়া। ঝিরঝির কাঁপছে ভিজে গাছের পাতা। শান্ত মনোরম এখানকার পরিবেশ। এখানে একটি নৌকাবিহারের জায়গা আছে। শিশু উদ্যান আছে। রয়েছে একটি নেচার ক্যাম্প। আগে থেকে ব্যবস্থা করে এলে সেখানে রাত্রিবাসের সুব্যবস্থা আছে। পার্কের টিকিট কাউন্টারের কাছে জলের মধ্যে রয়েছে মহাদেবের মূর্তি। জলপ্রপাত ঘুরে চলে যেতে চাইলে সকাল থেকে সন্ধ্যে অবধি এটি পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত থাকে। অনেকে এখানে পিকনিক করতে আসেন। আবার হান্ডিভাঙা জলপ্রপাত দেখতে গেলে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে পাড়ি দিতে হয় বেশ কিছুটা পথ। যাওয়ার পথে পাথুরে জমির ওপর চোখে পড়ে ছোট নদীর বহতা ধারা। আকারে অতিকায় না হলেও এর নিজস্ব একটা রূপ আছে। বর্ষামুখর দিনে প্রকৃতির বুকে এর মনোরম শোভা ভুলে যাওয়ার নয়।

এরপর পৌঁছই গুন্ডিচাঘাঘি জলপ্রপাত দেখতে। এটি পরিচিত ‘ওড়িশার নায়াগ্রা’ নামে। কেওনঝড় থেকে দূরত্ব ৬০ কিমি মতো। নামটি এসেছে দেবী গুন্ডিচার নাম থেকে। স্থানীয় আদিবাসীদের কাছে এটি খুবই পবিত্র স্থান। মুসালা নদীর ওপর অবস্থিত এই জলপ্রপাতের সৌন্দর্য অতুলনীয়। জল এখানে অজস্র ধারায় ভাগ হয়ে ওপর থেকে নিচে লাফিয়ে পড়ছে। উচ্চতা খুব বেশি না হলেও অনেকদূর বিস্তৃত। বর্ষায় নদীতে জলের পরিমাণ বেশি থাকায় জলপ্রপাতটিকে একটি চওড়া পর্দার মত দেখায়। চারপাশে ঘন জঙ্গল। মাঝে একটি লোহার ব্রিজ আছে, যেখান থেকে পুরো জলপ্রপাতটি একেবারে দেখতে পাওয়া যায়। সিঁড়ি বেয়ে জলের কাছে যাওয়া যায়। সর্বদা উড়তে থাকা জলকণা জায়গাটাকে আর্দ্র আর কুয়াশাচ্ছন্ন করে রেখেছে। পিকনিকমোদী জনতার উপস্থিতির সাক্ষ্যরূপে জলের স্রোতে ভাসতে দেখি পানমশলার রঙিন কাগজ, ঠাণ্ডা পানীয়ের খালি বোতল। নগরসভ্যতার অভিশাপ। এই প্যাকেট আর বোতলগুলো কোনোটাই জীবাণুবিযোজ্য নয়। মাটিতে বা জলে মিশে যাবে না। এই নির্মল প্রকৃতির আঙিনায় আমাদের মতো তথাকথিত ‘সভ্য’ মানুষদের কুৎসিত অভব্য মানসিকতার বিজ্ঞাপন হিসেবে এগুলোর অবশেষ কত শত বছর থেকে যাবে, সে হিসেব কে রাখে!

কেওনঝড়ে খণ্ডধর বা খান্দাধার নামে দুটি জলপ্রপাত রয়েছে। প্রথমটি কেওনঝড় জেলাতেই অবস্থিত। শহর থেকে ৫৪ কিমি মতো দূরত্বে। প্রায় ৩৩০-৩৫ ফুট ওপর থেকে খাড়া পাহাড়ের বুক চিরে দুধসাদা একটি ধারায় জল আছড়ে পড়ছে নিচে। কাছে গেলে উড়ে আসা জলের ছিটে লেগে সর্বাঙ্গ ভিজে যায়। বৈজ্ঞানিক কারণেই জলকণা আর সূর্যরশ্মির কেরামতিতে আলোর প্রতিসরণে পাহাড়ি ঝরনা বা জলপ্রপাতের বহতা ধারায় রামধনু রং দেখতে পাওয়া যায়। এখানে বিস্মিত হয়ে দেখি জমা জলের মধ্যেও রামধনু এঁকে রেখেছে প্রকৃতি। আরেকটি সমনামের জলপ্রপাত রয়েছে সুন্দরগড় জেলায়। এটি ওড়িশার দ্বিতীয় উচ্চতম এবং ভারতের নবম উচ্চতম জলপ্রপাত। প্রায় ৮০০ ফুট উঁচু। তরবারির ধারের মত জল সরু ধারায় অনেক নিচে পড়ছে, তাই নাকি এমন নাম। এটি একটি হর্স-টেল জলপ্রপাত। কোরাপানি নামের একটি ঝরনা থেকে এর সৃষ্টি। সারাবছর জল থাকলেও বর্ষায় প্রবল হয়ে ওঠে। জলপ্রপাতের মূল ভিউপয়েন্টে পৌঁছতে প্রায় ৬৫০টির মতো সিঁড়ি ভাঙতে হয়। তবে পৌঁছোবার পর এর অপূর্ব রূপ পথশ্রম ভুলিয়ে দেয় অনায়াসে। দুপাশে ঘন জঙ্গল, জীববৈচিত্র্যের সমাহার। এর উৎপত্তির সঙ্গেও জড়িয়ে রয়েছে লোকবিশ্বাস। স্থানীয় আদিবাসীদের অভিমত পুরাকালে এখানে কঙ্কালা বলে এক রাক্ষসীপ্রকৃতি দেবী ছিলেন, যিনি মাটি, পাথর, গাছপালা গ্রাস করে ফেলতেন। গ্রামবাসীরা শেষে তাঁকে একটি বিরাট পাথরের ওপর বসিয়ে রেখে এলে তিনি সেটিও গ্রাস করেন। সেখানে একটি গভীর গর্ত তৈরি হয়। সেই গর্ত থেকেই নাকি বেরিয়ে আসে খণ্ডধর বা খান্দাধারের জল। বর্ষণক্ষান্ত বিকেলে সিঁড়ি ভেঙে ওপরে পৌঁছতে গিয়ে দেখি উপচে পড়া জলের ধারা ওই সিঁড়িকেই পরিণত করেছে একটি ছোট ঝরনায়। জুতো খুলে ফেলি। খালি পা স্পর্শ করে পিচ্ছিল সিঁড়ির ধাপ। চলাচলের অংশটুকু বাদ দিলে চারপাশে নরম শ্যাওলার গালিচা পাতা। জল ছুঁয়ে উঠে যাই সেখানে, যেখানে ওই ফেনিল জলরাশি জলাশয়ে এসে পড়ছে। পড়ন্ত বিকেলে দূরের নীল পাহাড়, জঙ্গল আলোছায়ায় বিভ্রম সৃষ্টি করে। এখানেও চমৎকার ইকো কটেজ আছে। সারাদিন তার বারান্দা থেকে দেখা যায় দূরের পাহাড় চিরে নেমে আসা এই জলপ্রপাতের অনবদ্য রূপ। ইকো কটেজে থাকার সুবাদে ভোরবেলার সময়টুকু একান্তে পাওয়া যায় এই খরস্রোতাকে। এই সময় বাইরের পর্যটকদের প্রবেশের অনুমতি থাকে না। কিংবদন্তী অনুসারে এই অঞ্চল প্রাচীনকাল থেকে এখানকার ভূমিপুত্রদের দ্বারা সুরক্ষিত। কেওনঝড়ের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত যে আদিবাসী সম্প্রদায়, তারা হল পাউরি ভুইয়া। এরা ভারতের সবচেয়ে আদিম আদিবাসীদের মধ্যে অন্যতম। বর্তমানে বিশেষভাবে দুর্বল উপজাতিগোষ্ঠী। এরা নিজেদের ‘মাটির সন্তান’ বলে পরিচয় দেয়। খণ্ডধরের আশেপাশে দুর্গম পাহাড়ি জঙ্গলে এদের বসতি। বলা হয় খণ্ডধরের রক্ষাকর্তা এরাই। এদের প্রধানা দেবী মা পাউরি। খনির সম্প্রসারণের জন্য এরা জঙ্গল থেকে উচ্ছেদ হচ্ছে। উন্নয়নের রথের চাকার নিচে গুঁড়িয়ে যাচ্ছে প্রকৃতি আর মানুষের নিবিড় সহাবস্থানের প্রাচীন রীতি। তবু নানা প্রাচীন ঔষধের জ্ঞান, বীজ সংরক্ষণের জ্ঞান পরম্পরাক্রমে এরা বাঁচিয়ে রেখেছে যথাসম্ভব।

এরপর সীতাবিঞ্জি। ওড়িশার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান। সীতা নদীর ধারে অবস্থিত। রামায়ণের মুখ্য নারীচরিত্রের নামেই এই স্থাননাম। এখানেও পুরাণ, ইতিহাস, মহাকাব্য, শিল্পকলা মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে। লৌকিক বিশ্বাস, রামচন্দ্র সীতাদেবীকে নির্বাসন দিলে তিনি এখানেই আশ্রয় নেন। এখানেই বাল্মীকির আশ্রমে তাঁর সন্তান লব-কুশের জন্ম হয়। এখানে দুটি বিরাট আকৃতির গ্রানাইট পাথর একে অপরের ওপর হেলে আছে। মাঝে একটি ত্রিভুজাকার ফাঁক। এই পাথরের নাম রাবণছায়া। এই রাবণছায়া গুহার ছাদে ভারতের পূর্বাঞ্চলের একমাত্র টেম্পেরা ফ্রেস্কো পেন্টিং দেখতে পাওয়া যায়। অনুমিত হয় এটি গুপ্ত যুগে অঙ্কিত হয়েছিল। প্রায় ১৫০০ বছর আগে চুনের আস্তরণ এর ওপরে প্রাকৃতিক রঙে আঁকা। খুঁটিয়ে দেখলে হাতি, ঘোড়া, রাজকীয় শোভাযাত্রার অবশেষ খুঁজে পাওয়া যায়।
ওড়িশা-সফরে গিয়ে প্রভু জগন্নাথ, বলরাম এবং সুভদ্রাদেবীকে দর্শন না করলে সে সফর কি আর সম্পূর্ণ হয়? শ্রীক্ষেত্রে যেমন জগন্নাথধাম, তেমনই কেওনঝড় শহরে পুরানাবাজার এলাকায় শ্রী শ্রী বলদেবজিউ মন্দির অতি পবিত্র স্থান। ভক্তের বিশ্বাসে একে পুরীর জগন্নাথধামের মতোই পবিত্র বলে মনে করা হয়। ১৬৭১ খ্রিস্টাব্দে মহারাজ লক্ষ্মীনারায়ণ ভঞ্জ স্বপ্নাদেশ প্রাপ্ত হয়ে এই মন্দির নির্মাণ করান। এটি কলিঙ্গ স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত। প্রধান দেবতা বলদেব বা বলরাম। ভ্রাতা জগন্নাথ এবং ভগিনী সুভদ্রাও একসঙ্গে পূজিত হন। মন্দিরচত্বরে মা লক্ষ্মী, বিমলা, মহাদেব, গণেশের মন্দির আছে। এখানে রথযাত্রা মহাসমারোহে অনুষ্ঠিত হয়। পুরো শহর উৎসবে মাতোয়ারা হয়ে যায়। একটি রথে চড়েই তিন ভাইবোন মাসির বাড়ি যান। এই রথের উচ্চতা নাকি পুরীর রথের চেয়েও বেশি। স্থানীয় আদিবাসীরা অক্ষয় তৃতীয়া থেকে সন্ধান করে শিয়ালি লতা নিয়ে এসে রথের রশি তৈরি করেন। রাজবংশের ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে যায় আদিম জনজাতির উত্তরাধিকার। প্রভু জগন্নাথ যে সকলের দেবতা, তাঁর দরবারে মানুষ নির্মিত উচ্চ-নীচের ভেদ নেই, এই উৎসব তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ।
এরপর উপনীত হই মা তারিণীর আঙিনায়। কেওনঝড় জেলার ঘাটগাঁওতে জাতীয় সড়কের পাশে ঘন জঙ্গলের মধ্যে অধিষ্ঠিত আছেন মা তারিণী। কেওনঝড়ের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। এই মন্দির পূর্ব ভারতের একটি অতি জাগ্রত শক্তিপীঠ। মায়ের দ্বারে উপনীত হতে পারলে সব দুঃখের বিনাশ হয়, মানুষের বিশ্বাস এমনটাই। মা তারিণী সবার ত্রাণকর্ত্রী। সকলের ভরসাস্থল। হাইওয়েতে দুর্ঘটনা ঠেকাতে ট্রাক ড্রাইভাররা মায়ের কাছে নারকেল মানত করেন। এই মানত ওড়িশার যে কোনো জায়গা থেকে করা যেতে পারে, কারণ বিনা পারিশ্রমিকে সেই মানতের নারকেল এক ড্রাইভার আরেকজনকে পৌঁছে দেন, তিনি দেন আরেকজনকে। এভাবে হাতফেরতা সেই নারকেল মা তারিণীর কাছে পৌঁছে যায়। এখানে এখনও প্রথম পূজার অধিকার আদিবাসী সম্প্রদায়ের পুরোহিতের। দেহুরি গোষ্ঠীর ভূমিপুত্ররা মায়ের উপাসনায় মুখ্য ভূমিকায় আসীন। মা এখানে শিলাখণ্ডে পূজিতা হন। এই মন্দিরের সঙ্গেও জড়িত অলৌকিক মাতৃমহিমা এবং প্রাচীন কিংবদন্তী। ১৪৮০ খ্রিস্টাব্দে কাঞ্চীর রাজকুমারী পদ্মাবতীর সঙ্গে বিবাহ স্থির হয়েছিল পুরীর গজপতি মহারাজ পুরুষোত্তম দেবের। কিন্তু জগন্নাথদেবের রথযাত্রার সময় মহারাজকে পথে সম্মার্জনী দিয়ে ধূলি দূরীকরণের কাজে লিপ্ত দেখে অপমানিত কাঞ্চীরাজ বিবাহ বাতিল করেন। তাতে ক্ষুব্ধ হয়ে পুরুষোত্তম দেব কাঞ্চী আক্রমণ করেন। প্রথমবার যুদ্ধে তিনি পরাস্ত হন। তারপর প্রভু জগন্নাথের শরণ নিয়ে কেওনঝড়ের যুবরাজ গোবিন্দ ভঞ্জকে সেনাপতি পদে বরণ করলে তাঁর নেতৃত্বে কাঞ্চী বিজয় সম্ভবপর হয়। বিজয়ী সেনাপতি কাঞ্চী থেকে মা তারিণীকে কেওনঝড়ে নিয়ে আসতে চান। মা তারিণী কেবল একটি শর্তে গোবিন্দ ভঞ্জের সঙ্গে আসতে সম্মতি দেন। সেটি এই যে তিনি গোবিন্দ ভঞ্জের পিছনে পিছনে যাবেন, গোবিন্দ ভঞ্জ দেবীর ঘোড়ার খুরের শব্দ পাবেন কিন্তু কোনো অবস্থাতেই পিছনে ফিরে দেখতে পারবেন না। ঘাটগাঁওয়ের জঙ্গলে প্রবেশ করার পর কাদায় মায়ের ঘোড়ার খুরের শব্দ বন্ধ হয়ে যায়। শর্ত ভুলে গোবিন্দ ভঞ্জ পিছনে তাকালে মা সেখানেই প্রস্তরীভূত হয়ে যান। আর গোবিন্দ ভঞ্জকে সেখানেই পূজার অনুমতি দেন। সেই থেকে তিনি এই বনের রানী। সেই থেকেই এই শক্তিপীঠের জন্ম।
ছোটবেলা থেকে ভূগোল বইতে পড়েছি এসব অঞ্চল লৌহ-আকরিক উত্তোলনের জন্য বিখ্যাত। কিন্তু লুণ্ঠিত প্রকৃতিকে ঠিক কেমন দেখায়, তা চাক্ষুষ করি। প্রকৃতিকে সম্পদের উৎস হিসেবে দেখতে গিয়ে মানুষের অস্তিত্বের মূলও যে তার সঙ্গে লগ্ন, সেকথা ভুলে গেছি আমরা। তাই সর্বত্র উন্নয়নের উন্মার্গগামী তাড়নায় আদিম পৃথিবীকে ফালাফালা করে ফেলা হচ্ছে। সভ্যতার এই আপাতসাফল্যের অন্তরালে রয়ে যাচ্ছে প্রাণচক্রের গভীর সংকটের নির্মম বাস্তব-ছবি। ‘রক্তকরবী’র ভাষায় পাতালে সুড়ঙ্গ খুদে বার করে আনা হচ্ছে ‘যক্ষের ধন’। হাজার বছরের অরণ্যের হরিদ্রাভ আচ্ছাদন উপড়ে ফেলে মাটির বুক থেকে তুলে আনা হচ্ছে খনিজ সম্পদ। ছিঁড়ে যাচ্ছে ঝরনার ধমনী। ক্ষয়িষ্ণু পরিবেশের প্রতি অসাড় ঔদাসীন্য আমাদের নিয়ে যাচ্ছে আরও খাদের কিনারে। সবুজ পাহাড়ের ওপর মাথা তুলেছে সুবিশাল মোবাইল টাওয়ার। একুশ শতকের প্রযুক্তিমুখরতার অগ্রদূত। তার তরঙ্গের দাপটে কমে যাচ্ছে পাখি। বৃষ্টিভেজা ভোরে যে পাখির গান শুনতে শুনতে এই অবকাশযাপন, তা আগামীতে আর থাকবে কী না সেই নাছোড় প্রশ্নটা মনের আকাশে মেঘের মতো ঘনায়। ফেরার পথে বাতাসে ওড়ে লৌহ আকরিকের লাল ধুলো, বৃষ্টির জলে ভেজা পথে তা লালচে কাদা হয়ে থাকে। চারপাশের কোলাহল থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে নিজেকে খোঁজার চেষ্টা করি। তারকোভস্কি লিখছেন কেবলমাত্র একধরনের যাত্রাই সম্ভব, তা হল নিজের ভেতরে যাত্রা। কথাটা যথার্থ। আমরা যেখানেই যাই, আসলে নিজের অন্তরের সত্তার খোঁজই করি নিরন্তর। সেই যাত্রাপথে প্রাপ্ত কিছু অনুভব আমাদের এই অকিঞ্চিৎকর জীবনকে সার্থক করে তোলে। সহসা ছিন্ন মেঘের ফাঁক দিয়ে অস্তরবির রশ্মি মুখে এসে পড়ে। চমক ভেঙে দেখি, ঠিক চন্দ্রবিন্দুর গানের কথাকে সত্যি করে আঁচল ঘেরা বৃষ্টিছাটের ঘ্রাণ রেখে মেঘের শিশু গিয়েছে ভাসান। চোখের সামনে দিগন্তবিস্তারী কাশফুলের হাত ধরে ‘মাঠে ঘাটে বাটে আরব্ধ আগমনী’।
আলোকচিত্র: লেখক

লেখক
অদিতি ব্যানার্জী
হুগলী মহসীন কলেজের অধ্যাপক। প্রথমে প্রেসিডেন্সি কলেজ ও পরে প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা ও গবেষণা। প্রাবন্ধিক। বই পড়তে ও ভ্রমণ করতে ভালোবাসেন।
সব কাজ দেখুন →আরও পড়ুন

ভ্রমণকাহিনি
জ্ঞানবৃক্ষের ফল, নির্মল নিস্তব্ধতা, ভাঙা মন্দির এবং স্বর্গের ঠিকানা
হেমন্তের মায়াবী রোদে মোড়া কাশ্মীর—যেখানে আপেল বাগানের মিষ্টি সুবাস আর জাফরানের খেত ছুঁয়ে বয়ে যায় হিমেল হাওয়া। ডাল লেকের বুকে শিকারায় ভেসে দূর পাহাড়ের গায়ে রঙের খেলা দেখা, পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথে পাইন-উইলোর ছায়া মাড়িয়ে দুধপাথরি বা সোনমার্গের নির্জন নিসর্গে হারিয়ে যাওয়া—এ যেন এক অলীক স্বপ্নের দেশ। শুধু প্রাকৃতিক শোভা নয়, এই উপত্যকার পরতে পরতে জড়িয়ে আছে শতাব্দী-প্রাচীন ইতিহাস আর স্থানীয় মানুষের হৃদয়স্পর্শী আতিথেয়তা।