তুলি-কলমের জাদুকর অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ছবি আঁকার রাজ্যে অবনীন্দ্রনাথ যেমন চিত্রবিদ্যার প্রতিটি শাখায় তাঁর তুলির আঁচড় কেটেছেন এবং প্রমাণ করেছেন আপন অন্তরের শিল্প সুষমা। লেখার আঙিনায় এসেও সাহিত্যের প্রতিটি শাখায় তিনি তাঁর মনের মত ফুল ফুটিয়েছেন। শিশুদের মনের অন্দরে এতো গভীর তল্লাশি অবনীন্দ্রনাথ ছাড়া কেউ আগে করেননি।
সংখ্যা ১অবনীন্দ্রনাথের সাহিত্য সৃষ্টির সম্যক আলোচনার পথে প্রধান অন্তরায় স্বরূপ একটি অনন্য মন্তব্য করেছেন লীলা মজুমদার, তাঁর বক্তব্য—“সাহিত্য সমালোচনার খাতাগুলি থেকে মাঝে মাঝে এক এক জনার নাম বাদ পড়ে যায়। অবনীন্দ্রনাথ তাদের মধ্যে একজন। সম্ভবত এর প্রধান কারণ হলো যে, খ্যাতির রাজ্যে অবনীন্দ্রনাথের দুজন বড় প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন—একজনের নাম রবীন্দ্রনাথ। যার সঙ্গে তুলনা করলে সেই সময়কার অপর সকলের প্রতিভাকেই খর্ব মনে হত। অপর প্রতিদ্বন্দ্বী হলেন সেই অবনীন্দ্রনাথ, যিনি ছবি আঁকতেন। বিশেষ করে এই দ্বিতীয় জনের জন্যই সে সময় সাহিত্যক্ষেত্রে অবনীন্দ্রনাথের তেমন নাম হল না।”১
একথা সত্যি, চিত্রশিল্পী অবনীন্দ্রনাথ সাহিত্য সৃজনকারী অবনীন্দ্রনাথের তুলনায় সাধারণের কাছে বেশি সমাদৃত। বাংলা চিত্রশিল্পের ধারায় অবনীন্দ্রনাথের অবদান অনস্বীকার্য। চিত্রশিল্পের নানান শাখায়, বৈচিত্র্যময় মাধ্যম যোগে অবনীন্দ্রনাথ তার দক্ষতা দেখিয়েছেন। নানাবিধ পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ফুটে উঠেছে কত বিচিত্র শিল্প সুষমা। সাহিত্যের অঙ্গনে প্রবেশের আগে, তিনি রীতিমতো শিল্পী। তাই অবনীন্দ্রনাথ-কৃত সাহিত্য সৃজনের প্রসঙ্গেও শিল্পের কথা এসে পড়ে। আসলে সাহিত্যিক অবনীন্দ্রনাথের কলমের অগ্ৰভাগেও ছিল এক অদৃশ্য তুলি, তাই তার লেখা সাহিত্য হয়ে উঠেছে আর এক চিত্র, তার গল্পরা পেয়েছে চল-চিত্রের গতিময়তা। এ প্রসঙ্গে অশোকবিজয় রাহার মন্তব্যটি প্রণিধানযোগ্য, তিনি বলছেন—“অবনীন্দ্রনাথ আসলে রূপলোকেরই সাধক, বাণীলোকে এসেও তিনি মুখ্যত চিত্রশিল্পী। এই প্রসঙ্গে একটি পরিচিত দৃষ্টান্ত মনে আসে- রবীন্দ্রনাথের তুলির মুখে একদিন ঝাঁকে ঝাঁকে আশ্চর্য রকমের ছবি বেরিয়ে এসেছিল, শেষ জীবনে হঠাৎ ছবি আঁকতে শুরু করে সম্ভবত আড়াই হাজারের বেশি ছবি এঁকেছেন তিনি, কিন্তু তবু আমরা তাঁকে প্রধানত কবি বলেই জানি। তিনি নিজেও বলেছেন, তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি কবি। এর ঠিক উল্টোরকমটি ঘটেছে অবনীন্দ্রনাথের বেলায়। রবীন্দ্রনাথ মুখ্যত কবি হয়েও বাণীর আবেগকে মুক্তি দিয়েছিলেন রেখায়, আর অবনীন্দ্রনাথ মূলতঃ চিত্রশিল্পী হয়েও রূপসৃষ্টির আবেগকে ভাষা দিয়েছেন লেখায়। বাণীলোকে এসেও তাই ছবির জাদুকর হয়েই দেখা দিলেন তিনি।”২
চিত্রশিল্পের জগৎ থেকে অবনীন্দ্রনাথকে বাণী-শিল্পের আঙিনায় নিয়ে এলেন রবীন্দ্রনাথ, অবনীন্দ্রনাথের রবিকা। ‘জোড়াসাঁকোর ধারে’ গ্ৰন্থে অবনীন্দ্রনাথ সেকথা স্মরণ করেছেন, রবীন্দ্রনাথ তাকে বলেছিলেন—‘তুমি লেখো না, যেমন করে তুমি মুখে মুখে গল্প কর তেমনি করেই লেখ।’৩ অবনীন্দ্রনাথ সে কথায় ভয় পেলে, কবির অভয় বাণী ছিল—‘তুমি লেখোই-না, ভাষায় কিছু দোষ হয় আমি তো আছি।’৪ এরপর ভরসা পান অবনীন্দ্রনাথ। প্রথম রচনা ‘শকুন্তলা’ (১৮৯৫)। চব্বিশ বছরের তরুণ শিল্পীর প্রথম গদ্যগ্রন্থ। এরপর একে একে ‘ক্ষীরের পুতুল’ (১৮৯৬), ‘রাজকাহিনী’ ১ম খন্ড (১৯০৯), ‘ভূতপতরির দেশ’ (১৯১৫), ‘নালক’ (১৯১৬), ‘পথে বিপথে’ (১৯১৮), ‘বাংলার ব্রত’ (১৯১৯), ‘খাতাঞ্চির খাতা’ (১৯২১), ‘রাজকাহিনী’ ২য় খন্ড (১৯৩১), ‘বুড়ো আংলা’ (১৯৪১) প্রভৃতি গদ্য-গল্পে চিত্রশিল্পী অবনীন্দ্রনাথের বিচিত্র প্রকাশ। উল্লেখ্য বেশিরভাগ গদ্য রচনায় ভাইপো অবন কিন্তু রবিকা’র নির্দেশ মেনেছেন। যেমন, যে বইটি দিয়ে অবনীন্দ্রনাথের সাহিত্য জগতে হাতেখড়ি, সেই ‘শকুন্তলা’ বইয়ের নির্বাচিত অংশ একসময় আমাদের সরকারি বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণীতে পাঠ্য ‘কিশলয়’ গ্ৰন্থের অন্তর্ভুক্ত ছিল, যা শিশুর বর্ণপরিচয় তথা হাতেখড়ির পরই প্রথম পাঠ। অবনীন্দ্রনাথের গদ্যের সঙ্গে আমাদের প্রথম পরিচয় ঐ দ্বিতীয় শ্রেণীতে পাঠ্য ‘শকুন্তলা’-র অংশবিশেষ, তার গদ্য দৃষ্টান্ত—“একটি নিবিড় অরণ্য ছিল। তাতে ছিল বড় বড় বট, সারি সারি তাল তমাল, পাহাড় পর্বত আর ছিল—ছোটো নদী মালিনী। মালিনীর জল বড় স্থির—আয়নার মতো। তাতে গাছের ছায়া, নীল আকাশের ছায়া, রাঙা মেঘের ছায়া—সকলি দেখা যেত। আর দেখা যেত গাছের তলায় কতকগুলি কুটিরের ছায়া।”৫ যেন ছবি। এক একটি তুলির আঁচড়ে খুলে যাচ্ছে তপোবনের জগৎ। ছোট ছোট বাক্যে যেন এক একটি দৃশ্যপট উন্মুক্ত হচ্ছে। বর্ণনার সাবলীলতায় অনুভূতিপ্রবণ পাঠক বা কল্পনাপ্রিয় শিশুর কাছে, ‘সারি সারি তাল তমাল’-এর ছবি তার মানসপটে ফুটে উঠবে। ‘ছোটো নদী মালিনী’ ভেসে উঠবে একেবারে চোখের পাতায়। ‘শকুন্তলা’ গ্ৰন্থের আর একটি অংশের গদ্য দৃষ্টান্ত—“অমনি হাতীশালে হাতী সাজল, ঘোড়াশালে ঘোড়া সাজল, কোমর বেঁধে পালোয়ান এল, জাল ঘাড়ে জেলে এল। তারপর সারথি রাজার সোনার রথ নিয়ে এল, সিংহদ্বারে সোনার কপাট ঝনঝনা দিয়ে খুলে গেল।”৬ সেই যে রবিকাকা বলেছিলেন, ‘তুমি লেখো না, যেমন করে তুমি মুখে মুখে গল্প কর তেমনি করেই লেখো।’—এই ‘ঝনঝনা’ হলো সেই ‘মুখে মুখে গল্প’ করার মতো করে লেখা। খাঁটি লেখা। কোনো কৃত্রিমতা নেই। কোনো ভান ভনিতা নেই। আছে এক নির্ভার এক গদ্য। মুখে মুখে গল্প করার সৌরভ ছড়িয়ে আছে অবনীন্দ্রনাথের অধিকাংশ লেখায়। সেই সুরভিত সুষমা প্রমাণের জন্য, চাইলে অবনীন্দ্রনাথের সম্পূর্ণ গদ্য রচনাই দৃষ্টান্ত স্বরূপ রাখা যেতে পারে। মুখে গল্প করার লিখিত শৈলী জানতে আমরা আরও একবার ‘শকুন্তলা’-রই দ্বারস্থ হই—
“তারপর কি হল?
দুঃখের নিশি প্রভাত হল, মাধবীর পাতায় পাতায় ফুল ফুটল, নিকুঞ্জের গাছে গাছে পাখি ডাকল, সখীদের পোষা হরিণ কাছে এল।
আর কি হল?
বনপথে রাজা বর কুঞ্জে এল।
আর কি হল?
পৃথিবীর রাজা আর বনের শকুন্তলা দুজনে মালা বদল হল। দুই সখীর মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হল।
তারপর কি হল?
তারপর কতদিন পরে সোনার সাঁজে সোনার রথ রাজাকে নিয়ে রাজ্যে গেল, আর আঁধার বনপথে দুই বনপথে দুই প্রিয়সখী শকুন্তলাকে নিয়ে ঘরে গেল।”৭
—একি ছবি? না, কবিতা? না, ছবির রঙে কবিতার ঢঙে লেখা গদ্য। এ হল অবনীন্দ্রনাথের স্বকীয় গদ্য। একেবারে আপন ঘরানা।
রবীন্দ্রনাথের নির্দেশে এবং আশ্বাসে অবনীন্দ্রনাথের কলম ধরা। কিন্তু কোথাও কোনো গদ্য গল্পে রবীন্দ্রনাথকে অনুকরণ করেননি অবনীন্দ্রনাথ, এমনকি অনুসরণও নয়। রবিকাকাকে, তাঁর জীবনচর্চাকে অবনীন্দ্রনাথ আদর্শ মেনেছিলেন কিন্তু নির্মাণের জগতে অবনীন্দ্রনাথ স্বতন্ত্র। সেখানে তাঁর আদর্শ তিনি নিজেই। অবনীন্দ্রনাথের এই স্বকীয়তা সম্পর্কে এক অসামান্য মন্তব্য করেছেন লীলা মজুমদার—‘অবনীন্দ্রনাথ রবিকাকার গভীর ভক্ত হওয়া সত্ত্বেও তাঁর কোন রচনাতেই রবীন্দ্রনাথকে অনুকরণের চেষ্টা নেই। অবনবাবুর ছবি ও লেখা তাঁর একান্ত নিজস্ব। তাঁর ভাষাতেও কোথাও রবীন্দ্রনাথের প্রতিধ্বনি নেই।... বাংলা সাহিত্যের যদি শ্রেণীবিভাগ করতে হয়, রবীন্দ্রনাথের ভক্তদের বিরাট দলকে স্বীকার করে নিতে হয় যাঁরা গোটা একটা রবীন্দ্র ঐতিহ্যকে তাঁদের সাহিত্য সাধনার মূলমন্ত্র বলে গ্রহণ করে নিয়েছেন কিন্তু সে দল থেকে তাঁর ভক্তদের এই সেরা ভক্তকেই বাদ দিতে হয়। রবীন্দ্রনাথ অবনের মনের দরজার চাবি খুলে দিয়েছিলেন নিঃসন্দেহে, তার চেয়েও বড় কাজ করেছিলেন যে, খোলা দরজা দিয়ে তাকে বেরিয়ে পড়বার নির্দেশ দিয়েছিলেন।’৮ বাস্তবিক তাই, অবনীন্দ্রনাথের সাহিত্য সৃজনের দীপশিখাতে রবীন্দ্রনাথ সলতে পাকানোর কাজটুকুই করেছিলেন। তারপর সে দীপশিখার অম্লান দীপ্তি অবনীন্দ্রনাথের স্বীয় প্রতিভারই উজ্জ্বলতা।
ছবি আঁকার রাজ্যে অবনীন্দ্রনাথ যেমন চিত্রবিদ্যার প্রতিটি শাখায় তাঁর তুলির আঁচড় কেটেছেন এবং প্রমাণ করেছেন আপন অন্তরের শিল্প সুষমা। লেখার আঙিনায় এসেও সাহিত্যের প্রতিটি শাখায় তিনি তাঁর মনের মত ফুল ফুটিয়েছেন। শিশুদের মনের অন্দরে এতো গভীর তল্লাশি অবনীন্দ্রনাথ ছাড়া কেউ আগে করেননি। ‘ক্ষীরের পুতুল’-এর ক্ষীরের পুতুলটি ছাড়াও সুয়োরাণী দুয়োরাণী, ‘নালক’-এর নালক ও দেবলঋষি, ‘বুড়ো আংলা’-র রিদয় ও গনেশঠাকুর—এই সব, এরা সব্বাই শিশুর মনে স্থায়ী আসন করে নিয়েছে। শিশুদের জন্য সাহিত্য-রসের আয়োজনের পাশাপাশি তাদের বাংলা বর্ণপরিচয়ের বন্দোবস্ত করেছেন একেবারে অভিনব পন্থায়। একজন দক্ষ চিত্রকর বাংলা বর্ণের জ্যামিতিক কাঠামোকে মূল করে, নানা পশুপাখির আদলে সেইসব বর্ণকে হাজির করেছেন শিশুদের কাছে। বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’, রবীন্দ্রনাথের ‘সহজ পাঠ’ পড়ুয়া শিশু অভূতপূর্ব বিস্ময়ে দেখে অবনীন্দ্রনাথের ‘চিত্রাক্ষর’, ‘রেখাক্ষর’ ও ‘চিত্রে বর্ণমালা’-র মত ভিন্নমাত্রার আঁকা-লেখাকে। চিত্র বিচিত্রের মধ্যে অক্ষর খুঁজে নেওয়ার আনন্দে শিশুদের বর্ণের সঙ্গে যে পরিচয়,তার জুড়ি মেলা ভার। আবার পরিণত মনের জন্য আছে ‘পথে বিপথে’, ‘বাংলার ব্রত’, ‘বাগেশ্বরী শিল্প’—সবই এক চিত্রকরের চোখে দেখা জগৎ-জীবন ও শিল্প। আর শেষজীবনে এক স্বগত কৌতুকে অবনীন্দ্রনাথ লিখে চলেছেন—পুরাণ, রামায়ণ, মহাভারতের গল্প অবলম্বনে যাত্রা-পালা। গদ্যকে ভেঙেচুরে, গদ্যপদ্যের মিলমিশ ঘটিয়ে এক বিচিত্র কোলাজ তৈরি করছেন তিনি। যেন রঙের সঙ্গে রঙ মিশিয়ে নতুন রঙ তৈরির নেশা তাকে পেয়ে বসেছে।
অবনীন্দ্রনাথ তাঁর নিজের সৃষ্টি সম্পর্কে বলেছিলেন—‘ওবিন ঠাকুর ছবি লেখে’। এই ‘ছবি লেখা’ কথাটা মোটেই যে তিনি কাব্য করে বলেননি, সে কথাও যুক্তি তথ্য দিয়ে প্রবন্ধে লিখেছেন লেখক। যে আদিম মানুষের গুহাচিত্র নিছক ছবি নয় সে একটা বক্তব্য। অবনীন্দ্রনাথের বেলায় কথাটা দ্বিমাত্রিক। তিনি যেসব ছবি এঁকেছেন তা শুধু স্থির চিত্র নয়, সেগুলি কোনো-না কোনোভাবে বার্তাবাহী। আর তাঁর লিখিত রচনাগুলির অঙ্গে অঙ্গে জড়িয়ে আছে চিত্রময়তা। অর্থাৎ তাঁর লেখা ও আঁকা দুটোই শিল্পের অনুষঙ্গে, উভয়েই জাতশিল্পীর মানসজাত। ধরা যাক, তাঁর ছবি ‘শকুন্তলা ও মায়ামৃগ’ শুধুমাত্র চিত্রে বাঁধা নেই, হয়ে উঠেছে বাঙ্ময়। অন্যদিকে তাঁর রচনা ‘শকুন্তলা’ নিছক রচনা নয়, যেখানে গল্পের বুননে ক্ষণে ক্ষণে ফুটে উঠেছে ছবি। ইতিহাস আশ্রিত রাজা-উজিরদের চিত্রাবলী আর ‘রাজকাহিনী’-র আখ্যানগুলির সাযুজ্যও ঐ একসূত্রে বাঁধা। একটি তুলির ফসল, অন্যটি কলমের প্রকাশ। লেখার ক্ষেত্রেও অবনীন্দ্রনাথের চোখ যে শিল্পীর চোখ তার প্রমাণ মেলে গদ্যের বর্ণনায়। চোখের দেখাটা খুব স্বচ্ছ না হলে ঐ সাবলীল লেখা অসম্ভব। অবনীন্দ্রনাথ দেখতে জানতেন এবং সে দেখার সঙ্গে শিল্প-সুষমা যোগ করে অনন্য-মাত্রায় তা অন্যদেরকে দেখাতে পারতেন। একটু দৃষ্টান্ত দেওয়া যাক, তাঁর ‘আপন কথা’ বলতে গিয়ে, ছোটবেলায় তাঁর পরিচর্যায় থাকা ‘পদ্মদাসী’-র বর্ণনা দিতে গিয়ে লিখছেন—“কোন গাঁয়ের কোন ঘর ছেড়ে এসেছিলো অন্ধকারের মতো কালো আমার পদ্মদাসী? শুনি সে ভীষণ কালো ছিল। পদ্ম নামটা মোটেই তাকে মানাতো না। সে তার বেমানান নাম নিয়েই এসেছিলো এ বাড়িতে। রাগ করে গেছে, গল্প বলেছে, ঝগড়া করেছে, কাজও করেছে এবং মানুষ করবার বকশিস সোনার বিছেহার আর রক্তের টিপ্ পরে চলেও গেছে বহুদিন।”৯ যা অন্যের চোখ এড়িয়ে যায়, তা শিল্পীর চোখে ধরা পড়ে। সামান্যা দাসী, তার রাগ অভিমানের কথাও অনুভব দিয়ে লিখেছেন শিল্পী। ‘আপন কথা’ গ্ৰন্থের ‘উত্তরের ঘর’ স্মৃতিচারণে পদ্মদাসীর মতো ভিস্তিওয়ালার কথা বলতে গিয়েও অবনীন্দ্রনাথ এক অসামান্য পর্যবেক্ষক। যার কলমে লেখা হয়—
“... বাঁধা কাজে বাঁধা ভিস্তি, তার চাল চোল সমস্তই এমন বাঁধা ছিলো যে মনেই আসতো না সে মরতে পারে, বদলাতে পারে। ঘড়ির মতো দস্তুর মাফিক বাঁধা নিয়মে কাজ বাজিয়ে চলতো, দাঁড়াতো যেখানকার সেখানে, জল ভরতো সেখানে দিনের পর দিন। তার চেহারা দেখিনি, শুধু তার চলার ভঙ্গী, কাপড়ের রঙ- এই বিশেষত্ব দিয়েই তাকে আমি দেখতে পাই- সেকাল একাল মিলিয়ে সবকালেই সে একই ভিস্তি।”১০
রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘সহজ কথা যায় না বলা সহজে’। অবনীন্দ্রনাথ সেই কঠিন কাজটিতে সহজেই সফল হয়েছেন। রবি কাকার ঐ নির্দেশিকা—মুখে মুখে গল্প করার মতো লেখার কৌশল দিয়েই তিনি জিতে নিলেন যত স্বপ্নিল হৃদয়, আর কল্পনা-প্রিয় মানুষের মন। আর যত রাজ্যের শিশুদের হৃদয় হরণ তো করলেনই, তাঁর তুলি-কলমের আশ্চর্য জাদুতে। লীলা মজুমদার যথার্থই বলেছেন, অবনীন্দ্রনাথ শিশুদের লেখার জন্য যে কলম ব্যবহার করতেন তা নাকি কালিতে না চুবিয়ে মধুতে চুবাতেন। সত্যিই তাই। ‘ক্ষীরের পুতুল’, ‘বুড়ো আংলা’, ‘নালক’ মধুর কলমেই রচিত। আজকের শিশুরাও সেই মৌতাতে বুঁদ হয়ে যায়। অবনীন্দ্রনাথ বড়দের জন্য অবশ্যই লিখেছেন, শিল্প সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য অভিমত যেগুলি প্রবন্ধ আকারে লিখিত, এছাড়া রম্যরচনা, স্মৃতিচারণা মূলক গ্ৰন্থের সুখপাঠ বড়দের আবিষ্ট করে রাখে। তবে অবনীন্দ্রনাথের কলমটি বিশেষ করে কল্প-প্রিয় শিশুদের গল্প শোনানোর জন্য খুবই শানিত। যেসব শিশু স্বপ্নচারী, ভাবুক, যার ইচ্ছের আছে জোর সে অবশ্যই অবন ঠাকুরের রচনায় পেয়ে যাবে আপন ভুবন। লেখকও তাঁর নিজের লেখা সম্পর্কে এই অভিমতই দিয়েছেন। একটু দীর্ঘ উদ্ধৃতি হলেও, অবনীন্দ্রনাথের ‘আপন কথা’-তে যে ‘মনের কথা’ রচনা আছে, যা তাঁর সার্বিক রচনা সম্পর্কে খাঁটি কথা। তিনি বলছেন—“আমার ভাব ছোটদের সঙ্গে—তাদেরই দিলাম এই লেখা খাতা। আর যারা কিনে নিতে চায় পয়সা দিয়ে আমার জীবন ভরা সুখদুঃখের কাহিনী এবং সেটা ছাপিয়ে নিজেরাও কিছু সংস্থান করে নিতে চায় তাদের আমি দূর থেকে নমস্কার দিচ্ছি। যারা কেবল শুনতে চায় আপন কথা, থেকে থেকে যারা কাছে এসে বলে ‘গল্প বলো’, সেই শিশু জগতের সত্যিকার রাজা-রাণী-বাদশা-বেগম তাদেরই জন্য আমার এই লেখা পাতা ক’খানা। শিশু সাহিত্য সম্রাট যারা এসেছেন এবং আসছেন তাদের জন্য রইলো বাঁ হাতে সেলাম, আর ডান হাতের কুর্নিশ রইলো তাদেরই জন্য যারা বসে শোনে গল্প রাজা বাদশার মতো- কিন্তু ছেঁড়া মাদুরে নয়তো মাটিতে বসে, আর গল্পের মাঝে মাঝে থেকে থেকে যারা বকশিশ দিয়ে চলে একটু হাসি, একটু কান্না, মানপত্র নয়, সোনার পদকও নয়, হয় একটু দীর্ঘশ্বাস, নয় একটুখানি ঘুমে-ঢোলা চোখের চাহনি।... অনেক ভুগে যাওয়া এসব কাহিনী, কিনতে গেলে ঠকতে হয়। বলে যাওয়া চলে কেবল তাদেরই কাছে নির্ভয়ে, মনের কথা বেচা-কেনার ধার ধারে না যারা, যাত্রা করে বেরিয়েছে যারা, কেউ হামাগুড়ি দিয়ে, কেউ কাঠের ঘোড়া চড়ে, নানা ভাবে নানা দিকে আলিবাবার গুহার সন্ধানে।”১১ আপন লেখা সম্পর্কে অবনীন্দ্রনাথের ‘আপন কথা’-র বক্তব্যটি একেবারে যথার্থ। অবনীন্দ্রনাথের সময়কাল থেকে এই সময়ের সব শ্রেণীর শিশুর দল যারা ভাবুক, কল্পনা-প্রিয়, অনুসন্ধানী যাদের মন, আবার যেসব বড়োরা এখনও বুড়িয়ে যাননি, মুড়িয়ে যায়নি যাদের রঙবেরঙের লেখাআঁকার অভ্যন্তরে থাকা বিচিত্র রসাস্বাদনের ইচ্ছে, তাদের কাছে অবনীন্দ্রনাথের সাহিত্য-জগৎ এক আশ্চর্য মায়াময় দেশ।
তথ্যসূত্র
(১) লীলা মজুমদার, ‘যে দেখতে জানে’, ‘বিশ্বভারতী পত্রিকা’, বর্ষ ১৬, কার্তিক-চৈত্র ১৮৮১-৮২ শকাব্দ, পৃ. ১৫২।
(২) অশোকবিজয় রাহা, ‘বাণী-শিল্প অবনীন্দ্রনাথ’, ‘বিশ্বভারতী পত্রিকা’, বর্ষ ১৬, কার্তিক-চৈত্র ১৮৮১-৮২ শকাব্দ, পৃ. ১০৩।
(৩) অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও রানী চন্দ, ‘জোড়াসাঁকোর ধারে’, কলকাতা: বিশ্বভারতী গ্রন্থালয়, ১৩৫১ বঙ্গাব্দ, পৃ. ১২২।
(৪) ঐ
(৫) অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ‘শকুন্তলা’, ‘শ্রেষ্ঠ অবনীন্দ্রনাথ’, পত্রভারতী, ২০১৩, পৃ. ২২৮।
(৬) ঐ, পৃ. ২৩০।
(৭) ঐ, পৃ. ২৩২।
(৮) লীলা মজুমদার, ‘যে দেখতে জানে’, লীলা মজুমদার, পৃ. ১৫৬।
(৯) অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ‘আপন কথা’, কলিকাতা: সিগনেট প্রেস, ১৩৫৩ বঙ্গাব্দ, পৃ. ১৩।
(১০) ঐ।
(১১) ঐ।

লেখক সম্পর্কে
আবীর কর
আবীর কর বিশ্বভারতী-র বাংলা বিভাগের প্রাক্তন ছাত্র ও গবেষক। বর্তমানে ঝাড়গ্রামের জামবনি বাণী বিদ্যাপীঠের শিক্ষক। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ: ‘সহজ পাঠ : বই-চিত্র’, ‘ভোটের রঙ্গ-রসিকতা’। সম্পাদিত বই : ‘অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিত্রাক্ষর ও অন্যান্য’, ‘উনিশ শতকের বিস্মৃত বাংলা প্রাইমার’, ‘সহজ রচনাশিক্ষা’। পছন্দের বিষয় রবীন্দ্রনাথ, পুরনো পত্রপত্রিকা।
এই লেখকের সব লেখা দেখুন →সংখ্যা ১-এর অন্যান্য লেখা
সংখ্যা ১