প্রেস

প্রেসের কথা

লেখার আকার

বই প্রকাশের সিদ্ধান্ত কখনও আমাদের বাইরে থেকে নিতে হয়নি। বই প্রকাশ আমাদের কাছে অনিবার্য হয়ে উঠেছিল। প্যারালাল প্রেসের উত্থান এভাবেই। ফেসবুকের প্যারালাল পেজ থেকে প্যারালাল প্রেসের পরিসরে, বই প্রকাশনার জগতে। প্যারালাল প্রেসের কাজে যারা বেশি সময় দিতে পারি তাদের নানান ক্ষণস্থায়ী লিটিল ম্যাগাজিনের পূর্ব অভিজ্ঞতা এখানে বেশ কাজে লাগলো। প্যারালাল নামে একটি পত্রিকাও শুরু হল, বিশেষ সংখ্যা হিসেবে—কিন্তু পত্রিকার ধারাবাহিকতা রাখতে পারা গেল না, থমকে রইল একটি সংখ্যাতেই। যদিও, পত্রিকার পরবর্তী সংখ্যা নিয়ে পরিকল্পনা কিন্তু কম হল না। কিন্তু মন পড়ে রইল বই প্রকাশেই। বিজ্ঞান, ইতিহাস, সমাজ ও সংস্কৃতি, প্রত্নতত্ত্ব, সুন্দরবন, সুন্দরবনের মানুষ এবং তাঁদের যাপন। বিভিন্ন বিষয়ের মধ্যে দিয়ে আমাদের প্রকাশনার পরিসরও বাড়তে থাকল।

আমরা কোনও একটি বিষয়ের প্রকাশনা হতে চাইনি। বিজ্ঞান আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাস গুরুত্বপূর্ণ। লোকসংস্কৃতি গুরুত্বপূর্ণ, সুন্দরবন গুরুত্বপূর্ণ—সুন্দরবনের মানুষ, তাঁদের জীবন, তাঁদের সংগ্রাম, তাঁদের পরিবেশ গুরুত্বপূর্ণ। নৃ-তত্ত্ব, প্রত্নতত্ত্ব, সমাজ, সংস্কৃতি—সবই আমাদের আগ্রহের বিষয়। কারণ পৃথিবীকে বোঝার জন্য একটি মাত্র জানালা যথেষ্ট নয়। ইতিহাসকে বুঝতে গেলে ভূগোলের দরকার হয়। ভূগোলকে বুঝতে গেলে মানুষের জীবনকে দেখতে হয়। মানুষের জীবনকে বুঝতে গেলে অর্থনীতি, রাজনীতি, পরিবেশ, সংস্কৃতি—সবকিছুর দিকে তাকাতে হয়। তাই প্যারালালের বইয়ের বিষয়ও এক জায়গায় থেমে থাকেনি। আমরা চেষ্টা করেছি এমন বিষয় নিয়ে বই করতে, যেগুলো পাঠকের কৌতূহল বাড়ায়। এমন বিষয়, যা হয়তো ‘বাজার’-এর সবচেয়ে সহজ বিষয় নয়, কিন্তু পড়ে ফেললে পাঠক মনে করেন—‘এই বইটা আমার পড়া দরকার ছিল।’

প্যারালালের যাত্রায় একটা সময় আমরা ফিরে তাকালাম আমাদের নিজেদের ছোটোবেলার দিকে। সোভিয়েত শিশু সাহিত্য—সেই রঙিন প্রচ্ছদ। সেই ছবিগুলো। সেই গল্প। সেই অদ্ভুত এক পৃথিবী, যেখানে বই শুধু গল্প বলত না—ছোটোদের কল্পনাশক্তির সঙ্গে বন্ধুত্ব করত। অনেকের ছোটোবেলা এই বইগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে। কেউ কোনও বইয়ের নাম মনে রেখেছেন, কিন্তু বইটি আর নেই। কারও শুধু প্রচ্ছদের রং মনে আছে। কারও মনে আছে কোনও একটা বা দুটো চরিত্র। কারও মনে আছে বইয়ের পাতার গন্ধ। আর কারও কাছে সেই বই মানেই ছোটবেলায় ফিরে যাওয়া। আমরা সেই স্মৃতিকে চিনেছিলাম। কিন্তু সেই নস্টালজিয়াকে কোনোভাবেই ব্যাবসার সুযোগ হিসেবে দেখতে চাইনি। আমরা চাইনি পুরোনো বইয়ের একটা ছবি তুলে, সেটাকে কোনওভাবে ফ্যাক্সিমিলি করে ছেপে, দ্রুত ‘বাজারে’ ছেড়ে দিতে। তার বদলে আমরা অন্য পথ বেছে নিয়েছি। সময় নিয়ে কাজ করার পথ। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মানুষের বৌদ্ধিক সহায়তা, আর্থিক সহায়তা, পরামর্শ এবং শ্রম নিয়ে বইগুলোকে নতুন করে প্রস্তুত করার চেষ্টা করেছি। সম্পাদনা করেছি যত্ন নিয়ে। প্রয়োজনীয় কাজ করেছি। ছবির মান, মুদ্রণ, বিন্যাস—যতটা সম্ভব গুরুত্ব দিয়ে দেখেছি। কারণ আমাদের কাছে এই বইগুলো শুধুমাত্র পুরোনো বই নয়। এগুলো বহু মানুষের স্মৃতির অংশ। আর সেই স্মৃতির সঙ্গে কাজ করার সময় একটু বেশি যত্নবান হওয়া দরকার বলেই মনে হয়। আমরা জানতাম, এই বইগুলোর মধ্যে একটা নস্টালজিক মূল্য আছে। কিন্তু সেই নস্টালজিয়াকে আমরা পণ্য হিসেবে ব্যবহার করতে চাইনি, তার বড় প্রমাণ বইগুলোর সাধ্যমত উচ্চমানের পাশাপাশি অত্যন্ত কম বিনিময় মূল্য। আমরা চেয়েছি—যে ছোটোবেলার রঙিন মুহূর্তগুলো হারিয়ে গিয়েছিল, সেগুলোকে আবার ফিরিয়ে দিতে। একজন বাবা তাঁর ছোটোবেলার বইটা নিজের সন্তানের হাতে তুলে দিয়েছেন। একজন মা তাঁর ছেলেমেয়েকে দেখিয়ে বলেছেন—‘এই বইটা আমিও ছোটবেলায় পড়তাম।’ কেউ নিজের পুরোনো স্মৃতির সঙ্গে নতুন করে দেখা করেছেন। কেউ আবার সেই বই পরের প্রজন্মের হাতে তুলে দিয়েছেন। এই জায়গাটাই আমাদের কাছে সবচেয়ে আনন্দের—একটা বই তখন আর শুধু একটা বই থাকে না; এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মের মধ্যে একটা ছোট্ট সেতু হয়ে ওঠে।

স্বাভাবিক নিয়মেই প্যারালাল প্রেসের সঙ্গে অনেকগুলো বইয়ের নাম জড়িয়ে গেছে। লেখক জড়িয়ে আছেন। সম্পাদক জড়িয়ে আছেন। প্রচ্ছদশিল্পী, অনুবাদক, প্রুফরিডার, মুদ্রণ কর্মী, কাগজ বিক্রেতা, বাঁধাই কর্মী, বই বিক্রেতা এবং পাঠক—অসংখ্য মানুষের শ্রম জড়িয়ে আছে। কিন্তু এই সবকিছুর মাঝেও আমরা ভুলতে চাই না সেই প্রথম পেজটাকে। সেই ছোট্ট ফেসবুক পেজ। যেখানে কখনও বিজ্ঞান, ইতিহাস, শিল্প সংস্কৃতি, সাহিত্য নিয়ে লেখা হত। পেজটাই যেন আমাদের ভবিষ্যৎ পথ চলার দিকনির্দেশ করে দিয়েছিল। একটি বই থেকে একটি প্রকাশনা। এই পথটা কোনও প্রতিষ্ঠানের পরিকল্পনামাফিক তৈরি করা পথ নয়। এটি তৈরি হয়েছে মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগে। কেউ লিখেছেন। কেউ পড়েছেন। কেউ প্রশ্ন করেছেন। কেউ ভুল ধরেছেন, সমালোচনা করেছেন। কেউ আর্থিক সাহায্য করেছেন। কেউ বই কিনেছেন। কেউ আবার বইটি পড়ে আর একজনকে বলেছেন—‘এটা পড়ো।’ প্রকাশনার ইতিহাসের বড়ো বড়ো অধ্যায়ে হয়তো এই ছোটো ছোটো ঘটনাগুলোর কোনও হিসাব থাকে না। কিন্তু আমাদের কাছে প্যারালালের চলার পথে এই সবকিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই অসংখ্য ছোটো ছোটো ঘটনার যোগফলই আজকের প্যারালাল প্রেস।